আবহমান বাংলায় পয়লা বৈশাখকে বলা হয় ‘পুণ্যাহ’। শব্দটির অর্থ আরও একটু প্রশস্ত করে বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে যেতে পারেন পুণ্যার্জনে। চেনা ছকের বাইরে ভ্রমণের উদ্দেশ্য থাকলে বেছে নিতে পারেন তিন তীর্থ স্থান। সচরাচর যাওয়া হয় না, কিন্তু জায়গাগুলি ভালই লাগবে। তালিকায় থাকবে কী?
রামপ্রসাদের ভিটে। ছবি: সংগৃহীত।
রামপ্রসাদের ভিটে, হালিশহর: যাঁর শ্যামাসঙ্গীতের আবেশে চোখে জল আসে, সেই কালীসাধক কবিরঞ্জন রামপ্রসাদের ভিটে রয়েছে গঙ্গা তীরবর্তী হালিশহরে।
হালিশহর আর পাঁচটা মফস্সলের মতোই। টোটো-অটোর ভিড় রাস্তায়। তবে রামপ্রসাদের মন্দির চত্বরটি বেশ খোলামেলা। এখানেই এক সময় তাঁর ভিটে ছিল। রামপ্রসাদের ভিটেতে কালীমন্দির, উপাসনাকক্ষ, প্রাচীন পঞ্চবটী, বাঁধানো জলাশয় রয়েছে। নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে সেই সব। মন্দিরে বিশেষ বিশেষ তিথিতে পুণ্যার্থীদের ঢলও নামে।
এই কালীক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা লোককথা, ইতিহাস। প্রতিমার রূপ ভারি স্নিগ্ধ, তাঁর মুখে রয়েছে প্রসন্নতা। হালিশহরের মন্দির চত্বরের গা বেয়ে গিয়েছে রাস্তা। রাস্তার অন্য পাশে গঙ্গা। শোনা যায়, রানি রাসমণি এই ঘাটেই স্নান করতে আসতেন। সকাল সকাল পৌঁছলে কুপন কেটে ভোগও খেতে পারেন।
আশপাশে দেখার মতো আছে অসমবঙ্গীয় শাশ্বতমঠ, পূষণ আশ্রম, শঙ্কর মঠ, সৎসঙ্গ আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, ডাকাত কালীবাড়ি, ঘোষপাড়া সতীমায়ের মন্দির। আছে জামা মসজিদ, চশমাবাবার মাজার, মানিক পিরের দরগা।
কী ভাবে যাবেন: শিয়ালদহ মেন লাইনের ট্রেনে চেপে চলুন হালিশহর। সেখান থেকে টোটোয় রামপ্রসাদের ভিটে। কলকাতা বা যে কোনও জেলা থেকে সড়কপথেও পৌঁছতে পারেন সেখানে।
জটার দেউল। ছবি: সংগৃহীত।
জটার দেউল: মণি নদীর পাড়ে গাছগাছালি ঘেরা চত্বরে উন্নত শিখর, পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকাজের এ এক দারুণ নিদর্শন। ঠিক চেনা মন্দিরের মতো নয় অবশ্য, এটি হল প্রাচীন ভারতের এক অন্যন্য স্থাপত্যশৈলী, রেখা-দেউল। লোকমুখে পরিচিত ‘জটার দেউল’ নামে। জটাধারী অর্থাৎ শিব। স্থানীয়দের অনেকে এই স্থানকে শিবের থান বলে মনে করেন। মাটি থেকে তিন মিটার উঁচুতে এর ভিত্তিস্থল। দেউলটি প্রায় ৯৮ ফুট উঁচু।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘি থেকে ৫ কিলোমিটার পূর্বে কঙ্কনদিঘির পাশে রয়েছে দেউলটি। কে, কবে এটি তৈরি করিয়েছিলেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শোনা যায়, বিক্রমপুরের চন্দ্রবংশের রাজা জয়চন্দ্র জটার দেউল তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে খননকার্যে এই স্থলে পাওয়া গিয়েছে ইতিহাসের নানা নিদর্শন। পাথরের বুদ্ধমূর্তির পাশাপাশি জৈন দেবদেবীর মূর্তিও মিলেছিল এখানে। মন্দির স্থাপত্যে জটার দেউল বাংলার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
কী ভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ দক্ষিণ থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর-নামখানা লাইনের ট্রেন ধরে মথুরাপুর রোড স্টেশনে নামতে হবে। ট্রেকার, অটো অথবা বাসে পৌঁছন রায়দিঘি। সেখান থেকে অটোয় কঙ্কনদিঘি।
ঘুটিয়ারি শরিফ। ছবি: সংগৃহীত।
ঘুটিয়ারি শরিফ: দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে রয়েছে পির মোবারক গাজির মাজার। এই মাজার এখন মুসলমান সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। রয়েছে সাদা গম্বুজাকৃতির শিখরযুক্ত দরগা। চার কোণে রয়েছে অষ্টভুজাকার মিনার। গম্বুজ এবং মিনারে রয়েছে ফুলের নকশা।
মানবদরদি পিরকে নিয়ে অনেক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। শোনা যায়, তিনি মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর তপস্যার জোরে খরাপীরিত গ্রামে বৃষ্টি নেমেছিল। তবে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ঘুটিয়ারি শরিফে শুধু মুসলিম নন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষই তাঁদের মনোবাসনা জানাতে আসেন। এখানে বহু ভক্ত এসে প্রার্থনা করেন। পিরকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতে এবং চাদর চড়াতে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন লোকজন।
আরও পড়ুন:
কী ভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে ক্যানিং লোকাল থেকে ধরে ঘুটিয়ারি শরিফ স্টেশন নামুন। সেখান থেকে টোটো-অটো ধরে গন্তব্যে পৌঁছোন। কলকাতা থেকে সড়কপথে ইএমবাইপাস, বারুইপুর হয়ে ঘুটিয়ারি শরিফ।