পাঁচশো বছর আগেকার ‘মনসামঙ্গল’-এ পান্তার উল্লেখ পাওয়া যায়— “আনিয়া মানের পাত, বাড়ি দিল পান্তা ভাত।” অর্থাৎ মানকচুর বড় পাতায় পান্তা ভাত বেড়ে দেওয়া হল। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ লহনা খুল্লনাকে বলেন, “হরিদ্রা রঞ্জিত কাঁজি উদর ভরিতা ভুঞ্জি।” অর্থাৎ, কাঁজির ভাতও পান্তার মতোই, মাটির পাত্রে মজানো। শুধু কি মঙ্গলকাব্য বা পদ্মপুরাণ? উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘পান্তাবুড়ি’ তো বিখ্যাত গল্প।
কেবলমাত্র সাহিত্যে নয়, বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের খরার দিনের মূল ভাতই হল পান্তা, কাজে বেরোনোর আগে জল ঢালা পান্তার সঙ্গে পেঁয়াজ, লঙ্কা খেয়ে কাজে গেলে সারা দিন পেট ঠান্ডা থাকে, তাই পান্তায় ভরসা করেন তাঁরা। আমাদের প্রধান খাদ্য হল ভাত, রুটি, অর্থাৎ ধান, গম। তাকে কেন্দ্র করেই আমাদের উৎসব, সভ্যতার এগিয়ে চলা। কেবলমাত্র বাংলা, উড়িষ্যা, দক্ষিণ ভারত নয়, দক্ষিণ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর অঞ্চলে ভাতকে মজিয়ে নানা রকম খাবার তৈরি হয়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর দুর্ভিক্ষের দিনে জল ঢালা ভাতের জল ‘আমানি’, ভাতের ফ্যান সবই খাদ্য হয়ে ওঠে মানুষের কাছে, এবং পরিচিত হয় দরিদ্র মানুষের খাদ্য হিসেবে। এটি কেবলমাত্র পয়লা বৈশাখের খাবার নয়, পয়লা বৈশাখের দিনে পান্তাকে নানান সুখাদ্য, অনুষঙ্গের সঙ্গে বড় বড় রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হয়, গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পান্তা তাঁদের চিরকালের খাবার।আজকের দিনে পান্তার সঙ্গে নানান ভর্তা, শুঁটকি, ভাজা-পোড়া দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়।
মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার মঞ্চে কিশোয়ার চৌধরিকে আলুর ভর্তার সঙ্গে পান্তা ভাত তৈরি করতে দেখে অবাক হয়েছিল বাঙালিও। ছবি: সংগৃহীত।
আগের দিন রাঁধা ভাত ঠান্ডা হলে তাতে জল ঢেলে রাখতে হয়, একে ভাত সংরক্ষণের প্রাচীন উপায়ও বলা যায়। প্রতিবেশী উড়িষ্যায় অত্যন্ত জনপ্রিয় পখাল ভাত পান্তার মতোই, কখনও তাঁরা খান বড়িভাজা, শাকভাজা দিয়ে কখনো দই দিয়ে পান্তা মেখে। অসমে কাছাকাছি রকমের পয়তা ভাতের প্রচলন আছে। অরন্ধনের দিন, বাংলার নানান ব্রত পার্বণের দিনে পান্তার উল্লেখ পাওয়া যায়। পান্তার কোনো ভেদাভেদ নেই, তাই দেবী মনসা, শীতলা যেমন পান্তায় পূজিত হন, ঘরের মেয়ে দুর্গাকে দশমীর দিনে বিদায়বেলায় পান্তা, কচুশাক খাইয়ে পাঠানো হয় কৈলাসে।
বৈষ্ণবেরা রাধামাধবকে জলের ভাত, দই, মিছরি, ভাজাভুজি দিয়ে সাজিয়ে নিবেদন করেন। জগন্নাথদেবের মন্দিরের ভোগে হয় পাখাল। তাঁদের পাখাল আবার নানা রকমের, টাটকা ভাতে জল ঢেলে তাতে আদাকুচি, আম লঙ্কা দিয়ে হয় সাজা পাখাল, দই দিয়ে হয় দহি পাখাল। আবার নানান ফোরনে তৈরি হয় চুক্ষা পাখাল।
বাঙালি পান্তায় সাধারণত কাগজিলেবু কি গন্ধরাজ লেবুপাতা, শুকনো লঙ্কা ভেজে মেখে খাওয়া হয়, আবার অনেকে কাঁচা তেল ছড়িয়ে, কাসুন্দি দিয়ে মেখে খান। সঙ্গে আলুভাতে, বেগুনপোড়া, আলুভাজা, বড়াভাজা, মাছভাজা ইত্যাদি। অসমে আবার তিলবাটা দিয়ে পইতা ভাত খাবার রেওয়াজ আছে।
সালটা ২০২১। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার মঞ্চে কিশোয়ার চৌধরিকে আলুর ভর্তার সঙ্গে পান্তা ভাত তৈরি করতে দেখে অবাক হয়েছিল বাঙালিও। পান্তার মতো সাধারণ খাবারকেও রাজকীয় পোশাকে বিশ্বের দরবারে দক্ষ হাতে পরিবেশন করেছিলেন কিশোয়ার। তাই পান্তা কিন্তু এখন আর মোটেও ‘সাধারণ’ নয়। তার পরিচিতি ছড়িয়েছে দূর-দূরান্তে।
বাংলাদেশের ‘পহেলা বৈশাখে’র দিনে পান্তার আয়োজন থাকে তাক লাগানোর মতো, উড়িষ্যায় প্রতি বছর পাখাল দিবস পালিত হয়। ভাত এবং তাকে কেন্দ্র করে এই সব উৎসব আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ।
এখন আর সাধারণ খাবারের তকমা লেগে নেই পান্তার গায়ে। রেস্তরাঁর মেনুতেও ঠাঁই পেয়েছে এই খাবার। বিশ্বের নজরেও দর বাড়িয়েছে পান্তা। নববর্ষ উপলক্ষে বাড়িতেই যদি বানিয়ে ফেলা যায় পান্তা প্ল্যাটার, তা হলে কেমন হয়? রেস্তরাঁয় লম্বা লাইনে ঘেমেনেয়ে একাকার না হয়ে বাড়িতেই সেরে ফেলতে পারেন তৃপ্তির ভোজ। পান্তার সঙ্গে বানিয়ে ফেলতে পারেন রকমারি ভাজাভুজি আর ভর্তা। কী ভাবে সাজাবেন ভোজের থালি, কী কী রাখতে পারেন পান্তার স্বাদবর্ধক হিসাবে?
এখন আর সাধারণ খাবারের তকমা লেগে নেই পান্তার গায়ে। ছবি: সংগৃহীত।
যে কোনও সেদ্ধ মোটা চালের ভাত তৈরি করুন। ভাত ঠান্ডা হলে তাতে অনেকটা জল দিয়ে (যাতে পুরো ভাত ঢাকা পড়ে) আলগা করে ঢাকা দিয়ে রেখে দিন অনন্ত ঘণ্টাদশেক। রান্নাঘরে গ্যাসের পাশেই রাখবেন। গরমে ভাল মজবে।
ওই ভাতে গন্ধলেবু, কাঁচা লঙ্কা, শুকনো লঙ্কা বা আচারের তেল, নুন আর মিশিয়ে ভাল করে চটকে মেখে মাটির হাঁড়িতে ঢেলে রাখুন।
পান্তার সঙ্গে বানিয়ে নিতে পারেন মুচমুচে ডালের বড়া। আগের রাতে মুসুর ডাল আর মটর ডাল ভিজিয়ে রেখে দিন। সকালে ডাল বেটে তার সঙ্গে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কাকুচি, নারকেলকোরা, নুন, চিনি দিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিয়ে বানিয়ে ফেলুন মুচমুচে বড়া।
পান্তার স্বাদ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে বানিয়ে ফেলতে পারেন চিংড়ির হাতমাখা। ছোট চিংড়িতে নুন, হলুদ মাখিয়ে ভেজে নিন। তার পর সেই চিংড়ির সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজকুচি, লঙ্কাকুচি, ধনেপাতাকুচি, কাঁচা তেল ভাল করে মেখে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু পদ।
পান্তার সঙ্গে দারুণ জমবে কাঁচা আমবাটা। খোসা সমেত কাঁচা আম, রসুন, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতার ডাঁটি একসঙ্গে বেটে নিয়ে তার সঙ্গে নুন, শুকনোলঙ্কার গুঁড়ো আর চিনি মিশিয়েই তৈরি হয়ে যাবে টক-ঝাল-মিষ্টি চাটনি।
পান্তা আর ডাল মাখার যুগলবন্দিও কিন্তু বেশ লোভনীয়। ফ্রিজে ডাল থাকলে তা কড়াইয়ে নাড়াচাড়া করে শুকিয়ে নিন। এ বার শুকনো ডালে পেঁয়াজকুচি, শুকনো লঙ্কাপোড়া, আচারের তেল মিশিয়ে ভাল করে মেখে নিন।
পান্তার সঙ্গে মুচমুচে ‘পেঁয়াজু’ খেতেও মন্দ লাগে না। ঝিরিঝিরি খরে কাটা পেঁয়াজের সঙ্গে কাঁচালঙ্কাকুচি, ধনেপাতাকুচি, বেসন, নুন, শুকনোলঙ্কার গুঁড়ো আর সামান্য জল দিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ বানিয়ে নিন। এ বার গরম তেলে মুচমুচে করে ভেজে পরিবেশন করুন ‘পেঁয়াজু’।