গালভারী নাম নয়। আমপোড়া, বেলপোড়ার ঝক্কিও নয়। সামান্য মানে সামান্যই। বড়জোর দু’টি কি তিনটি উপকরণ— ব্যস। তাই দিয়েই রান্নাঘরে টুং টাং শব্দ তুলে শীতল পানীয় বানিয়ে আনতেন দিদিমা, ঠাকুমারা। গরমে বাইরে থেকে ঘেমে নেয়ে আসার পরে চোখের সামনে সেই সব ঘরোয়া শরবতই মনে হত অমৃতসম।
তখনও দোকানে দোকানে রেডিমেড রঙিন কুলার সহজলভ্য ছিল না। প্যাকেটবন্দি হয়ে ফ্রিজে শোভা পেত না মিল্কশেক, ফলের রস কিংবা ঠান্ডা সোডা! রেফ্রিজারেটরই থাকত না অধিকাংশ বাড়িতে। গরমে জালা বা কুঁজোর ঠান্ডা জলেই পেট জুরোতো, এক চুমুকেই জুড়িয়ে যেত মন। কালের নিয়মে ধীরে ধীরে সেই সব কুলার তাদের অস্তিত্ব হারাচ্ছে।
এ বারের গ্রীষ্মে তেমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া শরবতের খোঁজ। যা হয়তো টাইম মেশিনের মতো এক চুমুকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে শৈশবে। কিংবা গুপী-বাঘার জাদু পাদুকার মতো ক্ষণিকের জন্য উড়িয়ে নিয়ে যাবে ভ্যাপসা গরমের শহর থেকে বরফে মোড়া কোনও কাল্পনিক পাহাড়ে।
বাতাসা-কর্পূরের শরবত
গুড়ের বাতাসা যেকোনও বাড়িতেই মজুত থাকত এক কালে। গরমে বাড়িতে অতিথি এলে যাতে জলের সঙ্গে অন্তত কয়েকটি বাতাসা দেওয়া যায়। আর পুজোর কাজে ব্যবহারের জন্য কর্পূর থাকতই (তখনও মোম দেওয়া প্যাকেটে মোড়া কর্পূর বাজারে আসেনি, ভোজ্য কর্পূরই ব্যবহার হত)। এই শরবত তৈরি করা হত সেই গুড়ের বাতাসা আর কর্পূর দিয়ে। ঠান্ডা জলে বাতাসা ভিজিয়ে গলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাতে চাইলে সামান্য পাতিলেবুর রস বা গোলাপজল দিতে পারেন। আর এক চিমটে খাওয়ার কর্পূর মিশিয়ে নিলেই তৈরি শরীর জুড়ে শীতল ভাব আনা বাতাসার শরবত।
মঠের শরবত
দোলে বা রথের মেলায় কেনা রঙিন মঠ। গোলাপি, হলুদ, সাদা নানা রকম তার রং। সেই মঠ জলে গুললেই রঙিন শরবত তৈরি। হয় হলুদ, নয়তো গোলাপি, কিংবা দুইয়ে মিলে খানিক কমলা ভাব। এই শরবতের মজা এর সুন্দর রঙেই। তবে স্বাদ মোটেই খারাপ নয়। মঠ আধ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। পুরোপুরি গলে গেলে তাতে এক চিমটে বিটনুন আর গন্ধরাজ লেবুর রস দিয়ে চামচ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। চাইলে লেবু আর বিটনুনের বদলে গোলাপজলও দিতে পারেন।
তেঁতুল-গুড়ের শরবত
এ শরবত যেমন স্বাদু, তেমনই এর স্বাস্থ্যগুণও অসীম। পাকা তেঁতুল জলে ভিজিয়ে ক্বাথ বের করে নিয়ে তাতে আখের গুড়, বিটনুন আর সামান্য ভাজা জিরেগুঁড়ো ছড়িয়ে ঠান্ডা জলে গুলে নিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। গরমে এই শরবত শরীরে পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখার পাশাপাশি আয়রনেরও জোগান দেয়।
মৌরি-মিছরির জল
বাঙালির পেট ঠান্ডা করার চিরকালীন পানীয়। গরমে অতিরিক্ত পেটগরম হলে রাতে মৌরি আর তালমিছরি এক সঙ্গে ভিজিয়ে রেখে দেওয়া হত। সকালে সেই মৌরি-মিছরির জল ছেঁকে খাওয়ানো হত বাড়ির ছোটদের। এমনই তার স্বাদ এবং গন্ধ যে, এই একটি পথ্যে ‘আপত্তি’ থাকত না কারও। গরমে বাঙালির এই ঘরোয়া কুলার আজও স্বাস্থ্যোদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। অ্যাসিডিটি দূর করতে এর জুড়ি নেই। মৌরি হজমশক্তি বৃদ্ধি করে আর লিভারকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে তালমিছরি।
বেলের পানা
পাকা বেলের শাঁস দিয়েই তৈরি হয় বেলের পানা। উপকরণ বলতে বেল, গুড় আর জল। তবে বেলের পাকা শাঁসকে জল দিয়ে চটকে তার পরে ছাঁকনিতে বীজ আর ছিবড়ে ছেঁকে নিয়ে মারী বানানো একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে ওইটুকু করে নিতে পারলে এমন সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর ঘরোয়া পানীয় দু’টি হয় না। বেলের ক্বাথে ঠান্ডা জল আর গুড় মিশিয়ে নিলেই তৈরি বেলের পানা। চাইলে এক চিমটে বিটনুনও গুলে দিতে পারেন। গরমের দিনে ‘লু’ বা হিটস্ট্রোক প্রতিরোধের অব্যর্থ এই শরবত। তা ছাড়া বেলে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখতেও সাহায্য করে।
গন্ধরাজ ঘোল
এই শরবতটি অবশ্য হারিয়ে যায়নি, বরং নতুন করে ফিরে এসেছে। বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁয় গন্ধরাজ ঘোলের কদর এখন তুঙ্গে। আর এই ঘরোয়া শরবতটিও খুব অল্প সময়ে বাড়িতে থাকা উপকরণেই বানিয়ে ফেলা যায়। দরকার হবে শুধু টক দই, বিটনুন, চিনি আর একটি গন্ধরাজ লেবু। দইয়ে নুন-চিনি মিশিয়ে ভাল ভাবে ফেটিয়ে নিন। তার পরে ওতে ঠান্ডা জল, আর গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে দিলেই তৈরি গন্ধরাজ ঘোল। সাজানোর জন্য লেবুর পাতা দিতে পারেন। তাতে ঘোলের সুগন্ধ আরও বাড়বে।
তোকমার শরবত
এখন স্বাস্থ্যসচেতনেরা যে বেসিল সিডসের জন্য পাগল, তা বহু কাল ধরেই খাওয়া হচ্ছে বঙ্গদেশে। নাম তোকমা দানা। মিছরির জলে তোকমা দানা দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয় আধ ঘণ্টা। ফুলে উঠলে তাতে পরিমাণ মতো জল আর লেবুর রস মিশিয়ে খাওয়া হত। পেটের সমস্যা, মূলত কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে ওই তোকমার শরবত খাওয়ার পরামর্শ দিতেন ডাক্তার-বদ্যিরা। গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং ডিটক্স করতেও এই শরবত উপযোগী।
সাবুদানার ঘোল
আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা সাবুদানার সঙ্গে টক দই, বিটনুন, গোলমরিচ আর তালমিছরি দিয়ে তৈরি শরবত। মূলত শিবরাত্রির ব্রত করার সময় এই ধরনের শরবত খাওয়ার চল রয়েছে। গরমকালে এই শরবত স্বাস্থ্যকরও। সাবুদানা খুব সহজে হজম হয়। পাকস্থলীর প্রদাহ কমাতেও সাহায্য করে। পেট ভাল রাখতে এবং গরমের ক্লান্তি কমাতে এই শরবত খেয়ে দেখতে পারেন।
ডাবের শরবত
প্যারামাউন্টের ডাবমালাই শরবতের মতোই। এই গরমে ডাবের জল দিয়ে তৈরি এমন শরবত এক চুমুকেই শরীর ঠান্ডা করবে। ডাবের নরম শাঁস বেটে নিন। এবার তার সঙ্গে ডাবের জল, পুদিনা পাতার রস, গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে তাতে বরফকুচি দিয়ে দিলেই তৈরি হবে ডাবের শরবত। এই শরবত প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটের জোগান দিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।