এক কালে সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল মাথাভর্তি ঘন চুল। তেলে সিক্ত, বেণী বাঁধা চুলই রূপের সংজ্ঞা তৈরি করত। সময় এগিয়েছে, সৌন্দর্যের সংজ্ঞা পাল্টেছে। কিন্তু এখনও আজানুলম্বিত কেশের কদর কিছু কম হয়নি। তবে ফুরফুরে, বাঁধ না মানা চুলের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। যেখানে চুলের ঘনত্ব বজায় রেখেও হালকা ভাব চাই। আর এই সব চাহিদা মেটাতে নতুন হেয়ারকাটের প্রতি ঝুঁকছেন অনেকে। যাতে এক দিকে যেমন চুলের ঘনত্ব বেশি দেখাবে, অন্য দিকে এক প্রকার ছকভাঙা আমেজ আসবে। তাই পার্লার ও সালোঁয় গিয়ে ‘উল্ফ কাট’-এর দাবি করছেন অনেকে। কারণ, হলিউড, বলিউড, টলিউড অথবা দক্ষিণী তারকাদের মধ্যেও এই ছাঁটের প্রতি ঝোঁক চোখে পড়ছে। তা সে সুস্মিতা সেন হোন বা দক্ষিণের যশ, মাইলি সাইরাস বা জেনা ওরটেগা হোন কিংবা পিয়া চক্রবর্তী।
উল্ফ কাট করাচ্ছেন সুস্মিতা সেন। ছবি: সংগৃহীত
‘উল্ফ কাট’? নেকড়ের মতো চুলের ছাঁট?
যাঁরা এখনও এই ছাঁটের সঙ্গে পরিচিত হননি, তাঁদের কাছে এই নাম খুব আকর্ষণীয় না-ও হতে পারে। কিন্তু নেকড়ে প্রজাতির প্রাণীদের দেহের রোমবিন্যাসের সঙ্গে খানিক মিল আছে বটে। অন্তত সেই বিষয়টিকেই মানুষের মাথায় ফিট করানোর চেষ্টা চলছে। আর তাতে সাফল্য মিলেছে বলেই প্রমাণ করছে সাম্প্রতিক ট্রেন্ড। ‘নেকড়ের চুল’ মানে যেমন মাথার উপরে বেশি ঘনত্ব এবং চারপাশে একরাশ চুলের ঝাঁক, তেমনই লুক আসে এই হেয়ারকাটে। কেশসজ্জা শিল্পী প্রিসিলা কর্নার বলছেন, ‘‘অতিরিক্ত কায়দা, স্টাইলিং ছাড়াই অতীব কেতাদুরস্ত লুক পাওয়া যায় এতে। কোনও খাটনি ছাড়াই নজরে পড়া যায়। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বার বার ট্রেন্ডে ফিরে আসে উল্ফ কাট। কলকাতাতেও কত কত ছেলেমেয়ে আমার কাছে এই ছাঁটের চাহিদা নিয়ে আসেন! তবে এখন মূলত কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই এই দাবি বেশি থাকে। কিন্তু মজার বিষয় হল, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, যে কোনও সময়েই এই কাট মানিয়ে যাবে। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় যেমন পরীক্ষামূক ছাঁট দিতে পছন্দ করেন, যে কেউ সেটা করতে পারেন। আর এটি এমন কোনও হেয়ারকাট নয়, যা সকলের মুখেই হরেদরে একই রকম দেখাবে। এই ছাঁট প্রত্যেকের মুখে ভিন্ন রূপ নিয়ে আসতে পারে।’’
দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ পপ তারকা থেকে আমেরিকার নায়িকা, চারদিকেই এই ছাঁটের নজির চোখে পড়বে। ছবি: সংগৃহীত
চুলের এই ছাঁটে লিঙ্গবৈষম্য নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ পপ তারকা থেকে আমেরিকার নায়িকা, চারদিকেই এই ছাঁটের নজির চোখে পড়বে। কে-পপ তারকাদের থেকেই নতুন ভাবে এই কেশসজ্জার জনপ্রিয়তা শুরু হয়েছে। কিন্তু এ-ও আসলে পুরনো জিনিসকে নতুন মোড়কে পরিবেশন করার আর এক উদাহরণ। আসলে সাবেক দুই কেতাকে মিলিয়ে জন্ম নিয়েছে এই স্টাইল। সত্তরের দশকের ‘শ্যাগ’ এবং আশির দশকের ‘মুলেট’-এর ধারণা মিলেমিশে গিয়েছে এখানে। রুডওয়ার্ড কিপলিংয়ের ‘দ্য জাঙ্গল বুক’-এর চরিত্র মোগলিকে নিয়ে বানানো কার্টুন নব্বইয়ের দশক জুড়ে দেখেছে যে শিশুরা, তাঁরা এখন প্রাপ্তবয়স্ক। তাঁদের কাছে এই ‘হেয়ারকাট’ (যদিও মোগলিকে তার জন্য পার্লারে যেতে হয়নি) একেবারেই নতুন নয়। শাহিদ কপূর, শাহরুখ খান বা আরও অনেককে এমন ছাঁটে দেখেছেন লোকে। তা-ও কয়েক দশক আগেই। কারণ এই ছাঁটের নানা ধরন বহু যুগ ধরেই জনপ্রিয়।
সাবেক শ্যাগ ও মুলেট ছাঁটে ফরাহ ফসেট এবং মেরিল স্ট্রিপ। ছবি: সংগৃহীত
এটি এমন একটি কাট, যেখানে স্তরই মুখ্য চরিত্রে। মাথা জুড়ে কেবলই চুলের নানাবিধ স্তর। মাথার উপরের অংশে স্বল্প দৈর্ঘ্যের স্তর থাকে, আর পিছনের দিকে একটু লম্বা স্তর থাকে। পাশে ও কপালেও এলানো থাকে চুল। কিন্তু পুরনো কায়দা কী ভাবে নতুন মোড়ক নিল, সে বিষয়ে কলকাতার কেশসজ্জা শিল্পী জলি চন্দের বক্তব্য, ‘‘আমাদের খুব তাড়াতাড়ি একঘেয়েমি চলে আসে। তাই অল্প অদলবদল করে বাহারি নাম দিয়ে ট্রেন্ড হিসেবে মেনে চলতে পছন্দ করি আমরা। যেমন ধরা যাক, একটা লাল লিপস্টিকেরই কত শত নাম, ব্রিক রেড, বেরি রেড, ক্লাসিক রেড, ব্লাড রেড। সূক্ষ্ম, অল্পবিস্তর ফারাক আছে বটে, কিন্তু লাল তো সেই লালই। তেমনই এই উল্ফ কাট অনেক দিন ধরেই লোকে স্টাইল করছেন। কিন্তু এখন নতুন ভাবে এটা ট্রেন্ডে এসেছে। তবে অবশ্যই নতুন মোড়ক খানিক কঠিন বটে। এখানেই অভিজ্ঞ কেশসজ্জা শিল্পীর হাতের ছোঁয়া প্রয়োজন।’’
জেনা ওরটেগার উল্ফ কাট। ছবি: সংগৃহীত
৩০-৪০ বছর আগে চারদিকে ‘স্টেপ কাট’-এর রমরমা ছিল। তার পর এল ‘লেয়ার্স’। এ সব আসলে চুলে স্তর তৈরি করারই নানা পদ্ধতি। কিন্তু উল্ফ কাট-এ এই স্তর তৈরির কাজ আরও একটু বেড়ে যায়। চুলগুলি স্বাভাবিক ভাবে ঢেউ খেলানো থাকে এই কেশসজ্জায়। হালকা, বয়ে যাওয়া, বাঁধ না মানা এক চেহারা পায় চারপাশের চুলগুলি। একটু উন্মুক্ত, একটু এলোমেলো, সজ্জিত নয়, বরং মুখে আনে প্রাকৃতিক ভাব। থাকে থাকে কাটা হয় চুল। কপালে প্রচুর ‘ব্যাং’ থাকতে হবে। মাথায় চারদিকে কোনও কোনও চুল ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে থাকতে পারে। আর তাই এত স্তর দৃশ্যমান হয়। এই কাট যে কোনও দৈর্ঘ্যের চুলে মানিয়ে যায়। এটি এমন ভাবে স্তর তৈরি করে যেন চুলে স্বভাবিক ভাবে ঘনত্ব বেড়ে যায়। কিন্তু যদি কেশসজ্জা শিল্পী পারদর্শী না হন, তা হলে এই ছাঁট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। খুব সূক্ষ্ম হাতে কাঁচি চালিয়ে স্তর তৈরি করতে হবে।
প্রিসিলার পরামর্শ, উল্ফ কাট করা চুলের চলন যাতে খোলামেলা হয়, তার জন্য হাওয়ায় শুকিয়ে নিতে হবে, ভুলেও ব্লো-ড্রাই করলে চলবে না। তবে তার সঙ্গে টেক্সচার স্প্রে বা ডিফিউজ়ার ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত পলিশ করলে এই ছাঁটের স্বাভাবিকত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। উল্ফ কাটের সৌন্দর্য লুকিয়ে তার বিশৃঙ্খলা ও অসম্পূর্ণতাতেই। তবে জলির বক্তব্য, যাঁদের চুলে কেরাটিন বা বোটক্স অথবা স্মুদনিং ট্রিটমেন্ট করা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ছাঁট ভাল লাগবে না। অনেক ক্ষেত্রে পার্লারে গিয়ে এই হেয়ারকাটের দাবি করলে অনেকে কেটে দেন। চুলে জল দেওয়ার আগে পর্যন্ত আপনি হয়তো খুব সন্তুষ্ট থাকলেন, কিন্তু যেই মুহূর্তে মাথায় জল পড়বে, অমনি উল্লম্ব চুলগুলি বা ব্যাংস নষ্ট হয়ে যাবে। টলিউডে অনেককেই জলি এই ছাঁটে সাজিয়েছেন। পিয়া চক্রবর্তী, তৃণা সাহা বা অপরাজিতা ঘোষের মতো আরও অনেককে। কিন্তু যাঁরা পর্দার সামনে কাজ করেন, তাঁরা খুব বেশি দিন এই পরীক্ষামূলক সাজ ধরে রাখতে পারেন না। কিন্তু বাংলা ইন্ডাস্ট্রি থেকে সাধারণের মধ্যে যে নেকড়ের রোমের মতো চুলের কায়দা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, তা স্পষ্ট। চলতি বছরে নাকি আরও কদর বেড়েছে এই ছাঁটের। কারণ তা নিছক সাজের অনুষঙ্গ নয়, বরং মুখ্য ভূমিকা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলেই মনে করছেন অনেকে।