Advertisement
E-Paper

দুশ্চিন্তা থেকে বাড়তে পারে রক্তচাপ

রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। আধুনিক জীবনযাত্রা, দুঃশ্চিন্তা, খাদ্যাভ্যাস— নানা কারণে রক্তচাপের সমস্যা বাড়ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ খেলে এবং জীবযাত্রায় পরিবর্তন আনলে রক্তচাপের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। জানাচ্ছেন চিকিৎসক কৃষ্ণেন্দু রায় রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। আধুনিক জীবনযাত্রা, দুঃশ্চিন্তা, খাদ্যাভ্যাস— নানা কারণে রক্তচাপের সমস্যা বাড়ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ খেলে এবং জীবযাত্রায় পরিবর্তন আনলে রক্তচাপের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৯ ০১:৩১

প্রশ্ন: এখন প্রায়ই শোনা যায়, কেউ না কেউ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন। রক্তচাপ কী? এর থেকে কী ভাবে সমস্যা তৈরি হয়?

উত্তর: রক্ত হল আমাদের শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রক্ত ছাড়া শরীর অচল। রক্ত শরীরে প্রধানত দু’টি নালিকার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। একটি হল ধমনী, অন্যটি হল শিরা। ধমনী দিয়ে আমাদের হৃদপিণ্ড থেকে বিশুদ্ধ রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধমনীর প্রাচীরে প্রবাহমান রক্ত যে পরিমাণ পার্শ্বচাপ প্রয়োগ করে সেই চাপকেই বলে রক্তচাপ বলে। একেই ‘ব্লাডপ্রেসার’ বলে। রক্তচাপের ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা ‘প্রেসার’ শব্দটিই বেশি ব্যবহার করি। এই চাপের কারণেই আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, প্রত্যঙ্গে রক্ত পৌঁছয়। এবং সেখানে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও খাদ্যরস সরবরাহ করে। ধমনীর ভিতরে এই চাপ যখন নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে বেশি বা কম হয়, তখন তাকে আমরা যথাক্রমে ‘উচ্চ রক্তচাপ’ বা নিম্ন রক্তচাপ’ বলি। ইংরেজিতে ‘হাই ব্লাডপ্রেসার’ বা ‘লো ব্লাডপ্রেসার’ বলা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন: রক্তের চাপ স্বাভাবিকের থেকে বেশি বা কম হওয়ার বা এ ভাবে ওঠা-নামা করার কারণ কী?

উত্তর: রক্তচাপ কেমন থাকবে তা মূলত দু’টি বিষয়ের উপরে নির্ভর করে।

প্রথমত, আমরা জানি যে আমাদের হৃদপিণ্ড পাম্পের মতো কাজ করে। হৃদপিণ্ড পাম্প করে যে পরিমাণ রক্ত ধমনীতে ছাড়ে তার উপরে রক্তচাপ নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত, ধমনীর রোধ রক্তচাপের উপরে প্রভাব বিস্তার করে। মানে ধমনী রক্তপ্রবাহের বিরুদ্ধে যে বাধা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বলা যায়, বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় এবং অসুস্থতাজনিত কারণে এই দু’টি বিষয়ের হেরফের হলে আমাদের শরীরে রক্তচাপ ওঠা-নামা করে। এবং এই কারণেই রক্তচাপ পরিবর্তনশীল। সহজ করে বলতে গেলে, কোনও এক জন বিশ্রামে থাকা ব্যক্তির যদি রক্তচাপ মাপা যায়, তা হলে তাঁর রক্তচাপ যা থাকবে, কিছু ক্ষণ দৌড়ে আসার পরে তাঁর রক্তচাপ অনেকটা বেড়ে যাবে। কারণ, সেই সময় তাঁর হৃদপিণ্ড থেকে পাম্প করে বেড়িয়ে আসা রক্তের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যাবে। একই ভাবে, কোনও ব্যক্তি যদিও ‘ডিহাইড্রেশন’ বা জলশূন্যতা, কিংবা রক্তক্ষরণের সমস্যায় ভোগেন সে ক্ষেত্রে তাঁর রক্তচাপ কমে যাবে। যেমন ডায়েরিয়া, আঘাত-জনিত রক্তপাত ইত্যাদির ক্ষেত্রে যেমন হয়। অর্থাৎ, শরীর অসুস্থ হলেই এই রোগের উপসর্গ দেখা যাবে।

প্রশ্ন: রক্তচাপের ঠিকঠাক মাত্রা কত? এটা কি বয়সের সঙ্গে বদলাতে থাকে?

উত্তর: রক্তচাপ সাধারণভাবে বয়স, পরিবেশ এবং লিঙ্গভেদে পৃথক হয় তবে সাধারণভাবে ১২০/৮০ রক্তচাপকেই চিকিৎসকেরা ‘স্বাভাবিক’ বলে থাকেন।

প্রশ্ন: রক্তচাপের দেখেছি দু’টি সংখ্যা রয়েছে। এরা কী? কোনও সংখ্যাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: : রক্তচাপের দুটি মাত্রার উপরেরটিকে ‘সিস্টোলিক’ এবং নীচেরটিকে ‘ডায়াস্টোলিক’ ব্লাডপ্রেসার বলা হয়ে থাকে। রক্তচাপের এই দুটি মাত্রারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা বাড়লে নির্দিষ্ট সমস্যাও হতে পারে। তবে সাধারণভাবে উপরের সংখ্যা অর্থাৎ ‘ডায়াস্টোলিক ব্লাডপ্রেসার’টিই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগক্ষেত্রে দেখা যায় যে রক্তচাপের এই মাত্রাটি বাড়ার কারণেই নানা জটিলতা তৈরি হয়।

প্রশ্ন: উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপে এক জন আক্রান্ত হয়েছেন, এটা কী ভাবে বোঝা সম্ভব? মানে এর উপসর্গগুলি কী?

উত্তর: এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় বলে রাখা ভাল, উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত উপসর্গহীন হয়। সাধারণ ভাবে এই রোগ ধরা পড়ে না। রুটিন চেক চাপ বা অন্য কোনও অসুখে আক্রান্ত হলে চিকিৎসক যখন রক্তচাপ মাপেন তখন এই রোগ ধরা পড়ে। আবার অনেক সময় এই রোগীরা সরাসরি স্ট্রোক/ হার্ট আট্যাকের মতো সমস্যা নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা চিকিৎসকের কাছে আসেন।

অন্য দিকে, নিম্ন রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনেকগুলি উপসর্গ দেখা যায়। সেগুলি হল, ১) ক্লান্তি, ২) বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে অনীহা, ৩) মূত্রের পরিমাণ কমে যাওয়া, ৪) আচ্ছন্ন ভাব বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। এই রকম সমস্যা হলে অবশ্যই রক্তচাপ মাপা উচিত। তা হলেই, ধরা পড়ে যে রোগী নিম্ন রক্তচাপ জনিত সমস্যায় ভুগছেন।

প্রশ্ন: রক্তচাপের হের ফেরে শরীরে কী প্রভাব পড়ে?

উত্তর: রক্তচাপ জনিত সমস্যার প্রভাব বেশ গভীর। আগেই বলেছি, রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ রক্তচাপ উচ্চ বা নিম্ন হোক তা শরীরের নানা অঙ্গে সরাসরি প্রভাব সৃষ্টি করে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সাধারণত এই সব সমস্যা দেখা দেয়, ১) স্ট্রোক, ২) হার্ট আট্যাক, ৩) চোখের রেটিনায় সমস্যা এবং ৪) কিডনির সমস্যা বা নেফ্রোপ্যাথি ইত্যাদি। সাধারণভাবে উচ্চরক্তচাপের কোনও উপসর্গ না থাকলেও এই সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সমস্যা তৈরি হলে বোঝা যায় রোগী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।

একই ভাবে নিন্ম রক্তচাপ জনিত সমস্যাকে বলে ‘হাইপোটেনসিভ শক’। এই রোগের ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্তের প্রবাহ কমে যায়। ফলে ওই সব অঙ্গ কর্মক্ষমতা হারায়। এই সমস্যা দীর্ঘদিন চললে ওই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করেও দিতে পারে।

প্রশ্ন: আচ্ছা ডাক্তারবাবু, রক্তচাপ কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

উত্তর: প্রথমেই আসি, উচ্চ রক্তচাপের কথায়। এই রোগ কমানোর প্রধান ওষুধ হলো জীবনচর্চার পরিবর্তন। এই পরিবর্তন কিন্তু ওষুধ বা চিকিৎসা ছাড়াই রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। যেমন, নিয়মিত ব্যায়াম, শরীর মেদহীন রাখা, শাক, আনাজ, ফল খাওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় নুন না খাওয়া, বিশেষ করে কাঁচা নুন খাওয়া একদমই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে মদ্যপান বন্ধ করাও একান্ত জরুরি। সঙ্গে অবশ্যই দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে। দুশ্চিন্তা বা ‘টেনশন’-ই কিন্তু এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ, এটা একেবারেই ভুলে গেলে চলবে না।

আবার আসি নিম্ন রক্তচাপ প্রসঙ্গে। পূর্বোল্লেখিত ক্লান্তি, বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হওয়ার মতো সমস্যাগুলি দেখা দিলে সবার আগে চিকিৎসকের কাছে যান। নিম্ন রক্তচাপের কারণটি আগে জেনে সেই অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করে বা নিয়মিত চিকিৎসা করিয়ে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন: যদিও কারও এই রোগ থাকে তা হলে তারা কী ভাবে সতর্ক থাকবেন?

উত্তর: এ ক্ষেত্রে প্রথমে দরকার নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ‘চেকআপ’ করানো। এবং ঠিকমতো ওষুধ খাওয়া। অনেকেই, এক বার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসেন। তার পরে আর ‘চেকআপ’ করান না। এটা মারাত্মক ভুল। নিয়মিত ‘চেকআপ’ করালেই বোঝা যাবে রক্তচাপ কী মাত্রায় রয়েছে। সেই অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করতেও বলতে পারেন। এবং শুধু ওষুধ খেলেই যে সমস্যা মিটে যাবে, তা নয়। তার সঙ্গে অবশ্যই উপরের বিষয়গুলি মেনে চলতেই হবে।

প্রশ্ন: এই রোগ কি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব?

উত্তর: এই ক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল যে এই রোগ নিরাময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তবে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু অনেক সময় কোনও অসুখের কারণে এই সমস্যা হয়, যদি সেই অসুখ নিরাময় করা যায়, তা হলে, তা থেকে তৈরি হওয়া রক্তচাপের সমস্যাও অনেক অংশে নিরাময় করা যায়।

প্রশ্ন: কোন বয়স থেকে সাধারণ ভাবে এই সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে?

উত্তর: এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন। উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যা যে কোনও বয়সেই হতে পারে। একই ভাবে নিম্ন রক্তচাপও যে কোনও বয়সে হতে পারে। তবে এটা সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: শিশুদের ক্ষেত্রেও কি রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে?

উত্তর: শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণ ভাবে এই রোগ দেখা যায় না। তবে, হার্টের জন্মগত সমস্যা, হরমোনের সমস্যা বা কিডনির সমস্যা থাকলে এই রোগ হতে পারে।

প্রশ্ন: আপনি আগে বললেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা বেশি হয়। বয়স্কদের কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে?

উত্তর: এ ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ উপসর্গের কথা বলে রাখি। হঠাৎ বুকে চাপ অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, পা ফুলে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই ভাবে কোনও ব্যক্তির এই রোগ থাকলে তাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।

প্রশ্ন: আপনি তো অনেক দিন বর্ধমান হাসপাতালে রয়েছে। দুই বর্ধমানে এই রোগের চিত্র ঠিক কী রকম?

উত্তর: বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা (হু) জানাচ্ছে, সারা বিশ্বেই উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যা বাড়ছে। এই রোগের জটিলতাও বাড়ছে। বর্ধমানও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। অনেক মানুষ এই সমস্যা নিয়ে আসেন।

প্রশ্ন: কোন বয়সের রোগীর সংখ্যা বেশি পান?

উত্তর: প্রধানত বয়স্কদের এই রোগ বেশি হয়। তবে অল্প বয়সের রোগীরাও রক্তচাপজনিত সমস্যার চিকিৎসা করাতে আসেছেন।

প্রশ্ন: তাঁর মানে কি রোগটি নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে?

উত্তর: না এটা বলা যাবে। মানুষের কাজের চাপ বেড়েছে। টেনশন বাড়ছে। তাই হয়তো রক্তচাপ জনিত সমস্যাও বাড়ছে। কিন্তু নিয়মিত রক্তচাপ মাপালে বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে মানুষ এখন আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন। ছোট থেকে বড় সব স্তরের মানুষের মধ্যে এই সচেতনতার প্রসার হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক।

সাক্ষাৎকার: সুপ্রকাশ চৌধুরী

Health Tension Blood Pressure
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy