E-Paper

যোগাযোগে অস্পষ্টতা বাড়াচ্ছে দূরত্ব

ডিজিটাল নির্ভরতার যুগে যোগাযোগের অস্পষ্টতা থেকে বাড়ছে ভুল বোঝাবুঝির প্রবণতা

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১১

শব্দ এক কল্পদ্রুম— ব্যবহারে সে ব্রহ্মের মতোই শক্তিশালী। তা যেমন সম্পর্ক গড়ে, তেমন এক নিমেষে ভাঙতেও পারে। কথায় বলে, কী বললেন তার চেয়েও জরুরি বলার ভঙ্গি, শব্দচয়ন। সেখানেই ডিজিটাল কথোপকথনের ব্যর্থতা। মানুষ এখন মেসেজে কথা বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ। দ্রুত বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে তা। অপেক্ষার প্রহর কমছে। কিন্তু মুখোমুখি কথাবার্তায় ব্যক্তির অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি থেকে তাঁর পরিস্থিতি জানা যায়। তিনি ব্যস্ত, বিরক্ত, না কি রেগে আছেন, তার স্পষ্ট আন্দাজ মেলে। ব্যক্তির কণ্ঠস্বর, চাহনি তাঁর অভিপ্রায় বুঝিয়ে দেয়। ডিজিটাল কথোপকথনে সে সুযোগের অভাবে বোঝাপড়া অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে, যা ভুল বোঝাবুঝি বাড়াচ্ছে। তৈরি হচ্ছে মিসকমিউনিকেশন বা অ্যাম্বিগুইটি।

কমিউনিকেশন অ্যাম্বিগুইটি কী?

ধরুন, অফিসের ঊর্ধ্বতনকে কোনও সমস্যা জানালেন। জবাব এল ‘ওকে’। ঝগড়া মেটাতে কাউকে অনেক কথা লিখলেন। উত্তরে সে একটা ইমোজি পাঠিয়ে রেখে দিল। এই সংক্ষিপ্ত উত্তরগুলো আসলে সহমত, বিরক্তি না কি উদাসীনতা, তা বোঝা যায় না। সমাজতত্ত্ববিদ ড. নন্দিনী ঘোষ বলছেন, “স্ক্রিনে ফুটে ওঠা শব্দবন্ধ কিংবা ইমোজি মানবিক আবেগ, কনটেক্সটকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। ফলে অনেক কথাবার্তার পরেও বিপরীতে থাকা মানুষটি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। যোগাযোগের এই অস্পষ্টতা থেকেই অ্যাম্বিগুইটি তৈরি হয়।”

ভাষা আর সেতু নয়

সমাজমাধ্যমের আলাদা অভিধান, ব্যাকরণ রয়েছে। জেন-জ়ি কথায় কথায় ‘গোট’, ‘লল’, ‘ক্যাপ’-এর মতো যে শব্দগুলি ব্যবহার করে, তার অর্থ না জানলে ভুল বোঝাবুঝি অনিবার্য। একই ভাবে ইমোজি এখন বার্তা বিনিময়ের সহজ মাধ্যম। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই ছবির অর্থও। এক সময়ে ‘লাইক’ অর্থাৎ পছন্দ বোঝাতে ‘থাম্বস আপ’ ইমোজিটি ব্যবহার হত। এখন তা কিন্তু কথা বলতে না চাওয়ার ইঙ্গিত। মেসেজ দেখেও তার উত্তর না দেওয়ার অর্থ অবজ্ঞা, অবহেলা করা। বন্ধুবৃত্তে থাকা ব্যক্তির পোস্টে রিঅ্যাক্ট বা মন্তব্য না করার মানে বুঝতে হবে তাঁর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে চাওয়া হচ্ছে। ফলে সমাজমাধ্যমের ব্যাকরণ বুঝে চলতে না পারলে পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে মন কষাকষি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বাস্তব অবাস্তবের দুনিয়ায়

পোস্টে কতজন লাইক দিল, কে মন্তব্য করল— তার বিচারে এখন কাছের মানুষ, দূরের মানুষ বাছাই হয়। ফলে বেশি ভাবা, ধরে নেওয়া, ফোমোর মতো সমস্যা বাড়ছে। ডিজিটাল দুনিয়ার মিসকমিউনিকেশনের কারণে বাস্তবেও সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আবীর মুখোপাধ্যায় বলছেন, “এক সময়ে চিঠির জবাব পাওয়ার জন্য মাসের পরে মাস অপেক্ষা করতে হত। এখন মেসেজ করে রিপ্লাই পাওয়ার জন্য কয়েক মিনিট ধৈর্য ধরে না। লাস্ট সিন, টাইপিং, নোটিফিকেশনের মতো ফিচারগুলি তাতে আরও ইন্ধন জোগাচ্ছে। ধৈর্য, ভরসা, বোঝাপড়াকে সরিয়ে অবিশ্বাস, সন্দেহ জায়গা করে নিচ্ছে। সঙ্গী হচ্ছে মানসিক চাপ, অবসাদ, হতাশা। একাকিত্ব বাড়ছে।” সঙ্গে রয়েছে ইনডিরেক্ট পোস্ট কিংবা কনটেক্সট ছাড়াই একজনের মেসেজ অন্যকে ফরোয়ার্ড করে দেওয়ার মতো বিষয়। পোস্ট, পাল্টা মন্তব্য, ব্লক–আনফ্রেন্ডের মতো পরিস্থিতি ক্রমশ বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে, তিক্ততা বাড়ায়। “সাইকোসোম্যাটিক সমস্যা, অবসাদ বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো ইতিহাস থাকলে, তাঁদের ক্ষেত্রে এ সব ঘটনা অনুঘটকের মতো কাজ করে”, বলছেন ডা. আবীর।

মনেরে আজ কহ যে...

মুখোমুখি কথোপকথনে ভদ্রতার একটি স্বাভাবিক দায়বদ্ধতা কাজ করে। এতে উত্তর অনেকটাই পরিশীলিত ও সংযত হয়। সমাজমাধ্যমে আড়ালে থাকায় মানুষ বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। ড. নন্দিনী বলছেন, “অনলাইন আচরণ বা মেসেজের ভিত্তিতে কাউকে বিচার না করে বাস্তবে তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে, তাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ‘আমি ভুল বুঝছি না তো’, প্রশ্নটা নিজেকেই করতে হবে।” তিক্ততা বাড়ছে মনে হলে প্রয়োজন সচেতন ও স্পষ্ট যোগাযোগ। ব্যক্তিগত অহংবোধ ছেড়ে দু’পক্ষকেই উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনে ফোনে বা ভয়েস নোটে যোগাযোগ করুন। পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলছেন, “ছোট থেকে যে বাচ্চারা ভাল ভাবে মেলামেশা করতে পারে না, তারাই ডিজিটাল কমিউনিকেশনে বেশি স্বচ্ছন্দ হয়। সে যাতে স্পষ্ট করে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে সে দিকে মা-বাবাকে নজর দিতে হবে।”

একই সঙ্গে ডিজিটাল বাউন্ডারি তৈরি করাও জরুরি। সাতপাঁচ না ভেবে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে গিয়ে অনেক সময়েই ভুল হয়ে যায়। বরং একটু সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে উত্তর দিন। কেউ উত্তর দিচ্ছে না মানে ‘এড়িয়ে যাওয়া নয়, সে ব্যস্ত আছে’— সে কথা যেমন নিজেকে বোঝাতে হবে, একই ভাবে ব্যস্ত থাকলে ভবিষ্যতে যে যোগাযোগ করে নেবেন, নিজের মেসেজে সেটা স্পষ্ট করে দিতে হবে। সমাজমাধ্যমের নোটিফিকেশন অ্যাংজ়াইটি বাড়াচ্ছে মনে হলে তা বন্ধ রাখুন। সমাজমাধ্যম যখন এই সমাজের অংশ হয়েই উঠেছে, তখন সেখানেও দায়িত্ববান, সংবেদনশীল হতে হবে। ডিজিটাল কমিউনিকেশনে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে, বিষয়টিকে মাথায় রেখে দায়িত্বের সঙ্গে তা ব্যবহার করুন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Communication gap

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy