E-Paper

হবু মায়েরা কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ান

গর্ভাবস্থায় শরীরে নানা পরিবর্তন আসে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা তার মধ্যে একটি। জেনে নিন উপশমের উপায়।

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:৩৮

ছবি: অমিত দাস।

গর্ভাবস্থা মানেই কি হরমোনের আশীর্বাদ? উজ্জ্বল চুল, সুন্দর ত্বক, উৎফুল্ল মুখের ফোটোশুট? নিজের দেহের মধ্যে সন্তানকে বহন ও তাকে লালনের পর্বটা সব সময় এত সহজ, সুন্দর হয় না। অনেক কষ্ট, দৈহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় মায়েদের। যেমন, ঘুমের সময় পরিবর্তন হয়ে যাওয়া, অপরিসীম ক্লান্তি, বমি-বমি ভাব। এ সব নিয়ে তা-ও আলোচনা হয়, তবে শরীরের অন্দরে যখন একটি প্রাণ বেড়ে ওঠে তখন আরও অনেক কিছুই স্বস্তি কেড়ে নেয়। বহু ক্ষেত্রেই হবু মা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। এই সময়ে এটি অত্যন্ত কষ্টকর। অন্তঃসত্ত্বাদের এ সময়ে অনেক কিছুই খেয়াল রাখতে হয়। শরীরে বেশি চাপ দেওয়া যায় না, যে কোনও ওষুধও খাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতিতে কী করবেন, কী করবেন না, দিশা দেখালেন বিশেষজ্ঞ।

সমস্যার সূত্রপাত কোথায়

সন্তানধারণের প্রথম ত্রৈমাসিকে কোষ্ঠ পরিষ্কার না হওয়ার সমস্যায় অনেক মেয়েই ভোগেন। এ বিষয়ে ইনফার্টিলিটি স্পেশ্যালিস্ট এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনিকোলজিস্ট ডা. গৌতম খাস্তগীর বললেন, “আসলে গর্ভধারণ মানেই শরীরে হরমোনের পরিবর্তন, তার ফলে অন্ত্রের নড়াচড়া শ্লথ হয়ে যায়। হবু মায়েদের কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ সেটাই। প্রথম দিকে যাঁদের বমির সমস্যা থাকে তাঁরা ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে পারেন না। এমনকি জলও খেতে পারেন না। তাঁদের এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। আবার যাঁদের বন্ধ্যাত্বের জন্য সহায়ক চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বা যাঁদের আগে গর্ভপাত হয়েছিল, তাঁদের প্রোজেস্টেরন হরমোন জাতীয় ওষুধ দিতে হতে পারে। এঁদেরও এই অসুবিধা হতে পারে।”

দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে বমির সমস্যা কমলে, হরমোন ওষুধের মাত্রা কমলে মেয়েরা অনেকটাই আরাম পান। আবার তৃতীয় বা শেষ ত্রৈমাসিকের শেষ পর্যায়ে অনেকে এই সমস্যায় পড়েন। কারণ এ সময়ে গর্ভের শিশুর আকার অনেকটাই বড় হয়ে যায়। তখন আবার জরায়ু মলদ্বারের উপরে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে বর্জ্য নির্গমন সহজ না-ও হতে পারে।

যাঁদের এমনিই এই রোগের ধাত আছে, তাঁদের এ সময়ে মুশকিল বাড়তে পারে। আয়রন বা ক্যালশিয়াম ট্যাবলেটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও এই সমস্যা দেখা দেয়। সে রকম কিছু বুঝলে চিকিৎসক ওষুধ বদলে দেবেন বা প্রয়োজনমতো কিছু দিন তা বন্ধ রাখতে বলবেন।

ছবি: অমিত দাস।

সহজেই সমাধান

কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মা বা গর্ভস্থ শিশুর সে রকম কিছুই ঝুঁকি নেই। তবে যেহেতু এ ক্ষেত্রে খাবারদাবারের প্রতি অনীহা বাড়তে পারে তাই দু’জনের ক্ষেত্রেই অপুষ্টিতে ভোগার সম্ভাবনা থাকে, শিশুর বিকাশ ঠিকমতো না-ও হতে পারে। তাই এমন সমস্যা যাতে না হয়, তার জন্য চিকিৎসক আগেভাগেই সতর্ক থাকেন। প্রথমেই অবশ্য ওষুধ না দিয়ে ইসবগুলের ভুসিও দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া খাবারের তালিকায় ফাইবারযুক্ত আনাজ, ডাল, শাকসব্জি, ফলের পরিমাণ বাড়ান, এতে বর্জ্যের পরিমাণ ও অন্ত্রে গতি বাড়ে। সঙ্গে পর্যাপ্ত জল পান করুন। তা হলেই, বর্জ্য জলাভাবে অতিরিক্ত কঠিন হবে না এবং এই সমস্যায় পড়তেও হবে না। বমি কমানোর জন্যও চিকিৎসক ওষুধ দেবেন। তখন তৃপ্তি করে বাড়ির রান্না করা খাবার খান, শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলি নিয়মিত থাকবে। যাঁদের কোনও জটিলতার কারণে ‘বেড রেস্ট’ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের এ ধরনের সমস্যাটা বেশি হয়। তাই, সিঁড়ি না ভেঙেই ঘরের মধ্যে বা বারান্দায় পায়চারি করুন, সচল থাকুন।

নিরাপদ ওষুধের মাধ্যমে এই কষ্ট সহজেই মেটে। ডা. খাস্তগীর বললেন, “ল্যাক্টুলোজ় সলিউশনেই বেশির ভাগ মেয়ের সমস্যা দূর হয়। কিন্তু এর পরেও কষ্ট থেকে গেলে লিকুইড প্যারাফিন, মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া আর সোডিয়াম পিকোসালফেট-এর মিশ্রণ দেওয়া হয়। রাতে শোয়ার আগে দু’চামচ বা প্রয়োজনে চার চামচ খেয়ে নিতে হয়। ঈষদুষ্ণ গরম জলে মিশিয়ে খেলে ফল মেলে। দু’-তিন দিন ধরে টানা কষ্ট পেলে মলদ্বারে ওষুধ বা এনেমা প্রয়োগ করে বর্জ্য নরম করতে হয়। তবে, এমন পরিস্থিতি খুব বেশি ঘটে না।”

সন্তান প্রসবের সঙ্গে সঙ্গেই শরীর আগের অবস্থায় ফেরে না। তার পরেও কিছু দিন এই ঝামেলায় ভুগতে হতে পারে। মোটামুটি ছ’সপ্তাহের পর শরীরে হরমোনের প্রভাব কমতে শুরু করে। তখন উপশম মিলবে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় প্রসবের জায়গায় সেলাই পড়লে অনেকের ব্যথা হয়। তখনও তাঁর মলত্যাগে অসুবিধা হতে পারে। তবে চিকিৎসকরা আগেভাগেই ওষুধ দিয়ে রাখেন।

হবু মায়ের মনমেজাজ, ঘুম, খিদে এবং সার্বিক মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় প্রভাব পড়ে। তাই এই কয়েক মাসের পথ চলা মসৃণ রাখতে, গর্ভাবস্থার শুরুতেই এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন। এ সময়ে কী খাবেন ও কী খাবেন না, ডাক্তার ও পুষ্টিবিদের পরামর্শে ডায়েট চার্টও করে নিতে পারেন। বিষয়টি নিয়ে নীরব থেকে যন্ত্রণা ভোগ করবেন না। জলপান, হাঁটাচলা, সুষম আহার বজায় রাখলে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।

বিপরীত অবস্থায়

গর্ভাবস্থার অসুবিধাগুলি আঁচ করে চিকিৎসক ওষুধের তালিকা দিয়ে রাখেন। অন্ত্র এ সময় স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে থাকে না, তাই কোষ্ঠকাঠিন্যের মতোই, বারবার শৌচালয়ে যেতেও হতে পারে। এর জন্য ল্যাকটিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ প্রোবায়োটিকস দেওয়া থাকে। ডা. খাস্তগীরের আশ্বাস, সংক্রমণজনিত ডায়রিয়া মেট্রোনিডাজ়োল দিয়ে চিকিৎসা করা যাবে। সংক্রমণ না থাকলে ডাইফেনক্সিলেট হাইড্রোক্লোরাইড ও অ্যাট্রোপিন সালফেট কম্বিনেশনের ওষুধ ব্যবহার নিরাপদ। সঙ্গে চলবে ওআরএস।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pregnancy Care Pregnancy Tips Constipation Problem Constipation Risk

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy