হঠাৎ কেউ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে লুটিয়ে পড়লেন, অফিসে কাজ করার সময়ে সহকর্মী অচেতন হয়ে গেলেন, চোখের সামনে কেউ জলে ডুবে গেলেন কিংবা বাড়ির কোনও প্রবীণ সদস্য আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন— এ ধরনের পরিস্থিতিতে এক একটি মিনিটও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার বা অ্যাম্বুলেন্সকে খবর দেওয়া হলেও তা পৌঁছতে ন্যূনতম যে সময় লাগে, তাতে রোগীর প্রাণ চলে যেতে পারে। সে সময়েই সাহায্য করতে পারে সিপিআর।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কার্ডিয়োপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর হল জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা সকলের শিখে রাখা প্রয়োজন। জেনারেল ফিজ়িশিয়ান সুবীর মণ্ডল বলছেন, “জলে ডুবে গেলে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, রেসপিরেটরি অ্যারেস্ট ইত্যাদির মতো ঘটনায় অনেক সময়েই ব্যক্তির হৃৎস্পন্দন বা শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। শরীরে তখন অক্সিজেনের পরিমাণ কমে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু না হলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গ, বিশেষ করে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সে সময়ে সিপিআর দেওয়া দরকার।”
সিপিআর কী?
মূলত যতক্ষণ না চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছয়, ততক্ষণ বুকের উপরে চাপ দিয়ে এবং কৃত্রিম শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ সাময়িক ভাবে চালু রাখার চেষ্টাকেই বলা হয় সিপিআর। এক বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডা. ইন্দ্রনীল দাস বলছেন, “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং রেসপিরেটরি অ্যারেস্ট— এই দু’ক্ষেত্রেই সিপিআর দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। দুই ক্ষেত্রেই ঘটনার পরের চার-পাঁচ মিনিট ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে সিপিআর দেওয়া শুরু করা গেলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।” কিন্তু সমস্যা হল, অধিকাংশই জানেন না কী ভাবে সিপিআর দিতে হয়। ফলে সময় নষ্ট হয়।
কখন প্রয়োজন বুঝতে হবে
গরমে বা স্ট্রেস থেকে কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে সিপিআর দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এপিলেপ্সির মতো সমস্যাতেও সিপিআর দিতে হবে না। তাই ডা. সুবীর মণ্ডল বলছেন, “কখন সিপিআর দিতে হবে, সে জ্ঞান স্পষ্ট থাকতে হবে। সিপিআর দিতে শেখার চেয়েও, সেটা জানা বেশি জরুরি। এর জন্য আগে পালস দেখা শিখতে হবে।” অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা জলে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে একাধিক বার ডাকাডাকি করার পরেও যদি তাঁর সাড়া না পাওয়া যায়, তখন নাড়ি পরীক্ষা করতে হবে। পালসওযদি না মেলে, তবেই সিপিআরদিতে হবে।
সিপিআর দেওয়ার সময়ে
প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ বার চাপ দেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। প্রতিটি চাপের গভীরতা ৫-৬ সেন্টিমিটার হওয়া উচিত। সিপিআর যিনি দিচ্ছেন, তিনি যদি ঘেমে হাঁফিয়ে যান, তবেই বুঝতে হবে কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছে। প্রশিক্ষিত হলে প্রতি ৩০টি বুকের চাপের পর ২টি কৃত্রিম শ্বাস দেওয়া হয়। এর জন্য মাথা একটু পিছনে হেলিয়ে নাক চেপে ধরে মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিতে হয়, যাতে বুক সামান্য ফুলে ওঠে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ‘হ্যান্ডস ওনলি সিপিআর’ জীবন বাঁচাতে কার্যকর হতে পারে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে পদ্ধতি একই হলেও নিয়ম আলাদা। জলে ডুবে যাওয়া রোগী হলে তাকে উল্টো করে শুইয়ে দিন। তার মাথা পাশ ফিরিয়ে রেখে একই পদ্ধতি অবলম্বন করুন।
প্রয়োজনীয় সতর্কতা
প্রথম কথা হল, শুধু সিপিআর দেওয়া শিখলেই হবে না। তার অনুশীলন রাখতে হবে। নয়তো জরুরি অবস্থায় ঠিক মতো দেওয়া সম্ভব হবে না। তা ছাড়া, সিপিআর দেওয়ার কাজটা সহজ নয়। একজনের একার পক্ষে বেশিক্ষণ তা দেওয়াও কঠিন। তাই কাউকে সিপিআর দেওয়ার প্রয়োজন বুঝলে আগেই দ্রুত লোক জড়ো করতে হবে। চিকিৎসা সহায়তার জন্যও দ্রুত খবর দিতে হবে। রাস্তাঘাটে অসুস্থ কাউকে সিপিআর দিতে হলে আগে ট্রাফিক পুলিশকে ডেকে নেওয়া ভাল। ডা. ইন্দ্রনীল দাস বলছেন, “১৫ বছরের ঊর্ধ্বে সুস্থ যে কোনও ব্যক্তিই সিপিআর দিতে পারেন। তবে গর্ভাবস্থায় কাউকে সিপিআর না দেওয়াই ভাল। মেরুদণ্ড, কোমর বা কবজিতে কারও চোট থাকলে, তিনি সিপিআর দেবেন না। শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে অন্যকে সিপিআর দেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত।”
সমস্যাও রয়েছে
সিপিআর দিতে গিয়ে অনেক সময়েই রোগীর বুকের বা পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় বা চিড় খায়। চিকিৎসকেরা সে বিষয়ে সতর্ক থাকেন। ব্যক্তিকে প্রাণে বাঁচানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য থাকে। কিন্তু পথেঘাটে কোনও ব্যক্তিকে সিপিআর দিতে গিয়ে তার বুকের পাঁজরের হাড় ভাঙলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। অনেক সময়ে সিপিআর দিয়েও রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না বা রোগী ভেজিটেটিভ স্টেটে চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইনি সমস্যায় পড়তে হতে পারে ব্যক্তিকে। তাই এ সব বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
তবে এ কথাও ঠিক আইনি সমস্যার চেয়ে রোগীকে বাঁচানো জরুরি। সে কারণেই বিশ্বজুড়ে এখন সিপিআর শেখানোর উপরে জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক দেশে স্কুল, কলেজ, অফিস, এমনকি শপিংমল বা বিমানবন্দরেও সিপিআর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকে। এ দেশেও ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত সিপিআর প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করছে। বিপদআপদের কথা ভেবে তাই প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সিপিআর দেওয়া শিখে রাখতেই পারেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)