নানা সমস্যায় জর্জরিত পৃথিবী, মানুষ। অভিঘাত এড়াতে অনেকেই অনুসরণ করছেন ওয়াবি-সাবি, মিনিমালিজ়ম ইত্যাদি সংযমী ঘরানার জীবনশৈলী। এগুলি কিন্তু কৃচ্ছ্রসাধন নয়, বরং সমতার সাধনা।
কোথাও ভয়াবহ বন্যা, বা দাবানল। অর্থনীতিতে ধস। কোভিড, লকডাউন। যুদ্ধোত্তর জ্বালানি সঙ্কট, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়। সঙ্কট চারিদিকে। যেন এক দুর্যোগের কক্ষপথে চলেছে পৃথিবী। একটির প্রভাব স্তিমিত হতে না হতেই আর একটি বিপদ হাজির। দেখা গিয়েছে যখনই কোনও দেশ বা গোটা বিশ্ব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে, প্রতিরক্ষার কৌশল হিসাবে জনসাধারণ জীবনশৈলীতে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। এই অঙ্কেই জাপানের ওয়াবি-সাবি লাইফস্টাইল ইদানীং পৃথিবী জুড়ে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে যেমন মিনিমালিস্টিক জীবনশৈলী বা অল্পে সন্তুষ্ট থাকার দৃষ্টিভঙ্গির কদর বেড়েছে, এ-ও অনেকটা তেমনই।
যুগ-যুগান্তের রক্ষক
ওয়াবি-সাবির শিকড় বৌদ্ধদর্শনে। মূল ভাবনা, সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর জাপানে যখন চিনা পণ্য ছেয়ে গিয়েছিল, তখন স্থানীয় বাণিজ্য ও গ্রামীণ জীবনকে টিকিয়ে রাখতে নাকি এই দর্শনের প্রচলন শুরু। পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলার পর জাপান এই দর্শনকে ফের আঁকড়ে ধরে। মিতব্যয়িতা, জিনিসপত্র মেরামত করে পুনর্ব্যবহার ইত্যাদি অভ্যাসে ভর করে দেশ ধীরে ধীরে আলোর পথে ফেরে। বিশ্বের বহু দেশই কঠিন সময়ে এমন নানা পদ্ধতিকে ঢাল করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরে ইউরোপের বহু দেশেই খাদ্যের ন্যায্য বণ্টনের জন্য রেশনিং চলত, মানুষ বিলাস এড়িয়ে ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে ছোট জায়গায় থাকার অভ্যাস গড়েছিলেন। ১৯৭৩-র তেল সঙ্কটের সময়ে ছোট গাড়ি ব্যবহার, রবিবারে গাড়ি বার না করার সাশ্রয়ী ধারণা চালু হয়। এই সমস্ত জীবনাভ্যাসের মধ্যেই আধুনিক মিনিমালিস্টিক জীবনশৈলীরবীজ লুকিয়ে আছে।
ভারত হয়তো বাকিদের চেয়ে এই সংযমী জীবনের সঙ্গে বেশিই পরিচিত। ওয়াবি-সাবি, মিনিমালিজ়ম-এর ঝলক মেলে মহাত্মা গান্ধীর সমাজনীতিতেও। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘পৃথিবীতে সবার প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদ আছে, তবে লোভ মেটানোর মতো নেই।’ এ সবই কিন্তু অতিরিক্ত ভোগবিলাসের ত্রুটি দেখায়।
সীমারেখাটা চেনা থাক
সমাজতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক অনিরুদ্ধ চৌধুরী বললেন, “আমাদের নৈতিক কাঠামোয় বরাবরই ‘সিম্পল লিভিং হাই থিঙ্কিং’ ছিল। রতন টাটা তো এ কালেও সেটা করে দেখিয়েছেন। মুক্ত অর্থনীতির জোয়ারে বিজ্ঞাপনী চটক, ভোগবাদের দাপট বেড়েছে। প্রাথমিক চাহিদা মেটানোর পরেও অতিরিক্ত আড়ম্বরে ঝোঁক তারই একটা ফল। তার উপর জুড়েছে সমাজমাধ্যমে দেখনদারি। দামি গাড়ি, রোজ বেড়ানো, বাইরে খাওয়া, শপিং, এমনকি থাকা, খাওয়া, শোয়ার সময়েও নানা ব্র্যান্ড ব্যবহারের তাগিদে বহু মানুষ ঋণ, ইএমআই-এর খপ্পরে পড়ে যাচ্ছেন। বিলাস-ব্যসনকে বর্জন নয়, তবে, প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যের সীমারেখা চেনা জরুরি। দীর্ঘ অভ্যাস এবং পরিবারে এর চর্চায় এই সমতা রাখা সহজ হবে।” অতএব, সঙ্কটের প্রহরে পায়ের মাটি শক্ত রাখতে আমরাও কিছু কৌশল ভাবতে পারি।
সাত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’
- রোজ দু’পদের সাধারণ হাল্কা খাবার খেলেই একটি আধুনিক পরিবার এক মাস একটি গ্যাস সিলিন্ডারেই চালাতে পারবে। প্রায়ই ডুবো তেলে ভাজাভুজি, তিন-চার ঘণ্টা কষিয়ে রাঁধা মাটন, দমে পাকানো বিরিয়ানি চালিয়ে গেলে গ্যাস তো ফুরোবেই, স্বাস্থ্যও ভাঙবে। মরসুমি আনাজ, ফল খান। রোগ প্রতিরোধেও সহায়ক।
- দশটা জামাকাপড়ের বদলে চারটে এমন পোশাক কিনুন যেগুলি টেকসই; নানা ভাবে, নানা জায়গায় পরা যাবে। অর্থাৎ, ‘মাল্টিইউটিলিটি’। অধ্যাপক এবং সমাজতত্ত্ববিদ নন্দিনী ঘোষ বললেন, “একটা পোশাক তৈরিতে অনেক জলও নষ্ট হয়। তাই বুঝেশুনে কিনলে প্রকৃতিরও লাভ।”
- জেন জ়ি একই মানুষের তিন-চারটে বাড়ি-বাগানবাড়ির বিপক্ষে। তাদের মতে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গা দখল করা অনৈতিক, অত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের সময়ও নেই। বিনিয়োগ হিসাবে যৌক্তিক হলেও বর্তমান প্রবণতা— একটিই বাড়ি বা ফ্ল্যাটকে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা। বাড়ির অতিরিক্ত ঘর বা তল, একাধিক ফাঁকা ফ্ল্যাট ভাড়া দিলে আপনারই লাভ।
- ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরি, লং ড্রাইভের প্রবণতাতেও রাশ টানা যায়। ইচ্ছের বদলে প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিন, এক বারে অনেক কাজ সেরে আসুন, গণপরিবহণ ব্যবহার বাড়ালে জ্বালানিরও সাশ্রয় হবে, দূষণও কমবে।
- সামাজিকীকরণ বাড়ান। গোষ্ঠীজীবনের যূথবদ্ধ শক্তি বিপদ মোকাবিলায় সুবিধা দেয়। একসঙ্গে থাকতে পারলে সব দিক দিয়েই খরচ কমে। না পারলে, আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্কটুকু রাখুন। দেখবেন, সপ্তাহান্তে পার্টি বা রেস্তরাঁয় খাওয়া, মাসে দু’বার মাল্টিপ্লেক্স আর বছরে তিন বার দেশ-বিদেশ ঘোরাতেই আনন্দ সীমিত নয়। আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে বাড়িতেই ওয়ান পট মিল আর আড্ডা-গানের মাধ্যমেই দিব্যি অবসর-বিনোদনের আয়োজন হয়ে যায়।
- এক ঘরে সবাই থাকলে, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলে বিদ্যুৎ বাঁচবে। শক্তিসাশ্রয়ী বাল্ব ব্যবহার, এসি-র ব্যবহার কমিয়ে জানলা-দরজা খুলে রাখাও সুঅভ্যাস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ইউরোপের বিদ্যুৎ সঙ্কটের সময় হিটারের ব্যবহার কমিয়ে মানুষ গরম পোশাক বেশি চাপাতেন। আমাদের পক্ষে হয়তো পাখা-এসি ত্যাগ কষ্টকর। তবে, ছুটির সন্ধেয় ঘরের আলো নিভিয়ে খানিকক্ষণ ছাদে পায়চারির ভাবনা অবাস্তব নয়।
- মাসিক বাজেট করে ঘরে-বাইরে খরচ করুন। কিছুটা নগদে লেনদেন করুন। এগুলিও খরচের প্রবণতা সামাল দেয়। সঞ্চয় বাড়িয়ে তার কিছুটা সুরক্ষিত ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে নিশ্চিন্তি বাড়বে। সৌরশক্তি ব্যবহারের অভ্যাসেও দীর্ঘমেয়াদি ফল পাবেন।
পাঁচ কারসাজি বা ম্যাজিক-চাবি
পরিবারের মধ্যে পোশাক অদলবদল করে পরতে পারেন। ভেবে দেখবেন, তুতো ভাই-বোনদের পোশাক পরে অনেকেই বড় হয়েছেন।
সাময়িক প্রয়োজনের জিনিস কেনার বদলে বন্ধুবান্ধব, দোকান থেকে ধার নিন। যেমন ডিএসএলআর, ড্রোন, দূরবিন।
কিছু বিকল হলে, ভেঙে গেলেমেরামত করে নিন।
বাড়িতে জমা পুরনো অব্যবহৃত বস্তু বিক্রি করতে পারেন। ঘর পরিষ্কার থাকলে মন-মাথাও সাফ এবং লক্ষ্মীলাভ।
ডিজিটাল খরচ কমিয়ে দিন। অবসরের সবটা সমাজমাধ্যম, স্মার্টফোনকে দেবেন না। অনেক ঝঞ্ঝাট, প্রলোভন কমবে। পরিবেশকে সুস্থ করতে ই-বর্জ্য কমান। গ্যাজেট, মোবাইল প্রতি বছর বদলান? শুধু কভার পাল্টে দেখুন।
আমাদের মস্তিষ্কের কারসাজি হল— কোনও জিনিস পেতে ইচ্ছে জাগলে সে নানা ভাবে তার দিকে দৌড় করায়। অ্যালগরিদমের মতোই। তাই, শখের জিনিস কিনতে ইচ্ছে করলে, এক মাস অপেক্ষা করুন। পরের মাসেও আকাঙ্ক্ষা তীব্র থাকলে তখন কিনুন। অনেক সময়েই দেখবেন, এক মাস পরে সেই জিনিসটা কেনার তাগিদ আর অনুভব করছেন না।
নন্দিনী বললেন, “সব ক্ষেত্রেই মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত শুষে নিচ্ছে পৃথিবী থেকে। সেখানেই একটু লাগাম টানা প্রয়োজন।” আর সেটাই হল জাদুকাঠি। এই সব অল্প অল্প সংযমের সু্অভ্যাস যেমন অনিশ্চিত সময়ে মানুষকে রক্ষা করবে, তেমনই পৃথিবীও তো হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। ফলে, আগামী দিনের সেই মহা-বিপর্যয়ের বর্ম প্রস্তুতির কাজটাও এগোবে; যার নাম জলবায়ু সঙ্কট। মিনিমালিজ়ম একটা জীবনবোধ, তার অভ্যাস শুরু করলে দেখবেন ক্রমশ তার উপযোগিতাও বুঝতে পারবেন।
ছবি: অমিত দাস; মডেল:রেজ়ওয়ান রব্বানি শেখ, দীপান্বিতা হাজারি, অলিভিয়া সরকার,নিকুঞ্জ বিহারি দত্ত, রাইমা গুপ্ত; মেকআপ: প্রিয়া গুপ্ত
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)