নির্বাচনী প্রচারের সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক হাতে ছিল স্মার্টওয়াচ, অন্য হাতে ফিটনেস ব্যান্ড, সঙ্গে স্মার্টরিং। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সব একসঙ্গে কেন পরছেন, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। মমতা একা নন, ফিল্মি তারকা, ক্রীড়াবিদ, এমনকি চিকিৎসকেরাও এখন একসঙ্গে একাধিক ফিটনেস গ্যাজেট পরছেন। বিষয়টি নিয়ে বিবিধ মত রয়েছে। অনেকের মতে, পুরোটাই স্টাইল স্টেটমেন্ট। ব্যাপারটা নিছকই ফ্যাশন নাকি প্রয়োজনীয়, তা জানার জন্য বুঝতে হবে প্রত্যেকটি ডিভাইসের কাজ।
ফিটনেস ট্র্যাকারে নতুন যুগ
ফিটনেস ট্র্যাকার মানে শুধু স্টেপ কাউন্টার নয়। ঘুমের গুণমান, হার্ট রেট, স্ট্রেসের মাত্রা ইত্যাদিও বিশ্লেষণ করে এগুলি। আলাদা ট্র্যাকারের আলাদা বৈশিষ্ট্য।
- ফিটনেস ব্যান্ড: তুলনামূলক ভাবে সস্তা। শারীরচর্চা ও দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্য দিয়ে স্টেপ কাউন্ট, ক্যালরি বার্ন, হার্ট রেট ইত্যাদির হিসাব রাখে। তবে বিস্তারিত স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ করতে পারে না। অ্যাপ ইন্টিগ্রেশন ও তথ্যের যাথার্থ্যও তুলনায় কম।
- স্মার্টওয়াচ: ফিটনেস ট্র্যাকিংয়ের সঙ্গে স্মার্টফোনের কাজও হয়। ভাল স্মার্টওয়াচে ফিটনেস ব্যান্ডের সুবিধাগুলোর সঙ্গে ইসিজি, রক্তচাপ, শারীরিক তাপমাত্রা, জিপিএস-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণের সুবিধে থাকে। কাজের ব্যস্ততার মাঝে যাঁরা ফিটনেস ট্র্যাকিং ও স্মার্ট ফিচারস দুই-ই চান, তাঁদের জন্য ভাল। তবে এর ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়।
- স্মার্টরিং: নানা রকম সেন্সর থাকে। শরীরের ভিতরের তথ্য দিতে সক্ষম। ঘুমের গুণগত মান বিশ্লেষণ করতে পারে। বিশ্রামের পরে শরীর কতটা ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে পারল, তা-ও বোঝা যায়। দিনভর পরিশ্রম, শারীরচর্চার জন্য শরীর কতটা সক্ষম, হৃদ্স্পন্দনের ওঠানামার হার, সে হিসাবও আংটি কষে দিতে পারে। তবে এর নিজস্ব ডিসপ্লে নেই। শারীরচর্চার সময়ে ট্র্যাকিংও খুব ভাল করতে পারে না।
- হুপ ব্যান্ড: সবচেয়ে দক্ষ। এটি ফিটনেস ট্র্যাকার নয়, বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষতা কতটা বাড়ল, তার হিসাব দেয়। শরীরের কতটা শক্তিক্ষয় হয়েছে, তা থেকে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া, ঘুমের মানোন্নয়নের নির্দেশনা, বিশ্রামের সময়েও হৃদ্স্পন্দনের হারের ওঠানামার বিশ্লেষণ করতে পারে। এরও নিজস্ব ডিসপ্লে নেই। এর ব্যবহারের জন্য সাবস্ক্রিপশন চার্জ লাগে।
কার, কোনটা প্রয়োজন?
ফিটনেস বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ ঘোষাল বলছেন, “বিষয়টি ফ্যাশন কিংবা দামের মাপকাঠিতে ভাবলে হবে না। নিজেকে বুঝতে হবে কী কী সুবিধা চাই। সেই অনুযায়ী ডিভাইস বাছতে হবে।” সব ক’টা ডিভাইস একসঙ্গে পরার যৌক্তিকতা কী? এই ট্রেন্ডকে বলা হয় ‘ডেটা স্ট্যাকিং’ অর্থাৎ বহু তথ্যকে একত্রে বিশ্লেষণ। অনেকেই নিজের শরীরকে সম্পূর্ণরূপে জেনে সেই অনুযায়ী তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী। সঙ্গে রয়েছে বায়োহ্যাকিংয়ের প্রবণতা, যার অর্থ প্রযুক্তি এবং তথ্য ব্যবহার করে নিজের শরীর-মনের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা। যদিও অরিজিৎ ব্যক্তিগত ভাবে একসঙ্গে এত ফিটনেস গ্যাজেট ব্যবহারের পক্ষপাতী নন।
সমস্যা কোথায়?
ব্যবহারকারীদের মতে, শরীর সম্পর্কে যত তথ্য হাতে থাকবে, তত তার যত্ন করা সম্ভব হবে। তবে সব ক্ষেত্রে তা না-ও হতে পারে। অরিজিৎ বলছেন, “সমাজমাধ্যমের কল্যাণে বায়োহ্যাকিং, ডেটা স্ট্যাকিং এখন ট্রেন্ড। অনেকেই ভাবছেন একাধিক ডিভাইস থেকে তথ্য নিয়ে নিজের জন্য স্বাস্থ্যকর রুটিন বানাবেন। কিন্তু তার জন্য অনেক পড়াশোনা দরকার। সব ডিভাইস সব সময় একই রকম তথ্য দেবে না। ফলে বিভ্রান্তি, দুশ্চিন্তা বাড়তে পারে। অনেক সময়ে শারীরিক অস্বস্তি না থাকলেও, শুধু ডিভাইসের তথ্য দেখেই অনেকে ঘাবড়ে যান।” ডিভাইস যখন খুলে রাখা হচ্ছে, সেই সময়ে ব্যক্তি কী করল, তার হিসাব পেল না যন্ত্র। পরে যখন ব্যক্তি আবার পরবেন, সেখানে তথ্যের হিসেবনিকেশে গোলমাল হতে পারে।
ডিজিটাল ফরেন্সিক ইনভেস্টিগেটর পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় আরও একটি সমস্যা তুলে ধরলেন। “ডিভাইসগুলোর অধিকাংশই এআই দ্বারা চালিত। তাতে জিপিএস-সহ একাধিক ট্র্যাকিং সেন্সর থাকে। অ্যাপে তথ্য সংরক্ষিত হয়। এই অবস্থায় এতগুলো ওয়্যারেবল ডিভাইস একসঙ্গে ব্যবহার করার অর্থ ব্যক্তির যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য অন্যের নাগালে থাকা। এখনকার যুগে যেখানে ডিজিটাল স্ক্যাম জলভাত, সেখানে এত ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের নাগালে থাকা বিপজ্জনক।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ডিভাইসই যথেষ্ট। বড়জোর দু’টি। স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ব্যান্ডের সঙ্গে সাধারণ ঘড়ি পরা যায়। জিমে স্মার্টরিং ব্যবহার না করাই ভাল। ডেস্ক জবযাঁরা করেন, তাঁরা স্মার্টরিং পরতে পারেন। দিনভর যাঁদের বাইরে থাকতে হয়, তাঁদের জন্য স্মার্টওয়াচ সুবিধেজনক। প্রযুক্তি আমাদের শরীর সম্পর্কে সচেতন করছে, এটা নিঃসন্দেহে ভাল দিক। কিন্তু স্বাস্থ্যসচেতনতা যেন বাতিকে পরিণত না হয়। ডিভাইসের চেয়ে মানুষ নিজের শরীরকে সবচেয়ে ভাল বুঝতে পারে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)