E-Paper

লিভার প্রতিস্থাপনের আগে টিপস সার্জারি

সিরোসিস বা লিভারের অন্য সমস্যায় প্রতিস্থাপনই যখন একমাত্র পথ, তা কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে এই অস্ত্রোপচার

সায়নী ঘটক

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৮:৫৫

দীর্ঘ দিন ধরে লিভারের সমস্যা চলার পরে যদি তা সিরোসিসের দিকে চলে যায়, তা হলে একটা পর্যায়ের পরে প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। কিন্তু লিভার প্রতিস্থাপনের জটিলতা, খরচ যেমন বেশি, তেমনই এই অস্ত্রোপচারের আগে দাতা পাওয়াও অনেক সময়ে কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে সাময়িক সমাধান হতে পারে একটি অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফিক সার্জারি— টিপস (ট্রান্সজুগুলার ইন্ট্রায়েপেটিক পোর্টোসিস্টেমিক শান্ট)। এই অস্ত্রোপচারের সাহায্যে লিভারে একটি স্টেন্ট বসানো হয় এবং পোর্টাল প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এই সার্জারির পরেও কেউ লিভার প্রতিস্থাপন করাতেই পারেন, সে ক্ষেত্রে হাতে আরও একটু সময় পাওয়া যায়।

ইন্টারভেনশন রেডিয়োলজিস্ট ডা. মৌসম দে বললেন, “কলকাতা শহরে গত সাত আট বছরে আমরা ১৬৫ জন রোগীর টিপস সার্জারি করেছি। তার মধ্যে গোটা দশেক ব্যক্তি পরবর্তী কালে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের দিকে গিয়েছেন। বাকিরা উপসর্গহীন, ট্রান্সপ্লান্ট না করিয়েও ভাল আছেন।”

সমস্যার সূত্রপাত

ক্রনিক লিভার ডিজ়িজ় যাঁদের থাকে, প্রথম প্রথম তা খুব একটা সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু লিভারের সমস্যায় যাঁরা দীর্ঘ দিন ধরে ভোগেন, একটা সময়ের পরে দেখা যায়, তাঁদের পেট ফুলে যাওয়া, বমির সঙ্গে রক্ত বেরোনো কিংবা কালো মলত্যাগের মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রথমেই তাঁরা আল্ট্রাসাউন্ডের পরামর্শ দেন। সেটি করলে দেখা যায়, পেটে বা বুকে জল জমছে। তখন সূচ ফুটিয়ে সেই জল বার করতে হয়।

সিরোসিসের সমস্যা দীর্ঘ দিন ধরে থাকলেও উপসর্গ দেখা না দেওয়া অবধি অনেকেই সতর্ক হন না। ডা. দে জানালেন, এই সমস্যার কোনও চিকিৎসা আগে ছিল না। “লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পরামর্শ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকত না। কিন্তু আমাদের মতো দেশে লিভার প্রতিস্থাপন সকলের পক্ষে সহজ নয়। প্রথমত, রক্তের গ্রুপ মিলছে এমন কোনও ডোনার দরকার হয়, যাঁর বয়স ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। ডোনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সহজলভ্য নয়। দ্বিতীয়ত, লিভার প্রতিস্থাপনের খরচ বিপুল। সাফল্যের নিশ্চয়তাও সব সময়ে দেওয়া যায় না। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের কাছে তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে টিপস-এর মতো সহজ সমাধানের পথ বেছে নিতে পারেন রোগীরা,” বললেন তিনি।

কী ভাবে হয় এই সার্জারি?

টিপস কী ভাবে হয়, তা সংক্ষেপে বলতে গেলে— গলায় একটা মাত্র সূচ ফুটিয়ে ভিতরে অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফির মাধ্যমে লিভারের মধ্যে একটা নতুন রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হয় এই সার্জারির মাধ্যমে। রোগীর গলা পরিষ্কার করে প্রস্তুত করে নেওয়া হয় প্রথমে। মেজর অ্যানাস্থেশিয়া দেওয়া হয় না, লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া হলেই চলে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি দেখে গলার শিরার মধ্যে প্রবেশ করা হয়। অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফির মাধ্যমে লিভারের দু’টি শিরার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। তার পরে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে দেখে সেটায় একটা জালির মতো আকৃতির স্টেন্ট পরিয়ে দেওয়া হয়। তার পরে দেখা যায়, শিরার মধ্যকার রক্তপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সার্জারির এক-দু’দিন পরেই রোগী বাড়ি চলে যেতে পারেন। পেটে কোনও দাগওথাকে না।

লিভার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব?

টিপস-এর পরেও কি লিভার পাল্টানো যায়? অনেক রোগীর মনেই এই প্রশ্ন আসে। ডা. দে জানালেন, টিপস-এর মাধ্যমে শুধু সময়টা খানিক বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব। সিরোসিসের সরাসরি চিকিৎসা এটি নয়। কাজেই কেউ যদি ডোনার ও পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করতে পারেন, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত লিভার সম্পূর্ণ রূপে প্রতিস্থাপন করিয়ে নিতেই পারেন। টিপস-এর ফলে লিভারের মধ্যে যে রক্তের চাপ (পোর্টাল প্রেশার) বেড়ে গিয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এর পাশাপাশি কালো মলত্যাগ, রক্তবমি বা পেটে-বুকে জল জমার মতো সমস্যাগুলিও অনেকটা কমে যায়।

এই সার্জারির ঝুঁকি

টিপস-এর পরে হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথির ঝুঁকি থেকে যায়। এর ফলে ড্রাউজ়িনেস, অর্থাৎ ঝিমুনি বেড়ে যায়। লিভার ফেলিয়োর এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সম্ভাবনাও থেকে যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই অস্ত্রোপচার সফল হয়, যা ক্ষতিগ্রস্ত লিভারকে আরও কিছু বছর কার্যকর রাখতে সাহায্য করে। তবে কতটা সময় হাতে পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করে লিভার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার উপরে।

টিপস সার্জারিতে সময় যেমন কম লাগে, ব্যথা-যন্ত্রণাও প্রায় হয় না। রোগী খুব তাড়াতাড়ি আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন। এই সার্জারির আগে ও পরে হালকা ডায়েটের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। লিভারের অসুখে যেমন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে হয়, এ ক্ষেত্রেও তা করলেই হবে। খাদ্যতালিকায় লিন প্রোটিন, বেশি করে আনাজপাতি, ফল, গোটা শস্য রাখতে হবে। অ্যালকোহল সম্পূর্ণ রূপে বাদ দিতে হবে। সেই সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা, লিভার ফ্যাট কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। তবে যাঁদের হার্ট ও ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে, মস্তিষ্কের নার্ভের জটিলতা রয়েছে কিংবা অন্তিম পর্যায়ের লিভার ফেলিয়োর হয়েছে— তাঁরা এই সার্জারি করাতে পারবেন না।

টিপস সার্জারি লিভার সিরোসিসের প্রতিকার না হলেও সহায়ক। যাঁরা আর্থিক বা অন্য প্রতিবন্ধকতার কারণে লিভার প্রতিস্থাপন করাতে পারছেন না, তাঁরা এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে আস্থা রাখতে পারেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

liver

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy