‘‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে বিদেশি ব্যাপার, আমাদের কাছে তো সরস্বতী পুজোই রয়েছে।’’
যে প্রজন্ম নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন চলে অন্যান্য প্রজন্মের মানুষের মনে, সেই জেনারেশন জ়েড-ই কথার ছলে বলে বসল গুরুত্বপূর্ণ এক কথা। বিশ্বায়নের মূলকথা টেলিপাড়ার ২০ বছরের অভিনেতা সোহম বসু রায়চৌধুরীর মুখে। তিনি নাকি ফেব্রুয়ারি মাসের এই উদ্যাপনের খুঁটিনাটি জানেনই না। সরস্বতীপুজোই তাঁর কাছে বাঙালির প্রেমের দিবস।
সরস্বতীপুজো মানেই শীতেশেষের শুরু আর বসন্ত আসার ইঙ্গিত। ফুলের কুঁড়ি ফোটা শুরু হবে, বিষণ্ণতা কাটবে, প্রেমে ফুরফুর করবে মন। আর তাই হলুদ রঙে সেজে সঙ্গীর সঙ্গে হাত ধরে রাস্তায় বেরোনোর দিন। সঙ্গী না থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে মনের মানুষকে এক ঝলক দেখার দিন। শহর থেকে শহরতলির রাস্তা ভরা যুগল। তার উপর আবার স্কুলের উদ্যাপনে অংশ নেওয়া, অন্য স্কুলের বন্ধুদের নিজের স্কুলে আহ্বান করা, দুরুদুরু বুকে পছন্দের মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা দূর থেকে দেখা— এই নিয়েই তো বসন্তপঞ্চমী। অন্তত এমন ভাবেই আশি-নব্বইয়ের দশকে প্রেমে প্রেমে কাটত সরস্বতীপুজো। একুশ শতকের শুরুতেও পুজোর দিনে প্রেমের অভাব ঘটত না।
তবে এর পরই সমাজমাধ্যমের দাপট শুরু হল। নতুন যুগে সব ধীরে ধীরে বদলে লাগল। যদিও সব যুগের শেষেই এমন হাহাকার পড়ে। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সমাজমাধ্যমের জেরে সত্যিই সব কিছুর অর্থ পাল্টে যেতে শুরু করল। আর সেই পরিবর্তনের গতি বেদম তীব্র। ফলে সকলের মুখে মুখে শোনা যেতে লাগল, ‘‘নতুন প্রজন্ম সবই খুব খেলার ছলে নেয়’’, ‘‘ওদের কাছে শিকড় গুরুত্ব পায় না’’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
কলকাতা শহর জুড়ে প্রেমের আমেজ। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
সেই ধারণা কতখানি সত্য, এই সরস্বতীপুজোয় তা নিয়েই কথা বললেন টেলি ও টলিপাড়ার চার শিল্পী। তাঁরা প্রত্যেকেই নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। ‘রাখি বন্ধন’ ধারাবাহিকের সোহম আনন্দবাজার ডট কম-কে বললেন, ‘‘আমি কোনও সম্পর্কে নেই। ফলে সরস্বতীপুজোয় কখনওই প্রেম করতে বেরোইনি। কিন্তু এই ধারা তো ভালমতোই বজায় আছে। রাস্তায় বেরোলেই চারদিকে সবাইকে হাত ধরে ঘুরতে দেখি। বন্ধুদের মধ্যেও দেখেছি, স্কুলের পর সঙ্গীর সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আমাদের মতো একাদের জায়গা হয় না। তবে জেন জ়ি-দের মধ্যে একটা বিষয় আছে, প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে বেরোলে আর কাউকে চিনতেই পারে না যেন! আমি তো বাবা-মায়ের কাছ থেকে গল্প শুনেছি, প্রেমিক-প্রেমিকারা বন্ধুদের দলের সঙ্গেও ঘুরতে যেত। নিজেদের জীবনে হয়তো একটু গোপনীয়তা পছন্দ করে তারা। কিন্তু আগের চল বন্ধ হয়নি। কলকাতা শহরের বড় বড় স্কুলে গেলে আরওই বোঝা যাবে সেটা।’’
শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের ২২ বছরের কন্যা অভিনেত্রী হিয়া চট্টোপাধ্যায় জানেন, বাবা-মায়ের যুগ আর তাঁর যুগে আকাশ-পাতাল তফাত। ‘পাড়া সংস্কৃতি’তে বড় হননি তিনি। মা-বাবার কাছে কেবল গল্পই শুনেছেন সে সময়ের উৎসব উদ্যাপনের। কিন্তু সরস্বতীপুজোর মতো অন্যান্য বাঙালি পরবের আমেজ বজায় রাখার জন্য পরিবারের মানসিকতা, বড় করে তোলার ধরন খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন হিয়া। তাই হয়তো আজও পুজোর দিন সকালে হলুদ শাড়ি পরে পুষ্পাঞ্জলি দিতে যান তিনি। ছোট থেকেই এই চল রয়েছে তাঁদের বাড়িতে। এ বার তিনি বন্ধুদের বাড়িতে নিমন্ত্রণে যাবেন বলে ঠিক করেছেন। হিয়া বলছেন, ‘‘এখন তো আমার মনের মানুষ কেউ নেই, কিন্তু যদি কখনও হয়, আমার ইচ্ছে আছে, সরস্বতীপুজোর দিন আমি তার সঙ্গে বেরোব, একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেব।’’ যে সমাজমাধ্যমের জন্য সমাজ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে নতুন প্রজন্মের বিরুদ্ধে, সেই সমাজমাধ্যমের ভিডিয়ো এবং রিল থেকেও পুরনো দিনের সরস্বতীপুজো এবং প্রাচীন বাড়ির পুজো সম্পর্কে জানতে পারেন হিয়া। শাশ্বত-কন্যার কথায়, ‘‘বসন্তের সময়ে প্রেমের অনুভূতি কোনও প্রজন্মেই মিলিয়ে যাবে না। সরস্বতীপুজো এসেছে মানেই বসন্ত এসে গিয়েছে।’’
সরস্বতীপুজোয় বাঙালিদের নানা ধারায় বদল আসছে কি? ছবি: সংগৃহীত।
‘নেতাজি’ ধারাবাহিকের নায়ক অঙ্কিত মজুমদারের বয়স মাত্র ১৭ বছর। কিন্তু তাঁর কথায় বিভিন্ন প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের বিষয় উঠে এল। তিনি বললেন, ‘‘আগের প্রজন্ম আর পরের প্রজন্মের দ্বন্দ্ব চিরকালের বিষয়। বাঙালির নিজস্বতা আমরা ভুলে যাব, এই ধারণা কেনই বা তৈরি হয়েছে, আমি জানি না। এখনও একই ভাবে আমরা স্কুলে যাই, হলুদ পোশাক পরে বন্ধুদের সঙ্গে বেরোই। চার দিকে বেশ প্রেম-প্রেম ব্যাপারও নজরে আসে। মোদ্দা আমেজ থেকে এক বিন্দু সরিনি আমরা। তবে হ্যাঁ, প্রযুক্তির কারণে এখন যে ভাবে মুহূর্তের মধ্যে যুগলেরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারে, অথবা মুখ দেখতে পারে, তা তো আগে ছিল না। ফলে ‘প্রেম দিবস’ হিসেবে সরস্বতীপুজো আর এক্সক্লুসিভ নয়। যে ভাবে সরস্বতীপুজোও প্রেমের দিন, সে ভাবে অন্যান্য পার্বণের দিনগুলিও ভীষণ ভাবেই প্রেমের হতে পারে। অথবা প্রত্যেকটি দিনই যে কোনও যুগলের কাছে প্রেমের হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তার পরেও সরস্বতীপুজো বাঙালির ভ্যালেন্টাইন্স ডে-ই থাকবে। এই তকমা কোনও প্রযুক্তিই ঘোচাতে পারবে না।’’
প্রয়াত অভিনেতা অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা, ১৫ বছরের অভিনেত্রী সাইনা চট্টোপাধ্যায় অবশ্য গত বছরই জানতে পেরেছেন যে, সরস্বতীপুজোকে বাঙালির ভ্যালেন্টাইন্স ডে বলে। এই উৎসবে দেবীর কাছে বইপত্র রেখে পরীক্ষায় ৯০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার জন্যই প্রার্থনা করেন তিনি। এ ভাবেই পার্বণকে চিনেছেন অভিষেক-কন্যা। তাঁর স্কুলে সরস্বতীপুজো হত না বলে সেই ধারার সঙ্গেও তিনি পরিচিত নন। প্রজন্মের হিসাব করলে সাইনা জেন জ়ি হলেও জেন আলফা-ও তাঁর থেকে খুব দূরে নয়। ফলে আরও যারা নতুন, তাদের প্রজন্মে এই ধারা হারিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও মিলল। কিন্তু শেষ উত্তর দেবে সময়।