Advertisement
E-Paper

বিচ্ছেদের পর বিয়েতে ভীতি! সতর্ক হয়ে পা ফেলাতেই কাটবে আতঙ্ক? কী মত সুদীপ্তা-তথাগত-শ্রীলেখার

বিয়ে ভাঙার পর দেখা গিয়েছে, অনেকের মধ্যে বিয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা, বিয়ে নিয়ে ভীতি, প্রেমের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হয়ে যায়। যদি পরবর্তীতে বিয়ে করেন, তা হলে বিশেষ ভাবে সতর্ক হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। কিন্তু তাতে কি কোনও সুবিধা হয় সংসার পাততে?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ ১০:৫৩
আবার বিয়ে করার নিয়ে ভীতি কেন তৈরি হয়?

আবার বিয়ে করার নিয়ে ভীতি কেন তৈরি হয়? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনে তপন সিংহ ১৯৬৪ সালে তুলেছিলেন ‘জতুগৃহ’ নামের ছবিটি। শতদল ও মাধুরী সামাজিক অর্থে সুখী দম্পতি। কিন্তু এক সময়ে দু’জনের মধ্যে মেঘ ঘনিয়ে ওঠে অশান্তির। মাধুরীর সন্তানধারণের অক্ষমতাকে ঘিরে তৈরি হয় সমস্যা। শতদল সর্ব অর্থে মাধুরীকে ভালবাসলেও মাধুরী কিন্তু বেরিয়ে আসতে চায় বিবাহবন্ধন থেকে। শতদলকে ‘সুখী’ করতে চাওয়াই তার উদ্দেশ্য। শেষমেশ বিবাহবিচ্ছেদে গিয়েই ইতি হয়। তার পরে শতদল বা মাধুরী, কেউই আর বিয়ে করেনি। কেন? সে প্রশ্ন ছবিতে ঊহ্য থাকলেও দর্শক বুঝতে পারেন। যে ‘কমিটমেন্ট’ তাদের বন্ধনে নিয়ে এসেছিল, বিচ্ছেদের পরেও সেটিই তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। ফলে ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসার পরে আর তাতে প্রবেশের প্রবৃত্তি হয়নি কারও।

কিন্তু বাস্তবে সবাই শতদল আর মাধুরী নন, সেই সঙ্গে কমিটমেন্টের সংজ্ঞাও বদলে গিয়েছে। আর বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠানটিও সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। বদলাচ্ছে তার আনুষঙ্গিক অন্য সব কিছু। সমাজের চোখে যদি বিবাহ স্বাভাবিক হয়, তা হলে বিবাহবিচ্ছেদও স্বাভাবিক, পরের বিবাহও স্বাভাবিক, তার পরেরটিও স্বাভাবিক— একের পর এক ঘটনা নিঃশব্দে এই ধারণা প্রচার করেছে। বিবাহ ও বিচ্ছেদ নিয়ে ছুতমার্গ কমছে এক পা এক পা করে। যার ফলে বিয়ে করা, আর প্রয়োজনে বিয়ে ভেঙে বেরোনো খানিক সহজ হয়েছে।

এ তো গেল সমাজের কথা। কিন্তু বিয়ে ভাঙার পর সেই দুই মানুষের মনে কেমন প্রভাব পড়ে? বিয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে শুরু করে বিয়ে নিয়ে ভীতি, অথবা একেবারে প্রেমের প্রতিই অশ্রদ্ধা তৈরি হয়ে যাওয়ার নজিরও দেখতে পাওয়া যায়। পরবর্তী কালে আবার একটা সম্পর্কে জড়াতে গেলে বা বিয়ে করতে গেলে তাই বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সতর্ক হয়ে পড়ছে নতুন প্রজন্ম। ভাল-মন্দ পরের কথা, কিন্তু তথ্য কী বলছে?

সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমে বিবাহ সংক্রান্ত একটি অ্যাপের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বিবাহবিচ্ছিন্নদের পুনর্বিবাহের জন্য নির্মিত অ্যাপ ‘রিবাউন্স’-এর তথ্য অনুসারে, ৫ জনের মধ্যে ৩ জন বিবাহবিচ্ছিন্ন ব্যক্তি বলছেন, প্রথম বিয়েতে যে সমস্যাগুলি চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, এখন তা স্পষ্ট চোখে পড়ছে। পরের বারের জন্য বেশ কিছু শর্ত নিজের মধ্যে তৈরি করে রেখেছেন আগে থেকেই। অর্থাৎ সতর্কতা বেড়েছে। অনেক বেশি স্পষ্ট চোখে দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা। সত্যিই কি তাই?

বিয়ের ভীতি আসলে কী?

বিয়ের ভীতি আসলে কী? ছবি: সংগৃহীত

টলিউডের অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীর মতে অবশ্য সতর্ক হয়ে বিশেষ লাভ হয় না। তিনি নিজেও এক বার বিবাহবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। আর তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, এ ভাবে স্পষ্ট কোনও তালিকা তৈরি করা সম্ভব নয়। ধরা যাক, কোনও মহিলা প্রথম বিয়েতে আর্থিক অনটনের সম্মুখীন হয়েছেন। তাঁর স্বামী কাজ করতেন না। পরের বার তিনি ভেবে নিলেন, যা-ই হয়ে যাক, এমন বিয়ে করবেন, যাতে এই সমস্যাটা থাকবে না। দ্বিতীয় বিয়েতে কোনও অভাবই চোখে দেখতে হল না তাঁকে। কিন্তু দ্বিতীয় স্বামীর হাতে শারীরিক ভাবে নিগৃহীত হতে হল।

অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী

অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী ছবি: সংগৃহীত

ঠিক যেমন অভিজ্ঞতা হয় মুম্বইয়ের টেলি অভিনেত্রী দলজিৎ কৌরের। গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগে প্রথম স্বামী শালীন ভনোটের সঙ্গে ডিভোর্স করেন। তার আট বছর পর অনেক আশা নিয়ে বিয়ে করেন ব্যবসায়ী নিখিল পটেলকে। এক বছরের মধ্যেই দলজিতের অভিযোগ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে নিখিলের। ফলে একটি ভয় থেকে পালাতে গিয়ে অন্য বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। হিসেবনিকেশ যেন কোনও কাজেই লাগেনি তাঁর। যে যে জিনিসে ধাক্কা খেলেন, সেগুলিই কেবল মাথায় রাখলেন, অথচ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল অন্য এক সমস্যা। এ ভাবে সমস্যার কোনও তালিকা তৈরি করা যায় না বলেই সুদীপ্তার মত। তাই তিনি বলছেন, ‘‘নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করলে, অত হিসেবনিকেশ মাথায় থাকে না। তবে কোন বিয়ে টিকবে, সে কথা কেউ বলতে পারে না। দু’টি মানুষের আত্মিক যোগযোগ হল কি না, পরিপার্শ্ব তাঁদের অনুকূল কি না, সেটিই দেখার।’’

দ্বিতীয় বিয়ে ও সম্পর্কে যাওয়ার আগে কী কী খুঁজছেন বিবাহবিচ্ছিন্নেরা? একে অপরের সুখদুঃখে সঙ্গে থাকা, বিশেষ করে মানসিক ভাবে। সে বিষয়ে মানসিক গভীরতা সম্পন্ন মানুষকে সঙ্গী হিসেবে চাইছেন অনেকে। তা ছাড়া টাকাপয়সার ব্যাপারে উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকতে চাইছেন কেউ কেউ। আবার, ছোটখাটো বিষয়েও অপমানিত হওয়াকে আর প্রশ্রয় দিচ্ছেন না অনেকেই।

অভিনেতা-পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়।

অভিনেতা-পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

একই ভাবে অভিনেতা-পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ের কাছেও সতর্কতার স্পষ্ট তালিকা রয়েছে। যদিও নিজের জীবনের ক্ষেত্রে তার কোনওটিই মেনে চলা হয়নি বলে দাবি তাঁর। কারণ, খুঁত ধরার চেয়ে তিনি আবেগে ভেসে যাওয়ায় পক্ষপাতী। তথাগতের কথায়, ‘‘আমি সেই বোকাদের দলে পড়ি, যারা বার বার হেরে যায়। বিপদসঙ্কেত খুঁজিনি নিজের দাম্পত্যের ক্ষেত্রে। কিন্তু যুক্তি দিয়ে দেখলে, পরবর্তী কালে অনেক কিছু ভেবেছি। কিন্তু কোনও বারই সেগুলি প্রয়োগ করিনি। কিন্তু বন্ধুদের পরামর্শ দিতে পারি। তাঁদের বলতে চাই, সম্পর্ক বা বিয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকলে ভাল।’’ প্রথমত, সম্পর্ক বা সঙ্গীকে নিজের সম্পত্তি বলে ভেবে নেওয়ার প্রবণতা যেন না থাকে। দ্বিতীয়ত, দাম্পত্যে বন্ধুত্ব খুব প্রয়োজন, বন্ধুত্ব থেকে স্বচ্ছতা তৈরি হয়। সেটিকে সম্পর্কে বিশেষ জায়গা দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তথাগত। তৃতীয়ত, ছোটখাটো কোনও বিষয়কে বহু দিন ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার স্বভাব থেকে দূরে থাকতে হবে। খুবই বিষাক্ত এক প্রবণতা। চতুর্থ বিষয়টি হল, ম্যানিপুলেশন। সম্পর্কের মধ্যে যদি কোনও একজন নিয়ন্ত্রক হতে চান, তা হলে তা খুবই বিপজ্জনক।

অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের কাছে প্রতিটি সম্পর্কই ওজনদার। তাই সম্পর্ক ভাঙা, দূরত্ব তৈরি হওয়া, অভ্যাস ভেঙে বেরোনো, এই সমস্ত ঘটনা খুবই যন্ত্রণার। তিনি বলছেন, ‘‘অনেকেই মানসিক ভাবে পুরোপুরি সমর্পণ না করেও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন। আমরা যাঁরা আগের প্রজন্মের মানুষ, তাঁরা বড্ড বেশি আবেগে চলি। তাই নতুন করে সম্পর্কে যেতে ভয় লাগে। সময়ও বেশি লাগে। তাই যদি কেউ নিজের ভাল বোঝার জন্য, স্বার্থের জন্য সময় নেন, বা সতর্ক হয়ে যান, সেটা অন্যায় নয়।’’ আবার সব সময়ে সতর্ক হয়েও যে উপকৃত হবেন, তা না-ও হতে পারে। সতর্ক হয়েও অন্যান্য সমস্যা ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। অভিনেত্রীর মতে, নতুন প্রজন্ম যাকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বলে, অর্থাৎ সঙ্গীর বিপজ্জনক আচরণ বা স্বভাব, তা গুনে শেষ করা যাবে না। কারও এটা আছে, কারও ওটা আছে। তাই সম্পর্কের রাস্তা চিরকালই বিপদসঙ্কুল। কিন্তু একই সঙ্গে পুরোপুরি দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষপাতী নন শ্রীলেখা। তিনি নিজের মনের দরজাটা অল্প খুলে রাখতে চান। হতেও পারে, কখনও এমন মানুষ প্রবেশ করলেন, যাঁর সঙ্গে সত্যিই মনের মিল হল।

অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র।

অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। ছবি: সংগৃহীত

বিয়ে ভাঙার পর আবার বিয়ে করার জন্য কী ভাবে মনের দরজাটি খুলে রাখা যায় তা হলে?

মনোবিদ ঝুমা বসাক মনে করেন, এ ক্ষেত্রে বিয়ের ভীতি মানে ফের বিয়ে ভাঙার ভীতি। এক বার বা দু’বার বিয়ে ভাঙার সময়ে যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, আবারও তার মুখোমুখি হওয়ার ভয় থাকে। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে বিয়ে কেবল দু’টি মানুষের মধ্যে হয় না, দু’টি পরিবারের মধ্যে হয়। সমাজ সেখানে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। যতই প্রগতিশীল হোক না কেন, সমাজ এখনও কিছু কিছু বিষয় নিয়ে সেকেলে মনোভাব পোষণ করে। ফলে বিয়ে ভাঙার পর যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তা বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। সে জন্য বেশি সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে।’’ বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ অনেক বেশি সজাগ। তাই বার বার সেই সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় মেয়েদেরই। আর দিন দিন তাঁরা ক্ষয়ে যেতে থাকেন। মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে যান তাঁরা। নতুন করে আর এক জনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, নিজের মধ্যে ও সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা নিয়ে ধন্দে ভোগেন তাঁরা। তাই একটা বিয়ে ভাঙার পর সময় দিতে হবে। সম্পর্ক থেকে কী চাইছেন, নিজের জীবনের থেকে কী প্রত্যাশা, সেগুলির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে। নিজের চাহিদা নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে কী ভাবে কথা বলা যায়, সেই কাজটাও শেখার জন্য সময় দিতে হবে নিজেকে।

মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ও মনে করেন, শুধু নিজেকে সুরক্ষিত রাখলেই হবে না, মনের জানালা খোলা রাখাও জরুরি। সব মানুষ এক নন এবং সব সম্পর্কের পরিণতি এক হয় না। তাই সারা ক্ষণ নিজেকে আড়াল করে রাখলে হয়তো আঘাত থেকে বাঁচা যায়, কিন্তু নতুন করে কারও সঙ্গে মন থেকে জুড়ে যাওয়ার সুযোগটাও হারিয়ে যায়। তাই তিনি বলছেন, ‘‘সাবধান হওয়া ভাল, এটা আমাদের শেখায় কোথায় ‘না’ বলতে হয় এবং আমাদের জন্য কোনটা প্রয়োজন। কিন্তু এই সাবধানতা যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন আমরা সব কিছু নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করি। আমরা নতুন মানুষকে তাঁদের মতো করে না দেখে অতীতের অভিজ্ঞতার চশমা দিয়ে দেখতে থাকি। ফলে সম্পর্কটি আর সহজ ভাবে বেড়ে উঠতে পারে না, কারণ মনের কোণে সব সময় ‘আবার যদি খারাপ কিছু হয়’— এমন ভয় কাজ করে।’’

ফলে স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়াও দরকার, আবার ডিঙির খোঁজটাও রেখে দেওয়া দরকার।

Relationship Tips Divorcee Second Marriage
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy