এক গর্ভ ভাগ করে নিয়েছেন তাঁরা। একই পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁদের বয়সও একই। পরিপার্শ্বটাও এক। এমন দু’জন হঠাৎ এক দিন আলাদা হয়ে গেলে কী হবে! ছোটবেলায় এমনই এক অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন তারা সুতারিয়া এবং তাঁর যমজ বোন পিয়া সুতারিয়া। আর সেই ঘটনা গভীর ছাপ ফেলেছিল তারার মনে। সেখান থেকেই উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিক, শৈশবের সম্পর্ক কী ভাবে মানুষের ভিতরের নিরাপত্তাবোধকে গড়ে তোলে।
অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীর একটি পডকাস্টে এসে তারা নিজের বোনকে নিয়ে কথা বলেন। বলিউড অভিনেত্রী তারার ইনস্টাগ্রামের পাতা দেখলেই বোঝা যাবে, যমজ বোনের সঙ্গে অপূর্ব এক সম্পর্ক তাঁর। তারার কথায়, ‘‘পছন্দ-অপছন্দের দিক থেকে আমাদের মিল রয়েছে। কিন্তু আবার প্রচুর অমিলও রয়েছে। দু’জন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ আমরা। পিয়া খুবই স্মার্ট, লোকের সঙ্গে মিশতে পারে। আমি চিরকাল ওর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতেই পছন্দ করি। ওটাই আমার নিরাপদ আশ্রয় বললে অত্যুক্তি হয় না।’’
তারা সুতারিয়া এবং তাঁর যমজ বোন পিয়া সুতারিয়া। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
তারা তাঁর যমজ বোন পিয়ার সঙ্গেই থাকেন শৈশব থেকে। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত এক ক্লাসেই পড়তেনও তাঁরা। একই গর্ভ থেকে একই পরিবেশ, সব কিছুই ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল ছোট থেকে। কিন্তু স্কুলে পড়াকালীন একটি ঘটনা তারা ও পিয়ার মনে এখনও দুঃস্বপ্নের মতো গেঁথে রয়েছে। তাঁদের ক্লাস আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল। এবং শিক্ষিকা যখন এই কথাটা বলেছিলেন, তারা বোনের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। সেই মুহূর্তটা তারার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। কারণ বোন ছাড়া নিজেকে কল্পনাই করতে পারতেন না তিনি। তারা ছিলেন মুখচোরা। বোন পিয়ার উপস্থিতিতেই তিনি স্বস্তি পেতেন কেবল। বোনকে ছাড়া কিছুই করতে পারতেন না। এই অভিজ্ঞতা শুধু সেই মুহূর্তের কষ্ট নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বেও প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবেলায় তিনি অনেকটাই বোনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এমনকি তাঁর মনে হত, বোন ছাড়া তাঁর নিজের আলাদা কোনও পরিচয় নেই।
মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের অভিজ্ঞতা খুব স্বাভাবিক। যমজ ভাইবোনদের মধ্যে সম্পর্ক জন্মের আগেই তৈরি হয়। তাই হঠাৎ আলাদা হয়ে গেলে মানসিক ভাবে একটা শূন্যতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এতে অনেক সময় ‘অ্যাটাচমেন্ট’ বা নির্ভরতার অনুভূতি আরও গভীর হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলে। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা— এই সব মিলেই ধীরে ধীরে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি হয়। কিন্তু সেই বয়সে দুই বোন একে অপরের জগৎ ছিল। ফলে আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল এই ঘটনা।
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান মনোবিদ আত্রেয়ী ভট্টাচার্য। যমজদের ক্ষেত্রে যে মিল দেখা যায়, তার পিছনে শারীরবৃত্তীয় কারণ রয়েছে। স্বাভাবিক ক্ষেত্রে দু’ভাবে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। প্রথমটি হল, একটি মাত্র ডিম্বাণু একটি মাত্র শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত হওয়ার পর, সেই জ়াইগোটটি দু’ভাগে ভাগ হয়ে দু’টি ভ্রূণ তৈরি করে। এদের জিনগত গঠন একই হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যখন মহিলার ওভ্যুলেশনের সময়ে একটির পরিবর্তে দু’টি ডিম্বাণু বেরিয়ে আসে এবং দু’টি আলাদা শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত হয়, তারা দেখতে আলাদা হয়। তারা ও পিয়া দ্বিতীয় দলের। তাঁদের দেখতে এক রকম নয়। মনোবিদ বলছেন, ‘‘মুখে মিল নেই, এমন যমজদের মধ্যেও খুবই গভীর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তবে পিঠোপিঠি ভাইবোনদের মধ্যেও (যাঁরা যমজ নন) সম্পর্কের এমন বন্ধন দেখা যেতে পারে। একসঙ্গে বড় হয়েছেন, একই রকম পরিবেশে বড় হয়েছেন, ব্যক্তিগত পরিসরটাও একই যাঁদের, এমনিতেই তাঁদের সম্পর্ক গভীর হবে। তার সঙ্গে শারীরবৃত্তীয় কারণও খানিক থাকে। এঁরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদেরকে আলাদা বা ভিন্ন মনে করেন না। তাই একে অপরের সঙ্গে দূরে থাকতে হলে, মানসিক যন্ত্রণা শুরু হয়। জন্মের আগে থেকে একই গর্ভে ছিলেন তাঁরা। তার পর থেকে প্রতিটা দিন এক ভাবে কেটেছে তাঁদের। সেই অভ্যাস থেকে হঠাৎ চ্যুত হলে, কষ্ট তো হবেই। তখন নিজেকে অন্যের থেকে আলাদা করে দেখতে হয়, সেটা তাঁদের জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক। কারণ, তাঁরা জেনেটিক ইনফরমেশন থেকে শুরু করে সব কিছুই ভাগ করে নিয়েছেন জন্মের আগে থেকে। সেখান থেকে অ্যাংজ়াইটি তৈরি হতে পারে। নিজের একটা অংশকে হারিয়ে ফেলার মতো অনুভূতি হতে পারে।’’ যদিও তারা ও পিয়ার মতো ভিন্ন যমজদের থেকেও অভিন্ন যমজদের মধ্যে এই বন্ধনটা অনেক বেশি দেখা যায়।
ছোটবেলার সম্পর্ক, বিশেষ করে ভাইবোনের বন্ধন, মানসিক গঠনকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে। আর সেই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তৈরি করে আত্মবিশ্বাস, সম্পর্কের ধরন আর নিজের পরিচয়।