পড়াশোনার চাপ বাড়ছে। স্কুলের পড়াশোনার বাইরেও নাচের ক্লাস, গান শেখা, ছবি আঁকা বা আবৃত্তি শেখা, সবই চলছে সমানতালে। সব মিলিয়ে শিশুর মনের উপর চাপ বাড়ছে। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে গিয়ে উদ্বেগের বোঝা বাড়ছে। অনেক সময়েই বকাবকির ভয়ে শিশুরা তাদের মানসিক অবস্থা ব্যক্ত করতে পারে না। ফলে মনে মনে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে যা দীর্ঘস্থায়ী অবসাদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। মনোবিদেরা বলেন, মানসিক চাপ ছোটদের মস্তিষ্কের গঠন ও বৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে। দেখা গিয়েছে, যে শিশুরা দীর্ঘ কাল খুব বেশি মানসিক চাপ ভোগ করেছে, তাদের বুদ্ধির বিকাশ তেমন ভাবে হয়নি। স্মৃতিশক্তিও তেমন ভাবে উন্নত হয়নি। তাই আগে থেকেই সাবধান হওয়া জরুরি।
মানসিক চাপে কী বদল আসে শিশুর মধ্যে?
মানসিক চাপ বাড়লে বা অবসাদের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুর মানসিক পরিবর্তন ঘটবে, যা আচরণে ফুটে উঠবে। পরিবারে, স্কুলে এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আচরণে এই পরিবর্তন বিশেষ ভাবে চোখে পড়বে। ইউনিসেফের একটি সমীক্ষা বলছে, শিশু যদি বেশি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভোগে, তা হলে তারা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে তাদের মেলামেশায় সমস্যা হয়, এমনকি অপরাধমূলক কাজে প্ররোচিতও হতে পারে। তাই সময় থাকতেই সতর্ক হতে হবে অভিভাবকদের।
আরও পড়ুন:
ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এমন ভাবে বাড়ছে, যাতে অনেক শিশুই মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে। তারা পড়াশোনায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে, মেলামেশা করতে পছন্দ করছে না। নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে আর পাঁচজনের থেকে। এ সব দেখে বাবা-মায়েরা ভাবছেন হয়তো শিশু অমনোযোগী হয়ে উঠছে। শাসন বা বার বার তিরস্কার মনের এমন অসুখকে কব্জা করতে পারে না। বরং অতিরিক্ত শাসন ও শিশুর আচরণগত সমস্যাকে অবহেলা করলে তা ধীরে ধীরে ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিজ়অর্ডার’-এর (এডিএইচডি) কারণও হয়ে উঠতে পারে।
কোন কোন লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হবেন?
ক্রমাগত মাথাব্যথা ও পেটে যন্ত্রণা
মানসিক চাপ কেবল মনে নয়, শরীরেও প্রভাব ফেলে। শিশু যদি প্রায়ই স্কুলে যাওয়ার আগে বা পড়তে বসার আগে বলে যে মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে বা পেটে ব্যথা হচ্ছে, তা হলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কেন স্কুলে যেতে ভাল লাগছে না বা কোনও বিষয়ে ভীতি তৈরি হয়েছে কি না, তা খেয়াল করতে হবে। অনেক সময়ে স্কুলে বন্ধুবান্ধব বা শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে হেনস্থার শিকারও হয় ছোটরা। তা থেকেও এমন ভীতি আসতে পারে।
আরও পড়ুন:
ঘুমের সমস্যা
ছোটদের টানা ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমই জরুরি। যদি দেখেন শিশু শারীরিক ভাবে ক্লান্ত হলেও ঘুমোতে পারছে না, বা রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বারে বারে জেগে উঠছে, তা হলে সতর্ক হতে হবে। বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ ক্ষণ ছটফট করা এবং সহজে ঘুম না আসাও লক্ষণ হতে পারে।
মেজাজ সপ্তমে
কথায় কথায় তর্ক জুড়ে দেওয়া, খিটখিটে মেজাজ এমন লক্ষণের মধ্যে পড়ে। পড়াশোনার চাপ বা উদ্বেগ যখন সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন শিশুর আচরণে তার প্রভাব পড়ে। নেতিবাচক বদল আসতে থাকে। সামান্য কারণেই রেগে যাওয়া, চিৎকার করা, জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলা বা অবাধ্য হওয়া এর লক্ষণ।
মেলামেশা করতে চাইবে না
যে শিশু আগে খেলাধুলো করতে ভালবাসত, সে যদি হঠাৎ বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের লোকজনের থেকে নিজেকে আলাদা করে একা একা ঘরে থাকতে শুরু করে, তা হলে বুঝতে হবে কোনও কারণে যে মানসিক চাপ বা অবসাদের শিকার হচ্ছে। ছোটখাটো কোনও ভুল বা পরীক্ষায় সামান্য নম্বর কম পেলে অতিরিক্ত কান্নাকাটি করা বা ভেঙে পড়াও লক্ষণ হতে পারে।
পছন্দের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
ছবি আঁকা, গান শোনা বা আবৃত্তি করা— যে কাজই পছন্দ হোক না কেন তা করতে আর মন চাইবে না শিশুর। যে কোনও বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, সব সময়ে উদাসীন থাকা, সদ্য ঘটা ছোটখাটো ঘটনাও ভুলে যাওয়া অবসাদের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। নিজেকে নিয়ে হীনম্মন্যতায় হীনমন্যতায় ভোগা বা আত্মবিশ্বাস একেবারেই হারিয়ে ফেললে সতর্ক হতে হবে অভিভাবকদের। সে ক্ষেত্রে শিশু অপরাধমূলক কাজেও প্ররোচিত হতে পারে। তাই সময় থাকতেই সাবধান হতে হবে।