দশটা দোকান ঘুরে বিয়ের বেনারসি, গয়না কেনার ঝক্কির দিন শেষ। ঝাঁ চকচকে শপিং মলে এক ছাদের তলায় এখন মেলে বিয়ের যাবতীয় সম্ভার। কেনাকাটার লোক না থাকলে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিম তো আছেই। টাকা দিলেই হ্যাপা শেষ। বাকি কাজ করবে ম্যানেজমেন্ট টিম। শুধু কেনা কাটা নয়, পরিবর্তন এখন সর্বত্র। বাদ নেই বিয়ের ভূরিভোজও। শুধু চিকেন কষা বা মটন কারি দিয়ে কি আর নিমন্ত্রিতদের মন ভরানো যায়। তাই বিয়ের পাতেও নয়া ট্রেন্ড।
কয়েক বছর আগেও যে সব পদ দেখলেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন অনেকে। এখন তারই কদর বাড়ছে। মেদিনীপুরের এক ক্যাটারার সংস্থার কর্ণধার বিকাশ সিদ্ধান্ত-র কথায়, ‘‘খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১২-১৩ বছর হবে। বিয়েবাড়ির মেনুতে নতুনত্ব আনতে সেই প্রথম ফিশ তন্দুর আর বেবি নান দিয়েছিলাম। ফিস তন্দুরকে পোড়া মাছ ভেবে অনেকে পাঁচ কথা শুনিয়েছিল! কেউ কেউ গালমন্দও করেছিল!’’
তাঁর কথায়, ‘‘এই ১২- ১৩ বছরে শহরের কি বদল হয়েছে তা ফুটপাথের দু’ধারের দোকানগুলো দেখলেও বোঝা যায়। কত খাবারের দোকান। তন্দুর-নান দিব্যি বিকোচ্ছে।’’ এক সময় মেদিনীপুর শহরে বিরিয়ানি খাওয়ার চলও ছিল কম। আর এখন ফুটপাথের ধারেও বিরিয়ানির দোকান বসছে। বিয়েবাড়ির মেনুতেও ঢুকে পড়েছে বিরিয়ানি।’’ বিকাশবাবুর দাবি, “গত কয়েক বছরে মেনুতে একটা বিপ্লব ঘটে গিয়েছে!” শহরের আরেক ক্যাটারার সংস্থার কর্ণধার সঞ্জয় সাউ বলেন, “আগে অনেকে মেনুতে ফ্রায়েড রাইস পছন্দ করতেন। বিরিয়ানি রাখতে দিতেন না। এখন বিরিয়ানি রাখছেন। সঙ্গে সাবেকি পোলাও, ছানার ডালনা প্রভৃতি থাকছে।”
আগে মফস্সল এলাকায় বিয়েবাড়িতে খাওয়ার আগে ‘স্টার্টার’-এর চল সে ভাবে ছিল না। বড়জোড় সরবৎ বা কিছু স্ন্যাকস রাখলেই চলত। আজকাল স্টার্টার হিসেবে কদর বাড়ছে ফাস্টফুডের। যেমন পাপড়িচাট, আলু টিকিয়া, ফুচকা। জনপ্রিয় হচ্ছে চিল্লাও। চিল্লা খানিকটা ধোসার মতো। দক্ষিণ ভারতে পরিচিত খাবার। ক্যাটারার সংস্থার কর্ণধাররা জানাচ্ছেন, বছর সাত-আট আগে শুরুটাই হত রাধাবল্লবী দিয়ে। ফাস্ট মেনু ছিল রাধাবল্লবী আর মটর পনির।
শহরের এক ক্যাটারার সংস্থার কর্তা বলছেন, “এখন বিয়েবাড়িতে গিয়েও লোকে নিরামিষ খাবার খেতে পছন্দ করছেন। নতুন নতুন আইটেমের দিকেই ঝোঁক বেশি থাকে। একটা সময় চিরাচরিত বাঙালি ঘরানার বাইরের খাবার অনেকে খেতেই চাইতেন না। আর এখন ওই ধরনের খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।’’ একদিকে যেমন স্টার্টারের চল বেড়েছে। অন্য দিকে তেমনই শেষপাতে মিষ্টি খাওয়ার আগ্রহ কমছে। রসগোল্লা দেখলেই জিভে জল আসার দিন হয়তো গিয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে বিয়েবাড়ির মেনুতে যে ‘বিপ্লব’ ঘটে গিয়েছে তা মানছেন শহরের এক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কর্ণধার সঞ্জয় হাজরা। সঞ্জয়বাবু বলছেন, “দিন বদলের সঙ্গে সব কিছুই বদলাচ্ছে। বিয়েবাড়ির মেনুই বা এক থাকে কি করে! একটা সময় ছিল যখন নান-রুমালি রুটি মেনুতে রাখলেই লোকে না-না করে উঠতেন। বরং ফ্রায়েড রাইস রাখার জন্য জোরাজুরি করতেন। এখন ফ্রাইড রাইসের জায়গায় অনেকে বিরিয়ানি পছন্দ করছেন।’’
শহরের এক ক্যাটারার সংস্থার কর্তা জানান, গড়পড়তা একটা মেনু ট্রেন্ড চলেই এসেছে। শুরুতে ফুচকা, পাপড়িচাট থাকে। পরে চিকেন ফ্রাই, পনির পাসিন্দা, রুমালি রুটি, কড়াইসুটির কচুরি, তড়কা, চানা মশলা। পরে ‘মেন কোর্স’। তাঁর কথায়, ‘‘বাঙালি ভোজনরসিক। নিত্যনতুন খাবারের প্রতি দুর্বলতা তো বরাবরেরই। এ আর নতুন কি!’’