ইশা অম্বানীর বিয়েতে এক জাদু-মুহূর্ত সৃষ্টি করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। অসুস্থ কিংবদন্তি অনুষ্ঠানে হাজির হতে পারেননি। কিন্তু নবদম্পতিকে সেরা উপহারটা বুঝি তিনিই পাঠিয়েছিলেন। তা ছিল তাঁর নতুন গান! লতাজির মতো কণ্ঠবীণায় ঈশ্বরের উপহার না থাকলেও সকলেই চান নবদম্পতিকে এমন উপহার দিতে যা তাঁদের শুভেচ্ছার দ্যোতক হবে। বর-কনের প্রয়োজন-শখ মিটবে, চেনা উপহারের ভিড়ে হারিয়ে যাবে না... বিয়েতে এমন কী কী উপহার দেওয়া যায়?
নিমন্ত্রিতের মান বাড়াবে
গয়নার বিপণিতে পকেটসই দামে মিলবে মনোহর ও টেকসই কস্টিউম জুয়েলারির সেট। বন্ধুবান্ধব, চেনা-জানা, প্রতিবেশী, আত্মীয়-কুটুম্বের বিয়েতে আদর্শ। উৎসবে-পার্বণে, অনুষ্ঠানে শাড়ি বা অন্যান্য ভারতীয় পোশাক পরলে প্রয়োজন আর ফ্যাশন দুইয়ের সঙ্গেই তাল দেবে এমন অলঙ্কার। কনে খুশি আধুনিক ব্যাগ, মেকআপ কিট, প্রসাধনী, জুয়েলারি বক্সেও। একান্তই যদি বিছানার চাদর, পর্দার কাপড় বা কুশন কভার দিতে চান তবে ফ্যাশন-বুটিক বা স্টেট এম্পোরিয়ামগুলো থেকে কিনলে কিছুটা অভিনব হবে। বাহারি কার্পেট বা রাগ দিতে পারেন। এসি-তে গায়ে দেওয়ার কমফর্টারও খুব কাজের। ঘড়ি দিলে ডিজ়াইনার ওয়াল ক্লক বা নতুন ধরনের রিস্টওয়াচ বাছুন। পকেটঘড়িতেও বনেদিয়ানার ছাপ থাকবে। মুম্বইয়ের ফিল্মমহলের বিয়েবাড়িতে নাকি বিখ্যাত ছিল অশোককুমারের পাঠানো বিদেশি ভায়োলিন, উপহারে পিয়ানো, তানপুরাও পছন্দ ছিল দাদামণির। তেমনই এখন দিতেই পারেন গিটার।
সমাদৃত হবে ই-বুকরিডার কিংবা ট্যাব, ঘরের কাজ সহজ করার অ্যালেক্সা ইত্যাদি স্মার্ট স্পিকার। আভিজাত্যে আস্থা থাকলে দিন ঐতিহ্যবাহী মোগল ঝাড়লণ্ঠন বা টর্চ-ল্যাম্পশেড। ঝাড়লণ্ঠন মিউজ়িকালও হয়। ব্লু-টুথ দিয়ে সংযোগ করে নিলে সহজেই মায়াবী আলোর সঙ্গে গান চালিয়ে ঘরটাকেই নাইট ক্লাব বানিয়ে রাখার ব্যবস্থা আছে এ সব সেটে। রোম্যান্টিক ‘ব্রেকফাস্ট ইন বেড’-এর সরঞ্জামও দেওয়া যায়। কফি-মেকার, সুদৃশ্য কাঠের আলঙ্কারিক ট্রে, প্লেট, ফোল্ডেবল টেবল। ল্যাপটপ রেখেও কাজ করতে পারবে আরামে।
হবু দম্পতির আগ্রহ বুঝে উপহার নিয়ে যান। সাজুনি কনেকে দিন শৈল্পিক আয়না- চিরুনি, আগেকার কাজললতার আঙ্গিকে তৈরি বাক্সে পুরে দিন দুল-চেন-নূপুর। কলা-সমঝদার দম্পতির জন্য শহরের আর্ট-বাজার থেকে নিতে পারেন মধুবনী, তিব্বতি থাঙ্কা, মধ্যপ্রদেশের জনজাতির সোনামোড়া ছবি বা রাজা রবি বর্মার নয়নাভিরাম ছবির প্রিন্ট আউট। ভাস্কর্য, ইনস্টলেশনও দিতে পারেন বা পোড়ামাটির নামফলক। ভাল সেরামিকের ক্রকারিজ় বা মেটাল কাটলারিও দেওয়া যায়। বিয়ের পর যুগলের বেড়াতে যাওয়ার জন্য ট্রলি, কেবিন ব্যাগ, রাকস্যাক ইত্যাদি দিলে দিব্য হয়।
ঘনিষ্ঠজনের বিয়েতে, তত্ত্বে
যে দম্পতি ঘুরতে ভালবাসেন, তাঁদের ডিজিটাল ক্যামেরা, ভিডিয়ো করার অ্যাকশন ক্যামেরা বা পুরনো দিনের কায়দায় দূরবিন দিলে তো আহ্লাদে আটখানা হবে। নববধূ পোষ্যপ্রেমী? বিয়ের দিন কোনও হালকা উপহার দিন, কয়েক দিন পরে, ওদের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মিষ্টি কুকুরছানা বা পার্সিয়ান বেড়াল নিয়ে হাজির হয়ে যান। রুচিসম্মত উপহারে বুকশেলফ পছন্দ অনেকেরই। ভাই-বোনেদের জন্য একেলে আসবাব হিসেবে দিন রিক্লাইনার, লাউঞ্জ ফার্নিচার। আসবাব বিপণিতেও গিফট ভাউচার মেলে। সেগুলি দিলে ওঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের আসবাব কিনে নেবেন, বাড়তি প্রাপ্তি দু’জনের একটা ‘শপিং ডেট’।
হবু সম্বন্ধী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে তত্ত্বেই সাজিয়ে দিন গীতবিতান, রবীন্দ্র রচনাবলী। আসলে আগেকার দিনে হয়তো বিয়ে বা তত্ত্বে দেওয়ার জন্য এখনকার মতো অঢেল অপশন ছিল না, কিন্তু উপহারের মধ্যে নজর টানত আন্তরিকতা ও কাব্যময়তা। লীলা মজুমদারের বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়েছিলেন তাঁর নিজের হাতে নকশা করা চামড়ার হাতব্যাগ। ষাট-সত্তরের দশকে প্রেশার কুকারের সঙ্গে রান্নার বই দিলেও দু’টি বাক্সকে নকশা করা তোয়ালেতে মুড়ে, রেশম কাপড়ে ঢেকে সুন্দর রিবনে বাঁধা হত, হাতে বোনা টেবলক্লথের সঙ্গেও থাকত শুভেচ্ছার চিঠি, কালিঝরা নিব দিয়ে মুক্তোর মতো হস্তাক্ষরে লেখা। সেই হৃদয়ের ছোঁয়াই ফিরিয়ে আনুন।
তত্ত্বের সজ্জা ও ভাবনায় এখন অনেকেই নানা ভাবে নতুনত্ব রাখার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে যেহেতু দু’টি পরিবারের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে, তাই সাবেকিয়ানার সূক্ষ্ম ছোঁয়া রাখুন। যেমন হবু শাশুড়িকে দিতে পারেন বালুচরি, জামদানি, মুর্শিদাবাদি সিল্ক ইত্যাদি পরিধেয়। শীতের বিয়ের তত্ত্ব রাজকীয় হয়ে উঠবে পশমিনা, জামেওয়ারে। ফল, ড্রাই ফ্রুটস ইত্যাদি অভিজাত ধাতব পাত্রে সাজিয়ে দিন। দিতে পারেন পিতলের তৈরি পূজাঘরের সামগ্রীও। এগুলি এখন কম দেখা যায়, কদর হবেই। শাশুড়িকে দিতে পারেন পুরনো গানে ঠাসা মিডিয়া প্লেয়ার। ননদ পুঁটুলিতে আগেকার দিনের আতরের ঢঙে রাখুন সুগন্ধি। নিখাদ গোলাপ, জুঁই, চন্দনের গন্ধের সুবাস শিশিতে বিকোয় নানা এম্পোরিয়ামে, সেগুলি বেছে নিতে পারেন। শাশুড়ির ডালায় খোঁপার কাঁটা, সোনালি পিন ইত্যাদি জুড়ুন, ননদের জন্য আনুন টিকলি, ঝুমর, ঝালর তোলা মাথাপাট্টি ইত্যাদি। সাংস্কৃতিক উপকরণ পুরনো তো হয়ই না, আপনার প্রতি মুগ্ধতাও বাড়াবে।
শেষ কথা! টোপর পরা বরটিকে ভুলে গেলে চলবে? গয়নার দোকানেই ছেলেদের জন্য ব্রোচ, ব্রেসলেটও পাবেন। অফিস ব্যাগ, ট্রিমার সেট, বাইক বা গাড়ির প্রয়োজনীয় অ্যাকসেসরিজ়, ড্রোনও ওঁদের পছন্দ হতে পারে। তা ছাড়া এয়ারপড, সুগন্ধি বা ঘড়ির কাপল সেট, গ্যাজেট এবং চার্জার, অর্গানাইজ়ার দু’জনেরই কাজে লাগবে। আর আছে বই। চিরকালীন, চিরনবীন। উপহার হিসাবে দেশি-বিদেশি সাহিত্য সম্ভার বরাবরই ভারী ধ্রুপদী। দম্পতি কতটা পড়ুয়া জানা না থাকলে ভ্রমণের বই, গল্প সঙ্কলন বা ঝকঝকে ছবি-সহ কফি-টেবল বুক দিতে পারেন। সবশেষে উপহার মুড়ে দিন সুন্দর হ্যান্ডমেড পেপার বা ভরে দিন অপরূপ ভেলভেটের বাক্সে। সঙ্গে থাকুক হাতে লেখা গ্রিটিংস কার্ড, পারলে কবিতা বা মন ছোঁয়া দু’কলম লিখে দিন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)