Advertisement
E-Paper

অনিশ্চিত পান্তুয়া-ল্যাংচার ভবিষ্যৎ! গ্যাস নিয়ে আতঙ্কের মাঝে কপালে ভাঁজ মিষ্টির দোকানে, কী হাল ক্যাফে-রেস্তরাঁয়

রসগোল্লার জোগান দিতে পারলেও পান্তুয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে, জানা নেই শহরের মিষ্টি বিক্রেতাদের। গ্যাসের জন্য হাহাকারের মাঝে কপালে চিন্তার ভাঁজ শহরের মিষ্টির দোকানের মালিকদের! কী হাল ক্যাফে-রেস্তরাঁগুলির?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ১৮:৩৮
রসগোল্লা হয়তো পাবেন, তবে পান্তুয়া-ল্যাংচা পাবেন কি না, সেই নিয়ে শহরের মিষ্টি দোকানের মালিকেরা এখনই কোনও আশ্বাস দিতে পারছেন না।

রসগোল্লা হয়তো পাবেন, তবে পান্তুয়া-ল্যাংচা পাবেন কি না, সেই নিয়ে শহরের মিষ্টি দোকানের মালিকেরা এখনই কোনও আশ্বাস দিতে পারছেন না। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বারুদের ধোঁয়া এসে লাগল বুঝি রসগোল্লা-পান্তুয়া কিংবা বিরিয়ানি-ফিশ ফ্রাইয়ের গায়ে? জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর শহরে মিলবে তো এমন সব সুখাদ্য? যদি জ্বালানিতে টান পড়ে তাহলে তো আরও সমস্যা। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে ছড়িয়ে থাকা মিষ্টির দোকানের মালিকদের কপালে ইতিমধ্যেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। আগামীকালের অর্ডারগুলি আদৌ দিতে পারবেন কি না, সেই নিয়ে সংশয় বাড়ছে মিষ্টির দোকানের বিক্রেতাদের মনে। কপালে ভাঁজ পড়ার কারণ অবশ্যই ঘটেছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যে হারে এলপিজি গ্যাসের দাম বেড়েছে তার প্রভাব পড়তে পারে কলকাতার বিভিন্ন ছোট-বড় বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে। দামের ধাক্কা লাগতে পারে ক্যাফে আর রেস্তরাঁগুলিতেও। কেন্দ্রের তেল সংস্থাগুলি ১৪.২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে কলকাতায় একটি সিলিন্ডারের দাম ৮৭৯ টাকা থেকে বেড়ে ৯৩৯ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দামও প্রায় ১১৫ টাকা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা। তবে শুধু মূ্ল্যবৃদ্ধিই নয়, গ্যাসের জোগানেও টান পড়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক গ্যাসের জোগান না পাওয়ায় হোটেল, রেস্তরাঁ-সহ ছোট ব্যবসায়ীদের উপর চাপ বাড়ছে। দেশজুড়ে এই পরিস্থিতে মুম্বই-সহ বিভিন্ন মেট্রো শহরগুলির বিভিন্ন ক্যাফে, রেস্তরাঁ আর মিষ্টির দোকানগুলি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মালিকেরা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব কি আদৌ শহরবাসীর রসনাতৃপ্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? এমন সঙ্কটের অবস্থায় কী হাল কলকাতার মিষ্টির দোকান, ক্যাফে-রেস্তরাঁগুলির? খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম।

কোভিডের সময়েও সবার আগে শহরের মিষ্টির দোকানগুলির দরজা খুলেছিল সাধারণের জন্য। তবে এখন কী পরিস্থিতি? আদৌ কি রসগোল্লা, পান্তুয়া, চমচমের জোগান দিতে পারবে তারা? বলরাম মল্লিক অ্যান্ড রাধারমণ মল্লিকের কর্ণধার সুদীপ মল্লিক বলেন, ‘‘গ্যাস পেলে তো মিষ্টি তৈরি হবে। এদিক-ওদিক থেকে জোগাড় করে আজকের অর্ডারগুলি মোটামুটি তৈরি করতে পেরেছি আমরা। তবে কাল কী হবে জানিনা। এখনও গ্যাস ডিলারদের থেকে কোনও রকম আশাজনক খবর পাইনি। কাল কী ভাবে মিষ্টি তৈরি করব, সেই নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি। পরিস্থিতি ভীষণই খারাপ।’’তবে কি রোজ খাবার পরে আর মিষ্টিমুখ করা হবে না? ঠাকুরের প্রসাদে সন্দেশের পরিবর্তে কি এ বার কাজুবাদাম দিতে হবে, এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে শহরবাসীর মনে। এ বিষয় যোগাযোগ করা হয় কে সি দাসের কর্ণধারের সঙ্গে। তবে কি এ বার রসগোল্লাও পাবে না কলকাতাবাসী? কে সি দাসের কর্ণধার ধীমান দাস অবশ্য আশ্বাস দিলেন আপাতত তাঁদের রসগোল্লার জোগান দিতে কোনও রকম সমস্যা হচ্ছে না। ধীমান বলেন, ‘‘আমাদের দোকানের রসগোল্লা আর ছানার মিষ্টির চাহিদা গ্রাহকের কাছে সবচেয়ে বেশি। আর আমাদের দোকানে এই ধরনের ছানার মিষ্টি মূলত তৈরি হয় স্টিম বয়েলারে। তাই ছানার মিষ্টি তৈরি করতে আমাদের কোনও রকম সমস্যা হচ্ছে না।’’ ধীমান আরও খানিক ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘মূলত ভাজা মিষ্টিগুলি তৈরির জন্যই গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এখনও অবধি কিছুটা স্টক আছে গ্যাসের, সেই দিয়েই কাজ চালাচ্ছি। চার দিকে গ্যাসের জন্য যে হাহাকার দেখছি তাতে কত দিন গ্যাসের জোগান পাব জানি না। সে ক্ষেত্রে আগামী দিনে যদি গ্যাসের জোগান কমে যায়, সে ক্ষেত্রে পান্তুয়া, সরভাজা, কালোজাম, ছানার জিলিপির মতো ভাজা মিষ্টিগুলির বিক্রি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব ‌আমরা।’’ তাই পান্তুয়াপ্রেমীদের চিন্তা বাড়লেও রসগোল্লাপ্রেমীরা আপাতত খানিকটা হলেও চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন।

কোন পথে শহরের মিষ্টির দোকানগুলির ভবিষ্যৎ?

কোন পথে শহরের মিষ্টির দোকানগুলির ভবিষ্যৎ? ছবি: সংগৃহীত

যতই রসগোল্লা আর পান্তুয়া নিয়ে দোটানা হোক না কেন, সন্দেশের আলাদাই চাহিদা। এখনও অবধি সন্দেশের জোগান দিতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না গিরীশচন্দ্র দে অ্যান্ড নকুড়চন্দ্র নন্দী’র মিষ্টির দোকানে। তবে কত দিন পারবেন সেই নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন দোকানের অন্যতম কর্ণধার পার্থ নন্দী। তিনি বলেন, ‘‘রকমারি সন্দেশ বানানোই আমাদের মূল ইউএসপি। সন্দেশ ছাড়া তো আর কিছু বিক্রি করি না আমরা। এ কারণে অন্য মিষ্টির দোকানগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় খানিকটা পিছিয়ে পড়লেও আমরা কিন্তু আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনও রকম আপস করি না। তবে এ রকম পরিস্থিতিতে বলব অন্য মিষ্টির দোকানগুলির থেকে আমরা খানিকটা হলেও কম সমস্যায় পড়েছি। অন্য দোকানগুলির তুলনায় আমাদের দোকানে গ্যাসের চাহিদা কম। দুধ ফোটাতে সে পরিমাণ গ্যাস লাগে, ব্যাস ওইটুকুই। তবে আপাতত যে পরিমাণ স্টক আছে তাতে চার-পাঁচ দিন চলে যাবে। এর পরে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শহরের মিষ্টি দোকানগুলির উপর ভালই পড়েছে। আগামী দিনে কী ভাবে কী ভাবে দোকান খুলবেন, সেই নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে মিষ্টির দোকানগুলির মালিকদের মনে।

চিন্তায় রয়েছেন শহরের রেস্তরাঁ আর ক্যাফের কর্ণধারেরা। গ্যাস না পেলে কী ভাবে খাবার তৈরি হবে, সেই ভেবেই ঘুম উড়ে গিয়েছে তাদের। অউধ ১৫৯০, চ্যাপ্টার টু এবং চাউম্যানের ডিরেক্টর দেবাদিত্য চৌধুরী বলেন, ‘‘অন্যান্য মেট্রো শহরগুলিতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যদিও কলকাতায় এখনও পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না। তবে যা পরিস্থিতি তাতে খুব বেশি আশার আলো দেখছি না।’’

ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেবাদিত্য জানাচ্ছেন, ‘‘পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে, প্রতিটি রেস্তরাঁয় এত বিশাল মেনু চালানো আমাদের পক্ষেও চালানো সম্ভব হবে না, সে ক্ষেত্রে মেনুতে কাটছাঁট করা হতে পারে। তবে আমরা উদ্ভাবনীশক্তির উপর বিশ্বাসী, এই শক্তির সাহায্যে এই চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে পারব বলে আশা করছি।’’

গ্যাস সঙ্কোটের মাঝে রেস্তরাঁয় গিয়ে তার প্রিয় পদটি নাও পেতে পারেন শহরবাসী।

গ্যাস সঙ্কোটের মাঝে রেস্তরাঁয় গিয়ে তার প্রিয় পদটি নাও পেতে পারেন শহরবাসী। ছবি: সংগৃহীত।

ক্যালকাটা ৬৪ ক্যাফের অন্যতম কর্ণধার দেবজিৎ পালের মতে, পরিস্থিতি খুব একটা ভাল নয়। ইতিমধ্যেই গ্যাসের ঠিকমতো জোগান পাওয়া যাচ্ছে না। কালোবাজারি হচ্ছে তার উপর। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাফে চালাতে কতটা সমস্যা হচ্ছে? দেবজিৎ বলেন, ‘‘আমাদের বিভিন্ন ক্যাফেতে যে খাবার তৈরি হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশ কমার্শিয়াল ইন্ডাকশন অভেনে তৈরি করা হয়। তবে ক্যাফের মেনুতে এমন কিছু কিছু পদ রয়েছে, যা তৈরি করার জন্য হাই ফ্লেম বা গ্যাসের উচ্চ তাপের প্রয়োজন হয়। যে ভাবে গ্যাসের জোগান কমে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আগামী দিনে সেই আইটেমগুলি মেনু থেকে সরিয়ে রাখতে হবে যত দিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা বিভিন্য ক্যাফেতে কমার্শিয়াল ইন্ডাকশনের সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তাভাবনাও শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে প্রতি ক্যাফে পিছু প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। তবে ইন্ডাকশন ব্যবহারে বাড়ালে বিদ্যুতের খরচও বাড়বে, তাই সে দিকটাও ভাবতে হবে।’’

এলপিজি ঘাটতির ফলে রেস্তোরাঁগুলির হেঁশেলে বিভিন্ন ধরনের কাজকর্মে ইতিমধ্যেই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সিরাজ গোল্ডেন রেস্টুর‌্যান্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইশতিয়াক আহমেদের কথায়,‘‘বৃহৎ পরিসরে রান্নার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা এবং গতি বজায় রাখার জন্য এলপিজি অপরিহার্য। যদি সরবরাহ ব্যাহত হয়, তা হলে এটি চটজলদি খাবার তৈরি এবং পরিষেবা দেওয়ার উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এখনও অবধি কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে, তবে কত দিন সম্ভব হবে বলতে পারছি না। আমরা আশা করি সমস্যাটি শীঘ্রই সমাধান হবে।’’

আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পরেই গোটা বিশ্বে তেল এবং গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ওমান এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ় প্রণালী ইরান কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখায় তেল এবং গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারগুলি সেখানগুলি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভারতে মোট আমদানি হওয়া অশোধিত তেলের ৪০ শতাংশ এবং পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ৮০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়া থেকেই আসে। এই পরিস্থিতির কারণেই তেল এবং গ্যাসের জোগান নিয়ে অনিয়শ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে শহরের ক্যাফে, রেস্তরাঁ আর মিষ্টির দোকানগুলির উপর। আপাতত কোনও রকম ঠেকিয়ে কাজ চালানো হলেও কত দিন তা সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না মালিকেরা। সে ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য মেট্রোশহরগুলির মতো কি কলকাতার বিভিন্ন রেস্তরাঁ, ক্যাফে আর মিষ্টির দোকানে সাময়িক সময়ের জন্য তালা পড়বে? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

LPG Gas Kolkata Restaurants Kolkata
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy