Advertisement
E-Paper

বিয়ের মুহূর্ত ধরা থাক রং-তুলি-ক্যানভাসে! বিবাহ-বাজেটে নতুন সংযোজন ‘ওয়েডিং পেন্টিং’

যখন ক্যামেরা ছিল না, সেই সময় চিত্রশিল্পীকে ডাকা হতো বিবাহমুহূর্তটিকে সুন্দর ভাবে ছবিতে তুলে ধরার জন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রশিল্পীদের জায়গা দখল করে নিলেন ফোটোগ্রাফারেরা। তার পরে শুরু হয় ভিডিয়োগ্রাফি। বিয়ের অ্যালবাম, ভিডিয়োর রমারমা এখনও রয়েছে। তবে অনেকেই এখন এ সবেরই পাশাপাশি ‘ওয়েডিং পেন্টিং’-এর বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
রং-তুলির বিয়ে।

রং-তুলির বিয়ে। ছবি: সংগৃহীত।

ছাঁদনাতলায় বসে বর-বধু, মন্ত্রপাঠ করছেন পুরোহিত মশাই! মণ্ডপের চারদিক ঘিরে রয়েছেন আত্মীয়-পরিজন, বাজছে বিয়ের সানাই। এরই মাঝে এক কোণে বসে রয়েছেন একজন শিল্পী। তাঁর সামনে সাজানো ক্যানভাস। তুলি হাতে বিয়ের মুহূর্তগুলিকে ক্যানভাসবন্দি করছেন দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু। মোবাইল, ক্যামেরার যুগেও বিয়ের স্মৃতি ক্যানভাসে ধরে রাখার কারণটা ঠিক কী?

যখন ক্যামেরা ছিল না, তেমন শৌখিন পরিবারে সেই সময় চিত্রশিল্পীকে ডাকা হতো বিবাহমুহূর্তটিকে সুন্দর ভাবে ছবিতে তুলে ধরার জন্য। সেই ছবিতেই বছরের পর বছর বিয়ের স্মৃতি ধরা থাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রশিল্পীদের জায়গা দখল করে নেন ফোটোগ্রাফারেরা। তার পরে শুরু হয় ভিডিয়োগ্রাফি। বিয়ের অ্যালবাম, ভিডিয়োর রমারমা এখনও রয়েছে। তবে অনেকেই এখন এ সবের পাশাপাশি ‘ওয়েডিং পেন্টিং’-এর বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাইয়ের মতো শহরে আগেই ফিরেছে এই সংস্কৃতি। এখন শহর কলকাতাতেও খোঁজ শুরু হয়েছে ‘ওয়েডিং পেন্টার’-এর। উল্লেখ্য, ভারতে বিবাহ-চিত্রের তেম চল না থাকলেও ইউরোপে সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতক থেকেই ‘ওয়েডিং পেন্টিং’-এর চল ছিল। আর একটু পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে, পঞ্চদশ শতকেও ভ্যান আইকের মতো শিল্পী এঁকেছেন এ ধরনের ছবি। সে দিক থেকে দেখলে অবশ্য ভারতে এই ধারা খানিক নতুনই বলা যায়।

জোশেফ ইজ়রায়েলের আঁকা ছবি ‘আ জিউয়িশ ওয়েডিং’ (১৯০৩ সাল)।

জোশেফ ইজ়রায়েলের আঁকা ছবি ‘আ জিউয়িশ ওয়েডিং’ (১৯০৩ সাল)। ছবি: উইকি কমোন্‌স।

২০২৫ সাল থেকে ‘ওয়েডিং পেন্টিং’-এর কাজ শুরু করেছেন শিল্পী শুভশ্রী চক্রবর্তী। এ রকম কাজ করার কথা কী ভাবে মাথায় আসে? জবাবে শুভশ্রী বলেন, ‘‘বাইরে থেকে কলকাতায় বিয়ে করতে আসা এক দম্পতি তাঁদের বিয়ের স্মৃতি ক্যানভাসে ধরে রাখার জন্য এক জন শিল্পীর খোঁজ করছিলেন। হঠাৎ করেই আমার কাছে এই প্রস্তাব আসে। লাইভ পেন্টিং আমি আগেও করেছি। তবে বিয়ের মতো একটা ইভেন্টকে ক্যানভাসে তুলে ধরার অভিজ্ঞতা সেই প্রথম। মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম, বিষয়টি হিট না হলেও মিস হবে না। আমার পার্টনার তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে যত্ন নিয়ে কাজটি করলাম। বর-বধূ দু’জনেরই বেশ পছন্দ হল। নিজের সে দিনের কাজের একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিই। তার পরেই অনেক ভালবাসা পাই, একের পর এক কাজের প্রস্তাব আসতে থাকে।’’

শিল্পী শুভশ্রী চক্রবর্তী।

শিল্পী শুভশ্রী চক্রবর্তী।

বিয়ের মুহূর্ত ক্যানভাসে বন্দি করতে মোটামুটি ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। শিল্পী প্রথমে বর-বধূর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা বিয়ের ঠিক কোন মুহূর্তটিকে ক্যামেরাবন্দি করতে চাইছেন তা জানতে চাওয়া হয়। সিঁদুরদান থেকে মালাবদল, শুভদৃষ্টি থেকে কন্যাদান— নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী বিয়ের মুহূর্ত আগে থেকেই শিল্পীকে বলে রাখেন হবু দম্পতি। তাঁরা কী ধরনের জামাকাপড় পরবেন, কেমন সাজবেন, মণ্ডপসজ্জাই বা কেমন হবে— সে সব খুঁটিনাটি বিষয়ও আগে থেকেই ধারণা নিয়ে রাখেন শিল্পী। বিয়ের দিন ক্যানভাস আর রং নিয়ে ঘণ্টা পাঁচেক আগেই লোকেশনে চলে যান তিনি। বিয়ের মণ্ডপসজ্জার কাজ তখন প্রায় শেষ, আর সেই সময়েই কাজ শুরু হয় ওয়েডিং পেন্টারের। হাতে সময় নিয়ে তাঁরা মণ্ডপের সাজসজ্জা থেকে বর-কনের আদল সবটাই আগে থেকে এঁকে রাখেন। বর-বধূ মণ্ডপে আসার পর শুরু হয় নিখুঁত হাতের কাজ। গয়নার খুঁটিনাটি থেকে পোশাকের রং, আত্মীয় পরিজনদের সাজগোজ থেকে আলোকসজ্জার বিশদ— সবটাই ক্যানভাসে তুলে ধরেন শিল্পী। বিয়ে শেষ হতে হতে শিল্পীর কাজও হয় শেষের পথে। বর-কনের মণ্ডপ ছাড়ার আগেই তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাঁদের বিয়ের এক টুকরো মুহূর্ত।

শিল্পী রনি বিশ্বাসের আঁকা ‘ওয়েডিং পেন্টিং’।

শিল্পী রনি বিশ্বাসের আঁকা ‘ওয়েডিং পেন্টিং’।

ফোটোগ্রাফারদের ভিড়ে একজন শিল্পীকে দেখামাত্রই আত্মীয়পরিজনের মধ্যেও বেশ হইচই শুরু হয়ে যায়। শিল্পী শুভশ্রী বলেন, ‘‘কলকাতায় ওয়েডিং পেন্টিং দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। মূলত দু’ধরনের ক্লায়েন্ট আসেন আমাদের কাছে। এক, যাঁরা শিল্পের কদর দিতে জানেন আর দ্বিতীয়, যাঁরা শুধুই বিয়েতে নতুন চমক আনতে চান।’’

গত বছর থেকেই ওয়েডিং পেন্টিংয়ের কাজ শুরু করেছেন শিল্পী রনি বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘‘সমাজমাধ্যমে বেশ কিছু রিলে এ ধরনের কাজ দেখেছিলাম, তখনও ভাবিনি আমার কাছেই এক দিন এমন কাজের প্রস্তাব আসবে। এখন বাঙালি এবং অবাঙালি, দু’ধরনের বিয়েতেই ডাক পাচ্ছি। ভালবাসাও পাচ্ছি অনেক।’’

এখন প্রশ্ন হল বিয়ের আয়োজনে ওয়েডিং পেন্টার নিয়োগ করতে হলে কেমন খরচ পড়বে? শিল্পী শুভশ্রী বলেন, ‘‘কত খরচ পড়বে তা পুরোটাই নির্ভর করবে ক্যানভাসের মাপ, বর-কনে ঠিক কেমন ছবি চাইছেন তার উপর। কোনও কোনও দম্পতি শুধু তাঁদেরই ছবি চান, সে ক্ষেত্রে খরচ এক রকম। কেউ কেউ আবার পরিবারের সঙ্গে ছবি চান, সে সব ক্ষেত্রে ফিগার যত বাড়বে, খরচও ততই বাড়বে। মোটামুটি ১৬/২০ ইঞ্চির একটি ক্যানভাসে বর-কনের বিয়ের মুহূর্ত তুলে ধরার জন্য আমরা মোটামুটি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে থাকি।’’

শিল্পী শুভশ্রী চক্রবর্তী ও শিল্পী তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ‘ওয়েডিং পেন্টিং’।

শিল্পী শুভশ্রী চক্রবর্তী ও শিল্পী তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ‘ওয়েডিং পেন্টিং’।

স্টুডিয়োতে বসে লাইভ পেন্টিং করা এক রকম। তবে অল্প সময়ের মধ্যে একটা বিশেষ মুহূর্তকে রংতুলি দিয়ে এঁকে ফেলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় শিল্পীদের। শুভশ্রী বলেন, ‘‘এত অল্প সময়ে বর-কনের ছবিতে তাঁদের মুখের অবিকল মিল আনা বেশ শক্ত কাজ। আমরা যে টাকাটা নিচ্ছি, তা যেন গ্রাহকের কাছে ন্যায্য মনে হয়, সেই দায় পুরোটাই আমাদের উপর। আমরা যথাসাধ্য সেই চেষ্টা করে থাকি।’’

বৈশাখেই বিয়ে সারছেন সুরঙ্গনা আর সৈকত। দু’জনেই তাঁদের বিয়েতে এক জন ওয়েডিং পেন্টার নিয়োগ করেছেন। হঠাৎ এই শখ কেন? জবাবে সৈকত বলেন, ‘‘বিয়েতে মনে রাখার মতো কিছু করতে চেয়েছিলাম। অনেক রিলেই দেখেছি বিয়ের মুহূর্তটিকে রংতুলির সাহায্য ক্যানভাসে তুলে ধরতে। বিষয়টি বেশ নতুন। সে কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’

তবে ২০২৬-এর বিয়েগুলিতে খরচের তালিকায় নতুন সংযোজন নিশ্চিত? শুভশ্রী বললেন, ‘‘এ বছর বিয়ের মাসগুলিতে প্রায় দু’তিনটে করে বুকিং ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। আশা করছি, আরও বুকিং আসবে। যাঁরা শিল্পকে গুরুত্ব দেন, তাঁদের কাছে এই বিষয়টি আকর্ষণ করবেই।’’ রনি বলেন, ‘‘বেশ কিছু কাজ ২০২৬-এর জন্য হাতে আছে। এই কাজ এখনও নতুন। আশা করছি, আরও একটু প্রচারের আলোয় এলে আরও বেশি বুকিং আসবে। কেউ শিল্প বোঝেন, তাই আমাদের ডাকছেন, কেউ আবার স্রোতে গা ভাসাচ্ছেন মাত্র।’’

তবে কি বিয়ের অ্যালবামের গুরুত্ব কমেছে? হবু কনে সুরঙ্গনার মতে, ‘‘আমার বিয়েতে ফোটোগ্রাফাররাও আসবেন। তবে বিয়ের মতো বিশেষ মুহূর্তটা ক্যানভাসে ধরে রাখতে পারব ভেবেই বেশ উত্তেজিত লাগছে। অ্যালবাম তো থাকবেই, তবে ঘরে আলাদা জায়গা করে নেবে আমাদের বিয়ের হাতে আঁকা ছবি।’’

দিন দিন বিয়ের উদ্‌যাপনে চমক বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে খরচও। সেই খরচের তালিকায় যুক্ত হল আরও একটি নতুন খরচ। বিয়ের অ্যালবাম এখন পুরনো হয়েছে, নতুন ট্রেন্ড ওয়েডিং পেন্টিং-এর প্রেমে মজেছে শহর। ঠিক যেমন মেহন্দি, সঙ্গীতের মতো অনুষ্ঠান বাঙালি বিয়ের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে, তেমন ভাবে এই চলও জড়িয়ে পড়বে কি না, সেটাই এখন দেখার।

Wedding Bengali Wedding
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy