Advertisement
E-Paper

মৃণালদা সেই দিন অভিমান করেছিলেন! তিনি নিজের মতাদর্শের সঙ্গে কখনও আপস করেননি

‘মৃগয়া’, ‘ওকা উরি কথা’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘খারিজ’— মৃণাল সেনের চার ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন পরিচালককে। পরিচালকের ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে সেই সব স্মৃতি তুলে ধরলেন মমতাশঙ্কর।

মমতাশঙ্কর

শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
মৃণাল সেনের স্মৃতিতে মমতাশঙ্কর!

মৃণাল সেনের স্মৃতিতে মমতাশঙ্কর! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আজকের দিনটা আমার কাছে সত্যিই বড়। মৃণালদার জন্মদিন। এক দিকে বাবা-মা ও ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেয়েছি। আর চলচ্চিত্রজগতে এই মানুষটার আশীর্বাদধন্য আমি। ওঁর জন্যই এই জগতে আসা। মৃণালদার সঙ্গে বৌদির কথাও বলতেই হয়। ওঁদের দু’জনের থেকেই বিপুল ভালবাসা ও স্নেহ পেয়েছি।

অভিনয় নিয়ে আমার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। ভাবিনি কোনও দিন অভিনয় করব। বাবা-মাও চাননি। আমিও চাইনি। মৃণালদার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। প্রথম থেকেই মৃণালদা চেয়েছিলেন, আমি অভিনয়টা করি। আমাকে বলেছিলেন, “কোনও দিন যদি অভিনয় করার ইচ্ছে হয়, খবরটা আমাকে প্রথম দিও।” আমিও কথা দিয়েছিলাম, অভিনয় করলে, শুরু হবে মৃণালদার ছবি দিয়েই। কলেজে পড়াকালীন কিছুটা অবসর পাই। তখন মৃণালদাকে ফোন করে বলেছিলাম, “আমার এখন অনেকটা সময় আছে মৃণালদা। এখন পড়ার চাপ নেই। এখন অভিনয়ের সুযোগ থাকলে আমি রাজি আছি।” আজও মনে হয়, সেই ঈশ্বরই আমাকে দিয়ে কথাগুলো বলিয়ে নিয়েছিলেন।

‘মৃগয়া’-র দৃশ্য!

‘মৃগয়া’-র দৃশ্য! ছবি: সংগৃহীত

তার পরে শুরু হল মৃণালদার ছবিতে কাজ। তিনি কিন্তু খুবই কড়া পরিচালক ছিলেন। ‘মৃগয়া’র শুটিং শুরুর আগেই বলে দিয়েছিলেন, “ভুরু প্লাক করা চলবে না।” আমার কপাল চওড়া। তাই কপালের সামনে ছোট করে চুল কাটা ছিল। মৃণালদা বলে দিয়েছিলেন, “চুল কাটা চলবে না।” চরিত্রটি সাঁওতালের, সুতরাং রং মেখে কালো হতে হবে— বলে দিয়েছিলেন তিনি। ‘লুক টেস্ট’-এ প্রসাধনীর মাধ্যমে আমার গায়ে কালো রং করা হল। আমাকে ভীষণ কুৎসিত দেখতে লাগছিল। তখন মৃণালদাকে অনুরোধ করি, “আমি প্রসাধনীর মাধ্যমে গায়ে কালো রং করব না। রোদে পুড়ে গায়ের রং চাপাব?” খুব সাহস করে কথাগুলো বলেছিলাম মৃণালদাকে। তিনি পাল্টা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তুমি পারবে?” বলেছিলাম, “হ্যাঁ, পারব।”

মনে আছে, সেই বছর ডিসেম্বরের শেষে শুটিং শুরু হয়েছিল। আমি মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং শুটিং চলাকালীনও রোদের মধ্যেই থাকতাম। সূর্য ডোবা পর্যন্ত রোদেই ঘুরতাম আমি।

‘ওকা উরি কথা’র দৃশ্যে।

‘ওকা উরি কথা’র দৃশ্যে। ছবি: সংগৃহীত।

শুধু ‘মৃগয়া’ নয়। ওঁর ছবি ‘ওকা উরি কথা’র জন্যও গায়ের রং শ্যামলা করি। ওই ছবির জন্য মৃণালদার নির্দেশ ছিল, “খালি পায়ে হাঁটাচলা করা অভ্যাস করো।” হায়দরাবাদে শুটিং হয়েছিল। পথে বাবলার কাঁটা, রাস্তায় ছড়িয়ে বড় বড় পাথর। প্রবল দাবদাহ। কোনও গাছপালা নেই। ওই গরমের মধ্যে রাস্তায় হাঁটা অভ্যাস করেছিলাম। হাঁটার ধরনে যেন শহুরে ছাপ না থাকে, নির্দেশ ছিল মৃণালদার। ওঁর কথা আমার কাছে ছিল বেদবাক্যের মতো।

একটা সময়ে আমার উপর খুব অভিমান করেছিলেন। ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে আমাকে চেয়েছিলেন। তখন দীনেন গুপ্তের ছবি ‘কলঙ্কিনী’তে অভিনয় করছি আমি। শুটিং পিছোনো যায়নি। অতঃপর আমার আর ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে অভিনয় করা হয়নি। সেই জায়গায় অভিনয় করেছিলেন স্মিতা পাটিল। শাপে বর হল যেন! অসম্ভব ভাল অভিনয় করেছিলেন স্মিতা। জানি না, ওঁর মতো ভাল পারতাম কি না।

‘আকালের সন্ধানে’র পরিচালক মৃণাল সেন ও অভিনেত্রী স্মিতা পাটিল।

‘আকালের সন্ধানে’র পরিচালক মৃণাল সেন ও অভিনেত্রী স্মিতা পাটিল। ছবি: সংগৃহীত।

‘একদিন প্রতিদিন’ নিয়েও এমন একটি ঘটনা রয়েছে। শ্রীলা মজুমদারের চরিত্রটি আসলে আমার জন্য ভেবেছিলেন মৃণালদা। তখন আমার বড় ছেলের বয়স মাত্র ১৭ দিন। ওকে ছে়ড়ে শুটিং করা তখন সম্ভব নয়। মৃণালদাকে অনুরোধ করেছিলাম, “কোনও ছোট চরিত্র রয়েছে? অল্প দিন শুটিং করেই যাতে কাজটা হয়ে যায়!” তখন মৃণালদা বলেছিলেন, “একটি চরিত্র আছে। তাকে ঘিরেই ছবি। কিন্তু তার চরিত্র স্বল্প দৈর্ঘ্যের।” তখন চিনুর চরিত্রটি আমাকে দেন মৃণালদা। মৃণালদার ছবিতে ফের ‘না’ বলার দুঃখ আমিও আর পেতে চাইনি।

এর পর আসি ‘খারিজ’-এর কথায়। অন্যতম প্রিয় চরিত্র পেলাম। ছবিটি ভাল ব্যবসা করেছিল। কিছু অতিরিক্ত উপার্জন হয়েছিল। তাই আমাকেও পারিশ্রমিক দেওয়ার পরেও একটি চেক লিখে পাঠিয়ে দেন। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তবে সেই চেক আজও তেমনই আছে। ওই চেক আমি ব্যবহার করিনি।

‘মৃগয়া’ ছবির ক্যামেরার পিছনে।

‘মৃগয়া’ ছবির ক্যামেরার পিছনে। ছবি: সংগৃহীত।

মৃণালদার এই সততা আমাকে আজও উদ্বুদ্ধ করে। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করতে জানতেন না। সাহসও ছিল দেখার মতো। একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। সেখান থেকে সরে আসেননি কখনও। তবে কখনও সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। যেটা ঠিক, তার পক্ষে ছিলেন। আমার বিশ্বাস, এত দিন ধরে রাজ্যে যে অরাজকতা চলেছে, তার বিরোধিতা করতেন মৃণালদা। তিনি আজ জীবিত থাকলে এই পরিবর্তনে খুশিই হতেন। ওঁর মতাদর্শ ভিন্ন। সেই জায়গা থেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে কী ভাবে দেখতেন, জানা নেই। কিন্তু এই বদলকে স্বাগত জানাতেন।

আমি আজও ভাবতে পারি না, মৃণালদা আর বৌদি নেই। ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে মনে হয়, একটু দেখা করে যাই! আমি সব সময়ে দই নিয়ে যেতাম মৃণালদার জন্মদিনে। দরজা দিয়ে ঢুকলেই গম্ভীর গলায় বলতেন, “দই এনেছ?” এখনও মনে হয়, ওই গলার স্বর শুনতে পাব। বাবুদা (কুণাল সেন) বিদেশে থাকতেন। তাই মৃণালদাকে বলে রেখেছিলাম, “রাতবিরেতে কোনও অসুবিধা হলে অবশ্যই জানাবেন।”

রোজ ঘড়িতে রাত এগারোটা বাজলেই ফোন করে ওঁর খোঁজ নিতাম। এটা নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। ফোন ধরেই মৃণালদা বলতেন, “বেঁচে আছি। এখনও মরিনি।” সে সব স্মৃতি এখনও জীবন্ত। আজও মনে ফোন হয়, মৃণালদাকে ফোন করলেই সেই দৃপ্ত কণ্ঠে শুনতে পারব, ‘আমি বেঁচে আছি।’

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

mrinal sen Mamata Shankar
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy