চিকিৎসায় গাফিলতিতে এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বুধবার সকালে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধল ইন্দাস ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিস রুমের একাংশে ভাঙচুর চলল। মারধর করার অভিযোগ উঠল এক চিকিৎসক, নার্স-সহ কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করতে হল স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ ইন্দাসের বিএমওএইচ উজ্জ্বল মণ্ডল। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। পুলিশ পাঁচজনকে আটক করেছে।
বিষ্ণুপুরের এসডিপিও জে মার্সি বলেন, “এ দিন সকালে ইন্দাস ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক রোগীর মৃত্যুর পরে কিছু লোক অফিস ঘরে ভাঙচুর চালায়। চিকিৎসককে হেনস্থা করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেয়। হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকেই পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। মৃতার পরিবারের তরফে কোনও অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে পাত্রসায়র থানার রসুলপুরের বাসিন্দা মমতাজ বেগম নামে বছর ৪৫-এর এক মহিলাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইন্দাস ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অবস্থা আশঙ্কাজনক বুঝে চিকিৎসক সায়ন পাল তাঁকে অন্যত্র স্থানান্তর করে দেন। এরই পাশাপাশি ওই রোগীর ইসিজি, এক্স-রে করানোর জন্য রোগীর পরিবারের লোকজনকে বলেন চিকিৎসক। বুধবার সকালে ওই রোগীর ইসিজি, এক্স-রে করানোর পরে সকাল ৯টা নাগাদ মমতাজ বেগম এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই মারা যান। অভিযোগ, তার পরেই মৃতার বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় কিছু বাসিন্দা স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এরপর তাঁরা ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিস রুমে, নার্সদের রুমে ঢুকে ভাঙচুর চালান বলে অভিযোগ। অফিস রুমের মধ্যেই চিকিৎসক সায়ন পাল-সহ কর্তব্যরত নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়। শারীরিকভাবে নিগৃহীত হন ওই চিকিৎসক।
মৃতার স্বামী শেখ সফিকের বক্তব্য, মঙ্গলবার রাতে মমতাজ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। রাত ১১টা নাগাদ ইন্দাস ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরে তার চিকিৎসা শুরু হয় বলে অভিযোগ। চিকিৎসক তাঁকে দেখার পরে ইসিজি, এক্স-রে করাতে বলেন। তাঁকে অন্য কোনও হাসপাতালে স্থানান্তরও করে দেন। এ দিন সকালে ইসিজি, এক্স-রে করানোর রিপোর্ট দেখানোর পরে চিকিৎসক ফের তাঁকে অন্যত্র নিয়ে যেতে বলেন। মৃতার স্বামীর অভিযোগ, “আমার স্ত্রী-র ঠিকমতো চিকিৎসা করা হয়নি। রেফার করেই দায় সারা হয়। অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার আগেই সে মারা গেল। চিকিৎসায় গাফিলতির জন্যই আমার স্ত্রী-র অকাল মৃত্যু হল।”
মৃত্যুর পরে মৃতার আত্মীয়েরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে চেয়ার, টেবিল, চিকিৎসা সামগ্রী ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ। নার্সদের বসার ঘরে ঢুকেও ভাঙচুর চালানো হয়। খবর পেয়ে ইন্দাস থানার ওসি শুভাশিস হালদার পুলিশবাহিনী নিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। লাঠি উঁচিয়ে উত্তেজিত জনতাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বর থেকে সরানো হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক সায়ন পাল অবশ্য গাফিলতির অভিযোগ মানতে চাননি। সায়নবাবুর দাবি, “সময়মতো ওই রোগীর চিকিৎসা শুরু করা হয়েছিল। শ্বাসকষ্ট, টিবির পাশাপাশি হার্টের সমস্যাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ওই মহিলা। রোগীর অবস্থা ভাল নয় বুঝে মঙ্গলবার রাতেই তাঁকে অন্য কোনও বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে রেফার করেছিলাম। তা সত্ত্বেও ওঁরা রোগীকে এখানেই রেখে দেন। ওই রোগীর মৃত্যুর জন্য আমরা কেউই দায়ী নই।”
ইন্দাসের বিএমওএইচ বলেন, “চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়নি। বাড়ির লোকেরা মহিলাকে গুরুতর অবস্থায় এখানে এনেছিলেন। চেষ্টা করেও চিকিৎসক তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু ওরা মিথ্যা অভিযোগ তুলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে এবং অফিস ঘরে ঢুকে ভাঙচুর করেছে। চিকিতসক, নার্স-সহ স্বাস্থ্যকর্মীদের শারীরিক ভাবে হেনস্থা করেছে।” বিএমওএইচ জানিয়েছেন, মৃতার পরিবারের দাবি মেনে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দেহ ময়নাতদন্তের জন্য বিষ্ণুপুর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে মৃত্যুর কারণ।