লোকসভায় দাপটে তাঁর নতুন ইনিংস শুরু করলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। কংগ্রেস দলনেতা হিসাবে। দলের পর্যাপ্ত সাংসদের অভাবে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা না পেলেও, বুধবার লোকসভায় তাঁর নতুন ইনিংসের প্রথম দিনের ভাষণেই কংগ্রেস দলনেতা বুঝিয়ে দিলেন, বিনা যুদ্ধে তিনি ছাড়বেন না সূচ্যগ্র মেদিনীও। কোনও রকমের আপস করবেন না ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে। রাম আর রহমান দুই-ই তাঁর কাছে সমান। এ দিনের ভাষণে সকলেরই মন জয় করে নেন অধীর। লোকসভার সদস্যদের তো বটেই, যাঁরা আজ তাঁর ভাষণ টেলিভিশনে শুনেছেন, তাঁদেরও। শুরুতেই সেঞ্চুরি!

নতুন স্পিকার ওম বিড়লা এ দিন তাঁর আসনে বসার পরেই সভায় প্রথম বলার সুযোগ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। তার পরেই বলার সুযোগ পান কংগ্রেস দলনেতা অধীর চৌধুরী। স্পিকার তাঁর নাম ঘোষণা করেন দু'বার।

তাঁর ভাষণে একটি শায়েরিকে উদ্ধৃত করে অধীর বলেন, ''দেশটা এমন হোক, আমাদের সমাজটা এমন হোক যাতে এক জন মুসলিম মসজিদে গিয়ে রামকে খুঁজে পান। এক জন পণ্ডিত (হিন্দু) যেন মন্দিরে গিয়ে খুঁজে পান রহমানকে। বিভেদে যেন খণ্ডিত না হয়ে যায় দেশ। মা্নুষ যেন মানুষকে্ই খুঁজে পান। কোনও ধর্মের রং প্রকট না হয়ে ওঠে। যেন  ধর্ম যেন হয়ে ওঠে ঐক্য, সংহতির চালিকাশক্তি। সমাজটাকে আমাদের সেই ভাবেই গড়ে তুলতে হবে।"

দিল্লিতে বুধবার। -নিজস্ব চিত্র।

অধীররঞ্জন চৌধুরীকে কতটা চেনেন? 

তাঁর আগে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী এ দিন বলেন, "আমি কারও পক্ষে যেতে চাই না। যেতে চাই না কারও বিপক্ষেও। আমি নিরপেক্ষ থাকতে চাই।"

অধীর প্রধানমন্ত্রীর সেই মন্তব্যের উল্লেখ করে নতুন স্পিকারকে বলেন, "প্রধানমন্ত্রী আজ যে কথা বলেছেন, আমি চাই, সেই মতো আপনিও লোকসভায় কোনও আলোচনা, বিতর্কে কারও পক্ষে বা কারও বিপক্ষে না গিয়ে নিরপেক্ষ থাকুন পুরোপুরি। সেটাই ভারতীয় গণতন্ত্র, ভারতীয় সংবিধানের মর্ম কথা।"

আরও পড়ুন- সংস্কৃতে শপথ পাঠ করলেন সুকান্ত, দেবশ্রী বাংলায়​

আরও পড়ুন- মোদীর বৈঠক: মমতার পাশে মায়াবতী, বললেন, ইভিএম নিয়ে কথা হলে যেতাম, অনিশ্চিত কংগ্রেস​

আর সে ক্ষেত্রে কংগ্রেস যে আদর্শ বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে, সেই অঙ্গীকারও করেন অধীর। স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, "আপনার কোটার (রাজস্থানের কোটা লোকসভা আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন নতুন স্পিকার) কচুরি খুব বিখ্যাত। খুব সুস্বাদু। আমি চাই, আপনার সভাপতিত্বে এই সভার আলোচনা, বিতর্কও যেন সুস্বাদু থাকে সব সময়। তা যেন খিচুড়ি না হয়ে না যায়। আমরা বিরোধীরা সেই দিকে কড়া নজর রাখব।"

তাঁর প্রথম দিনের ভাষণে স্পিকারকে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাটির কথাও মনে করিয়ে দিতে ভুল হয়নি অধীরের। কৃষকদের সমস্যার কথা তুলতেই অবশ্য কিছুটা প্রতিবাদের মুখে পড়েন কংগ্রেস দলনেতা। তবু সেই সব উপেক্ষা করে বিনীত ভাবেই অধীর বলে চলেন, "জানি, আপনি এক জন সমাজসেবী। এক জন কৃষি বিশেষজ্ঞও। সেই ভরসাতেই বলব, আমাদের দেশের কৃষকদের সমস্যাগুলি যাতে লোকসভার আলোচনায় গুরুত্ব পায়, আপনি সেই দিকে নজর রাখবেন।"

ভারতীয় গণতন্ত্রের গভীরতা কতটা বোঝাতে এ বার লোকসভা ভোটে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা। বলেন, "মালে গাঁও বলে একটা জায়গা রয়েছে অরুণাচল প্রদেশে। সেটা একটা পাহাড়ি গ্রাম। সেখানে ভোটার ছিলেন এক জন। তিনি যাতে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য ২ দিন ধরে পাহাড়ে ৬ কিলোমিটার পথ বেয়ে ৬ জন নির্বাচনী আধিকারিক গিয়েছিলেন সেই ভোটারের গ্রামে। তাঁর ভোট নিয়ে এসেছিলেন। দেশের মোট ৯০ কোটি ভোটারের ৬৭ শতাংশ এ বার ভোট দিয়েছেন। এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রমাণিত হয়, দেশের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ভোটে সামিল হয়েছেন।"

সপ্তদশ লোকসভায় তাঁর দলের ভূমিকা কী হবে? স্পিকারকে অধীর বলেছেন, "আপনার মাধ্যমে আমি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দিতে চাই, আমার দল যে নীতিতে এত দিন বিশ্বাস করে এসেছে, সেই ডিবেট (আলোচনা), ডিসেন্স (সহবত) ও ডিসিশন (সিদ্ধান্তকে মর্যাদা)-এর আদর্শেই অটল থাকবে। তবে লোকসভার মর্যাদা রক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব আপনারই। আপনিই সভার প্রিসাইডিং অফিসার। সভার প্রহরী।"

লোকসভার কাজকর্মকে আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে কী কী করণীয়, এ দিন সেই ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছেন কংগ্রেস দলনেতা। বলেছেন, "সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলিকে অযথা বেশি বড় না করাটাই ভাল। সংসদে যত বেশি আলোচনা, বিতর্ক চলে ততই সাধারণ মানুষের উপকার হয়। তাঁদের সমস্যাগুলি সামনে আসে।"

এ দিন নতুন স্পিকার হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংসদ ও তাঁর অফিসারদের সঙ্গে করমর্দন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ওম বিড়লা।