মাত্র আধ ঘণ্টায় বদলে গেল গোটা ছবিটা।

সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরে যখন মহারাষ্ট্র রাজভবনে ঢুকছেন, তখন দল নিশ্চিত, এনসিপি এবং কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গড়ে ফেলবে তারা। ১০ জনপথ থেকে সমর্থনের চিঠি সোজা চলে আসবে রাজভবনে। কিন্তু সেই আশায় জল ঢেলে এল কংগ্রেসের বিবৃতি। তাতে সরকার গঠন নিয়ে কোনও কথা নেই। উল্টে বলা হয়েছে, মহারাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ে এনসিপি-র সঙ্গে আগামী দিনে আলোচনা চালিয়ে যাবে কংগ্রেস।

কংগ্রেসের সমর্থন আসছে না বুঝে রাজ্যপাল ভগৎ সিংহ কোশিয়ারির সঙ্গে বৈঠকে ইতি টেনে বেরিয়ে আসেন উদ্ধব-পুত্র। বলেন, ‘‘রাজ্যপাল শিবসেনাকে সরকার গড়ার ইচ্ছা ও সরকার গড়ার মতো সংখ্যা রয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন। আমরা সরকার গড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছি। কিন্তু সংখ্যার জোর দেখাতে পারিনি। সে জন্য আরও তিন দিন সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু রাজ্যপাল সেই অনুরোধ খারিজ করে দিয়েছেন।’’ বিজেপি-কে সরকার গড়তে তিন দিন সময় দেওয়া হলেও তাঁদের কেন মাত্র এক দিন দেওয়া হল, এই প্রশ্ন তুলে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন আদিত্য।

এ দিকে, রাতেই রাজ্যের তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এনসিপি-কে চিঠি পাঠিয়ে সরকার গড়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রাজ্যপাল। সময় দেওয়া হয়েছে ওই এক দিনই। রাতে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করতে যান এনসিপি নেতারা। সব মিলিয়ে মহারাষ্ট্রে সরকার গড়া নিয়ে রুদ্ধশ্বাস নাটক চলল গভীর রাত পর্যন্ত।

আরও পড়ুন: ভোটে পড়বে না অযোধ্যা-প্রভাব, দাবি বিরোধীদের

অথচ, দিনভর ঘটনাপ্রবাহে তেলে-জলে মিশ খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল মহারাষ্ট্রে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে শিবসেনাকে সরকার গড়ার ব্যাপারে সমর্থন দেবে কংগ্রেস-এনসিপি, এটা একপ্রকার ঠিকই হয়ে গিয়েছিল। এনসিপি শর্ত দিয়েছিল, এনডিএ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে শিবসেনাকে। সেই শর্ত মেনে সকাল ১১টায় দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে শিবসেনার একমাত্র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরবিন্দ সাবন্ত জানান, ভারী শিল্পমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিচ্ছেন তিনি।

মিশন মহারাষ্ট্র

২৪ অক্টোবর: ফল প্রকাশ, বিজেপি-শিবসেনা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আসন কমল বিজেপির

২৫ অক্টোবর: আড়াই বছর মুখ্যমন্ত্রী পদ চেয়ে সেনার চাপ

২৭ অক্টোবর: দেবেন্দ্র ফডণবীস বললেন, মুখ্যমন্ত্রী পদ ভাগ নয়

২ নভেম্বর: শিবসেনার মুখ্যমন্ত্রী ছাড়া সরকার নয়, বলল সেনা

৪ নভেম্বর: দিল্লিতে সনিয়া গাঁধী ও শরদ পওয়ারের বৈঠক

৫ নভেম্বর: অমিত শাহ-দেবেন্দ্র ফডণবীস বৈঠক, সেনার সামনে মাথা নত না-করার সিদ্ধান্ত

৮ নভেম্বর: এনসিপি-কংগ্রেসকে নিয়ে সরকার গড়ার ইঙ্গিত উদ্ধব ঠাকরের। বিধায়কদের হোটেলবন্দি করল শিবসেনা

৯ নভেম্বর: বিজেপি-কে সরকার গড়তে ডেকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিলেন রাজ্যপাল

১০ নভেম্বর: সরকার গড়বে না জানাল বিজেপি। শিবসেনাকে ১১ তারিখ রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সময় দিলেন রাজ্যপাল

সোমবার দিনভর

• সনিয়ার বাড়িতে কংগ্রেস নেতাদের বৈঠক

• শিবসেনাকে এনডিএ ছাড়ার শর্ত দিল এনসিপি

• মুম্বইয়ের হোটেলে উদ্ধবের সঙ্গে পওয়ারের বৈঠক

• শিবসেনার একমাত্র কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ইস্তফা

• উদ্ধবের সঙ্গে ফোনে কথা হল সনিয়ার

• বিকেলে সনিয়ার বাড়িতে ফের বৈঠক, ফোনে কথা বিধায়কদের সঙ্গে

• সন্ধ্যায় রাজ্যপালের কাছে আদিত্য ঠাকরে

• সময় চাইলেন ৭২ ঘণ্টা

• সময় দেওয়া সম্ভব নয়, জানাল রাজভবন

• এনসিপি-কে সরকার গড়তে ডাক। সময় দেওয়া হল ১২ তারিখ রাত ৮টা পর্যন্ত

তার পর দুপুরে শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে দেখা করেন এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ারের সঙ্গে। ঠিক হয় মুখ্যমন্ত্রী হবেন উদ্ধব, উপমুখ্যমন্ত্রিত্ব পাবে এনসিপি। সরকারে না-থাকলে দল আরও ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে এনসিপি-তেও। তাই রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে রাজি হন এনসিপি প্রধান। তবে পওয়ারের শর্ত ছিল পাশে পেতে হবে কংগ্রেসকেও। কারণ
তাদের সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব নয়।

মহারাষ্ট্রে বিজেপির আগ্রাসনে কয়েক বছর ধরে কোণঠাসা হচ্ছে শিবসেনা। দ্রুত কমছে জনভিত্তি। জোট সরকারে থেকেও কার্যত গুরুত্বহীন হওয়া নিয়ে  একাধিক বার সরব হয়েছে তারা। তাই এ বার ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হলে দল আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, এমন আশঙ্কা থেকে কংগ্রেসকে রাজি করতে সনিয়া গাঁধীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন উদ্ধব। তার পরেই শিবসেনা জানায়, কংগ্রেস নীতিগত ভাবে তাদের সমর্থনে রাজি। কংগ্রেস নেতৃত্ব সন্ধ্যার বৈঠকে এ নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা করবেন। যার ভরসায় আজ সন্ধ্যায় রাজ্যপালের কাছে সরকার গড়ার দাবি নিয়ে পৌঁছে যান আদিত্য।

কিন্তু কংগ্রেস সূত্রের খবর, গোড়ায় শিবসেনাকে সমর্থনে রাজি হলেও, পরে পিছিয়ে আসেন শীর্ষ নেতারা। বিজেপির প্রাচীনতম সঙ্গী তথা হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে পরিচিত শিবসেনার সঙ্গে হাত মেলানো উচিত হবে কি না এই প্রশ্নে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যায় দল। মল্লিকার্জ্জুন খড়্গে, সঞ্জয় নিরুপম, সুশীল শিন্দের মতো নেতারা শিবসেনার সঙ্গে হাত মেলানোর বিপক্ষে। অন্য দিকে বিপক্ষ শিবিরের যুক্তি ছিল, সরকারে যোগ না দিলে কর্নাটকের মতো এখানেও বিজেপি কিছু দিন পর থেকেই কংগ্রেস বিধায়কদের ভাঙানো শুরু করবে। সরকারও গড়ে ফেলবে। আরও দুর্বল হবে কংগ্রেসে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সন্ধ্যায় সনিয়ার বাড়িতে বৈঠকে বসেন আহমেদ পটেল, এ কে অ্যান্টনি, খাড়্গে, পৃথ্বীরাজ চহ্বাণের মতো নেতারা।

আরও পড়ুন: ‘পাক সেনার গুলি খেয়েছি, এত ব্যথা লাগেনি’

সরকারে যোগ দেওয়ায় পক্ষে থাকা নেতারা যুক্তি দেখান, শিবসেনার সঙ্গে হাত মেলালে মুসলিমরা সরে যাবেন এমন ভাবা ভুল। বরং বিজেপি-কে রুখতে হিন্দু সমাজকে বার্তা দেওয়ার সময় এসেছে। সংখ্যালঘু সমাজকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যাদের এত দিন অবহেলা করে এসেছে দল।

বিরোধী শিবির বলে, বিজেপির থেকেও বেশি কট্টরবাদী দল শিবসেনা। তা ছাড়া, শিবসেনার উত্তর ভারতীয় খেদাও নীতির বিরুদ্ধে এত দিন সরব ছিল কংগ্রেস। ফলে এখন হঠাৎ করে শিবসেনার পিছনে দাঁড়ালে ভোটারদের সামনে দলের অবস্থান স্পষ্ট করতে সমস্যায় পড়বে দল।

এই মতপার্থক্যের কারণে আপাতত ধীরে চলো নীতি নেয় কংগ্রেস। খড়্গের কথায়, ‘‘আগামী দিনেও এনসিপির সঙ্গে আলোচনা জারি রাখবে কংগ্রেস।’’ আগামিকাল সকালে সনিয়ার বাড়িতে দলের কোর কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে।

এ দিকে, এ দিন মুম্বইতে দলীয় বৈঠকের পরে বিজেপি নেতা সুধীর মুঙ্গাত্তিওয়ার বলেন, ‘‘আমরা পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছি।’’