সংবিধানকে প্রণাম করে সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস অর্জন করার আশ্বাস মোদীর
এনডিএ-র সংসদীয় দলনেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে সংবিধানেই মাথা ছোঁয়ালেন নরেন্দ্র মোদী। এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর সঙ্গে নতুন মন্ত্র যোগ করলেন, ‘সবকা বিশ্বাস’।
Narendra Modi

শনিবার সংসদের সেন্ট্রাল হলে সংবিধানে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম নরেন্দ্র মোদীর। ছবি: প্রেম সিংহ

নরেন্দ্র মোদী সংসদের সেন্ট্রাল হলে পা রাখার ঠিক আগে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা সংবিধানের উপরের আস্তরণটা সরিয়ে নেওয়া হল। তৈরি হল দিনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছবির প্রেক্ষাপট।

প্রথমে বিজেপি সংসদীয় দলের নেতা, তার পরে আনুষ্ঠানিক ভাবে এনডিএ-র সংসদীয় দলনেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে সেই সংবিধানেই মাথা ছোঁয়ালেন নরেন্দ্র মোদী। এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর সঙ্গে নতুন মন্ত্র যোগ করলেন, ‘সবকা বিশ্বাস’।

কাদের বিশ্বাস? সংখ্যালঘুদের। স্পষ্ট করে বললে, মুসলমানদের। যাঁরা বিজেপি-কে ভোট দেন না ধরে নিয়েই এ দেশের রাজনীতির হিসেব কষা হয়। বিজেপি নেতারাও মুসলমানদের ভোট মিলবে না ধরে নিয়েই অঙ্ক কষেন। রাষ্ট্রপতির কাছে নতুন সরকার গঠনের দাবি জানাতে যাওয়ার আগে আজ নরেন্দ্র মোদীর প্রতিজ্ঞা, ‘‘ওঁদের বিশ্বাস জয় করতে হবে।’’

আজ সংসদের সেন্ট্রাল হলে বিজেপি তথা এনডিএ সাংসদদের উদ্দেশে মোদী বলেছেন, ‘‘দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ছলনা করে তাঁদের আতঙ্কিত করে রাখা হয়েছে। তার থেকে ভাল হত, যদি সংখ্যালঘুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করা হত। ২০১৯-এ আমি আপনাদের থেকে আশা করব যে এই ছলনায় ছিদ্র করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস জিততে হবে।’’

২০১৪-য় সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন মোদী। আজ সংবিধানে মাথা ছুঁইয়ে তিনি বলেন, ‘‘সংবিধানকে সাক্ষী রেখে আমরা প্রতিজ্ঞা করছি যে সব বর্গের মানুষকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। ধর্ম-জাতির ভিত্তিতে কোনও ভেদাভেদ হবে না। সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, এবং তার সঙ্গে সবকা বিশ্বাস আমাদের মন্ত্র হবে।’’

গত পাঁচ বছরে সংখ্যালঘুদের উপর গোরক্ষক বাহিনীর হামলার ঘটনায় বারবার মোদীর দিকে আঙুল উঠেছে। লোকসভা ভোটের আগে মার্কিন পত্রিকা তাঁকে ভারতের ‘ডিভাইডার ইন চিফ’ তকমা দিয়েছিল। আজ মোদীর কথা শুনে বিজেপি নেতাদের মনে হয়েছে, তিনি এ বার বিজেপির ‘সংখ্যালঘু-বিরোধী’ তকমা ঝেড়ে ফেলতে চান। 

প্রণাম: পাঁচ বছর আগে সংসদের সিঁড়িতে নরেন্দ্র মোদী। 

মোদীর দাবি, গরিবরা তাঁর উপর বিশ্বাস রেখেছেন। গরিবরাই নতুন সরকার গড়েছেন। এ বার সমাজের বাকি সব বর্গের বিশ্বাস জিততে হবে। তিনি বলেন, ‘‘দেশে গরিবরা রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের বিষয় হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ বছর সরকারে থাকার পর বলতে পারি, গরিবদের সঙ্গে যে ছলনা চলছিল, তাতে ছিদ্র করে আমরা সোজাসুজি গরিবদের কাছে পৌঁছে গিয়েছি। গরিবদের সঙ্গে যে প্রতারণা হয়েছে, সেই একই প্রতারণা সংখ্যালঘুদের সঙ্গেও হয়েছে।’’

৩০৩ আসনে বিজেপির এবং ৩৫৩ আসনে এনডিএর জয়কে অমিত শাহ ‘প্রচণ্ড বহুমত’ আখ্যা দিয়েছেন। তবে গুরুত্ব কমার আশঙ্কায় ভুগছে বিজেপির শরিক দলগুলি। সেই আশঙ্কা দূর করতে মোদী আজ বুকে হাত রেখে বলেছেন, এনডিএ-কেও আরও মজবুত করতে হবে। আরও অনেককে এনডিএ-র সঙ্গে জুড়তে হবে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুর পরে সংসদের সেন্ট্রাল হলে তাঁর বিশাল ছবি টাঙানো হয়েছে। তার দিকে তাকিয়ে মোদী বলেন, ‘‘অটলজি যেমন এনডি-র সম্প্রসারণ করেছিলেন, আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। আমাদের সাফল্য দেখে অটলজি আজ হাসছেন।’’

এনডিএ-র শরিকদের পুরোপুরি পাশে রাখতেই প্রবীণ অকালি দল নেতা প্রকাশ সিংহ বাদলকে দিয়ে এনডিএ-র দলনেতা হিসেবে মোদীর নাম প্রস্তাব করানো হয়েছে। তাতে একে একে সমর্থন করেছেন জেডিইউয়ের নীতীশ কুমার, শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরে, এডিএমকের ই পলানিস্বামী, এনডিপিপির নেফিয়ু রিয়ো, এনডিপির কনরাড সাংমা।

তার আগে অমিত শাহ বিজেপির দলনেতা হিসেবে মোদীর নাম প্রস্তাব করার পর রাজনাথ সিংহ ও নিতিন গডকড়ী তাতে সমর্থন জানিয়েছেন। লোকসভা ভোটের ফল অন্যরকম হলে, মোদী দুর্বল হলে বিজেপি তথা এনডিএ-র এই নেতারাই হয়তো অন্য রূপ ধরতেন। কিন্তু আজ তাঁদেরও সেন্ট্রাল হল জুড়ে ‘মোদী-মোদী’ জয়ধ্বনিতে টেবিল চাপড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না।

সংসদের সেন্ট্রাল হলে লালকৃষ্ণ আডবাণীকে প্রণাম নরেন্দ্র মোদীর। ছবি: প্রেম সিংহ

আজ সকালেই রাষ্ট্রপতি ভবনের নির্দেশিকায় ষোড়শ লোকসভা ভেঙে দেওয়া হয়। তার পর নির্বাচন কমিশনাররা সপ্তদশ লোকসভার নির্বাচিত সাংসদদের তালিকা রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেন। এনডিএ-র বৈঠকের পর শাহের নেতৃত্বে এনডিএ নেতারা রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সিদ্ধান্ত জানান। এর পরে মোদী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকার গঠনের দাবি জানান। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। নতুন মন্ত্রিসভা কবে শপথ নেবে তা অবশ্য এখনও ঠিক হয়নি। জানা গিয়েছে, আগামিকাল মায়ের সঙ্গে দেখা করার পরে আমদাবাদে জনসভা করবেন মোদী। পরশু যাবেন বারাণসীতে।

আজ রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে মোদী বলেন, ‘‘দেশ বিপুল জনমত দিয়েছে। এর সঙ্গে প্রত্যাশা জড়িয়ে। আমাদের সরকার নতুন ভারত নির্মাণে কাজ করবে। চরৈবেতি মন্ত্র নিয়ে আমরা সময় নষ্ট না করে এগোতে থাকব। সকলের সুরক্ষা, দেশের সমৃদ্ধি আমার দায়িত্ব। ভরসা দিচ্ছি, আপনাদের স্বপ্নপূরণে কোনও কসুর করব না।’’

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত