বিজ্ঞান কংগ্রেসে এ বার মোদী সরকারের মন্ত্রী দাবি করলেন, স্টিফেন হকিং মানতেন, আইনস্টাইনের চেয়ে বেদ এগিয়ে!

সদ্যই প্রয়াত হয়েছেন হকিং। জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে তাঁকে স্মরণের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী হর্ষ বর্ধন আজ জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর প্রসঙ্গ টানলেন পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত প্রেক্ষাপটে।

মন্ত্রীর দাবি, হকিং বলেছিলেন, বেদের তত্ত্বগুলি সম্ভবত আইনস্টাইনের বিখ্যাত ‘‘e=mc2’’ সূত্রটির চেয়েও উন্নত।

উত্তর-পূর্বে দ্বিতীয় বার বসল এই আসর। আজ এখানে ১০৫তম জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের উদ্বোন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বলেন, “বিশ্বে বিজ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে ভারত ছিল পথিকৃৎ। সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনে ভারতকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে হবে। আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ সব উন্নয়ন ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি উপহার দিতে হবে।” আবিষ্কারের স্বার্থে গবেষণা নয়, উন্নয়নের খাতিরে গবেষণার ডাক দেন মোদী।

মোদী সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেন না। তবে হর্ষ তাঁর ওই মন্তব্যের জন্য সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়েন। এক, কবে কোথায় এমন কথা বলেছিলেন হকিং? দুই, যদি বলে থাকেন, তার বৈজ্ঞানিক কোনও ভিত্তি আছে কি? মন্ত্রী এ সবের জবাব এড়িয়ে দায় ঠেলেছেন সাংবাদিকদের দিকেই। তাঁর বক্তব্য, ‘‘যা বলার প্রকাশ্য মঞ্চেই বলেছি। আপনারাই খুঁজে দেখুন। না পেলে দিল্লিতে আমার কাছে আসবেন।’’

যার অর্থটি স্পষ্ট, জাতীয়তাবাদী আবেগের বশে বা আলটপকা কোনও মন্তব্য এটি নয়। মোদী ও হর্ষ ভেবেচিন্তেই বিজ্ঞানের এই মঞ্চকে ব্যবহার করেছেন, ভারতে বিজ্ঞান সাধনার অতীত ও বেদ নিয়ে আলোচনা উস্কে দিতে। বিজেপি ও সঙ্ঘ শিবিরের লোকজন দীর্ঘদিন ধরেই এই চেষ্টাটি করে যাচ্ছেন।

হকিং এমনটা বলেছিলেন, তার কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণও মিলছে না প্রাথমিক অনুসন্ধানে। ইন্টারনেটে খুঁজলে হকিং ও বেদ নিয়ে যে কয়েকটি লিঙ্ক পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলি বেদচর্চার বিভিন্ন ওয়েবসাইট। এর একটির দাবি, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা দফতরের স্বীকৃত সংস্থা। সেগুলিতেও সরাসরি হকিং ও কথা বলেছেন, তার উল্লেখ মেলেনি।

হকিং বরং ২০০১-এ নয়াদিল্লিতে আইনস্টাইন স্মারক বক্তৃতায় মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত নয় বলেই বেশির ভাগ বিজ্ঞানী জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করেন না। এটা ঘটনা পরীক্ষা দ্বারা এখনও প্রমাণিত নয় হকিংয়ের কিছু তত্ত্বও। তবে বেদের ধারণাগুলির সত্যাসত্য প্রচলিত বিজ্ঞানের পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত নয় বলেই সেগুলিকে ভুল মনে করার যুক্তি নেই বলে মনে করেন দেশের অনেক বেদ বিশেষজ্ঞ। জাতীয় কংগ্রেসে এমন বিশ্বাসের প্রকাশও তাই নতুন নয়। এর আগে ২০১৫ সালের বিজ্ঞান কংগ্রেসে বলা হয়েছিল, এখনকার বিমান আবিষ্কার হওয়ার বহু আগে বৈদিক শাস্ত্রেই আধুনিক বিমান (পুষ্পক রথ)-এর কথা বলা হয়েছিল।

বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করছেন, হকিং এমন কোনও কথা বলেছিলেন বলে তাঁদের মনে হয় না। আইনস্টাইনের সূত্রটি ভর ও শক্তির সম্পর্ক নিয়ে। টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের ময়ঙ্ক বাহিয়ার বক্তব্য, ‘‘দর্শনে শক্তি থেকে কিছু সৃষ্টির ধারণা থাকলেও তা বৈজ্ঞানিক কোনও তত্ত্বের বিষয় নয়। বিজ্ঞানের চেয়ে উন্নত বলে মনে করার প্রশ্নই ওঠে না।’’