মানচিত্র ছিঁড়ে ফেলা, তার জেরে হইহল্লা, এজলাস থেকে প্রধান বিচারপতির উঠে যাওয়ার হুমকি— ৪০তম দিনে এমন সব নাটকের মধ্য দিয়েই সুপ্রিম কোর্টে শেষ হল বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি মামলার শুনানি। আজ রায়দান স্থগিত রেখেছে আদালত। কবে রায় বেরোবে, তা-ও বলা হয়নি। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-সহ সাংবিধানিক বেঞ্চের পাঁচ বিচারপতি আগামিকাল রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসবেন। মামলাকারী কোনও পক্ষেরই সেখানে প্রবেশাধিকার থাকবে না।

আজ আদালতে এক আইনজীবী শুনানির জন্য আরও সময় চাইলে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘যথেষ্ট হয়েছে (এনাফ ইজ় এনাফ)।’’ কিছু অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগামী ১৮ অক্টোবর থেকে দুবাই হয়ে মিশর, ব্রাজিল ও আমেরিকা সফরের কথা ছিল প্রধান বিচারপতির। সেই সফর বাতিল করেছেন তিনি। সদ্য পুজোর ছুটি শেষ হয়েছে আদালতে। আবার দীপাবলি উপলক্ষে ২৭ অক্টোবর থেকে এক সপ্তাহের ছুটি। অনেকের আশা, আগামী ১৭ নভেম্বর নিজের অবসরের আগে রায় ঘোষণা করতে চান প্রধান বিচারপতি। রায় লিখতে সময় লাগবে বলেই হয়তো বিদেশ সফর বাতিল করলেন তিনি। 

আজ আদালতে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী রাজীব ধবনের সঙ্গে সংঘাত বাধে হিন্দু মহাসভার একটি শাখার আইনজীবী বিকাশ সিংহের। সাবেক বাবরি মসজিদের মূল গম্বুজের ঠিক নীচের জমিতে রাম জন্মেছিলেন বলে প্রমাণ দিতে প্রাক্তন আইপিএস কিশোর কুণালের লেখা একটি বই পেশ করেন বিকাশ। বইয়ে ছিল রাম জন্মভূমির একটি সচিত্র ম্যাপ। রাজীব আপত্তি তুলে বিচারপতিদের কাছে জানতে চান, মানচিত্রটি নিয়ে তাঁর কী করা উচিত। বিচারপতিরা বলেন, রাজীব চাইলে কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলতে পারেন। এ কথা শুনেই মানচিত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন রাজীব। স্তম্ভিত হয়ে যান সকলে। তার পরেই তুমুল হইহল্লা বাধে। এক সময়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, এ রকম চলতে থাকলে তাঁরা বেরিয়ে যাবেন। পরে রাজীব যুক্তি দেন, প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন বলেই তিনি মানচিত্রটি ছিঁড়েছেন। বলেন, ‘‘আমি এ সব ক্ষেত্রে আইনজীবী অরবিন্দ দাতারের পরামর্শ নিই। তিনি বললেন, এটি আসলে নির্দেশ।’’ প্রধান বিচারপতি অবশ্য জানান যে, তিনি বলেছিলেন বলেই নথিটি ছিঁড়েছেন এই আইনজীবী। তবে বিপক্ষের আর এক আইনজীবী পি এন মিশ্রের সঙ্গেও কথা-কাটাকাটিতে জড়ান রাজীব। 

বুধবার শীর্ষ আদালতে

প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ: যথেষ্ট হয়েছে। আজ বিকেল ৫টায় শুনানি শেষ করব। 
(রাম জন্মভূমির মানচিত্র-সহ একটি বই পেশ করেন হিন্দু মহাসভার একটি শাখার আইনজীবী বিকাশ সিংহ)

সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী রাজীব ধবন: সুপ্রিম কোর্টের উচিত নয় এই সব বইয়ের উপরে নির্ভর করা।

বিকাশ: মানচিত্রটিকে নথিভুক্ত করার জন্য বলছি না।

রাজীব (বিচারপতিদের): মানচিত্র নিয়ে আমার এখন 
কী করা উচিত?

বিচারপতিরা: চাইলে ওই কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলুন। 
(রাজীব মানচিত্রটি ছিঁড়ে ফেলতেই গোলমাল বাধে) 

প্রধান বিচারপতি: শিষ্টতা বজায় রাখুন। এ রকম চলতে থাকলে আমরা বেরিয়ে যাব।

(মধ্যাহ্নভোজের পরে)

রাজীব: আমি নিজে থেকেই কাগজ ছিঁড়ে ফেলেছি বলে খবর ছড়াচ্ছে। প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক হলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলুন।’ আমি সেই নির্দেশ মেনেছি। 

বিচারপতি এস এ নাজ়ির: হ্যাঁ, খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। 

প্রধান বিচারপতি: ড. ধবন ঠিকই বলছেন। প্রধান 
বিচারপতি বলেছিলেন বলেই তিনি সেটি ছিঁড়েছেন। এই ব্যাখ্যা প্রচার করা হোক।

সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ করা তিন মধ্যস্থতাকারীর প্যানেলও আজ তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। কয়েকটি সূত্র দাবি করে, অন্যতম মধ্যস্থতাকারী শ্রীরাম পঞ্চুর মাধ্যমে চিঠি দিয়ে অযোধ্যার বিতর্কিত জমির দাবি ছাড়তে রাজি হয়েছে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড। বোর্ডের চেয়ারম্যান জ়াফর আহমেদ ফারুকির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে তাদের সিইও সৈয়দ মহম্মদ শোয়েব এবং কৌঁসুলি জ়াফরায়াব জিলানি বলেন, এমন বার্তা দিয়ে আদৌ কোনও চিঠি দেয়নি সুন্নি বোর্ড। 

২০১০ সালে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, অযোধ্যার বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালা বিরাজমানের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিতে হবে। রায়ের বিরুদ্ধে ১৪টি আবেদন জমা পড়ে সুপ্রিম কোর্টে। মধ্যস্থতায় সুরাহা না-হওয়ায় গত ৬ অগস্ট থেকে প্রতিদিন শুনানি শুরু হয়। পুজোর ছুটির আগেই ৩৭ দিন শুনানি হয়ে গিয়েছিল। আজ আদালত তিন দিন সময় দিয়েছে সব পক্ষকে। ঠিক কোন কোন বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ আদালতের কাছে বিচার চাইছে— তা নির্দিষ্ট করে লিখিত ভাবে জানাতে হবে এই তিন দিনের মধ্যে।