নতুন বছরে যেন এক নতুন মোদী। ২০১৯-এর প্রথম সন্ধ্যায় দেশ জুড়ে সম্প্রচারিত হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎকার। সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে যে মোদীকে পাওয়া গেল, গত সাড়ে চার বছরে একবারও দেখা যায়নি তাঁকে। সেই চেনা শীতল চাহনি নেই। চোয়ালের সেই অবিশ্রান্ত কাঠিন্য নেই। বিরোধীর প্রতি তাচ্ছিল্য নেই। গোরক্ষক তাণ্ডব থেকে গণপ্রহারের সংস্কৃতি, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক থেকে রাফাল, রামমন্দির থেকে শবরীমালা— সব বিতর্কিত প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে গেলেন এক অচেনা মোদী।

হিন্দি বলয়ের তিনটি রাজ্যে সম্প্রতি বড়সড় নির্বাচনী ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। ২০১৪ সালে বিজেপি-কে বেনজির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইয়ে দেওয়ায় ওই তিন রাজ্যের অবদান ছিল অনেকটাই। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের মাস ছয়েক আগে নিজেদের সেই গড়ে ধাক্কা খেয়েই কি আত্মমন্থন করলেন নরেন্দ্র মোদী? রাজনৈতিক শিবিরে জোর চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর এই নতুন ‘অবতার’ সম্পর্কে।

অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে মোদী সরকারের উপরে চাপ বাড়াতে শুরু করেছে সঙ্ঘ পরিবার। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, অর্ডিন্যান্স জারি করে রামমন্দির তৈরির কাজ শুরু হোক— প্রকাশ্যে এমন দাবি তুলেছে আরএসএস। বিজেপির ভিতরেও সেই একই দাবি উঠে গিয়েছে। কিন্তু নতুন বছরের নতুন মোদী যেন আচমকা রাজধর্মের পূজারী। অর্ডিন্যান্স জারির সম্ভাবনা নস্যাৎ করলেন তিনি। বললেন, ‘‘আগে মামলার নিষ্পত্তি হোক। তার পরে কেন্দ্রীয় সরকারের যা কর্তব্য তাই করা হবে। মন্দির নির্মাণের বিষয়টি সংবিধান মেনেই হবে।’’ এতেই অবশ্য থামলেন না পোড় খাওয়া রাজনীতিক। ভঙ্গি যতই সমাহিত হোক, তিরটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করার মতো ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদী নন। সুতরাং কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ রেখে বললেন, ‘‘আমি কংগ্রেসকে অনুরোধ করছি, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে, এই মামলায় বাধা সৃষ্টির পথ থেকে আপনাদের আইজীবীদের বিরত করুন। মামলাটাকে নিজের গতিতে চলতে দিন। মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই আমাদের সবার কাজ করা উচিত।’’

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার সাজানো, নরেন্দ্র মোদীকে ১০ প্রশ্ন কংগ্রেসের

কিন্তু তিন তালাকের অবলুপ্তি ঘটাতে তো অর্ডিন্যান্স জারির পথেই হেঁটেছিল সরকার। রামমন্দিরের ক্ষেত্রে তা হবে না কেন? মোদী মনে করালেন, ‘‘তিন তালাকের ক্ষেত্রে অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষিত হওয়ার পরে।’’

তিন তালাকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রসঙ্গে অস্বস্তিকর প্রশ্ন অবশ্য আরও ছিল। তিন তালাক প্রশ্নে একটি ধর্মের নিজস্ব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দ্বিধা নেই, কিন্তু শবরীমালার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়ে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধিতা করছে বিজেপি। এটা কি দ্বিচারিতা নয়? তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখেও মোদী অবিচল। তাঁর ব্যাখ্যা— অনেক ইসলামি দেশই তিন তালাক প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, অর্থাৎ এই প্রথার সঙ্গে ধর্মীয় আস্থার কোনও সম্পর্ক নেই, কিন্তু শবরীমালা বিতর্কের সঙ্গে ধর্মীয় আস্থা জড়িত, তাই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা।

একের পর এক শরিক দল বিজেপির বিরুদ্ধে মুখ খুলছে, শিবসেনার মতো সবচেয়ে পুরনো শরিকের সঙ্গেও বিপুল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলি বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট। এই পরিস্থিতি কেন? এ সব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শরিকি অসন্তোষের ব্যাখ্যা মোদী দিলেন না। উল্টোটা করলেন। শীতল ভাবে বুঝিয়ে দিলেন, অসন্তোষ তাঁরও রয়েছে। বললেন, ‘‘আমাদের কাছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু সব শরিক দলকে সঙ্গে নিয়েই সরকার গড়েছিলাম। সকলের মতামত নিয়েই কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম।’’ মোদীর দাবি, আঞ্চলিক আশা-আকাঙ্খাকে বরাবরই গুরুত্ব দেয় বিজেপি, তাই আঞ্চলিক দলগুলি বিজেপির সঙ্গে থাকলে লাভবানই হয়। কেন লাভবান হয়? মোদীর ব্যাখ্যা— বিজেপির সঙ্গে যে দল জোট গড়ে, বিজেপি চায় সেই দলেরও বৃদ্ধি হোক। কিন্তু কংগ্রেস তা চায় না। এই সব আঞ্চলিক দলের অধিকাংশই কংগ্রেস ভেঙে তৈরি। এক সময়ে কংগ্রেস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে দল ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন দল গড়েছিল এই সব দলের নেতারা। এখন আবার এঁরা কংগ্রেসের হাত যখন ধরেন, তখন কংগ্রেস এই দলগুলোকে শেষ করে দিতে চায়।

এমন গুরুতর অভিযোগ যদি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে থাকে, তা হলে কংগ্রেসের পাশে আজ এতগুলো দল কেন? মোদীর জবাব— এঁদের আর কোনও লক্ষ্য নেই, একটাই লক্ষ্য, মোদীর বিরোধিতা।

যে কেউ প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু মোদী নন— এ কথা তো বিরোধী দলগুলো নিজেরাই বলছে। তা হলে মোদীর ব্যাখ্যায় আর নতুন কী পাওয়া গেল? মোদী বললেন, ‘‘এই নির্বাচনটা হতে চলেছে জনতা বনাম গঠবন্ধন।’’ যে দলগুলি তাঁর বিরোধিতায় এক জায়গায় এসেছে, তাঁদের নিজেদের মধ্যেই নানা বিষয়ে মতপার্থক্য এখনও প্রকাশ্যে— দাবি মোদীর। তাঁর কথায়, ‘‘এঁরা কারা? এঁরা শুধু নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একে অপরের হাত ধরছেন।’’ মোদীর পরামর্শ, ‘‘সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধিকে ছোট করে দেখা কিন্তু আমাদের উচিত হবে না।’’

আরও পড়ুন: বাংলার দিকে দেখুন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করা যাচ্ছে না: মোদীর নিশানায় মমতা

গোরক্ষার নামে তাণ্ডব, দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া গণপ্রহারের সংস্কৃতি— এ সব নিয়ে কী বলবেন? মোদীর দ্ব্যর্থহীন জবাব, ‘‘সভ্য সমাজে এই ধরনের ঘটনার কোনও স্থান নেই।’’ গোরক্ষার নামে বা অন্য কারণে গণপ্রহারের যে সব ঘটনা সামনে আসছে, তা ‘অত্যন্ত নিন্দনীয়’— মত মোদীর। কিন্তু তিনি আরও বললেন, ‘‘এই সব ঘটনা কি ২০১৪ সালের পরে শুরু হয়েছে? কী ভাবে এগুলো শুরু হয়েছিল, কারা শুরু করেছিল, আমি আর সে সব আলোচনায় যেতে চাইছি না।’’ এই ধরনের ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করার পরামর্শও দিলেন মোদী।

আজ না হয় গোরক্ষকদের তাণ্ডব নিয়ে রাজনীতি না করার পরামর্শ দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। এক সময় কংগ্রেসও তো বলেছিল, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে রাজনীতি করা অনুচিত। বিজেপি কি শুনেছিল সে কথা? মোদী প্রথমেই মেনে নিলেন, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে রাজনীতি করা একেবারেই উচিত নয়। তার পরেই সুকৌশলে প্রশ্ন তুলে দিলেন, ওই বিষয় নিয়ে রাজনীতিটা করল কারা?

সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়েছে, অভিযান শেষ করে ফিরে আসার পরে সেনা-ই সে কথা পাকিস্তানকে জানিয়েছে, তার পরে সাংবাদিক বৈঠক করে সেনাবাহিনীই জানিয়েছে যে, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছে, সরকারের কেউ সে কথা ঘোষণা করতে যায়নি— মনে করালেন মোদী। তার পরে বললেন, ‘‘যে দিন সেনা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের কথা জানাল, সেই দিনই কয়েকটি দল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দিল।’’ মোদীর প্রশ্ন— রাজনীতিটা কারা করল? তিনি বললেন, ‘‘পাকিস্তানও প্রথমে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পাকিস্তান তো করবেই। নিজেদের মনোবল ধরে রাখার জন্য ওই কথা বলতে পাকিস্তান বাধ্য ছিল। কিন্তু তা বলে ভারতের কিছু রাজনৈতিক দলও সেই একই প্রশ্ন তুলবে!’’

সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি পর্ব এবং স্ট্রাইকের দিনের ঘটনা সম্পর্কে অনেক কথাই এ দিনের সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘উরির সেনা ছাউনিতে হামলা হওয়ার পর থেকে আমার ভিতরে একটা আক্রোশ ছিল। আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। ...সেনার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে নিরন্তর কথা বলছিলাম। সেনার ভিতরে আমার চেয়েও বেশি আগুন জ্বলছিল। আমি খোলাখুলি ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছিলাম— যা করতে চান আপনারা করুন, যতটা করতে পারেন করুন।’’ দফায় দফায় সেই আলোচনার মধ্যে দিয়েই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সিদ্ধান্ত হয় বলে মোদী এ দিন জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, স্ট্রাইকের জন্য বেশ কিছু দিন প্রস্তুতি চলে, বিশেষ সরঞ্জাম জোগাড় করা হয়, দু’বার তারিখ বদল হয়। মোদীর কথায়, ‘‘আমি চেয়েছিলাম, আমাদের একজন জওয়ানেরও যেন ক্ষতি না হয়।’’ তিনি জানালেন যে, তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, সূর্যোদয়ের আগেই অভিযান চালিয়ে ফিরে আসতে হবে, সূর্যোদয়ের পরে কোনও ভাবেই নিয়ন্ত্রণরেখার ও পারে থাকা চলবে না। অভিযানের সময়ে সারারাত কী ভাবে তিনি নিজে প্রতি মুহূর্তে যোগাযোগ রাখছিলেন, কী ভাবে সকালের দিকে এসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, কী ভাবে ঘণ্টাখানেক অত্যন্ত উদ্বেগে কাটিয়েছিলেন তিনি— বিশদে এ দিন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই অসামান্য অভিযানের পরে ভারতীয় সেনার সক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর ধারণাই বদলে গিয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী এ দিন মন্তব্য করেন। সেনার গৌরবের কথা প্রচার করার মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই, মত মোদীর।

আরও পড়ুন: অমিত শাহকে ফাঁসাতে সিবিআইয়ের অপব্যবহার করেছে কংগ্রেস: স্মৃতি ইরানি

কিন্তু রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তি? তা নিয়ে তো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দিকে আঙুল উঠেছে। প্রথমেই প্রশ্ন সংশোধন করে দিলেন মোদী। বললেন, ‘‘আমার বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তিগত অভিযোগ ওঠেনি, উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে।’’ তার পরে বললেন, ‘‘রাফাল প্রশ্নের জবাব আর কতবার দেব? সংসদে এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। জনসভায় যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই এ নিয়ে বলেছি। রাফাল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ও বেরিয়ে গিয়েছে। আর কী বলার প্রয়োজন রয়েছে?’’ সংবাদমাধ্যমকে মোদীর পরামর্শ, ‘‘যাঁরা বার বার প্রশ্নগুলো তুলছেন, তাঁদের একবার প্রশ্ন করুন। তাঁদের একবার বলুন দুর্নীতির প্রমাণ দিতে।’’ এর পরেই ফের স্পর্ধা কণ্ঠস্বরে— ‘‘যত গালি দেওয়ার দিন, যত দোষারোপ করার করুন। দেশের স্বার্থে যা আমার ঠিক মনে হবে, আমি তা-ই করব।’’

বিতর্ক তো আরও রয়েছে। দেশের সাংবিধানিক সংস্থাগুলির স্বশাসন বা গুরুত্ব খর্ব করে দিয়েছে মোদী সরকার— বার বার এই অভিযোগ উঠছে। মোদী বললেন, ‘‘কারা বলছে এ কথা! কংগ্রেস! কংগ্রেসের তো এ সব বলার অধিকারই নেই।’’ কেন নেই? মোদীর ব্যাখ্যা— পিএমও-র মাথার উপরে জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদ বসিয়ে দিয়েছিল যে কংগ্রেস, মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের কাগজ সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন যে কংগ্রেসের নেতা, সমস্ত সিনিয়র বিচারপতিদের ছুড়ে ফেলে জুনিয়র একজনকে মাথার উপরে বসিয়ে দিয়েছিল যে কংগ্রেস, সেই কংগ্রেসের আর এ সব প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই। মোদীর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রেখেছে কংগ্রেস?’’

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর পদ থেকে উর্জিত পটেলের ইস্তফার বিষয়ে কী বলবেন? সেটা কি সরকারের চাপে নয়? মোদী বললেন, ‘‘চাপ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। উর্জিত পটেল ছ’মাস ধরে আমাকে বলছিলেন যে, তিনি ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করতে চান। লিখিত ভাবেও জানিয়েছিলেন।’’ মোদীর সংযোজন, ‘‘আমি বলছি, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে অত্যন্ত ভাল কাজ করে দেখিয়েছেন উর্জিত পটেল।’’

আরও পড়ুন: মধুচন্দ্রিমার পর্ব কি শেষ! মায়াবতীর শর্ত মেনেই ‘জোটরক্ষা’ কংগ্রেসের

ভারত-পাক সম্পর্ক প্রসঙ্গে মোদীর জবাব ছিল আরও কুশলী। বললেন, ‘‘ইউপিএ সরকার হোক বা এনডিএ, ভারতের কোনও সরকার, কোনও প্রধানমন্ত্রী কখনও বলেননি যে, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা চাই না। ভারত সব সময়ে আলোচনার পক্ষে। যে কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনার পক্ষে। কিন্তু আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তার আগে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে।’’ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত প্রশ্ন আসতেই দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে একমত হিসেবে তুলে ধরার যে প্রয়াস এ দিন মোদী করলেন, তা মোদী জমানায় বেশ নতুন। তবে কূটনৈতিক মহল এতে মোদীর প্রশংসাই করছে। আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য এই রকম হওয়া উচিত বলেই কূটনীতিকরা মনে করছেন।

অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছিল মোদীর বিদেশ সফরের বিষয়েও। ঘন ঘন বিদেশ সফরে যান প্রধানমন্ত্রী মোদী, দেশের চেয়ে বেশি সময় বিদেশে কাটান— কটাক্ষ করে থাকে বিরোধী দলগুলি। সেই কটাক্ষের উদ্ধৃতিতেও কিন্তু মোদী অবিচলিতই রইলেন এ দিন। বললেন, ‘‘আগে প্রধানমন্ত্রীদের এত বার বিদেশে যেতে হত না। কারণ বছরে একবার রাষ্ট্রপুঞ্জে গেলেই চলত। কিন্তু এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চ তৈরি হয়েছে। নাম বলতে শুরু করলেও সবক’টা মনে করে বলতে পারব না, এতগুলো মঞ্চ এখন। ফলে নানা কর্মসূচি থাকে, বিদেশে যেতেই হয়।’’ এতেই থামলেন না মোদী। বললেন, ‘‘আমাকেই প্রথম এ ভাবে বিদেশে যেতে হচ্ছে এমন নয়। মনমোহন সিংহকেও যেতে হত।’’ যে মনমোহনের দিকে বরাবর কটাক্ষই ছুড়ে এসেছেন মোদী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের কূটনীতিতে সেই মনমোহনের অবদান মোদী স্মরণ করছেন— এও বেশ বিরল।

তবে সংসদে বিরোধীদের ভূমিকা নিয়ে নাম না করেই এ দিন কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘সংসদে ভাল ভাবে আলোচনা হোক, গভীর আলোচনা হোক, এটা জরুরি। … কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, সংসদে বিতর্কের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।’’ প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা— সংসদের কাজ হল গোটা ব্যবস্থার উপরে চাপ তৈরি করা, তাতে আমলাতন্ত্র চাপে থাকে। কিন্তু এখন আর তা হচ্ছে না। কারণ আমলাতন্ত্র জেনে গিয়েছে, সংসদে একটা বিষয় উঠলেই সেটা রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হবে, চাপটা রাজনৈতিক দলের উপরেই তৈরি হবে।

(দেশজোড়া ঘটনার বাছাই করা সেরা বাংলা খবর পেতে পড়ুন আমাদের দেশ বিভাগ।)