দলিত ছেলেকে বিয়ে করে উত্তরপ্রদেশের বিধায়কের মেয়ে প্রাণভয়ে ভুগছেন। সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে তাঁর ভিডিয়ো। গুজরাতে উচ্চবর্ণের তরুণীকে বিয়ে করার অপরাধে ক’দিন আগেই খুন হয়েছেন এক যুবক। অথচ ভিন্ জাতে বিয়ে করার জন্য কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের উৎসাহভাতা রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, খুব অল্পসংখ্যক দম্পতিই এই টাকার জন্য আবেদন করেন বা শেষ পর্যন্ত টাকা পান।  

কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের শেষ লগ্নে, ২০১৩ সালে, ভিন্ জাতে, অর্থাৎ তথাকথিত উচ্চবর্ণের সঙ্গে তথাকথিত নিম্নবর্ণের বিয়েকে উৎসাহ দিতে আর্থিক সাহায্যের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে টাকার পরিমাণ ছিল দেড় লক্ষ। পরে তা বাড়িয়ে আড়াই লক্ষ করা হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে এ জাতীয় বিয়েতে পাত্র-পাত্রীর পরিবারের তরফ থেকে প্রবল বাধা আসে। অর্থসাহায্য দিয়ে নবদম্পতিকে থিতু হতে সাহায্য করার ভাবনা থেকেই এই প্রকল্পের রূপায়ণ। 

‘সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন’ মন্ত্রকের অধীনে ‘অম্বেডকর স্কিম ফর সোশ্যাল ইন্টিগ্রেশন থ্রু ইন্টার-কাস্ট ম্যারেজ’ নামের এই প্রকল্প সম্পর্কে সরকারি স্তরে প্রচার নেই। প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকে অতি অল্পসংখ্যক দম্পতি এই টাকার জন্য আবেদন করে তা পেয়েছেন। নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাত থেকে ২০১৭-১৮ সালে এক জন দম্পতিও এই ভাতার জন্য আবেদন করেননি। ২০১৮-১৯-এ গুজরাতের মাত্র চার দম্পতির আবেদন অনুমোদিত হয়েছে।

প্রকল্প শুরু করার সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ জাতের বিয়ের সংখ্যা বিচার করে ঠিক করা হয়, বছরে সর্বোচ্চ ৫০০ ভিন্ জাতের বিয়েতে অর্থ সাহায্য দেবে কেন্দ্র। কোন রাজ্যে কত জনকে ভাতা দেওয়া হতে পারে, তা-ও ঠিক করা হয়। কিন্তু গত সাড়ে পাঁচ বছরে সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছে পৌঁছনো যায়নি। ২০১১ সালে সরকারি হিসেবে ভারতে ভিন্ জাতে বিয়ের হার ছিল মাত্র ৫.৮%। ২০১৫ সালে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চ’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই হার কমে হয়েছে ৫.৪%। এক সমীক্ষকের কথায়, ‘‘আমাদের ধারণা ছিল, শিক্ষা-আধুনিকতা-অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জাতপাতের সঙ্কীর্ণতা মুছে যায়। কিন্তু এই সমীক্ষা করতে গিয়ে বুঝলাম, এ দেশে এখনও তা হয়নি।’’

২০১৪-১৬ সালে ১১৬ জন দম্পতি এবং ২০১৭-১৮ আর্থিক বর্ষে ১৩৬ জন দম্পতি এই ভাতা পেয়েছেন। ২০১৮-১৯ সালে পেয়েছেন ১৩১ জন দম্পতি। এই সব দম্পতির বেশির ভাগই আবার অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তেলঙ্গানা বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যের।

কেন্দ্রীয় সরকার-পোষিত স্বশাসিত সংস্থা ‘অম্বেডকর ফাউন্ডেশন’ এই প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে। সংস্থার প্রধান দেবেন্দ্র মাজির কথায়, ‘‘প্রকল্প যতটা সফল হওয়ার দরকার ছিল তা হয়নি। কারণ, এর প্রচারও ঠিকমতো হয়নি। তা ছাড়া, ভিন্ন ধর্মে বিয়ে হিন্দু ম্যারেজ আইন ১৯৫৫-র আওতায় নথিভুক্ত হলে শুধু সেগুলির ক্ষেত্রেই উৎসাহ ভাতা মিলবে বলে নিয়ম। এটাও অন্তরায় হচ্ছে।’’ প্রকল্প সফল করতে ২০১৭ সালে টাকা দেওয়ার নিয়মকানুন বেশ কিছুটা শিথিল করা হলেও কাজ হয়নি।

সমাজ-সমীক্ষকদের এক অংশ মনে করছেন, সমস্যা অন্যত্র। দেশের রাজনৈতিক নেতারা যদি জাতপাতের রাজনীতি থেকে ফায়দা লোটেন, তা হলে এমন প্রকল্প নিয়ে তাঁরা প্রচার চাইবেন না। বরং বাধ সাধবেন। এই প্রকল্পের টাকা পেতে গেলে স্থানীয় সাংসদ, বিধায়ক ও প্রশাসনিক কর্তাদের অনুমোদন দরকার। এই অনুমোদন পেতেই মানুষকে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ। এক প্রবীণ সমাজবিদ্ বলেন, ‘‘ভিতরে ভিতরে আমি জাতপাত নিয়ে বিভেদে ইন্ধন জোগালাম আর বাইরে বিভেদ দূর করার নামে লোক দেখানো প্রকল্প চালু করলাম— এতে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না।’’

কেন্দ্রের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মতো একাধিক রাজ্যে আবার ভিন্ জাতের বিয়েতে উৎসাহভাতা দেওয়ার নিজস্ব প্রকল্প রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যেমন টাকার পরিমাণ ৩০ হাজার টাকা।  অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ২০১৭-১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে এমন ১৮০৪ জন দম্পতির ভাতা অনুমোদিত হয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে অনুমোদন পেয়েছে ১৪৩৬ জনের ভাতা। রাজনৈতিক সদিচ্ছাতেই এই সাফল্য এসেছে বলে মন্ত্রীর দাবি।