সংশয় আগেও প্রকাশ করেছিলেন। এ বার আরও স্পষ্ট করলেন তাঁর অভিযোগ। পুলওয়ামায় জঙ্গিহানার প্রসঙ্গে সোমবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রায় সরাসরি আঙুল তুললেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দিকে। ‘‘ঘটনা যে ঘটবে আপনি তো আগে থেকে জানতেন’’— তৃণমূলের কোর কমিটি বৈঠকের মঞ্চ থেকে নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে এ দিন এমনই মন্তব্য করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করাই কি আসল লক্ষ্য? অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে প্রশ্ন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

দেশে সাধারণ নির্বাচনের দিন ক্ষণ সম্ভবত ঘোষিত হয়ে যাবে মার্চের প্রথম সপ্তাহেই। তার আগে বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি ও দলীয় পদাধিকারীদের নিয়ে এটাই সম্ভবত ছিল তৃণমূলের শেষ ‘কোর কমিটি’ বৈঠক। সেই মঞ্চে ভাষণ দিতে গিয়ে এ দিন নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে তথা বিজেপির বিরুদ্ধে চড়া সুরে আক্রমণ শানালেন তৃণমূল চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাষণের প্রায় গোড়ার দিকেই আনলেন পুলওয়ামা প্রসঙ্গ। এই ভয়াবহ জঙ্গিহানার জন্য গোটা দেশই যে শোকসন্তপ্ত সে কথা আরও এক বার উচ্চারণ করলেন, শহিদদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানালেন, তার পরেই চলে গেলেন তীব্র আক্রমণে।

‘‘কেন ঘটনা ঘটেছিল? মোদীবাবু কোথায় ছিলেন আপনি?’’— প্রশ্ন তুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলে তিনি বললেন, ‘‘ঘটনা যে ঘটবে আপনি তো আগে জানতেন। আপনার কাছে তো খবর ছিল। সরকারের কাছে তো গোয়েন্দা তথ্য ছিল।’’ তার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘‘তা হলে কেন সে দিন জওয়ানদের এয়ারলিফ্ট না করে, নাকা চেকিং না করে, রাস্তাগুলো স্যানিটাইজ না করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন? রাজনীতি করবেন বলে? ভোট আসছে?’’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা সম্বন্ধে কতটা জানেন?

কলকাতায় দলের কোর কমিটি বৈঠকের মঞ্চে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —নিজস্ব চিত্র।

প্রশাসনিক ভাবে তো বটেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা এই প্রশ্ন রাজনৈতিক ভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূলের কোর কমিটি বৈঠকের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্নটা এ দিন তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু দিনের শেষ তিনি শুধুমাত্র তৃণমূলনেত্রী নন, তিনি দেশের একটি বৃহৎ রাজ্যের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী। আর যাঁর দিকে এই গুরুতর প্রশ্নচিহ্নটা তিনি ছুড়ে দিয়েছেন, তিনি শুধুমাত্র বিজেপি নেতা নন, দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা এই প্রশ্ন এবং তাঁর ইঙ্গিত নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

আরও পড়ুন: ‘শাহিস্নান আর দলিতদের পা ধুয়েই সব পাপ দূর হবে তো’? মোদীকে তোপ মায়াবতীর

এত বড় হামলা জঙ্গিরা কী উপায়ে সফল ভাবে চালাতে পারল, সরকারের গাফিলতি ছিল কি না, জঙ্গিহানা হতে পারে বলে সরকারের কাছে আগাম সতর্কবার্তা ছিল কি না— সে নিয়ে চর্চা এই প্রথম শুরু হল, এমন নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো বটেই, বিরোধী শিবিরে থাকা অন্যান্য দলও বিষয়টি নিয়ে এর আগে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এ দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অনেক স্পষ্ট ভঙ্গিতে বিজেপির দিকে তথা মোদীর দিকে অভিযোগের আঙুলটা তুলেছেন। রাজনৈতিক লাভের স্বার্থেই জঙ্গিহানাটা ঘটতে দেওয়া হল বলে ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

আরও পড়ুন: ‘স্বামীর ইউনিফর্ম-স্টার পরেই স্যালুট জানাব’! সেনায় যোগ দেওয়ার আগে বললেন নিহত মেজরের স্ত্রী

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি হয় না, হবে না। কিছু দিনের জন্য ভুল বুঝিয়ে রাখতে পারবেন।’’ ভোটের স্বার্থেই যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চলছে বলে এ দিন ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘শ্যাডো ওয়ার? সার্জিক্যাল স্ট্রাইক? যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা?’’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, ‘‘খুব বড় নেতা! দেশে চলছে যুদ্ধ! যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে, দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে শান্তি প্রাইজ নিচ্ছেন, যেন মনে হচ্ছে ওরে বাবারে একেবারে মানবতার দূত!’’

জওয়ানদের রক্ত নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে যে দিন তুললেন মমতা, সে দিনই দিল্লিতে শহিদদের সম্মানে ‘যুদ্ধ স্মারক’ (ওয়ার মেমোরিয়াল) উদ্বোধন করছেন মোদী। অবশ্য সে প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন করেননি। এই ‘যুদ্ধ স্মারক’ উদ্বোধনকে কটাক্ষ করার জন্যই বেছে বেছে এই দিনটায় পুলওয়ামা প্রসঙ্গে মোদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন, এমন কোনও ইঙ্গিতও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেননি। 

কলকাতায় যে দিন দুপুরে এই আক্রমণ শানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সে দিন রাতেই তিনি দিল্লি পৌঁছচ্ছেন। মঙ্গলবার দিল্লি প্রেস ক্লাবে একটি বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। বুধবার সংসদের অ্যানেক্স ভবনে বিরোধী শিবিরের বৈঠক হবে। সেই সফরে রওনা হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পুলওয়ামা কাণ্ড নিয়ে মোদীর বিরুদ্ধে যে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আগামী কয়েক দিনে সে প্রশ্ন নিয়ে গোটা দেশেই জোর চর্চা শুরু হতে চলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

(দেশজোড়া ঘটনার বাছাই করা সেরাবাংলা খবরপেতে পড়ুন আমাদেরদেশবিভাগ।)