গঙ্গার কলুষেই খুব দ্রুত গজিয়ে উঠছে, ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের জীবন বাঁচানোর হাতিয়ারকে ভোঁতা করে দেওয়ার অস্ত্র! ‘কলুষনাশিনী’ গঙ্গার দৌলতে সেই সময়টা আর বেশি দূরে নেই, যে দিন কোনও অ্যান্টিবায়োটিকই কাজে লাগবে না আমাদের। অকেজো হয়ে যাবে ২০ থেকে ২৫টি গ্রুপের অন্তত ২৫০ থেকে ২৭৫টি অ্যান্টিবায়োটিক। যেগুলি রুখতে পারে ব্যাকটিরিয়ার হানাদারি। তাতে আমাদের নানা রকমের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। বাড়বে নতুন নতুন সংক্রামক রোগের সম্ভাবনাও। শুধু পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার পরেই গঙ্গার শরীরে ঢুকছে রোজ ২০০ কোটি ৭০ লক্ষ লিটারেরও বেশি বর্জ্য-নিকাশি জল! যা কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আড়াই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ গঙ্গার বুকের গভীরে গজিয়ে ওঠা সেই ঘরশত্রু বিভীষণরা আদতে ভয়ঙ্কর ব্যাকটিরিয়া। কয়েকশো প্রজাতির। যারা সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধকেই অকেজো করে দিতে পারে। অনায়াসে। বাড়তি উদ্বেগের কারণ, সব রকমের অ্যান্টিবায়োটিক-রোধী (অ্যান্টিবায়োটিক্স-রেজিস্ট্যান্ট) সেই ব্যাকটিরিয়ার প্রজাতিগুলি গজিয়ে উঠছে খুব দ্রুত হারে। তারা গঙ্গার প্রবাহে ছড়িয়ে পড়ছে আরও দ্রুত হারে। মিশছে বাতাসে, আশপাশের পরিবেশে।

কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইচইউ) হালের একটি গবেষণা এ কথা জানিয়েছে। গবেষণাপত্রটি ছাপা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘এনভায়রনমেন্টাল পলিউশান’-এ। গবেষকদলের প্রধান, বিএইচইউয়ের সেন্টার অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন বটানির মলিকিউলার ইকোলজি ল্যাবরেটরির অধ্যাপক সুরেশ কুমার দুবে।

বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ সদস্যের গবেষকদল। মধ্যমণি অধ্যাপক সুরেশ কুমার দুবে

আরও পড়ুন- ইতালীয় মহিলাকে নিয়ে ভিন গ্রহে প্রাণ খুঁজবেন পুরুলিয়ার সুজন​

সুরেশ ‘আনন্দবাজার ডিজিটাল’কে জানিয়েছেন, গঙ্গার ৫টি ঘাটের জল ও পলি মাটি পরীক্ষা করে ওই ঘরশত্রু বিভীষণদের হদিশ মিলেছে। সেই ঘাটগুলি হল- অশি, ভাদায়িনি, হরিশচন্দ্র, ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদ ও রাজঘাট। তাঁরা দেখেছেন, গঙ্গার জলে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক-রোধী নানা রকমের ব্যাকটিরিয়া। যাদের শরীরে রয়েছে ভয়ঙ্কর কয়েকটি জিন। ওই জিনগুলিই গঙ্গার জলে থাকা ব্যাকটিরিয়াকে খুব দ্রুত হারে বদলে দিচ্ছে। তাদের করে তুলছে সব রকমের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী। তাদের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। তারা ১ থেকে ২ হচ্ছে। তার পর, ২ থেকে ৪। সঙ্গে সঙ্গে ৪ থেকে সংখ্যায় বেড়ে  ৮ হচ্ছে। হচ্ছে ৮ থেকে ১৬টি। এই ভাবে কয়েক লহমার মধ্যে গঙ্গার জলে মিশে থাকা ব্যাকটিরিয়ার বংশবৃদ্ধি হচ্ছে।

ব্যাকটিরিয়ার ওই দ্রুত বংশবৃদ্ধির জন্য দায়ী কে?

ডিঅক্সি-রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা ডিএনএ। এমন কাণ্ড ঘটাচ্ছে তিন ধরনের ডিএনএ। ‘ট্রান্সপোসন’, ‘প্লাজমিড’ আর ‘ক্রোমোজোমাল’। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে ট্রান্সপোসনের। তার পরেই রয়েছে প্লাজমিক। ক্রোমোজোমাল ডিএনএ-র ভূমিকাটা তুলনায় কিছুটা কমই বলা যায়।

ওই ডিএনএ-রাই এক প্রজাতির ব্যাকটিরিয়া থেকে খুব দ্রুত অন্যান্য প্রজাতির ব্যাকটিরিয়ার শরীরে ঢুকে পড়ে তাদেরও করে তুলছে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী।

কী ভাবে দ্রুত বংশবৃদ্ধি হয় ব্যাকটিরিয়ার? দেখুন ভিডিয়ো

গঙ্গায় ওই সব ভয়ঙ্কর ব্যাকটিরিয়া​র জন্ম হচ্ছে কেন?

অন্যতম মূল গবেষক সুরেশ ‘আনন্দবাজার ডিজিটাল’কে বলেছেন, ‘‘আমরা আকছার যে সব অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করি, মানুষ ও পশুদের শরীরে সেগুলি ঢুকে কাজ করার পর তাদের কিছু অবশেষ দেহেই থেকে যায়। সেই অবশেষই ঘর-গেরস্থালির বর্জ্য, আবর্জনা, ওষুধ তৈরির কারখানা, হাসপাতাল, পোলট্রি শিল্পের বর্জ্য থেকে এসে মিশছে গঙ্গার জলে। নালা, নর্দমা, নোংরা, মজে যাওয়া খালের মাধ্যমে। যথাযথ পরিশোধন করে শিল্প-বর্জ্য গঙ্গায় না ফেলার ফলে। গঙ্গা পরিশোধনের কাজ প্রত্যাশিত গতি ও গুণমান বজায় না রাখতে পারার ফলে।’’

আতঙ্কের ছবিটা কতটা ভয়াবহ?

কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০০ মিলিলিটার গঙ্গার জলে কলিফর্ম ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা ৫০০টির বেশি হলেই তা খুব চিন্তার বিষয়। ২০১৬ সালের কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, গঙ্গার যে ৪৫টি পয়েন্টকে সবচেয়ে দূষিত বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে ৪১টিতেই গঙ্গার জলে মিশে থাকা কলিফর্ম ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। আমাদের হাওড়া থেকে শিবপুর পর্যন্ত গঙ্গার জলে মিশে থাকা কলিফর্ম ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সেই মানদণ্ডের ৩০০ গুণ!

গঙ্গায় গরল আসার একটি উৎস

গঙ্গায় গরল মিশছে কী ভাবে?

কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিম হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে বেরিয়ে উত্তরপ্রদেশের কানপুরে এসেই উল্লেখযোগ্য ভাবে বিষিয়ে যেতে শুরু করে গঙ্গা। কানপুরে পারমিয়া খাল যখন এসে মেশে, তখন গঙ্গায় জমা হয় দিনে ১০০ কোটি লিটার বর্জ্য-নিকাশি জল (ওয়েস্টওয়েটার)। কানপুর-লাগোয়া পান্ডু নদী মেশার পর তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় দিনে ১০০ কোটি লিটার। প্রয়াগরাজ (পূর্বতন ইলাহাবাদ) পেরনোর পর যার পরিমাণ হঠাৎ করে বেড়ে গিয়ে হয় দিনে ৩০০ কোটি লিটার। ওই সময় বারাণসীর বরুণা খাল দিয়েও গঙ্গায় এসে মেশে বর্জ্য-নিকাশি জল। তার পর বক্সার থেকে পটনা পেরিয়ে মুঙ্গের হয়ে ভাগলপুরের দিকে যত এগোয় গঙ্গা, ততই তার জল আরও বেশি করে ভরে উঠতে শুরু করে বিষে। বর্জ্য-নিকাশি জলে। শুধু ভাগলপুরই গঙ্গার বুকে ঢেলে দেয় দিনে ১৪ কোটি ১০ লক্ষ লিটার বর্জ্য-নিকাশি জল। ফলে, পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার ঠিক আগে গঙ্গায় বর্জ্য-নিকাশি জলের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় দিনে ৪০০ কোটি লিটার। সবচেয়ে দূষিত বক্সার-ভাগলপুরের মধ্যে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা।

পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেই গঙ্গার ডান আর বাঁ পাড়ে পড়ে হুগলি, শ্রীরামপুর, কল্যাণী, হালিশহর, নৈহাটি, ভাটপাড়া আর ব্যারাকপুরের মতো শিল্পাঞ্চল। যে এলাকাগুলি গঙ্গার বুকে গরল ঢালার জন্য তৈরি হয়েই থাকে সব সময়। এর পরেও গঙ্গাকে পেরোতে হয় রিষড়া, বালি, টিটাগড়, খড়দহ, কামারহাটি, বরানগর। আরও বিষে ভরে উঠতে থাকে কলুষনাশিনী গঙ্গা।

তার পরেই হাওড়া ও কলকাতা। শুধু হাওড়ার নাজিরগঞ্জ খালই গঙ্গায় ঢালে দিনে ৩২ কোটি ৬০ লক্ষ লিটার বর্জ্য-নিকাশি জল। আর কলকাতার সার্কুলার ক্যানাল ঢালে দিনে ৩২ কোটি লিটার গরল। কলকাতারই দইঘাট আরও বেশি গরল ঢালে গঙ্গার বুকে। দিনে ৩৮ কোটি লিটার বর্জ্য-নিকাশি জল। ফলে, ওই পর্বে গঙ্গায় দিনে বর্জ্য-নিকাশি জলের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০০ কোটি লিটারে। গঙ্গার বুকে গরল ঢালে, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই এমন বড় বড় খালের সংখ্যা ৫৭টি। ছোট ও মাঝারি খাল রয়েছে ৩০০-রও বেশি।

না, তার পরেও রেহাই পায় না গঙ্গা। উৎস থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দু’পাড়ের অন্তত ৪০ কোটি মানুষের ‘দুর্গতিনাশিনী’র কপালে আরও দুঃখ জমা হয়ে থাকে উলুবেড়িয়া আর খাস কলকাতা শহরের সৌজন্যে। এখানে পৌঁছনোর পর দিনে ৬০০ কোটি ৭০ লক্ষ লিটার গরল জমা হয় গঙ্গার বুকে।

গঙ্গায় মেশা বর্জ্য, আবর্জনা কত রকমের হয়?

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের কথায়, ‘‘যাবতীয় বর্জ্যই হয় দু’ধরনের। কঠিন ও তরল। কঠিন বর্জ্যের উৎস হয় ৬টি। ঘরবাড়ি, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক, ওষুধ বা ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক, নির্মাণশিল্প বা ঘরবাড়ি ভাঙার পর টুকরোটাকরা। এ ছাড়াও রয়েছে হ্যাজার্ডাস বর্জ্য। যা পরিবেশের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। যাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তরল বর্জ্যগুলি নালা-নর্দমা, নোংরা খাল দিয়ে এসে গঙ্গার জলে মেশে। তারই সঙ্গে গঙ্গায় আসে কঠিন ও তরল পদার্থে মেশানো মিশ্র বর্জ্য বা মিক্সড ওয়েস্ট।’’

যে ভাবে শোষণ চলছে গঙ্গার!

ঘর-গেরস্থালি ও শিল্প-বর্জ্যের মাধ্যমেই আমাদের রোজকার জীবনে ব্যবহার করা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের অবশেষগুলি চলে আসে গঙ্গায়। দ্রুত মিশে যায় গঙ্গার জলে। আর তারাই গঙ্গার জলে থাকা ব্যাকটিরিয়াকে শিখিয়ে দিতে শুরু করে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধকে রোখার, জব্দ করার মন্ত্র।

অ্যান্টিবায়োটিক রোখার মন্ত্রে কী ভাবে দীক্ষা নেয় গঙ্গার ব্যাকটেরিয়া?

কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট মাইক্রোবায়োলজিস্ট ভাস্কর নারায়ণ চৌধুরী জানাচ্ছেন, দীক্ষার মন্ত্রটি প্রাথমিক ভাবে নেয় গঙ্গার জলে থাকা ব্যাকটিরিয়ার শরীরে থাকা কয়েকটি জিন। তাদের সেই মন্ত্রটি শেখায় বর্জ্যের মাধ্যমে গঙ্গায় এসে মেশা আমাদের রোজকার জীবনে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধগুলির অবশেষ।

তার জন্য আমাদের দোষও কিছু কম নয়। আমরা দিনে ৪টি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কথা থাকলে দু’বার খাই, আর দু’বার খেতে ভুলে যাই। যে সময়ে বা যত দিন অন্তর সেই সব অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কথা, অনেক সময়েই তা আমরা খাই না। শরীরে হানাদার ব্যাকটিরিয়ার পুরোপুরি নির্মূল করতে যত দিন পর্যন্ত সেই সব ওষুধ খেয়ে যাওয়ার দরকার, সেই কোর্সও আমরা মেনে চলি না। আবার সামান্য সর্দি-কাশি হলেই আমরা গপাগপ খেয়ে ফেলি অ্যান্টিবায়োটিক। যেটাও আদৌ কাম্য নয়।

আরও পড়ুন- ভয়ঙ্কর সুনামি আসছে! সূর্যের মনের কথা জানিয়ে চমক রানাঘাটের কন্যার​

ভাস্কর জানাচ্ছেন, অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধগুলির সেই সব অবশেষ শুধুই যে আমাদের মল-মূত্র, আবর্জনার মাধ্যমে গঙ্গায় পৌঁছয়, তা কিন্তু নয়। প্রয়োজনীয় গবাদি পশুর দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি ও তাদের মাংস, ডিমের দ্রুত হারে উৎপাদন বাড়ানোর জন্যেও আমরা আকছার ব্যবহার করি নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। ফলে, সেগুলির অবশেষও থেকে যায় ওই সব পশুর শরীরে। গবাদি পশুর মৃতদেহ গঙ্গায় ফেলে দেওয়ার চল তো আজকের নয়। আর সেটা খুব একটা কমেওনি এখনও পর্যন্ত। তার ফলে, পশুর শরীরে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধগুলির অবশেষও এসে মেশে গঙ্গার জলে। তারাও গঙ্গায় থাকা ব্যাকটিরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার মন্ত্রটা শিখিয়ে দেয়।

(বাঁ দিক থেকে) মাক্রোবায়োলজিস্ট ভাস্কর নারায়ণ চৌধুরী, পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত ও নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র

মন্ত্রটা শেখার জন্য গঙ্গার ব্যাকটেরিয়া কী করে?

ভাস্কর বলছেন, ‘‘তাদের শরীরে থাকা কয়েকটি ভয়ঙ্কর জিনই এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই জিনে থাকা মূলত দু’ধরনের ডিএনএ- ট্রান্সপোসন ও প্লাজমিড গঙ্গার জলে থাকা একই প্রজাতির ব্যাকটিরিয়ার শরীরে যেমন ঢুকে পড়ে, তেমনই ঢুকে পড়ে অন্যান্য প্রজাতির ব্যাকটিরিয়ার শরীরেও। তাদের দেয় দ্রুত বদলে যাওয়ার, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার মন্ত্র।’’

মন্ত্রটাকে খুব দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শুরু হয় ব্যাকটিরিয়ার অত্যন্ত দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি। যা আমাদের আর গবাদি পশুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। আমাদের আশপাশের পরিবেশে।

অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী কোন কোন ব্যাকটিরিয়া রয়েছে গঙ্গায়?

মূল গবেষক অধ্যাপক সুরেশ দুবে জানাচ্ছেন, ‘বিটা-ল্যাকটাম’ ব্যাকটিরিয়া। মাল্টিড্রাগ বা ইফ্লাক্স ব্যাকটিরিয়া। এলফামাইসিন গোত্রের ব্যাকটিরিয়াও। এরাই মূলত প্রচুর পরিমাণে রয়েছে গঙ্গার জলে। এগুলি মোটামুটি সব রকমের অ্যান্টিবায়োটিককেই অকেজো করে দিতে পারে। এর পাশাপাশি, আমরা আকছার যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলি খেয়ে থাকি বা গবাদি পশুর উপর প্রয়োগ করে থাকি, সেগুলিকে ভোঁতা বা নিষ্কর্মা করে দেওয়ার মতো বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটিরিয়ারও হদিশ গঙ্গার জলে মিলেছে প্রচুর পরিমাণে।

উদ্বেগের আরও কিছু বাকি রয়েছে। শুধুই আমাদের রোজকার জীবনে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের অবশেষ গঙ্গায় মিশে গিয়ে সেখানকার ব্যাকটিরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের মন্ত্র শেখাচ্ছে, তাই নয়। গঙ্গায় গিয়ে মিশছে আমাদের শরীরে থাকা বিশেষ প্রয়োজনীয় কয়েকটি ধাতব মৌল বা যৌগও। তাদের মধ্যে রয়েছে, রুপো, তামা, লোহা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক ও জিঙ্ক। আমাদের শরীরে এই সব পদার্থের খুব বড় ভূমিকা রয়েছে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রোগ প্রতিরোধের জন্যেও।

গবেষকরা জানিয়েছেন, ব্যাকটিরিয়ার শরীরে কয়েকটি জিন রয়েছে, যেগুলি ওই পদার্থগুলিকে কাজ করতে দেয় না।

সুরেশের কথায়, ‘‘আমাদের গবেষণা দেখিয়েছে, গঙ্গায় গিয়ে মেশা ওই সব পদার্থের অবশেষ সেখানকার ব্যাকটিরিয়ার মধ্যে সেই জিনগুলিকে ঘুম ভাঙিয়ে জাগিয়ে তুলছে। ফলে, সেই সব ব্যাকটিরিয়া আমাদের পক্ষে হয়ে উঠছে আরও ক্ষতিকারক।’’

গঙ্গায় মেশা জৈব বর্জ্যও খুব কম কিছু নয়!

নালা, নর্দমা দিয়ে জলে মেশা জৈব বর্জ্যও বিষিয়ে দিচ্ছে গঙ্গাকে। উদ্বেগজনক ভাবে। সেগুলির মধ্যে রয়েছে নানা রকমের কীটনাশক, পতঙ্গনাশক ও ধাতব পদার্থ। স্নান, শৌচের মাধ্যমেই ওই সব জৈব বর্জ্য এসে মেশে গঙ্গার জলে। যা মাপার পদ্ধতির নাম বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি)। বিওডি-র পরিমাণ কম হওয়া মানে, জৈব বর্জ্য থেকে কম দূষিত হয়েছে গঙ্গার জল। গঙ্গার ৫৬টি জায়গার জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, ২১টিতেই ওই বিওডি-র পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি!

বিশিষ্ট পরিবেশ আন্দোলন-কর্মী সুভাষ দত্ত বলছেন, ‘‘উৎস থেকে মোহানা পর্যন্ত গঙ্গার দু’পাড়ে রয়েছে মোট ৮০টি বড় শহর। রয়েছে ১ হাজারেরও বেশি গ্রাম। এই সুদীর্ঘ পথে গঙ্গাকে বার বার আমরা শোষণ করছি। রোজ। প্রতিনিয়ত। গঙ্গা সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে কলকাতা পুরসভা এলাকায়, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায়, হাওড়া, হুগলিতে। কিছুটা নদিয়াতেও। শুধু কলকাতা পুরসভা এলাকার মানুষের ২০ শতাংশ রোজ প্রক্ষালন করেন গঙ্গায়।’’

২১১টি নর্দমা থেকে রোজ ১ কোটি ৭ লক্ষ ৫০ হাজার লিটার বর্জ্য মিশছে গঙ্গায়। তাদের মধ্যে শুধু ১৫১টি নালা, নর্দমা থেকেই রোজ গঙ্গায় মিশছে ১০ লক্ষ লিটারেরও বেশি বর্জ্য-নিকাশি জল। মিশছে রোজ ৫ হাজার ১০ লক্ষ লিটার শিল্প-বর্জ্য। দু’পাড়ে ৭৬৪টি কারখানা রোজ বর্জ্য ফেলছে ১০০ কিলোগ্রামেরও বেশি।

পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র বলছেন, ‘‘গঙ্গা যে কবে বিষমুক্ত হবে বা আদৌ তা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ, এখনও বারাণসীতে, গ্রামাঞ্চলে, মফস্‌সলে বৈদ্যুতিক চুল্লির পরিবর্তে কাঠের চুল্লিতে শবদাহের চল রয়েছে। এই আধপোরা মৃতদেহগুলির অবদানও থাকতে পারে গঙ্গার জলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটিরিয়া দ্রুত গজিয়ে তোলা আর তাদের আর দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে।’’

কেন গঙ্গার গায়ে বেশি ‘কালি’ লাগছে কলকাতায়?

সুভাষ জানাচ্ছেন, তার মোট ৫টি কারণ রয়েছে। মোহানার দিকে এসে কলকাতাই গঙ্গার পাড়ে সবচেয়ে বড় শহর। জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি এই শহরে। বৃহত্তম শিল্প-শহরও। প্রাচীনতমও বটে।

তাই কলুষনাশিনীর কপাল যে আজ বললে কালই ফিরবে, তেমনটা বলা যাচ্ছে না। আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বরং বাড়িয়ে দিচ্ছে কলুষনাশিনীর গর্ভে অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে ওঠা বিভীষণরা। যারা আমাদেরই মারফত শিখে নিচ্ছে আমাদের যাবতীয় রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে অকেজো, ভোঁতা করে দেওয়ার কায়দা-কৌশল! অসম্ভব দ্রুত হারে!

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

গ্রাফিক-তথ্য: বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ