• সুজয় চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

নিজের ছোড়া ‘বাণ’ থেকে আমাদের বাঁচায় সূর্যই! দেখালেন মেদিনীপুরের সঞ্চিতা

coronal mass ejection
সূর্য থেকে বেরিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর করোনাল মাস ইজেকশান। -ফাইল ছবি।

সূর্যেরও একটা ‘দরদী মন’ রয়েছে! যার হদিশ পেলেন মেদিনীপুর শহরের কন্যা সঞ্চিতা।

কখন যে সে ভয়ঙ্কর হামলা চালাবে আমাদের উপর তা কেউ জানে না। কিন্তু সেই রুদ্ররোষে আমরা যাতে একেবারে ধ্বংস না হয়ে যাই, তারও ব্যবস্থা করে সূর্যই। সেই ‘দরদ’ রয়েছে সূর্যের!

শক্তির প্রমাণ যে সংযমে, দুর্বলকে রক্ষায়!

সঞ্চিতাই বিশ্বে প্রথম দেখালেন, ঠিক যে সময়ে তার তেজ থাকে খুব বেশি, সেই সময়েই আমাদের বাঁচানোর জন্য আরও বেশি তৎপর হয়ে ওঠে এই সৌরমণ্ডলে আমাদের এক ও একমাত্র রক্ষাকর্তা। যাতে আমরা যুঝে উঠতে পারি, টিঁকে থাকতে পারি ভয়ঙ্কর সৌরঝড়ের আচমকা হামলার পরেও। এর ফলে সৌরঝড় থেকে সূর্য থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের ‘হামলা’ ঠেকাতে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগেভাগে নেওয়ার কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল।

সূর্য গবেষণায় পথ দেখানো এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায়। যার লিড অথর মোহনপুরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইসার কলকাতা)’-এর পিএইচডি-র ছাত্রী হবিবপুরের সঞ্চিতা পাল। সহযোগী গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন আইসার কলকাতার ছাত্র সৌম্যরঞ্জন দাস ও বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানী দিব্যেন্দু নন্দী।

যিনি মারেন, তিনিই রাখেন! দেখালেন সঞ্চিতা পাল (মাঝে), সৌম্যরঞ্জন দাস (বাঁ দিকে) ও অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দী।

সৌরঝড় আমাদের বায়ুমণ্ডলের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। তা অত্যন্ত ক্ষতিকারক মহাকাশের আবহাওয়ার পক্ষেও। যা তছনছ করে দিতে পারে পৃথিবীর যাবতীয় বিদ্যুত সংযোগ, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে আকাশে থাকা বিমানের। নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে বিভিন্ন কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকেও।

আরও পড়ুন- কোনও অদৃশ্য শক্তি আছে কি ব্রহ্মাণ্ডে? নোবেলজয়ীদের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ অক্সফোর্ডের বাঙালির

আরও পড়ুন- লকডাউনে নেই দূষণ, পরিষ্কার আকাশে বহু অচেনা তারার খোঁজ পেলেন বাঙালি বিজ্ঞানীরা​

সঞ্চিতারা দেখালেন, এই সবের হাত থেকে আমাদের কিছুটা বাঁচানোর ব্যবস্থা করে রেখে সূর্য যেন এটাই বোঝাতে চায়, ‘বাণ’ যেমন রয়েছে তার হাতে, তেমনই সে এই সৌরমণ্ডলের পরিত্রাতাও। ‘ভগবান’!

রাখে হরি তো মারে কে?

সূর্যের তেজ কমা-বাড়া করে তার সৌরচক্রের (সোলার সাইক্‌ল) উপর। যা সাধারণত, ১১ বছরের হয়। কখনও কখনও সৌরচক্রের আয়ু হয় ১৩/১৪ বছরও। সৌরচক্রেই সূর্যের পিঠে (ফোটোস্ফিয়ার) তৈরি হয় একের পর এক সৌরকলঙ্ক বা সানস্পট। সৌরকলঙ্কের সংখ্যা যত বাড়ে ততই শক্তি বাড়ে সৌরচক্রের। ৩০০টি বা তারও বেশি সৌরকলঙ্ক তৈরি হলে সেই সৌরচক্রটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত শক্তিশালী। যেমনটা হয়েছিল গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে। সংখ্যাটা ২০০ বা তার কম হলে সেই সৌরচক্রকে দুর্বল বলা হয়। আর সৌরকলঙ্কের সংখ্যা ২৫০ হলে সেই সৌরচক্রটি হয় মাঝারি শক্তির।

সঞ্চিতা ও তাঁর সহযোগী গবেষকরা এই প্রথম দেখিয়েছেন, যে সৌরচক্র যত বেশি শক্তিশালী, সেই চক্রে সৌরঝড়ের ভয়াবহতা কমানোর ব্যবস্থা ততটাই জোরালো করে রাখে সূর্য। যেন ‘রাখে হরি তো মারে কে?’

আরও পড়ুন- কখন হামলা বাড়াবে সূর্য, ১০ বছর আগেই তার পূর্বাভাসের পথ দেখালেন বাঙালি

আরও পড়ুন- ফের মিলল বাঙালির পূর্বাভাস, লকডাউনেও সৌরমণ্ডলে ঢুকল ভিন্ মুলুকের ‘রাজহাঁস’

সূর্যের পাঠানো হানাদাররা!

সৌরকলঙ্কের জন্মের পর পরই সূর্য থেকে বেরিয়ে আসে সৌরবায়ু (সোলার উইন্ড), সৌরঝড় (সোলার স্টর্ম), সৌর-ঝলক (সোলার ফ্লেয়ার), করোনাল মাস ইজেকশান (সিএমই)-এর মতো ভয়ঙ্কর হামলাবাজরা। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর করোনাল মাস ইজেকশান (সিএমই)। যা একেবারেই আচমকা হয়। এখনও পর্যন্ত সম্ভব হয়নি করোনাল মাস ইজেকশানের পূর্বাভাস। সূর্যের বায়ুমণ্ডল বা করোনা থেকে অসম্ভব গরম আধান-যুক্ত (আয়ন) কণাস্রোত নিয়ে একেবারে সাপের ফণার মতো উঠে আসে সিএমই। আর তার পর তা ধেয়ে যায় পৃথিবী-সহ সৌরমণ্ডলের সবক’টি গ্রহ, উপগ্রহের দিকে।

সিএমই আদতে খুব শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের একটি স্তম্ভের মতো। যার ‘পা’ থাকে সূর্যের পিঠ (ফোটোস্ফিয়ার বা সারফেস)-এ গজিয়ে ওঠা সানস্পটেই। সিএমই হলে সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ কণার বিষের ছোবল আমাদের বায়ুমণ্ডলের পক্ষে হয়ে ওঠে অত্যন্ত বিপজ্জনক। তা অত্যন্ত ক্ষতিকারক হয় মহাকাশের আবহাওয়ার পক্ষেও। যা তছনছ করে দিতে পারে পৃথিবীর যাবতীয় বিদ্যুত সংযোগ, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে আকাশে থাকা বিমানের। নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে বিভিন্ন কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকেও।

যত বেশি শক্তি সৌরচক্রের, ততই শক্তি ক্ষয় হয় সিএমই-র

গবেষকরা দেখেছেন, সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা সৌরবায়ুই শক্তি কমিয়ে দেয় করোনাল মাস ইজেকশানের। আর যে সৌরচক্র যত বেশি শক্তিশালী, সেই সৌরচক্রেই সিএমই-র শক্তি তত বেশি করে কমিয়ে দেয় সৌরবায়ু।

সেই ভয়ঙ্কর করোনাল মাস ইজেকশান (সিএমই)।

১৯৯৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা ২০ বছর ধরে দু’টি সৌরচক্র (২৩ এবং ২৪ নম্বর) খতিয়ে দেখেছেন গবেষকরা। দু’টি সৌরচক্রের মধ্যে এখনকারটির (২৪) চেয়ে আগেরটি (২৩) ছিল শক্তিশালী। দেখা গিয়েছে, সিএমই-র শক্তি কমানোর ব্যাপারে আগের সৌরচক্রে অনেক বেশি জোরালো ব্যবস্থা নিয়েছিল সূর্য।

বিষয়টি বোঝার জন্য দু’টি সৌরচক্রের মোট ৭২টি সিএমই দেখেছেন গবেষকরা। আগের সৌরচক্রের ৩৭টি। এখনকার ৩৫টি।

কী ভাবে শক্তি কমে যায় ভয়ঙ্কর সিএমই-র?

আইসার কলকাতার অধ্যাপক বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানী দিব্যেন্দু নন্দী জানাচ্ছেন, সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি পৃথিবী-সহ সবক’টি গ্রহ, উপগ্রহ তো বটেই, পৌঁছে যায় একেবারে সৌরমণ্ডলের পাঁচিল ‘হেলিওপজ’ পর্যন্ত। তার মধ্যে দিয়েই সৌরমণ্ডলের সর্বত্র ধেয়ে যায় সৌরবায়ু। সূর্য থেকে বেরিয়ে পৃথিবী-সহ সৌরমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার সময় সিএমই এসে পড়ে সেই সব চৌম্বক ক্ষেত্র ও বাহির পানে ছোটা সৌরবায়ুর মধ্যে। সে ক্ষেত্রে সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির মেরু সিএমই-র চৌম্বক ক্ষেত্রের ভিন্ন-মুখী হলেই শক্তি ক্ষয় হয়ে যায় সিএমই-র। তা যতটা ভয়াবহ হয়ে ওঠার কথা ছিল, আর ততটা ভয়ঙ্কর হয় না।

মূল গবেষক সঞ্চিতা বলছেন, ‘‘আমরা দু’টি সৌরচক্রের টানা ২০ বছরের ৭২টি সিএমই-র হিসাব নিয়ে দেখেছি, সূর্য থেকে বেরিয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার পর দু’টি সৌরচক্রে গড়ে সিএমই-র শক্তি ক্ষয় হয় ২৫ শতাংশ। তবে যেটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল, আমরাই প্রথম দেখিয়েছি, আগের সৌরচক্রে সিএমই-র শক্তি ক্ষয় অনেক বেশি হয়েছিল (২৮ শতাংশ), এখনকার সৌরচক্রের (২২ শতাংশ) চেয়ে।’’

পার্কার সোলার প্রোবই প্রমাণ করবে সঞ্চিতাদের কথা

নৈনিতালের ‘আর্যভট্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ অবজারভেশনাল সায়েন্সেস’-এর অধিকর্তা বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানী দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এটা অবশ্যই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। সিএমই-র শক্তি হ্রাসের ব্যাপারে সৌরবায়ু ও সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির যে ভূমিকা রয়েছে, তা আগেই জানা গিয়েছিল। সূর্যের খুব কাছে গিয়ে সম্প্রতি তা ধরাও পড়েছে নাসার ‘পার্কার সোলার প্রোবে’র চোখে। কিন্তু এই প্রথম জানা গেল, সেই শক্তি ক্ষয়ের পরিমাণ নির্ভর করে সৌরচক্রের শক্তির উপর। জানা গেল, যে সৌরচক্র যত বেশি শক্তিশালী, সেই চক্রে সিএমই-র শক্তি বেশি হ্রাস পায় সূর্য থেকে বেরিয়ে তা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার পর।’’

পার্কার সোলার প্রোব দু’টি সৌরচক্র পর্যবেক্ষণের সুযোগ পায়নি। মাত্র এক বছর হল সে গিয়েছে সৌর-মুলুকে। কিন্তু এই বছর থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন সৌরচক্র (২৫ নম্বর)। ফলে, এখনকার ও পরবর্তী, দু’টি সৌরচক্রই সূর্যের খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাবে এ বার পার্কার সোলার প্রোব।

দিব্যেন্দু বলছেন, “এতে ভালই হল। আমরা তাত্ত্বিক মডেল ও কম্পিউটার সিম্যুলেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছি, সৌরচক্র শক্তিশালী হলে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়া সিএমই-র শক্তি ক্ষয় হয় বেশি। এ বার যদি একই ঘটনা ধরা পড়ে পার্কার সোলার প্রোবের চোখেও, তা হলে তা প্রমাণ করবে আমরাই ঠিক। ১০০ শতাংশ। আরও একটা বাড়তি লাভ হবে আমাদের। ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় শক্তি হ্রাস হয় সিএমই-র, নাসার মহাকাশযানের চোখে সেটাও ধরা পড়তে পারে। আর তা হলে সোনায় সোহাগা!’’

সমরাস্ত্রের বড়াই করে চলা শক্তিধর দেশগুলিকে কি সূর্য কিছু শিক্ষা দিল?

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: আইসার কলকাতা ও নাসা।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ ও তিয়াসা দাস।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন