রোমান সভ্যতায় মানুষের মল দিয়ে তৈরি হত ওষুধ। প্রাচীন পুঁথিতেও এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তা জানা ছিল শুধু পুঁথিগত ভাবেই। বাস্তবে এত দিন তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বার সেই প্রমাণ খুঁজে বার করলেন গবেষকেরা।
প্রাচীন ভারতে যেমন চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী চরক, সুশ্রুতেরা ছিলেন, তেমনই প্রাচীন রোমান সভ্যতায় ছিলেন গ্যালেন। ১২৯ সালে তৎকালীন রোমান সভ্যতার পেরগামনে (বর্তমানে শহরটি নাম বারগমা, যা তুরস্কে অবস্থিত) এক গ্রিক পরিবারে জন্ম হয়েছিল ক্লডিয়াস গ্যালেনের। পরবর্তী সময়ে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন এবং তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। তিন জন রোমান সম্রাটের ব্যক্তিগত চিকিৎসকও ছিলেন তিনি।
সেই গ্যালেনের চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন পুঁথিতে মানুষের মল দিয়ে ওষুধ তৈরির বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে ওই প্রাচীন কালে তা কী ভাবে প্রস্তুত করা হত, বা ওই বর্ণনার আদৌ কোনও সত্যতা রয়েছে কি না— তা নিয়ে পুঁথিগত তথ্যের বাইরে এত দিন কিছুই জানা যায়নি। সম্প্রতি তুরস্কের একদল গবেষক এমন কিছু খুঁজে পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয় সত্যিই প্রাচীন রোমান সভ্যতায় মানুষের মল দিয়ে ওষুধ তৈরি হত।
বারগমা শহরের জাদুঘরে এখনও প্রাচীন রোমান সভ্যতার বিভিন্ন সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। রাখা আছে কাচের বোতলও, যা রোমান সভ্যতায় সেই সময়ে ব্যবহার হত। কয়েক বছর আগে ওই কাচের বোতলগুলি নিয়ে একটি বই লেখা শুরু করেছিলেন তুরস্কের সিভাস কামহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক সেনকার আতিলা। ‘গ্লাস অবজেক্ট্স ফ্রম বারগমা মিউজ়িয়াম’ নামে ওই বইটি লেখার তাগিদেই কাচের বোতলগুলি নাড়াচাড়া করছিলেন তিনি। সেই সময়েই কিছু কাচের বোতলের নীচে অবশিষ্টাংশের চিহ্ন খুঁজে পান আতিলা। সেখান থেকেই এই গবেষণা শুরু।
আতিলা এবং তাঁর সঙ্গীরা সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কাচের পাত্রে কিছু অবশিষ্টাংশের সন্ধান পান। সেগুলি বিশ্লেষণ করার পরে অবশ্য মাত্র একটিতেই মানুষের মলের নমুনা মিলেছে। সেটি ছিল আনুমানিক দ্বিতীয় শতাব্দীর। ওই শতাব্দীতেই (২১৬ সালে) মৃত্যু হয়েছিল গ্যালেনের।
আরও পড়ুন:
গত মাসে ‘জার্নাল অফ আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স: রিপোর্ট্স’-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। মাটির ঢাকনা দেওয়া ওই কাচের পাত্রটিতে বাদামি রঙের কিছু পদার্থ খুঁজে পান আতিলারা। ওই নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেটির মধ্যে মানুষের মল, জলপাইয়ের তেল এবং প্রচুর পরিমাণে গাছ-গাছালির মিশ্রণ ছিল।
যেহেতু গ্যালেন আগেই মানুষের মল দিয়ে ওষুধ তৈরির বর্ণনা দিয়েছেন পুঁথিতে, তাই গবেষকদলও প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন, এই নমুনা ওষুধ তৈরির জন্যই ব্যবহার হত। তা ছাড়া এই কাচের পাত্রের নমুনা এবং গ্যালেনের চিকিৎসাশাস্ত্রের অনুশীলনও প্রায় সমসাময়িক। ফলে আতিলাদের কাছে এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ওই মলের মিশ্রণকে যে কাচের পাত্রে রাখা ছিল, সেটি লম্বাটে ধরনের। সাধারণত প্রাচীন রোমান সভ্যতায় সুগন্ধি রাখার জন্য এই ধরনের পাত্রের ব্যবহারের চল ছিল। আতিলাদের অনুমান, সম্ভবত ওই সুগন্ধির বোতলকেই পরে ওষুধের বোতল হিসাবে ব্যবহার করা হত। মলের দুর্গন্ধ ঠেকানোর জন্য সুগন্ধির বোতল ব্যবহার করা হত বলে তাঁর অনুমান। আর বিভিন্ন গাছ-গাছালি ব্যবহার করা হত মূলত সেগুলির অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যের জন্য।
তবে ওই নমুনা দিয়ে কী ধরনের ওষুধ তৈরি করা হত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রাচীন পুঁথি অনুযায়ী, মানুষ এবং বিভিন্ন প্রাণীর মলকে শরীরের কোথাও জ্বালা বা ফুলে যাওয়া, সংক্রমণ থেকে শুরু করে প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যাতেও ওষুধ হিসাবে ব্যবহার হত। যদিও এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে মল দিয়ে তৈরি ওষুধের চল এখনও রয়েছে। ‘সিএনএন’ জানাচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্কদের কোলনে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রুখতে মল দিয়ে তৈরি দু’টি ওষুধে অনুমোদন দিয়েছে আমেরিকার ওষুধ নিয়ামক সংস্থা ‘ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’।