মহাকাশে নতুন একটি কৃষ্ণগহ্বরের (ব্ল্যাক হোল) সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রকাণ্ড সেই গহ্বরের আচরণে তাঁরা স্তম্ভিত। আস্ত একটি নক্ষত্রকে ছিঁড়ে খেয়েছে ওই কৃষ্ণগহ্বর। তার পর থেকে ঢেঁকুর তুলেই চলেছে! প্রতি ঢেঁকুরের সঙ্গে উগরে দিচ্ছে রাশি রাশি পদার্থ। বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, সেগুলি আসলে কৃষ্ণগহ্বরের বুকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সেই নক্ষত্রেরই অবশিষ্টাংশ। এমন কাণ্ড এর আগে দেখা যায়নি।
মহাশূন্যের অন্যতম রহস্য কৃষ্ণগহ্বর। সূর্যের চেয়ে লক্ষ লক্ষ গুণ বড় বিপুল ঘনত্ববিশিষ্ট এই মহাজাগতিক বস্তুর সিংহভাগই এখনও বিজ্ঞানীদের অজানা। অধিক ঘনত্বের কারণে কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষ বল তীব্র। আলোর কণাও এর মধ্যে প্রবেশ করলে বেরোতে পারে না। মহাকাশে ঘুরতে ঘুরতে কৃষ্ণগহ্বরের ধারেকাছে কোনও পদার্থ পৌঁছোলেই বিপত্তি। সাতপাঁচ বিবেচনা না করেই গহ্বর তাকে গিলে ফেলে। এক বার কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে চলে গেলে আর নিস্তার নেই। ফিরে আসার আর কোনও উপায় নেই। প্রতি দিন কত শত নক্ষত্রকে এ ভাবে গিলে খাচ্ছে কত অচেনা গহ্বর! এ যেন বিজ্ঞানের এক না-মেলা অঙ্ক। মেলেনি বলেই তাকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের তাড়না এত বেশি। গবেষণার বহর এত বেশি।
আরও পড়ুন:
ব্ল্যাক হোল নক্ষত্রকে বাগে পেলে গিলে খায়, এ কথা কারও অজানা নয়। কিন্তু নতুন যে ব্ল্যাক হোলটিকে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, তার আচরণ সকলকে হতবাক করে দিয়েছে। নক্ষত্রকে গিলে ফেলার পর ঢেঁকুর তোলার কোনও নজির এর আগে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই কৃষ্ণগহ্বরটি পৃথিবী থেকে ৬৫.৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমাদের পৃথিবী যে ছায়াপথের মধ্যে রয়েছে, তার কেন্দ্রেও একটি কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে। নতুন আবিষ্কৃত কৃষ্ণগহ্বরটির ভর মিল্কিওয়ে ছায়াপথের সেই কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে তুলনীয়। এটি আমাদের সূর্যের চেয়ে ৫০ লক্ষ গুণ বড়। একসঙ্গে ৫০ লক্ষ সূর্য গিলে নিতে পারে এই কৃষ্ণগহ্বর। যে নক্ষত্রটি এই গহ্বরের সংস্পর্শে এসে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, তা আমাদের সূর্যের চেয়ে ১০ গুণ বড় ছিল।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, নক্ষত্রটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর অন্তত দু’বছর চুপ ছিল সেই কৃষ্ণগহ্বর। তার পর ঢেঁকুর তুলতে শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়া চলছে অন্তত ছ’বছর ধরে। বিচ্ছুরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পর ঢেঁকুর তোলা ধীরে ধীরে কমবে, এ বিষয়ে সকলেই প্রায় একমত। তবে সেই চূড়ান্ত পর্যায় কবে আসবে, এখনও এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, পৃথিবীর সমুদ্রে জোয়ারভাটার ঘটনার জন্য যে ধরনের মহাকর্ষ বলকে দায়ী করা হয়, কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যেই সেই একই বল ক্রিয়াশীল। সেই বল প্রয়োগ করেই কৃষ্ণগহ্বর মহাকাশ থেকে নক্ষত্র ‘শিকার’ করে। আমেরিকার আরিজ়োনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ কেট আলেকজ়ান্ডারের কথায়, ‘‘নক্ষত্র বা যে কোনও বস্তু যদি কৃষ্ণগহ্বরের কাছাকাছি যায়, তবে জোয়ার-ভাটার সমান শক্তিতে তা তছনছ হয়ে যাবে। ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ভেসে যাবে সেই বস্তু। এই প্রক্রিয়াকে ‘স্প্যাগেটিফিকেশন’ বলে। নক্ষত্রটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে তার কিছু গ্যাস কৃষ্ণগহ্বরের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার পর ধীরে ধীরে সেই কৃষ্ণগহ্বর নক্ষত্রটিকে গিলতে শুরু করে। আমরা আমাদের টেলিস্কোপ দিয়ে যে উজ্জ্বল রেডিয়ো রশ্মি দেখতে পাই, তা ওই নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকেই তৈরি।’’
বিজ্ঞানীরা বলেন, কৃষ্ণগহ্বরের কাছে একটি ‘লক্ষ্মণরেখা’ রয়েছে, যা পার করে গেলে বস্তু আর ফিরে আসতে পারে না। যে সমস্ত পদার্থ ওই ‘লক্ষ্মণরেখার’ ঠিক আগে পর্যন্ত গিয়ে থেমে যায়, তা থেকে রেডিয়ো রশ্মি নিঃসৃত হয়। কোনও শিশু খাবার চিবিয়ে ফেলার পর তা না-গিলে যদি থু থু করে বাইরে ফেলে দেয়, তখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, কৃষ্ণগহ্বরের ঢেঁকুরের সঙ্গে তার তুলনা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ সেন্ডেসের মতে, এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এখনও আসতে পারেননি কেউই।