হ্যাঁ, ইসরো যাবে এই সৌরমণ্ডলের সেই সুদূর প্রান্তে, যাকে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান বলে, ল্যাগরাঞ্জে-২ পয়েন্ট! হ্যাঁ, কয়েকশো কোটি বছর আগে ব্রহ্মাণ্ডের কোনও অজানা মুলুকে দু’টি নিউট্রন তারার মধ্যে ধুমধাড়াক্কা সংঘর্ষ হয়েছিল কি না, তার খবর নিতে এ বার পৃথিবীর কক্ষপথে দু’-দু’টি শক্তিশালী উপগ্রহ পাঠাবে ইসরো! আজ থেকে ২৪ বছর আগে যে কাজগুলির কথা ভাবতেই পারত না ইসরো।

শুরুটা হয়েছিল ভারতের গর্বের উপগ্রহ ‘অ্যাস্ট্রোস্যাট’ দিয়ে। ১৯৯৬-এ। ইসরো ঠিক করেছিল, নিজেদের আর শুধুই আবহাওয়া ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় বেঁধে রাখবে না। নজরদার উপগ্রহ বানানো ও পাঠানো ছাড়াও মহাকাশ গবেষণাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকবে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার।

যেতে হবে যে আরও অনেক দূরে...

সেই ২৪ বছর পর এখন আরও দৌড়তে, আরও দূরে যেতে পা এক রকম বাড়িয়েই ফেলেছে ইসরো! দূরে, বহু বহু দূরে। গভীর মহাকাশে। ব্রহ্মাণ্ডের অচেনা, অজানা গন্তব্যে। যে দূরত্বে পৌঁছনোর কথা আগে কখনও ভাবেইনি ইসরো। সেই রোমাঞ্চকর জার্নির ভাবনাটা এ বার সত্যি-সত্যিই ভাবা শুরু হয়েছে। যে পথ পরিক্রমা আর শুধুই প্রযুক্তি, প্রকৌশলের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না।

রানার, ছুটেছে রানার...

প্রথম ডেস্টিনেশন সূর্য। ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’-এর কথা আমরা আগে শুনেছি। হয়তো আগামী বছরের শেষেই রওনা হয়ে যাবে ইসরোর ‘সূর্যমুখী’ সেই মহাকাশযান। যা সুর্যের করোনা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা করবে। সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যে সেই সুদূর ল্যাগরাঞ্জে-১ পয়েন্টে গিয়ে।

কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। দেশের স্বপ্নের প্রকল্প ‘লাইগো-ইন্ডিয়া’র এক জন কর্মকর্তা হিসাবে বলব, আর দু’-তিন বছরের মধ্যেই ইসরো আরও দু’টি উপগ্রহকে পাঠাতে চলেছে পৃথিবীর কক্ষপথে। যে দু’টি উপগ্রহ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করবে পরস্পরের বিপরীত দিক থেকে। সেই উপগ্রহদু’টির কাজই হবে মহাকাশ থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের (গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ) ঘটনার আঁচ পাওয়া। কয়েকশো কোটি বছর আগে দু’টি নিউট্রন তারার মধ্যে সংঘর্ষের ফলে যে গামা রশ্মির সৃষ্টি হয়েছিল, তার উপরেই নজর রাখবে ওই দু’টি উপগ্রহ। ওই সময়ের মধ্যেই আশা করি, ভারতে চালু হয়ে যাবে লাইগো-ইন্ডিয়া প্রকল্প।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হদিশ পেতে ইসরো যাচ্ছে মহাকাশে?

যে কোনও মহাজাগতিক বস্তুর ভরের জন্যই বেঁকেচুরে যায় ব্রহ্মাণ্ডের স্থান ও কালের (স্পেস টাইম) জ্যামিতি। পুকুরের জলে যেমন ঢিল ফেললে তরঙ্গের সৃষ্টি হয় আর তা ছড়াতে ছড়াতে পুকুরের পাড়ে এসে মিলিয়ে যায়, তেমনই দু’টি নিউট্রন তারা বা দু’টি ব্ল্যাক হোল বা একটি নিউট্রন তারার সঙ্গে একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ হলে, সেই ধুন্ধুমার ঘটনার জেরে ব্রহ্মাণ্ডের স্থান ও কালের (স্পেস টাইম) জ্যামিতিও ভীষণ ভাবে বেঁকেচুরে যায়। টানটান বিছানায় ভারী ল‌োহার বল গড়িয়ে দিলে যেমন বিছানার মাঝখানটায় একটা গর্তের সৃষ্টি হয় আর তার আশপাশের বিছানার চেহারা বদলে যায়। ব্রহ্মাণ্ডের স্থান ও কাল বেঁকেচুরে গেলেই সৃষ্টি হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের। আইনস্টাইনই প্রথম বলেছিলেন ওই তরঙ্গের কথা। যা প্রথম পৃথিবীতে ধরা পড়েছিল ২০১৬-য়।

লক্ষ্য ‘দক্ষ’

মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে ওই তরঙ্গের হদিশ পাওয়ার কাজটা তুলনায় সহজ হয়। সেটার জন্যই ইসরো ওই দু’টি উপগ্রহকে পাঠাবে পৃথিবীর কক্ষপথে। সেগুলি রওনা হবে লাইগো-ইন্ডিয়া চালু হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। খুব দেরি হলেও আশা করি তা রওনা হবে ২০২৪ সালের মধ্যেই। প্রকল্পের নাম- ‘দক্ষ’। যা মূলত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (আইআইটি) মুম্বইয়ের অধ্যাপক বরুণ ভালেরাওয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ই বলা যায়।

আরও পড়ুন- চাঁদে এখন না নামলে পরে খুবই পস্তাতে হত ভারতকে!​

আরও পড়ুন- চাঁদই হতে চলেছে আগামী দিনের সেরা ল্যাবরেটরি!​

মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে ইসরোর ‘দক্ষ’ হবে একটি মাইলস্টোন। এখন অ্যাস্ট্রোস্যাট রয়েছে পৃথিবীর যতটা দূরের কক্ষপথে, প্রায় সেখানেই থাকবে ‘দক্ষ’-এর দু’টি উপগ্রহ। প্রতিটি উপগ্রহের ওজন হবে বড়জোর ১০০ থেকে ২০০ কিলোগ্রাম। ২০১৭-য় দু’টি নিউট্রন তারার মধ্যে সংঘর্ষের জন্য সৃষ্টি হওয়া মহাকর্ষীয় বলের ‘ছাপ’ ধরা পড়েছিল অ্যাস্ট্রোস্যাটে। কিন্তু সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি, ঘটনাটি পৃথিবীর ছায়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল বলে। সেই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্যই এ বার ‘দক্ষ’ প্রকল্পে পাঠানো হচ্ছে দু’টি উপগ্রহ। আর সেগুলিকে পরস্পরের বিপরীতে পৃথিবী প্রদক্ষিণের কথা ভাবা হয়েছে। সেগুলিকে হয়তো ‘পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যাল (পিএসএলভি)’ রকেটে চাপিয়ে ইসরো পাঠাবে মহাকাশে। তবে সেটি সরাসরি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হদিশ পাবে না। দু’টি নিউট্রন তারার মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার ফলে যে গামা রশ্মি বেরিয়ে আসে, সেটাই ধরা পড়বে ওই উপগ্রহগুলির বিশেষ যন্ত্রে।

ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান: কী ভাবে চাঁদে, দেখুন ভিডিয়ো

সিএমবি ভারত

আসছে আরও একটি বড় প্রকল্প ‘সিএমবি (কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড) ভারত’। আমিই এই প্রকল্পের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর। টেলিভিশনের সম্প্রচার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে স্ক্রিনটাকে যে ভাবে ঝিরঝির করতে দেখেন, তার মধ্যেই মিশে রয়েছে সিএমবি। প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহা-বিস্ফোরণের পর যার সৃষ্টি হয়েছিল। এক-এর পর ৩৫টি শূন্য বসালে যে সংখ্যাটা হয়, বিগ ব্যাংয়ের পর খুব সামান্য সেই সময়টুকুর মধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল ‘কসমিক গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড’। ওই সিএমবির মধ্যেই মিশে রয়েছে ব্রহ্মাণ্ডের জন্মলগ্নের একটি বিশেষ সিগন্যাল। সেটা হল, কসমিক গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড। যখন ব্রহ্মাণ্ডের মূল তিনটি বল স্ট্রং ফোর্স বা গুরু বল, উইক ফোর্স বা লঘু বল ও ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফোর্স বা তড়িৎ-চুম্বকীয় বল যে এক সময় একত্রিত ছিল, তার প্রমাণ মিলবে ওই কসমিক গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই।

‘সিএমবি-ভারত’-এর মডেল

বিগ ব্যাংয়ের পর সেই উৎসে যে অবস্থাটা হয় নদীর। পরে নদী তার গতিপথে যেমন বিভিন্ন শাখা নদীতে ভেঙে যায়, তার গতিপথ বদলায়, তেমনই ওই তিনটি বল পরে আলাদা হয়ে গিয়েছে বলেই কণাপদার্থবিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশের ধারণা।

আরও পড়ুন- চার বছরের মধ্যেই চাঁদের পাড়ায় ‘বাড়ি’ বানাচ্ছে নাসা!​ 

আরও পড়ুন- সাড়ে ৫৬ মিনিট আগের সিদ্ধান্তেই বাজিমাত! বিশ্বে নজির গড়ল ইসরো

‘সিএমবি-ভারত’-এর শরীরে কোথায় কী থাকবে

‘সিএমবি-ভারত’-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হবে সেই সিগন্যালটির হদিশ পাওয়া। যা পাওয়া গেলে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরে পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি অজানা জগৎ পুরোপুরি খুলে যাবে। জানা যাবে নতুন নতুন কণা ও কণিকাদের অস্তিত্ব।

জিএসএনভি-মার্ক-৩ রকেটেই পাঠানো হবে ‘সিএমবি-ভারত’

‘সিএমবি-ভারত’ পাঠানো হবে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে আরও দূরের সেই ল্যাগরাঞ্জে-২ পয়েন্টে। যা পাঠানো হবে ইসরোর হাতে থাকে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘জিএসএলভি-মার্ক-৩’ রকেটে চাপিয়ে। ওজনে যা হবে ২ টন। আশা করি, ২০৩০/’৩৫ সালের মধ্যেই ইসরো মহাকাশে পাঠাতে পারবে ‘সিএমবি-ভারত’। বিশাল খরচের প্রকল্প বলে আমরা এ ব্যাপারে নাসা, ইসার বিশেষজ্ঞদের মতো বিশ্বের বড় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলিকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রকল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছি ইসরোকে।

লেখক পুণের ‘ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এর সিনিয়র প্রফেসর ও ‘লাইগো-ইন্ডিয়া’র মুখপাত্র

টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন: সুজয় চক্রবর্তী

ছবি সৌজন্যে: ইসরো ও অধ্যাপক তরুণ সৌরদীপ

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: ইসরো