এ বার কি তা হলে বলতে পারা যাবে ‘ভিনগ্রহীদের আলো’ আসছে ঠিক কোথা থেকে? ব্রহ্মাণ্ডে প্রায় অনবরতই সেই আলো জ্বলছে, নিভছে আমাদের চেয়ে কতটা দূরে, এ বার কি তা জানা যাবে? তেমন সম্ভাবনাই জোরালো হয়ে উঠল একটি সাম্প্রতিক আবিষ্কারে। যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বাঙালির নাম। আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শমী চট্টোপাধ্যায়। রয়েছেন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অনাবাসী ভারতীয় শ্রীহর্ষ তেন্ডুলকরও।

‘ভিনগ্রহীদের আলো’কে এ বার ব্রহ্মাণ্ডের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দেখা গেল, জ্বলছে আর কিছু ক্ষণ পর তা নিভে যাচ্ছে। আবার জ্বলছে। তার পর ফের নিভে যাচ্ছে। এক বার, দু’বার নয়, এই ঘটনা ঘটেছে বার বার। দু’মাসে অন্তত ১৩ বার। এই সপ্তাহে সিয়াট্‌লে, আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ২৩৩তম বৈঠকে সেই পর্যবেক্ষণের ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্র বেরচ্ছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘নেচার’-এ।

ফাস্ট রেডিও বার্স্ট কী জিনিস?

আতসবাজির মতো সেই আলো যতই ক্ষণস্থায়ী হোক, কয়েক লহমায় তা যে পরিমাণ তাপশক্তি ছড়িয়ে দেয় মহাকাশে, বছরভর আমাদের সূর্যের ছড়ানো আলোর শক্তি (তাপ) তার কাছে নস্যি! এই ভিনগ্রহীদের আলোকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে, ‘ফাস্ট রেডিও বার্স্ট (এফআরবি)’।

সেই ভিনগ্রহীদের আলো!

‘এফআরবি’ আদতে একটা অত্যন্ত শক্তিশালী রেডিও তরঙ্গ। যা গোটা ব্রহ্মাণ্ডেই ছড়িয়ে রয়েছে। আতসবাজি ফাটানো হলে যেমন হয়, তেমনই খুব শক্তিশালী, অত্যন্ত উজ্জ্বল আলোর ঝলক। যাকে বলা হয়, ‘লাইট ফ্ল্যাশেস’। প্রতি দিন ব্রহ্মাণ্ডে এমন আলোর ঝলসানির ঘটনা ঘটে গড়ে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারটি। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের অনেক দূরের সেই আতসবাজির আলোর ঝলক আমাদের চোখে খুব একটা ধরা পড়ে না। ২০০৭ সালে তা প্রথম আমাদের নজরে আসে। এখনও এমন ধারণা রয়েছে অনেকেরই যে, ওই আলোর ঝলসানিগুলির ‘কারিগর’ আসলে ভিনগ্রহীরা! তাঁরাই বোধহয় বিশাল বিশাল আতসবাজি ফাটাচ্ছেন! আর সেটাই অত শক্তিশালী, অত উজ্জ্বল আলোর ঝলক তৈরি করছে ব্রহ্মাণ্ডে।

গত ১২ বছরে এমন এফআরবি বা ভিনগ্রহীদের আলো বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দেখা গিয়েছে কম করে ৬০টি। যা হয়েছে ব্রহ্মাণ্ডের নানা মুলুকে। দেখা গিয়েছে, তার পর তা উধাও হয়ে গিয়েছে। তাই বোঝা যায়নি, ঠিক কোথা থেকে আসছে সেই আলো।

ফাস্ট রেডিও বার্স্ট কী জিনিস? দেখুন ভিডিয়ো

এ বার নতুন কী দেখলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা?

অন্যতম গবেষক কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শমী চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এ বার ‘কানাডিয়ান হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং এক্সপেরিমেন্ট (কাইম)’ প্রকল্পের টেলিস্কোপের নজরে ধরা পড়া সেই আলোকে ব্রহ্মাণ্ডের একটি নির্দিষ্ট এলাকাতেই দু’মাসের মধ্যে অন্তত ১৩ বার জ্বলতে আর নিভতে দেখা গিয়েছে। তার ফলে, ব্রহ্মাণ্ডের ঠিক কোথায় সেই আলো জ্বলছে-নিভছে, এ বার তা জানতে সুবিধা হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর কোথাও এমন আলো জ্বলা, নেভার ঘটনা ঘটলে তাকে বলা হয়, ‘রিপিটে়ড ফাস্ট রেডিও বার্স্ট’। যা এর আগে এক বারই দেখা গিয়েছিল। তবে এ বার সেই আলোকে একই জায়গায় অন্তত ৬ বার ঝলসে উঠতে দেখা গিয়েছে। খুব সামান্য সময়ের ব্যবধানে। ফলে, তা ঠিক কোথায় হচ্ছে, সেই এলাকা খুঁজে বের করার কাজটা সহজতর হল বিজ্ঞানীদের কাছে।’’

যে ভাবে অন্য গ্যালাক্সি থেকে আমাদের মিল্কি ওয়েতে পৌঁছয় সেই আলো

মূল গবেষক ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অনাবাসী ভারতীয় শ্রীহর্ষ তেন্ডুলকর বলেছেন, ‘‘গত বছরের জুলাই ও অগস্ট, এই দু’মাসেই এই ঘটনা ঘটেছে।’’

আরও পড়ুন- কোথা থেকে আসে রেডিও তরঙ্গ, ধাঁধার জট খুললেন কলকাতার শমী

আরও পড়ুন- সীতাপুরের আকাশে দেখা গেল ব্রহ্মাণ্ডের আদিমতম ভুতুড়ে আলো!

শমীর আশা, আগামী কয়েক সপ্তাহে এমন অন্তত ১০০টি রিপিটেড ফাস্ট রেডিও বার্স্ট দেখা যাবে।

কেন সহজে দেখা মেলে না ওই ‘ভিনগ্রহীদের আলো’র?

২০০৭-এ ধরা পড়া ফাস্ট রেডিও বার্স্ট

কী ভাবে আলোর ঝলসানিগুলি তৈরি হচ্ছে, তা যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারছিলেন না, তার অন্যতম কারণ ছিল, এক বার সেগুলি আমাদের নজরে আসার পর সেই ঝলসানি আর আমরা দেখতে পারছিলাম না। সেগুলি যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল! উধাও, হাপিশ হয়ে যাচ্ছিল! এর থেকে আমাদের অনেকেরই এই ধারণা জন্মেছিল, ব্রহ্মাণ্ডে নিশ্চয়ই কোথাও কোনও বড় বড় বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে। কোনও বিস্ফোরণ হলে যেমন হয়, তার পর পরই বেরিয়ে আসে আলোর ঝলক। একটা ঝলসানি। তার পরেই সব নিভে যায়। আবার অন্ধকারে ভরে যায় চার পাশ। গত ১০ বছরে এমন আলোর ঝলসানি যে ১৭ বার দেখা গিয়েছে মহাকাশের বিভিন্ন প্রান্তে, তার প্রত্যেকটিই এক বার দেখা যাওয়ার পর আর আমাদের নজরে আসেনি। ফলে, যাঁরা বিশ্বাস করেন ভিনগ্রহীরা এখনও বেঁচে-বর্তে, বহাল তবিয়তে রয়েছেন এই ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও না-কোথাও, তাঁরা এমন প্রচারও করতে শুরু করে দিয়েছিলেন, ওই সব আদতে ভিনগ্রহীদেরই কাজ! তাঁরাই ‘আতসবাজি’ ফাটাচ্ছেন!

২০০৭-এ ধরা পড়া ফাস্ট রেডিও বার্স্টের বর্ণালী 

আলোর ঝলসানি বার বার (রিপিটেড) হওয়ার অর্থ কী?

শমীর কথায়, ‘‘আলোর ঝলসানিটা যখন ‘রিপিটেড’ হচ্ছে, তখন আমরা নিশ্চিত হই, এটা কোনও বিস্ফোরণ থেকে হচ্ছে না। কারণ, কোনও বিস্ফোরণ থেকে আলোর ঝলসানি হলে তা কখনও ‘রিপিটেড’ হতে পারে না। এক বার সেই আলোর ঝলসানি দেখতে পাওয়ার পরেই তা হারিয়ে যাবে। উধাও, হাপিস হয়ে যাবে। আর সেই আলোর প্রতিটি ঝলসানিই খুব বেশি হলে এক মিলি-সেকেন্ডের চেয়ে স্থায়ী হয় না। অত কম সময় স্থায়ী হয় বলেই এই রেডিও বার্স্ট বা রেডিও তরঙ্গকে খুব সহজে আমরা দেখতে পাই না।’’

আচার-আচরণে কেমন এই ‘ভিনগ্রহীদের আলো’?

শমীর কথায়, ‘‘ওই রেডিও তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ১ থেকে ২ গিগাহার্ৎজ বা ২ থেকে ৪ গিগাহার্ৎজ। আর তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ২০ সেন্টিমিটার থেকে ১০ সেন্টিমিটারের মধ্যে। একেবারে আলোর গতিতেই ছোটে এই তরঙ্গ। আর মূলত তা আলোক-কণা ‘ফোটন’ দিয়েই তৈরি। একটা সূর্যের মোট আয়ুষ্কালে যতটা শক্তির নিঃসরণ হয়, তাকে ১০-এর পিঠে ৩৮টা শূন্য বসিয়ে যে সংখ্যাটা হয়, তা দিয়ে গুণ করলে শক্তির যে পরিমাণ হয়, ওই আলোর ঝলসানি থেকে প্রতি মিলি-সেকেন্ডে তৈরি হয় সেই বিপুল পরিমাণ শক্তি। না হলে ৩০০ কোটি বছর ধরে জ্বলতে পারে ওই আলোর ঝলসানি! আর তা ব্রহ্মাণ্ডে কি এতটা পথ পেরিয়ে এসে এখনও অতটা উজ্জ্বলতা ঘরে রাখতে পারে!’’

‘ভিনগ্রহীদের আলো’র ধাঁধার জট খুলে রেডিও তরঙ্গের উৎস-সন্ধানে গোটা বিশ্বকে এ বার হয়তো আলো দেখাতে চলেছেন কলকাতার শমী। যাঁর সঙ্গী আর এক অনাবাসী ভারতীয় শ্রীহর্ষ তেন্ডুলকর।

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: নাসা