হ্যাঁ, ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে আমার, আপনার শহর- কলকাতার নাম! কী ভাবে জানেন?

শোনা যায়, ১৭৫৬ সালের জুনে 'ব্ল্যাক হোল অফ ক্যালকাটা' নামে একটি ঘটনার থেকেই নাকি অধ্যাপক জন হুইলার এই নামটি দিয়েছিলেন।কী সেই ঘটনা? সেই ব্রিটিশ আমলে ফোর্ট উইলিয়াম ছিল এখন যেখানে জিপিও, ঠিক ওই খানেই। বাংলার নবাব তখন সিরাজদৌল্লা। ১৭৫৬ সালের জুনে সেই সিরাজদৌল্লার সেনাবাহিনীই সেখানে একটি ঘরে ১৮৪ জন ব্রিটিশকে বন্দি করে রেখেছিল। দু'-চার জন ছাড়া যাঁদের বেশির ভাগই মারা গিয়েছিলেন। সেই সময় ওই ঘটনা নিয়ে তুমুল হইচই হয় ব্রিটেনের পার্লামেন্টে। এমপি-রা ঘটনাটির নাম দেন 'ব্ল্যাক হোল অফ ক্যালকাটা ইনসিডেন্ট'। আমরা এই ঘটনাটিকেই জানি 'অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড' নামে। পরে ছয়ের দশকে যখন বিজ্ঞানীরা প্রথম জানতে পারলেন, এই ব্রহ্মাণ্ডে এমন একটি পদার্থ রয়েছে, যার ভিতরে ঢুকলে কোনও কিছুই আর বেরিয়ে আসতে পারে না। তখন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার ওই 'ব্ল্যাক হোল অফ ক্যালকাটা ইনসিডেন্ট'-এর সঙ্গতি রেখেই নাম দিয়েছিলেন, ব্ল্যাক হোল।

এ তো গেল ব্ল্যাক হোলের নাম কেন এমন হল, তার গোড়ার দিকের একটা ইতিহাস।

এখন ঢুকে পড়া যাক সেই আলোচনায়, ব্রহ্মাণ্ডে কী ভাবে জন্ম হয় ব্ল্যাক হোলের? সবটুকু জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় কোনও তারা বা নক্ষত্র যখন মরে যায়, তখন অত্যন্ত জোরালো হয়ে ওঠে তার অভিকর্ষ বল (গ্র্যাভিটেশনাল ফোর্স)। সেই বলের টানেই কোনও মৃত নক্ষত্রের শরীরটা ছোট হতে হতে একটি বিন্দুতে পরিণত হয়। সেটাই ব্ল্যাক হোল।

কী ভাবে জন্ম হয় ব্ল্যাক হোলের?

তবে বিন্দু বলেই যে তা উপেক্ষার বস্তু, তা কিন্তু নয়। কারণ, সেই বিন্দুরও অভিকর্ষ বল হয় অত্যন্ত জোরালো। শক্তিশালী। এতটাই যে, তার টানে যখন আশপাশের কোনও তারা থেকে তার কোনও অংশ ছুটে আসে, তখন সেই সব অংশগুলি থেকে আলো বেরিয়ে আসতে থাকে প্রচুর পরিমাণে। সেই আলোর ছটা দেখেই বিজ্ঞানীরা আগেভাগে আঁচ করতে পারেন, কোনও তারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা ওই অংশটি এ বার এসে পড়তে চলেছে ব্ল্যাক হোলে।

বিন্দুটি থেকে তো বটেই, এমনকি বিন্দুর চার পাশেও সৃষ্টি হয় নানা ঘটনার একটি দিগন্ত। যাকে বলে, 'ইভেন্ট হরাইজন'। বিন্দু বা ব্ল্যাক হোলের চার পাশে নানা রকমের ঘটনার সেই দিগন্তটা কিন্তু বেশ বড়। ফলে, ওই সামান্য একটি বিন্দুর ভিতর থেকে কোনও আলোর কণাই বেরিয়ে এসে আমাদের কাছে পৌঁছতে পারে না।

আলোর 'বার্তা' পাঠিয়ে বিন্দু কিছু জানায় না ঠিকই, কিন্তু তার চার পাশে থাকা ইভেন্ট হরাইজনের বাইরের দিকে ছড়িয়ে থাকা আলোর ছটা আমাদের কাছে এসে পৌঁছয়।

ফলে, আমরা যেটা দেখতে পাই, সেটা হল- মাঝখানটায় অত্যন্ত জমাট অন্ধকার। আর তার চার পাশটা আলোয় আলোময়।

আরও পড়ুন- ৮ মহাদেশে বসানো টেলিস্কোপে এই প্রথম ধরা দিল ব্ল্যাক হোল!​

আরও পড়ুন- যুগান্তকারী আবিষ্কার, নিউট্রন তারার ধাক্কার ঢেউ দেখা গেল প্রথম

কোন ব্ল্যাক হোল দেখা সহজ? কোনটি কঠিন?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও যদি এমন সন্দেহজনক অন্ধকার আর তার চার পাশে অমন আলোর ছটা লক্ষ্য করা যায়, তা হলে সেখানেই ব্ল্যাক হোল রয়েছে। কোনও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা দিয়ে তা দেখাও যাবে।  

তবে যে ভাবে বললাম, বাস্তবে ব্যাপারটি অত সহজ নয়। সে ক্ষেত্রে অনেকগুলি ফ্যাক্টর কাজ করে। বলা যায়, অনেকগুলি শর্ত কাজ করে। সেগুলি কী কী?

রেজোলিউশন ১০ মাইক্রো সেকেন্ড বা তার কম হলে ব্ল্যাক হোলকে দেখতে এমন লাগবে। এখানে বাতাস নেই। 

প্রথমত, কোনও ব্ল্যাক হোলের ভর যদি সূর্যের ভরের সমান হয়, তা হলে সেই ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনটার চেহারা হবে ৬ কিলোমিটার ব্যাসের একটি বলের মতো।

সূর্যের অনুপাতে কোনও ব্ল্যাক হোলের ভর যদি বাড়তে থাকে, তা হলে তার বা তাদের ইভেন্ট হরাইজনের ব্যাসও  বাড়তে থাকে, একই অনুপাতে। কোনও ব্ল্যাক হোলের অত বড় ইভেন্ট হরাইজনের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরার যতটা রেজোলিউশন প্রয়োজন, ততটা বেশি রেজোলিউশনের ক্যামেরা এখনও আমরা বানাতে পারিনি।

দ্বিতীয়ত, এই ব্ল্যাক হোলগুলি আমাদের চেয়ে এতটাই দূরে থাকে যে, তাদের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরায় বন্দি করতে গেলেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।

ধরা যাক, কোনও ব্ল্যাক হোল যদি সূর্যের ভরের চেয়ে দশ গুণ ভারী হয়, তা হলে তাকে থাকতে হবে আমাদের চেয়ে অন্তত ১০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। যার মানে, ১-এর পিঠে ১৭ খানা শূন্য বসিয়ে কিলোমিটারে যতটা দূরত্ব বোঝায়, ঠিক ততটাই দূরে রয়েছে সেই ব্ল্যাক হোলটি।

'স্যাজিটেরিয়াস-এ*'কে দেখানো হয়েছে ৫০ মাইক্রো সেকেন্ড রেজোলিউশনে। এখানে বাতাস রয়েছে।

আমাদের চেয়ে এত দূরে থাকা কোনও ব্ল্যাক হোলের রেজোলিউশন হওয়ার কথা মাইক্রো সেকেন্ডের চেয়েও অনেক অনেক কম।

আবার যদি সেই ব্ল্যাক হোলের গোল পরিধিটা দেখতে হয়,  তা হলে আরও ১০ গুণ ভালো হওয়া চাই সেই রেজোলিউশন।

একটা মশাকে ১ হাজার কোটি কিমি দূর থেকে দেখতে যেমন লাগে!

সেটা কেমন জানেন? মাত্র ৫ মিলিমিটার লম্বা একটি মশাকে ১ হাজার কোটি কিলোমিটার দূর থেকে দেখার জন্য যতটা রেজোলিউশনের প্রয়োজন, টেলিস্কোপের ক্যামেরার ঠিক ততটাই রেজোলিউশনের প্রয়োজন হবে ওই ব্ল্যাক হোলটিকে দেখার জন্য।

তাই তাদের দেখার জন্য বিজ্ঞানীদের পছন্দের ব্ল্যাক হোল কোনগুলি জানেন? যেগুলি ভীষণ ভারী আর যেগুলি রয়েছে আমাদের যতটা সম্ভব কাছাকাছি।

কাছেপিঠের ব্ল্যাক হোল কারা?

আমাদের নাগালে থাকা এমন ব্ল্যাক হোল রয়েছে মাত্র দু'টি। একটির নাম 'স্যাজিটেরিয়াস-এ*'। যা রয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের ঠিকানা 'মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি'র ঠিক মাঝখানে। কেন্দ্রে।

বাস্তবের অনেকটাই কাছাকাছি ব্ল্যাক হোলের এই ছবিও

এই রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোলটির ভর সূর্যের তুলনায় ৪০ লক্ষ গুণ। রয়েছে আমাদের থেকে মাত্র ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে।

দ্বিতীয়টির নাম- 'এম-৮৭'। যা রয়েছে 'মেসিয়ার-৮৭ গ্যালাক্সি'র কেন্দ্রে। ওই ব্ল্যাক হোলটির ভর তার নক্ষত্রের ভরের ৪০০ কোটি গুণ। রয়েছে আমাদের থেকে মাত্র সাড়ে ৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে।

সহজ ধারণা হল, যেহেতু 'এম-৮৭' ব্ল্যাক হোলটি আমাদের গ্যালাক্সির ব্ল্যাক হোলের চেয়ে রয়েছে অনেক গুণ বেশি দূরত্বে, তাই তাকে আমরা অতটা ভাল ভাবে দেখতে পারব না। বেশি ভাল ভাবে দেখা যাবে আমাদের গ্যালাক্সির ব্ল্যাক হোলটিকে।

কেন দূরের ব্ল্যাক হোল 'এম-৮৭'-কে বেশি ভাল দেখতে পাব?

কিন্তু তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে থাকা ব্ল্যাক হোল- স্যাজিটেরিয়াস- এ* ততটা খাবারদাবার পায় না। কারণ, তার আশপাশে অতটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই খাবারদাবার। বছরে সূর্যের ভরের দশ লক্ষ ভাগের মাত্র এক ভাগ মহাজাগতিক বস্তু এসে পড়ছে তার নাগপাশে। এটা বহু দিন ধরেই চলছে। তার ফলে, আমাদের ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন থেকে যে বিকিরণ (রেডিয়েশন) বেরিয়ে আসবে, সেটা এতটাই অনুজ্জ্বল যে, সেই ইভেন্ট হরাইজনের ভাল ছবি তোলা খুবই কষ্টকর।

'এম-৮৭' ব্ল্যাক হোলটি কিন্তু প্রচুর খাবারদাবার পায়। তার ইভেন্ট হরাইজনে এসে পড়ে বছরে সূর্যের ভরের ২০ গুণ মহাজাগতিক বস্তু। তাই এই ব্ল্যাক হোলটির ছবি তোলা অনেক অনেক বেশি সহজ। অন্তত আমাদের ব্ল্যাক হোলটির চেয়ে।

২০০ মাইক্রো সেকেন্ড রেজোলিউশনে তুললে এমন দেখতে লাগবে ব্ল্যাক হোলকে। যা বাস্তবের অনেকটাই কাছাকাছি

ব্ল্যাক হোলের ছবি তুলতে যাওয়ার সময় একটি কথা মনে রাখতে হয়। সেটা হল, কোনও ক্যামেরার রেজোলিউশন নির্ভর করে আলোক তরঙ্গের দৈর্ঘ্যের উপর। এক্স-রে দেখার ক্যামেরার রেজোলিউশন এতটাই দুর্বল যে, সেটা দিয়ে ভাল কেন খুব সাধারণ মানের ছবি তোলারও কোনও প্রশ্ন ওঠে না।

কী ভাবে ছবি তোলা সম্ভব হল?

বরং অনেক ভাল ছবি উঠতে পারে রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে। কিন্তু একটি অ্যান্টেনা দিয়ে সেই কাজটা করতে গেলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেন বেশ কয়েকটি অ্যান্টেনাকে নিজেদের থেকে দূরে দূরে রেখে তাদের রেজোলিউশন বহু গুণে বাড়িয়ে দিতে।

পৃথিবীর ব্যাস ১২ হাজার কিমি। পৃথিবীর উপর দু'টি অ্যান্টেনাকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে রেখে নির্দিষ্ট কোনও ব্ল্যাক হোলের দিকে তাক করিয়ে রাখলে সবচেয়ে বেশি রেজোলিউশন তৈরি করা সম্ভব। এই ভাবেই বানানো হয়েছে ইভেন্ট হরাইজন রেডিও টেলিস্কোপ। যার রেজোলিউশন প্রায় ৬০ মাইক্রো সেকেন্ডের কাছাকাছি।

এ বার যদি আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিটাকে দেখতে হয়, তা হলে তার রেডিও টেলিস্কোপের রেজোলিউশন দরকার ২০ মাইক্রো সেকেন্ডের মতো। আর যদি 'এম-৮৭' গ্যালাক্সিটাকে দেখতে হয়, তা হলে রেজোলিউশন দরকার  ১০ মাইক্রো সেকেন্ডের মতো।

বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত মিল্কি ওয়ে বা 'এম-৮৭' ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন দেখার মতো উন্নত মানের যন্ত্র বানাতে পারেননি। তবে যদি আরও উন্নত মানের ডেটা অ্যানালিসিস টেকনিক ব্যবহার করা যায়, যেমন 'অ্যাডাপ্টিভ অপটিকস্', তা হলে ব্ল্যাক হোলকে ভাল ভাবে দেখা যেতে পারে।

কেমন দেখতে ব্ল্যাক হোল?

১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কারজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী এস চন্দ্রশেখরের ঘরে বিজ্ঞানী জে পি ল্যুমিনেরের কম্পিউটার সিম্যুলেশনের মাধ্যমে আঁকা একটি ছবি দেখেছিলাম। যেখানে একটি উজ্জ্বল চাকতির চার পাশ থেকে বেরিয়ে আসছে বিকিরণ। আর সেই চাকতির মাঝখানে একটি কালো গর্ত। এখনও বিজ্ঞানীরা সেই কালো গর্ত-সহ উজ্জ্বল চাকতিটিই খুঁজে চলেছেন!

বড় ভরসা রেডিও তরঙ্গ

একটি কথা মাথায় রাখতে হবে, রেডিও টেলিস্কোপ থেকে শুধু সেই সব মহাজাগতিক বস্তুকেই দেখা যায়, যেগুলি থেকে রেডিও তরঙ্গ বেরিয়ে আসছে। সাধারণত সেটা ইভেন্ট হরাইজন থেকে বেশ দূরে থাকে। ঘূর্ণায়মাণ চাকতি থেকে যে বাতাস বেরিয়ে আসছে, সেখান থেকেই এই তরঙ্গের জন্ম হয়। কাজেই রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে কোনও ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন স্পষ্ট দেখতে পাওয়া খুব সম্ভব নয়।

ব্ল্যাক হোল দেখার সময় আমাদের আরও একটি বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। ব্ল্যাক হোলটিকে আমরা কী ভাবে দেখছি? যেমন, কোনও একটি পাশ থেকে দেখলে ইভেন্ট হরাইজন দেখাই যাবে না। কারণ, চাকতিতেই সেটি ঢাকা পড়ে যাবে।

ছবি সৌজন্যে: ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স (আইসিএসপি), কলকাতা

(ছবিগুলি কম্পিউটার সিম্যুলেশনের মাধ্যমে বানানো)