×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

শনিবারের নিবন্ধ...

রানিকাহিনি

১২ জুলাই ২০১৪ ০০:০০

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে যখন ব্যারিস্টারের বাবু হিসেবে কলকাতা হাইকোর্ট বার লাইব্রেরির সামনে বেঞ্চিতে বসে থাকতাম, তখন সিনিয়র বাবুদের সঙ্গে যে সব বিষয় নিয়ে নিরন্তর আলোচনা হত তার মধ্যে স্বর্গের দেবদেবীরা প্রায়ই থাকতেন।

ওইখানেই শুনেছিলাম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ঐশ্বর্য এটসেটরা সব বিষয়েই এক জন দেবতা বা দেবী স্পেশাল দায়িত্বে রয়েছেন, কিন্তু কেউ জানে না, মামলা-মোকদ্দমার অধীশ্বর কোন দেবতা?

Advertisement



আইনপাড়ায় একজন ‘হাইকোর্টেশ্বর’ ছিলেন, কিন্তু তাঁর দাপট তেমন নয়। তিনি বাদী-বিবাদী দু’পক্ষের কাছ থেকেই আগাম পুজো নিতে আপত্তি করতেন না।

বাবুসমাজে সকলের শ্রদ্ধেয় ছোকাদা বলতেন, ওরে জেনে রাখিস, এই মামলা-মোকদ্দমার ব্যাপারে মন্দিরের দেবতারাও ফোর্ট উইলিয়মের মহামান্য আদালতের কাছে নতমস্তক হয়ে নির্দেশ প্রার্থনা করেন।

আরও একটা বিষয় উঠেছিল, আইনের চোখে দেবদেবীদের স্ট্যাটাস কী? শুনেছি, সাগরপারের প্রিভি কাউন্সিলও তাঁদের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়েছে, তাঁরা বিষয়-আশয়ের মালিক হতে পারেন, কেনাবেচা করতে পারেন অন্য নাগরিকদের মতো। কিন্তু একটা খুঁত রেখে দিয়েছেন খেয়ালী সায়েব জজরা, দেবদেবীরা নাকি চির নাবালক, এঁদের হয়ে যাঁরা পার্থিব কাজকর্ম করেন তাঁরা সেবাইত।

পলাশির যুদ্ধের পর মালক্ষ্মীর কৃপায় বাঙালিরা বিভিন্ন বাণিজ্যে কোটিপতি হতে আরম্ভ করেছেন। তখন পরবর্তী প্রজন্মের দুর্মতি ও অবহেলায় যাতে কষ্টার্জিত সম্পত্তি লাটে না ওঠে তা আটকাবার জন্য অনেক মাথা খাটিয়ে, আইনি বুদ্ধিকে দলিলের মাধ্যমে যথাসাধ্য প্রয়োগ করে, বিপুল সম্পত্তি দেবোত্তর করে দিয়ে তার বিক্রি নিষেধ করে দিতে সমর্থ হয়েছেন অনেকে। তবু হাইকোর্টেশ্বর তাঁর নিজস্ব খেয়ালে চলেছেন এবং কোটিপতি দে, মল্লিক, শীল, দত্তরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

কলকাতানিবাসী শতসহস্র মামলার নায়ক-নায়িকারা কালের খেয়ালে অবলুপ্ত হয়েছেন, কিন্তু যা ভরসার তাঁদের দলিল দস্তাবেজ, আবেদন-নিবেদনের বিভিন্ন বিবরণ মহামান্য আদালতের সংগ্রহশালায় রয়ে গিয়েছে, যা থেকে একালের সন্ধানী লেখকরা বিস্ময়কর সব বই লিখতে পারেন।

এই সব সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় জোড়াসাঁকোর নাবালকরা মামার মাধ্যমে জন্মদাতা বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, মেয়েদের বিরুদ্ধে এবং জামাইদের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বিধবা মা এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের সংখ্যাহীন উত্তেজনার কথা নাই বা তুললাম। যেখানে তেমন অর্থ নেই কিন্তু পারিবারিক গৃহের ভাগ নিয়ে নির্লজ্জ বিরোধ আছে, সেখানেও মহামান্য আদালতের অস্বস্তির ছায়া পড়েছে। যেমন ধরুন শিমলের দত্ত পরিবারে শরিকি সংঘাত, যা নিয়ে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দও জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে মামলায় নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং বিধবা মা ও নাবালক ভাইদের মাথার উপর ছাদ সুনিশ্চিত করবার জন্য দীর্ঘ সময় উকিলপাড়ায় ব্যয় করেছেন এবং সাক্ষীর ভূমিকাতেও ধর্মাবতারের কাঠগড়ায় তাঁকে দেখেছি।

জ্ঞাতিদের সঙ্গে স্বামীজির ও পরিবারের মামলায় এক সায়েব জজের নাম ইদানীং প্রায়ই এসে যায়, তাঁর নাম ম্যাকফারলেন। হাইকোর্টের এই বিখ্যাত বিচারকের নাম আরও একটি বিখ্যাত মন্দির সংক্রান্ত মামলায় ইদানীং দেখছি। বলা বাহুল্য এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জানবাজারের ধনবতী রানি রাসমণি।

সুদূর বনগ্রাম থেকে ভাগ্যসন্ধানে আমার পিতৃদেব এক সময় গঙ্গার পশ্চিমকূলে হাওড়ায় এসেছিলেন এবং সেই আদ্যিকাল থেকে আমার মা ও বাবার পবিত্র দর্শনীয় স্থান বলতে কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর এবং বেলুড়। তার পরে বিবেকানন্দের নামাঙ্কিত বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের সংখ্যাহীন গল্প কানের মধ্যে ঢুকেছে।

যারা হাওড়ার অলিগলি পছন্দ করত না, তারা জিজ্ঞেস করত বিবেকানন্দ আর জায়গা খুঁজে পেলেন না! চলে এলেন এই হাওড়ায়! আমাদের এক মাস্টারমশায় প্রতি সপ্তাহে পদব্রজে হাওড়া খুরুট রোড থেকে বেলুড়ে যেতেন, তিনি বলতেন, ওরে ভুলিস না, গঙ্গার পশ্চিমকূল বারাণসী সমতুল। কথায় কথায় অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার অভ্যাস সে যুগেও ছিল। তাঁদের প্রশ্ন, দক্ষিণেশ্বর তাহলে পূর্বকূলে কেন? রানি রাসমণির তো পয়সার অভাব ছিল না।

মাস্টারমশাই বিরক্ত না হয়ে আমাদের বলতেন, ঠাকুর, স্বামীজি, রানি রাসমণি সম্বন্ধে অনেক কথাই তো এখনও জানা যায়নি, তোমরা বড় হয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের সেই কাজটা করবে।

আমাদের ইস্কুলের কয়েকজন বিশিষ্ট ছাত্র পরবর্তী সময়ে বিবেকানন্দ নিবেদিতা গবেষণায় স্মরণীয় কাজ করেছেন। বেলুড় মঠে তাঁরা বহু সময় ব্যয় করেছেন, কিন্তু দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির এত কাছে থেকেও যেন বেশ দূর।

শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত তাঁদের প্রায় মুখস্থ, কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের কিছু ঘটনা যেন তাঁদের অস্বস্তিতে ফেলে দিত। আমরা শুনতাম, এটা ঠিক যে পুরোহিত ঠাকুরের চাকরি যেতে বসেছিল, তাঁর ভাইপোর চাকরি গিয়েছিল। বিশ্ববিজয়ী বিবেকানন্দও সেখান থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়েছিলেন এবং এক সময় ঠাকুরের নিজের হাতে আঁকা দুর্লভ দেওয়াল-ছবিগুলো রক্ষা হয়নি। ঠাকুরের যে ছবিগুলি এখন সারা বিশ্বে প্রচারিত সেগুলো ভক্ত নন্দলাল বসুর স্মৃতি থেকে আঁকা।

এসব নিতান্ত ঘরোয়া কথাবার্তা। মূল ব্যাপারটা হল, মাসমাইনের ছোট ভট্চায্যি থেকে ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের অভ্যুত্থান এই দক্ষিণেশ্বরেই সম্ভব হয়েছিল এবং সিস্টার নিবেদিতা ছোট্ট একটি কথায় তা স্পষ্ট করে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দির না হলে আমরা ঠাকুর রামকৃষ্ণকে পেতাম না। ঠাকুরকে না পেলে আমরা বিবেকানন্দকে পেতাম না।

অর্থাত্‌ ছোটখাটো পান থেকে চুন সরে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে অকারণ অভিমান পুষে রাখার কোনও অর্থ হয় না। এই সহজ সত্যটুকু বুঝে নেবার মতো দূরদৃষ্টি ও মানসিকতা ঠাকুর তাঁর নামালম্বী সন্ন্যাসী সঙ্ঘকে দিয়ে গিয়েছেন, এবং সাম্প্রতিক কালে ভক্তদের মধ্যে দূরত্ব কমে গিয়েছে।

জানবাজারের রানি রাসমণি সম্পর্কে একালের বাঙালিদের আগ্রহ ইদানীং বেশ বাড়ছে। যাঁরা এই স্বীকৃতির পরিমাণে সন্তুষ্ট নন তাঁদের বলা যেতে পারে, অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে পরবর্তী উনিশ ও বিশ শতকে যাদের কীর্তিকাহিনি নিয়ে আমরা বসবাস করছি তাঁরা সবাই মহাপুরুষ।



মহামানবী বলতে যে দু’জনের নাম বেরিয়ে আসে তাঁদের কীর্তির পটভূমি দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ি, এক জন এই পীঠস্থানের প্রতিষ্ঠাত্রী, আর এক জন সেখানকার সাত টাকা মাইনের পুরোহিতের স্ত্রী সারদামণি। তাঁর মর্তলীলার একটা বড় অংশের পটভূমি এই দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গণ, স্বামীর জীবনকালে প্রায় কেউই তাঁকে চিনত না, রান্নাবান্না পুজোআচ্চা এবং স্বামীসেবা করেই জীবনের একটা স্মরণীয় অংশ এখানেই কাটল, কিন্তু কেউ ভুলেও তাঁর ছবি একখানা তুলল না। বরং নানা অবহেলা, মাসে মাসে বিধবার যে সাত টাকা পেনশনের ব্যবস্থা ছিল তাও নিঃশব্দে বন্ধ হল।

তিনি আরও জানতেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত স্বামী কাশীপুর বাগানবাড়ি থেকে দক্ষিণেশ্বরের পুরোধা আশ্রয়ে আবার ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মন্দিরের মালিকদের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া আসেনি।

সত্যি কথা বলতে কী, জননী সারদার বিস্ময়কর বিকাশ তাঁর স্বামীর দেহাবসানের পর। মনে রাখা ভাল তাঁর বৈধব্যকাল নিতান্ত ছোট নয়, ১৬ অগস্ট ১৮৮৬ থেকে ২১ জুলাই ১৯২০। এই পর্বে দক্ষিণেশ্বরের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। কাশীপুরে স্বামীর মহাসমাধির পর কেন তিনি এক দিনের জন্যও দক্ষিণেশ্বরে ফিরলেন না, সে নিয়েও নানা মুনির নানা মত।

রামকৃষ্ণ-ভক্তদের সঙ্গে অতীতের ভুল বোঝাবুঝির অবসানের পর দক্ষিণেশ্বরে জনসমাগম বেড়েই চলেছে। স্বভাবতই নতুন যুগের মানুষদের কৌতূহল বাড়ছে এই আশ্চর্য উদ্যোগের ইতিহাস সম্পর্কে। মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত দেবদেবী ও প্রতিষ্ঠাতার বংশধরদের বাইরে সামান্য একজন মাসমাইনের পূজারিকে নিয়ে এত কৌতূহল এবং শ্রদ্ধা এদেশে এর আগে কখনও লক্ষ করা যায়নি।

নতুন যুগের মানুষ জানতে চান দক্ষিণেশ্বরে কালীঘাটের মতো বলিদান প্রথা আছে কিনা? এই প্রশ্নের উত্তর: এক সময় নাটমন্দিরের দক্ষিণ প্রান্তে বিশেষ পূজা উপলক্ষে ছাগ মহিষ মেষ বলি দেওয়া হত, বর্তমানে সঙ্গত কারণে মন্দিরের ট্রাস্টিরা তা বন্ধ করে দিয়েছেন। দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসদেব রসিকতা করতেন, “মা কালী খান দান কালীঘাটে, বিশ্রাম করেন এখানে এসে।”

আরও সব প্রশ্ন ওঠে, যার উত্তর সন্ধান করছেন গবেষকরা। নেই নেই করে দক্ষিণেশ্বর মন্দির নিয়ে কয়েক ডজন বই লেখা হয়ে গিয়েছে। লেখকরাই খবর দিয়েছেন, পশুবলি বন্ধ হলেও কালীমন্দিরে আমিষ ভোগের ব্যবস্থা আছে।

মার্কিন দেশে পারফিউমের গবেষণায় জগদ্বিখ্যাত এক বৈজ্ঞানিক একবার আমাকে অবাক করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা এসেছিল দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের একটা ঘটনা থেকে।

পঞ্চবটির সামনে একটা গাছ থেকে ঠাকুর বিল্বপত্র তুলছিলেন, তুলতে গিয়ে গাছের ছাল খানিকটা উঠে এল। ঠাকুরের মনে হল, যিনি সর্বভূতে আছেন তাঁর কত না কষ্ট হল, তিনি আর বেলপাতা তুলতে পারলেন না। আর একদিন ফুলগাছ দেখে তাঁর মনে হল, পুষ্পশোভিত গাছগুলি যেন শিবকে নিবেদিত এক একটি ফুলের তোড়া। সেদিন থেকে আর ফুল তোলা হল না।

এই ঘটনা থেকে প্রবাসী বৈজ্ঞানিক নতুন ইঙ্গিত পেলেন, গাছে ফুটে থাকা ফুলের আঘ্রাণ আর উত্‌পাটিত ফুলের গন্ধের কোয়ালিটি এক নয়। এই আবিষ্কারেই পৃথিবীর পারফিউম শিল্পকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হল। যার নেতৃত্বে ফ্রান্স নয়, আমেরিকা।

নবযুগে পারফিউমের প্রাণসন্ধান সে মস্ত এক গল্প, দক্ষিণেশ্বরের এক পুরোহিত সেই অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন তা প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক সময় লাগবে, আমরা আপাতত যে-মন্দিরে তাঁর সাধকজীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি ব্যয় করলেন তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখব।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রাসমণির জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে যত বই বেরিয়েছে, সেখানে লোকশ্রুতির প্রাধান্য, ঊনিশ শতকের এক অসামান্যা বঙ্গরমণীর ঐতিহাসিক পদক্ষেপগুলি কোথাও তেমন বিস্তারিত ভাবে আলোচিত হয়নি। ব্যতিক্রম একটি প্রচেষ্টা, রিপন কলেজের এক বিজ্ঞানের অধ্যক্ষ কোনও রকম ঢাক না বাজিয়ে (ড.শিবতোষ সামন্ত) দুই দশক ধরে একক প্রচেষ্টায় চার খণ্ডে ‘রাসমণির অন্তহীন জীবনবৃত্তে’ নামে যে মূল্যবান বইটি লিখলেন তা কেন ভক্তজনের নজরে তেমন পড়ল না তা কিছুটা আশ্চর্যজনক।

সাড়ে সাতশো পাতার এই বিশাল বইটির আর একটি সম্পদ শ’পাঁচেক চিত্রমালা ও দুষ্প্রাপ্য দলিল থেকে উদ্ধৃতি। অর্থের অভাবে এই সব দলিল দস্তাবেজ এবং নথিপত্র যে ঠিক মতো পুনর্মুদ্রণ করা যায়নি তা বেশ দুঃখজনক।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের জটিল ইতিহাস বুঝতে গেলে এক নজরে রাসমণি পরিবারের কিছু বিবরণ শুরুতেই জেনে নেওয়া মন্দ নয়।

নিতান্ত গরিব ঘরের মেয়ে এই রাসমণি। জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৭৯৩। শ্বশুর জানবাজারের বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী প্রীতিরাম মাড়। তাঁর পুত্র রাজচন্দ্রের তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী এই রাসমণি।

রাজচন্দ্র ছিলেন দূরদর্শী ব্যবসায়ী। সেই সঙ্গে জমিদারি। যে দিন ২০/২৫ হাজার টাকা লাভ না হত, সেদিন আয় অতি অল্প হল বলে তিনি মনে করতেন। কোনও কোনও দিন লক্ষাধিক টাকাও লাভ করতেন।

এই টাকায় তিনি কলকাতায় বিপুল সংখ্যক বাড়ি কিনেছিলেন। এই তালিকাটি দেখলে আজও বিস্মিত হতে হয়। পিতৃদেব প্রীতিরাম মৃত্যুকালে (১৮১৭) সাড়ে ছয় লাখ টাকার ধনসম্পত্তি রেখে যান।

রাজচন্দ্রের চার কন্যা ও এক পুত্র: পদ্মমণি- স্বামী রামচন্দ্র আটা (দাস), কুমারী- স্বামী পিয়ারিমোহন চৌধুরী, করুণাময়ী- স্বামী মথুরমোহন বিশ্বাস (সেজবাবু), মৃতপুত্র, জগদম্বা- স্বামী মথুরমোহন বিশ্বাস।

রাজচন্দ্রের দেহাবসান ৫৩ বছর বয়সে ১৮৩৬ জুন মাসে। তৃতীয় পক্ষের স্ত্রীর বয়স তখন ৪৪ বছর। মৃত্যুকালে তাঁর তিন কন্যা, তিন জামাতা, নাতি নাতনি ও স্ত্রী রাসমণি। সম্পত্তির পরিমাণ অগাধ, তা ছাড়া নগদ ৬৮ লাখ টাকা, বেঙ্গল ব্যাঙ্কের শেয়ার ৮ লাখ টাকা, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে দেওয়া ঋণ ২ লাখ টাকা এবং সায়েব কোম্পানি হুক ডেভিডসনকে দেওয়া ঋণ ১ লাখ টাকা।

স্বামীর শ্রাদ্ধ উপলক্ষে রাসমণি এলাহি আয়োজন করেছিলেন। অতিথি ও ব্রাহ্মণ বিদায় ছাড়াও ছিল তিরিশ হাজার কাঙালি সমাবেশ। পরের দিন রাসমণি রৌপ্যমুদ্রায় তাঁর দেহ ওজন করে ৬০১৭ টাকা দান করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায় বৈধব্যকালে রাসমণি নিজেকে ভোগিনী থেকে যোগিনীতে রূপান্তরিত করলেও বিষয়সংক্রান্ত ব্যাপারে কড়া নজর রেখেছিলেন। পূজাআচ্চা ছাড়াও প্রতিদিন তাঁকে সংবাদপত্র পাঠ করে শোনাতে হত। আরও আশ্চর্য, যোগাযোগ রক্ষার জন্য তিনি শহরের বিশিষ্ট সায়েবদের নিজের বাড়িতে ভোজসভায় নেমন্তন্ন করতেন এবং সেই উপলক্ষে জানবাজারের বাড়ি বিশেষ ভাবে সজ্জিত করেন।

ধনবতী রাসমণির জনসংযোগ প্রচেষ্টা খঁুটিয়ে দেখবার মতন। কিন্তু আজ তা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়, আমরা তাঁর পারিবারিক জটিলতা এবং মন্দির প্রতিষ্ঠার ওপর আলোকপাত করতে চাই।

এই শহরের অনেক ক্রোড়পতি বিপুল সামাজিক ব্যয়ের ইতিহাস স্থাপন করেও সময়ের স্রোতে বিস্মৃতির সাগরে হারিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু রাসমণি, তাঁর নিয়োজিত মাসমাইনের পূজারি ছোট ভট্চায্যি এবং তাঁর স্থাপিত মন্দির আজও ভক্তজনের কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে আছে।

একই সঙ্গে কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে, এ দেশে কেন দেবদেবীকে উত্‌সর্গ করা মন্দিরও দীর্ঘস্থায়ী মামলা-মকদ্দমার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

মামলা-মকদ্দমার কথা যখন উঠল তখন গোড়া থেকে শুরু করাই ভাল। লেখক শিবতোষ সামন্ত খোঁজখবর করে রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্রের দায়ের করা পঁচিশটা মামলার তালিকা উপহার দিয়েছেন।

এর মধ্যে সাতটা মামলা জনৈক মধুসূদন মণ্ডলের বিরুদ্ধে, আটটি মামলা গোপীমোহন দাসের বিরুদ্ধে। একটি মামলা রবীন্দ্রনাথের দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে, মনে হয় ধার দেওয়া টাকা উদ্ধারের প্রচেষ্টায়। ১৮৩৬ সালে অংশ্যঘাত রোগে রাজচন্দ্রের মৃত্যুর আট বছর পরেও রাসমণি যে সত্যেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই মামলা চালাচ্ছেন তার প্রমাণ রয়েছে।

রাজচন্দ্রের স্ত্রী রাসমণিও যে মামলা-মকদ্দমায় ভয় পেতেন না তার যথেষ্ট প্রমাণ আদালতে রয়েছে। গবেষক সামন্তের মন্তব্য: জমিদারি চালাতে গেলে মামলা-মকদ্দমা জীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। টাকা আদায়ের মামলা, বন্ধকী মামলা, এমনকী ফৌজদারি মামলা। কী ছিল না! জনৈক শম্ভুচরণ দাস ফৌজদারি মামলা করেন রাসমণির বিরুদ্ধে এবং প্রথম পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট রাসমণির বিরুদ্ধে রায় দেন। এর বিরুদ্ধে রাসমণি যশোরের আদালতে আবেদন করেন এবং সফল হন। আগেকার রায় তো বাতিল হলই, সেই সঙ্গে সুদ-সহ তাঁর প্রাপ্য টাকা ফিরে পেলেন রাসমণি।

রাসমণি তখনকার সুপ্রিম কোর্টে যে সব মামলা দায়ের করেছিলেন তার একটি দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যাচ্ছে, একই সঙ্গে রয়েছে রাসমণির বিরুদ্ধে যে সব মামলা হয়েছিল তার একটি তালিকা।

সামন্ত লিখছেন, “আত্মীয়স্বজন ও জ্ঞাতিদের সঙ্গেও” মামলা হয়েছিল বলে শোনা যায়।

প্রয়াত স্বামীর সম্পত্তি রক্ষার কঠিন দায়িত্ব নিয়ে রাসমণি এক সময়ে নিজের দুই জামাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে দিতেও দ্বিধা করেননি। দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের প্রাথমিক দায়িত্বে ছিলেন বড় জামাই রামচন্দ্র দাস। মন্দির উদ্বোধনের মাত্র চার মাস আগে ১৮৫৫-র ১৭ জানুয়ারি রাসমণি “নিজকন্যা পদ্মমণিকে জড়িয়ে, বড় জামাই রামচন্দ্রকে জড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টে অর্থ তছরুপের মামলা করেন।”

বিচারপতি স্যর লরেন্স কীল-এর আদালতে চার বছর এই মামলা চলে এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৫৯ সালের ১৩ জানুয়ারিতে রানি এই মামলা প্রত্যাহার করেন।

বলা বাহুল্য, জামাই রামচন্দ্র সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। এই মামলার নথি থেকে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পরে রাসমণি তাঁর জামাতাদের সহায়তায় জমিদারি পরিচালনা করতেন এবং পালাক্রমে এক এক জন জামাতাকে ‘ম্যানেজার’ বা ‘স্টুয়ার্ট’ বা ‘এজেন্ট’ হিসেবে নিয়োগ করতেন।

দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণকালে গঙ্গায় বানের ফলে পোস্তা, ঘাট ইত্যাদি ভেঙে বিশেষ ক্ষতি হয় এবং তার পর রানি তাঁর জামাতা রামচন্দ্রকে (১৮৪৯) ম্যানেজারের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় জামাই প্যারিমোহন চৌধুরীকে নিয়োগ করেন। মন্দির নির্মাণের তত্ত্বাবধানে আসেন মথুরমোহন বিশ্বাস, যিনি প্রথমে বিবাহ করেন রাসমণির তৃতীয়া কন্যা করুণাময়ীকে এবং তার অকালমৃত্যুর পরে রাসমণি এঁর সঙ্গেই কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বার বিবাহ দেন। এই গুণবান জামাইকে রাসমণি নাকি হাতছাড়া করতে চাননি।

যে জামাইয়ের ওপর তাঁর এতখানি বিশ্বাস, সেই মথুরের বিরুদ্ধেও সুপ্রিম কোর্টে রাসমণি এক মামলা দায়ের করেন ১১ ডিসেম্বর ১৮৫১-তে। অভিযোগ: সম্পত্তির বেহিসাব এবং টাকা আত্মসাত্‌। শুধু ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে টাকা তছরুপের অভিযোগই নয়, সংবাদ প্রভাকরে বিজ্ঞাপন দিয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। এই নোটিসে দেখা যাচ্ছে রানির অ্যাটর্নি ১১ ওল্ড পোস্টাপিস স্ট্রিটের ডেনম্যান অ্যান্ড এবাট।

এই মামলা চলার সময় কন্যা-জামাতার সঙ্গে রানির ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্বন্ধে বিস্তারিত সংবাদ তেমন প্রচারিত নয়, শুধু জানা যায় মথুরবাবু সস্ত্রীক ফরাসডাঙায় চলে যান।

১২ জানুয়ারি ১৮৫২-তে মামলার একতরফা হিয়ারিং হয় এবং চার দিন পরে রাসমণি একটা ডিক্রি পান। এই মামলার পরেও রানির অ্যাটর্নি জন নিউমার্চ বাংলা ও ইংরেজি পত্রপত্রিকায় রানির কোম্পানির কাগজের বিবরণ দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন।

যাই হোক, পরবর্তী সময়ে (১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৪) শাশুড়িমাতা রাসমণি জামাতা মথুরের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেবার জন্য আবেদন করেন। আদালতে তাঁর বক্তব্য, পাওনা টাকার বেশির ভাগই ফেরত পাওয়া গিয়েছে।

শুধু দুই মেয়ে-জামাই নয়, তার বাইরেও রানির মামলার ছড়াছড়ি। দক্ষিণেশ্বরে জমি কিনতে গিয়েও হাজার হাঙ্গামা। কয়েক জন জমিদার এই জমি কেনায় যথাসাধ্য বাধা দিয়েছিলেন।

শোনা যায়, রানিকে আটকাবার জন্যে একজন ধনবান মোট ১৬ বার কেস করেন এবং প্রতিবারই হেরে যান। এই বাধা অতিক্রম করার জন্য রাসমণি স্বয়ং নাকি প্রতিপক্ষের বাড়িতে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু মিষ্টি কথায় কাজ হয়নি।

শেষ পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বরের সমস্ত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে কুঠিবাড়ি সমেত সাড়ে চুয়ান্ন বিঘা জমি ৪২ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়, ‘বিল অব সেল’-এর তারিখ ৬ সেপ্টেম্বর ১৮৪৭। বেশ কয়েক বছর পরে রানি একটা দেবোত্তর দলিল করেন এবং সেই দলিল আরও পরে (২৭ অগস্ট ১৮৬১) আলিপুরে রেজিস্ট্রি করা হয়। তখন অবশ্য রাসমণি আর ইহলোকে নেই।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের নকশা ও নির্মাণ যে এক সায়েব কোম্পানির (ম্যাকিনটস বার্ন) তা আমাদের খেয়াল থাকে না। প্রথম পর্বে খরচ হয়েছিল ৯ লক্ষ টাকা।

বিশেষজ্ঞেরা মনে রাখতে বলেন, কালীমন্দির কথাটি লোকমুখে প্রচারিত হলেও এটি একটা শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব দেবদেবীর মন্দির-সমবায়, যাকে ইংরেজিতে বলা চলে ‘টেম্পল কোঅপারেটিভ’।

এক নয়, দ্বাদশ শিবমন্দিরের সগর্ব উপস্থিতি এখানে। ভক্তজনরা জানেন, এঁদের নাম নরেশ্বর, নন্দীশ্বর, নাদেশ্বর, জগদীশ্বর, জলেশ্বর, জঙ্গেশ্বর, যোগেশ্বর, যত্নেশ্বর, জটিলেশ্বর, নকুলেশ্বর, নাকেশ্বর, নির্জরেশ্বর।

কালীমন্দিরে শ্রীশ্রী জগদীশ্বরী বগলা ছাড়াও উপস্থিত শ্রীশ্রী জগদীশ্বর মহাকাল। বিষ্ণুমন্দিরে রয়েছেন রাসমণির পিতৃকুূলের কুলদেবতা শ্রীশ্রী জগন্মোহিনী রাধা ও জগদীশ্বর গোবিন্দ। দক্ষিণেশ্বরের দেবীর প্রকৃত নাম ‘জগদীশ্বরী’ এবং এই নামেই তাঁর পূজা হয় তবে এঁর প্রচলিত নাম ‘ভবতারিণী’।

পরবর্তী কালের সাহেব ঐতিহাসিকরা কিছু তুলনামূলক খবর দিয়েছেন। গঠনশৈলীর দিক থেকে দক্ষিণেশ্বরের সাদৃশ্য রয়েছে টালিগঞ্জের রাধানাথ মন্দিরের, যার প্রতিষ্ঠাতা রামনাথ মণ্ডল, সময় ১৮০৯। এই মন্দিরটি বোধ হয় দক্ষিণেশ্বর থেকে কিছুটা উঁচু।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদিপর্বের অনেক কথা রামকৃষ্ণর জীবনকথা মারফত আজকাল ভক্তমহলে সুপরিচিত। শুধু আইন-আদালত নয়, জাতপাতের বিচারে সামাজিক বাধাবিপত্তির কথা উঠল, রাসমণির নিজস্ব পুরোহিতরাও দেবীর ভোগের ব্যাপারে নানা প্রশ্ন তুলে বসলেন।

এই সময়ে আসরে আবির্ভাব ঝামাপুকুরনিবাসী গদাধরের দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের। তিনি অভিনব বিধান দিয়ে দুরূহ সমস্যার সহজ সমাধান করলেন। এই রামকুমারই যে গদাধরের দাদা তা আজকাল সকলেই জানেন, তাঁর মাধ্যমেই গদাধরের দক্ষিণেশ্বরে পদার্পণ এবং নবযুগের ইতিহাস সৃষ্টি।

আমরা সকলেই জানি রানির ইচ্ছানুসারে রামকুমার স্নানযাত্রার দিনে (বৃহস্পতিবার ৩১ মে ১৮৫৫) মন্দির প্রতিষ্ঠার পুণ্য কাজ সমাধান করেন। কিন্তু মনে রাখা ভাল, সেকালে শুভকাজে বাধার শেষ ছিল না। “যখন দক্ষিণেশ্বরে জমি কিনতে যান, তখনও পণ্ডিতরা খ্রিস্টানের কুঠি ও মুসলমানদের পীরের দরগার অজুহাতে বাধা দান করেছিলেন। আবার মন্দির নির্মাণ চলাকালে রানিমার বিরুদ্ধেও মামলার পর মামলা দায়ের করেছিলেন এই অজুহাতে যে হিন্দুধর্মে বিধবাদের মন্দির নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠা করার কোনও অধিকার নেই।”

প্রতিষ্ঠাদিবসে বিশেষ আকর্ষণ অন্নদানযতি। এর মধ্যে রয়েছে দুগ্ধ-সাগর, দধিপুষ্করিণী, ঘৃত-কূপ, তৈল-সরোবর, লুচি-পাহাড়, মিষ্টান্ন-স্তূপ, পায়েস-সমুদ্র, কদলীপত্র-রাশি, মৃন্ময়পাত্র-স্তূপ।

দুটি হাতির পিঠে চড়িয়ে দক্ষিণেশ্বরে আনা হয়েছিল অতি বিশুদ্ধ ঘৃত। স্থানীয় বাজারে সে দিন মিষ্টান্নের দাম আগুন। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ীপ্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হয়েছিল। জনরব এই যে ৫০০ মন সন্দেশ কেনা হয়।

কাঙালিও হয়েছিল সংখ্যাহীন। সংবাদ প্রভাকরের আন্দাজ, ওই দিন পুণ্যকার্যে রানি দু’লাখ টাকা ব্যয় করেন। অন্য মতে দান-দক্ষিণাসহ ব্যয়ের পরিমাণ ৯ লাখ টাকা, শোনা যায় সেদিন লক্ষাধিক ব্রাহ্মণ উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা দান গ্রহণ করেন।

দক্ষিণেশ্বরের ঐতিহাসিকরা জানিয়েছেন, গদাধর (কোষ্ঠীনাম ‘শম্ভুরাম’) প্রথম দক্ষিণেশ্বরে আসেন ৩০ মে ১৮৫৫, পরের দিন বিকেলে ঝামাপুকুরে ফিরে যান।

দ্বিতীয় বার আসেন ১ জুন সকালে, তৃতীয় বার ৭, ৮ কিংবা ৯ জুন। ওই সময় থেকেই দাদার অনুরোধে দক্ষিণেশ্বরে থাকা শুরু করেন। “এর পর এক মাসের মাথায় তিনি দক্ষিণেশ্বরে স্থায়ী ভাবে চলে আসেন।”

গলায় ক্যানসার নিয়ে দক্ষিণেশ্বর থেকে ঠাকুরের এক সময় কলকাতায় আসা, তার পর কাশীপুরে দেহাবসান ১৬ অগস্ট ১৮৮৬। শোনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ শেষ পর্বে দক্ষিণেশ্বরে ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কর্তাদের মধ্যে তেমন উত্‌সাহ দেখতে পাননি।

ইতিমধ্যে মামলা-মকদ্দমার অবসান হয়নি। মথুর, তাঁর স্ত্রী জগদম্বা ও পুত্রগণ, রানির অপর কন্যা পদ্মমণি, তাঁর তিন পুত্র এবং পরলোকগত কন্যা কুমারীর একমাত্র পুত্রকে পরিচালনার ব্যাপারে সুযোগ না দেওয়ায় বিবাদটি আদালতে যথা সময়ে গড়ায়।

কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলার শুরু হয় ১৮৭২ সালে। আদালতের রায় বেরোয় ১৮৭৫-এ। রানির শেষ দলিল অনুযায়ী তাঁর আট জন দৌহিত্র ও তাঁদের বংশধরগণ মন্দিরের সেবায়েত রূপে পরিগণিত হবেন এবং দেবোত্তর এস্টেটের পরিচালনার ভার তাঁরা বংশপরম্পরায় ভোগ করবেন।

মা কালীর মন্দিরে হাইকোর্টের ভূমিকা তখন থেকেই ধারাবাহিক ভাবে চলেছে। ১৯০৫ সালে সেবায়েত সংখ্যা ১৬/১৭ জন হওয়ায় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটা স্কিম অব ম্যানেজমেন্টের এবং একজন রিসিভার নিয়োগের আবেদন করা হয়।

হাইকোর্ট এই আবেদন মঞ্জুর করেন এবং সেই সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির জামাই, খ্যাতনামা লেখক এবং ব্যারিস্টার প্রমথ চৌধুরীকে রিসিভার নিয়োগ করেন।

নির্মলকুমার রায় লিখেছেন: পরবর্তী সময়ের আর একটি নির্দেশ, “পরিচালনার সুবিধার্থে ৩০২/১৮৭২ সালের মকদ্দমার সূত্রে দরখাস্ত করলেই তা গ্রাহ্য হবে। প্রত্যেক বার পৃথক মামলা রুজু করবার প্রয়োজন হবে না।” তাই এই ঐতিহাসিক মকদ্দমা প্রায় সার্ধশতবর্ষ পরে আজও সজীব আছে।

১৯২৩ সালে রিসিভার প্রমথ চৌধুরী পদত্যাগ করেন এবং আদালত কিরণচন্দ্র দত্তকে রিসিভার নিয়োগ করেন। কয়েক বছর পরে কিরণচন্দ্র এই পদ থেকে সরে যান এবং ১৯২৯ সাল থেকে তিন জন সেবায়েত দ্বারা গঠিত বোর্ড অব ট্রাস্টি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই ব্যবস্থা এখনও চালু আছে। এই স্কিম অনুযায়ী প্রথম তিন জন ট্রাস্টি অবসর গ্রহণ করলে, সেই জায়গায় যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁরা প্রত্যেকে ৯ বছর মেয়াদকাল ভোগ করবেন।

কয়েক জন ট্রাস্টির প্রার্থনা অনুযায়ী হাইকোর্ট ১৯৭৬-এর নভেম্বরে ভোট গণনার পদ্ধতির কিছু পরিবর্তন করেন এবং এর জন্য স্কিমের কিছু রদবদল প্রয়োজন হয়।

দু’বছর পরে (১৯৭৮) হাইকোর্ট দুজন বিশিষ্ট অ্যাটর্নিকে স্পেশাল অফিসার নিয়োগ করেন। ১৯৮৬-তে এই দুজন স্পেশাল অফিসার স্বেচ্ছায় অবসর নেন এবং নতুন নিয়মানুযায়ী তিন জন ট্রাস্টি নির্বাচিত হন। এঁদের দায়িত্বের মেয়াদ তিন বছর।

নির্মলকুমার রায় খোঁজখবর নিয়ে জানিয়েছেন, অনেক দেবালয়ের সেবায়েতরা যেমন মন্দিরের আয়ের কিছু ভাগ পান, দক্ষিণেশ্বরে সেবায়েতরা কিছু পান না।

সম্প্রতি ‘কলকাতা হাইকোর্ট সার্ধশতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ’-এ শ্রীঅহিন চৌধুরী দক্ষিণেশ্বর দেবোত্তর এস্টেট ও হাইকোর্টের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্যবহুল একটি রচনা লিখেছেন।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের খবরাখবর যাঁরা রাখেন তাঁরা বলেন, ১৯৮৬ সালে সেবায়েতরা নতুন নিয়মে বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠন করলেন এবং তখন থেকে দেবোত্তর এস্টেটের কাজ নির্বিঘ্নে আইন অনুযায়ী চলেছে এবং এই সময়ে মন্দিরের প্রশাসন যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, এখন রানির বংশধরদের সংখ্যা ১৬০০-এর থেকেও বেশি।

বলে রাখা ভাল, স্বামী বিবেকানন্দ দক্ষিণেশ্বরে শেষ আসেন ২১ মার্চ ১৮৯৭। এর পরে আর কোনও দিন সেখানে পা দেননি। স্বামীজির অনুসরণে মঠের সন্ন্যাসীরাও মন্দিরে আসতেন না। সৌভাগ্যের বিষয়, মন্দিরের অন্যতম ট্রাস্টি শ্রীকুশল চৌধুরীর দূরদর্শিতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় কয়েক বছর আগে দক্ষিণেশ্বর-বেলুড়ের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটেছে এবং মঠের সাধুরা এখন যাতায়াত করেন।

কালের আসরে স্থান করে নেবার জন্য সেকালের ধনপতিরা বিরাট ব্যয়ে নানা সত্‌কার্য করেছেন। কিন্তু তার বেশির ভাগই জনমনে স্থায়ী আসন লাভ করেনি। রানির দূরদৃষ্টি অন্যরকম, তিনি তাঁর নিয়োগপত্রের দলিলে লিখেছেন, “স্বামীর অভিলাষ-পূরণের জন্যই” দক্ষিণেশ্বরে মন্দির নির্মাণ করেন। নতমস্তকে যে সিলমোহর ব্যবহার করতেন সেখানে খোদাই করা হয়েছিল, “কালীপদ অভিলাষী শ্রীমতী রাষমণী দাশী”।

Advertisement