Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৬ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

‘কে বাবা কে মা দিয়ে কী হবে! আমার কাননবালা পরিচয়ই যথেষ্ট’

এক সময় স্থান ছিল নিষিদ্ধ পাড়ায়? পরিচারিকার কাজও করেছেন। বাবার পরিচয় জানে না কেউ! জনশ্রুতি, এ বছরটি কাননদেবীর শতবর্ষ। লিখছেন শঙ্করলাল ভট্টাচ

০৪ জুন ২০১৬ ০০:০০

কাননদেবীকে সুচিত্রা সেনের আগের জমানার ‘সুচিত্রা সেন’ বললে খুব একটা ভুল হয় না।

সেই অপরূপ মুখশ্রী!

মুহূর্তের পর মুহূর্তের পর মুহূর্ত আলো নেওয়া আর ক্যামেরার লেন্সে উদ্ভাসিত হয়ে থাকার ক্ষমতা!

Advertisement

পরের পর ছবি হিট করানো, রুপোলি পর্দা ও পর্দার বাইরেও সমানভাবে নায়িকা থাকা, ইন্ডাস্ট্রির মাথাদের কব্জায় আনা, নিজেকে প্রায় একটা ব্র্যান্ডে গড়ে নেওয়া!

এবং সর্বোপরি, কয়েক প্রজন্মের পুরুষের স্বপনচারিণী হয়ে ভেসে থাকা— সুচিত্রার কেরিয়ারের নীল নকশাই যেন তৈরি করে গেছিলেন কানন দেবী।

চাইলে সুচিত্রাকেও পরের যুগের কানন বললে সিনেমার মানহানি হয় না।

তবে দুই নায়িকার দুটো মস্ত ফারাকও আছে। সুচিত্রা, তখন রমা, ওঁর পাবনার জীবনে গান গাইলেও এবং নায়িকা জীবনে এক সময় একটা বেসিক বাংলা আধুনিকের ডিস্ক করলেও নিজের প্লে-ব্যাক কখনও করেননি। সে-কাজ করেছেন সন্ধ্যা, গীতা।

কানন কিন্তু একাই এক নিখুঁত, অতুলনীয় প্যাকেজ। আর গান বলে গান! কার নয়? আর হায়, কী গান! কী বাংলায়, কী হিন্দিতে। রবীন্দ্রনাথ সিনেমায় তাঁর গানের চিত্ররূপ অনুমোদন করলে সেই প্রথম গানটি ছিল কাননের— ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে’।



রবীন্দ্রনাথ বললেন, কী সুন্দর মুখ তোমার

গান নিয়ে করা প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবি দুরন্ত হিট হওয়ার পর হিন্দুস্তান রেকর্ডজে কবিকে প্রথম দেখা কাননের।

প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘এ হল কানন, তারকা অভিনেত্রী।’’ কানন প্রণাম করতে রবীন্দ্রনাথ ওঁর ঠোঁট ছুয়ে বলেছিলেন, ‘‘কী সুন্দর মুখ তোমার! গান করো?’’

এ ঘটনা ‘বিদ্যাপতি’ ছবির সময়কার। কবির মনে ছিল না এই মেয়েটিই ‘মুক্তি’-তে ওঁর গান গেয়েছে। প্রশান্তচন্দ্র তখন যোগ করলেন, ‘‘ও তো আপনার গান গেয়েই বিখ্যাত।’’ রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন, ‘‘তাই? তা হলে একবার শান্তিনিকেতনে এসে গান শুনিয়ো আমাকে।’’

সেই সৌভাগ্য কাননের আর হয়নি।

কে বাবা, কেউ জানে না

সুচিত্রার সঙ্গে কাননের দ্বিতীয় প্রভেদ ওঁদের জন্ম, শৈশব, কিশোরীকাল ও সিনেমায় আসা।

পাবনার মেয়ে সুচিত্রার পরিবার অবস্থাপন্ন, পড়শুনো, বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত বাঙালি স্টাইলে, উচ্চবিত্ত পরিবারে বিয়ে, কিন্তু একেবারে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সিনেমায় নামা।

কাননের সেখানে বাবার পরিচয় কেউ জানে না।

কাননের সেখানে জন্মের সন-তারিখেরই ঠিক নেই। কে বাবা, কেউ জানে না। কোথায় জন্ম, ঈশ্বর জানেন।

কোনও তথ্যই যেখানে নেই সেখানে মতামত নিয়েই চলতে হয়।

যেমন এক মতে স্থির হয়েছে কানন দেবীর জন্ম ২২ এপ্রিল, ১৯১৬। আরেক মতে— যা আরওই সম্ভাব্য— সালটা ১৯১২।

এ ভাবেই জন্মস্থানও স্থির হয়েছে কলকাতার কাছেই— হাওড়া।

আর কাননের কষ্টের বেড়ে ওঠা?

তা তো ভাষায় আনা যায় না। তিনি নিজেও সেটা পারেননি সন্ধ্যা সেনকে শোনানো ওঁর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’-তে।

দুঃখ জয় করা গেলেও তার বিবরণ দেওয়া বিপত্তি। নানা লেখায় ছড়িয়ে থাকা ওঁর মেয়েবেলার কথা

পড়তে পড়তে কখনও কখনও মনে হয়েছে গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ‘কলকাতার কাছেই’ উপন্যাসের পাতা ওল্টাচ্ছি।

আর কখনও কখনও— বুকে হাত রেখে বলছি, এতটুকু বাড়াবাড়ি না করে— মনে হয়েছে চ্যাপলিনের ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’-র পাতায় ঢুকেছি। মা নেই, বাবা নেই, খাওয়া-পরা নেই, ঝি-গিরি করে, দোরে দোরে মাথা ঠুকে, কানন থেকে কাননবালা তার পর কাননদেবী হওয়া বাংলা সিনেমার সব চেয়ে আশ্চর্য সাফল্য গাথা। যা সিনেমা করে দেখালেও বাংলা বায়োস্কোপের বাড়াবাড়ি মনে হবে।



পাশে মহানায়িকা

দর্জির মেয়ে, নাকি বাঈজির

গল্পগাছা, শোনা কথা ছাড়া কাননের মেয়েবেলায় ঢোকার উপায়ই বা কী?

এই সব ছড়ানো বৃত্তান্ত এক জায়গায় এনে সম্ভাব্যের একটা তালিকা দিয়েছেন মেখলা সেনগুপ্ত তাঁর ‘কানন দেবী: দ্য ফার্স্ট সুপারস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা’ বইয়ে। যা এই রকম দাঁড়ায়...

এক বৃত্তান্তে জানা যাচ্ছে, বালিকা কাননকে প্রথম পাওয়া যায় হাওড়ার এক গরিব পাড়ায়।

হাওড়ার এক কনভেন্ট স্কুলে ওর নাম লেখানো হয়েছিল, কিন্তু মাইনে জোগানো যায়নি বলে বার করে আনতে হয়।

আরেকটিতে আছে যে ওকে শিশু অবস্থায় আনা হয় ভাগলপুরে গঙ্গা তীরবর্তী রাজবাটী আদমপুরের পোস্তা বাগানবাড়িতে। সেটা ছিল স্ববর্ণিত ‘রাজা’ শীলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি। ভদ্রলোক পেশায় উকিল।

শিশু কাননকে ওঁর কাছে আনা হয় কলকাতার হাড়কাটা গলি থেকে। এবং পাঁচ-ছ’বছর বয়েসে কলকাতায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় বায়োস্কোপে নেমে কিংবা গান গেয়ে রুজি দেখতে।

অন্য শ্রুতি আছে বাবা দর্জি। মা বাঈজি। কোথাও বলা হচ্ছে ওকে কলকাতায় আনা হয় ওর গানের গলা দেখে, কিন্তু পেট চালাতে হচ্ছিল বাড়ি-বাড়ি পরিচারিকার কাজ করে। সেই আয়ে গান, নাচও চালিয়েছে।

এই সব সম্ভাবনার যে-কোনটি সত্যি হতে পারে।

লগন-এ কে এল সায়গলের সঙ্গে

রাজবালা, রতনচন্দ্র ও কানন

একটি শ্রুতি কোনও ভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তা হল কাননকে প্রতিপালন করেছেন রাজবালা দেবী ও রতনচন্দ্র দাস।

কানন দেবী ওঁর আত্মকথায় ওঁদেরই মা ও বাবা বলে উল্লেখ করছেন। অমিয়া নামে এক দিদির কথাও বলছেন। কিন্তু বলছেন না বাড়িটা কোথায় ছিল বা কোন ধরনের মানুষের আনাগোনা ছিল সেখানে।

রাজবালা নাকি নানা ঠিকানায় কাজের লোক ছিলেন, কাননকে ওঁর জিম্মায় রাখা হয়েছিল বড় করে তোলার জন্য। এই করতে করতে ওর মা বনে যান। কিন্তু কাননের জন্মদাত্রী মা ছিলেন না।

কানন দেবী মেনে নিয়েছিলেন যে ওঁর মা ও বাবার হয়তো বিয়েই হয়নি কখনও। তাঁরা সহবাস করেছেন শুধু। বলেছেন, ‘‘কে বাবা, কে মা, এই ভেবে বুকের ব্যথা বাড়িয়ে কাজ কী? আমি কানন, এই পরিচয়টুকুই তো যথেষ্ট।’’

রতনচন্দ্রের টাকা ডুবেছিল রেসে। সঙ্গে তাসের জুয়ো ও মদ্যপানও ছিল। মার্চেন্ট অফিসে চাকরি ও একটা সোনার দোকান ছিল ওঁর। নিজের ফিটন হাঁকিয়ে বেড়াতেন। এই করে অকালে গতও হলেন এবং রাজবালাকে হঠাৎ করে নেমে আসতে হল পরিচারিকার জীবনে, কারণ রতনচন্দ্রের আত্মীয়রাই হাতিয়ে নিল তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি।

তবে ওই সীমিত ক’বছরের প্রতিপালনে কাননের মধ্যে দু’দুটো টান তিনি সৃষ্টি করে গেছিলেন। বইয়ের প্রতি আর গানের দিকে।

কানন তখনও পড়তে শেখেনি, রতনচন্দ্র বই কিনে এনে ওকে পড়ে শোনাতেন। আর ওকে গান শোনানোর জোগাড়যন্ত্র করতেন। সেই সব গল্প ও গান শুনে শুনে বালিকার অভ্যেস তৈরি হল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নেচে গেয়ে নায়িকা সাজা।

রতনচন্দ্রের সম্পত্তির কানাকড়িও জোটেনি রাজবালার, কারণ তিনি তো রক্ষিতা মাত্র! কিন্তু গায়ের গয়না, ঘরের আসবাব বেচে ও টুকিটাকি জমানো টাকা দিয়ে শুধতে হল ‘বাবু’র অঢেল ধার।

ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় প্রফুল্লচন্দ্র সেনের হাতে,

সোনার গয়না তুলে দিচ্ছেন কাননদেবী

বাবুর বাড়ির কাজের মেয়ে

কাননকে ইস্কুল ছাড়িয়ে লাগানো হল ধনীগৃহে রান্না, ঘর ঝাড়া, ঘর নিকানো, কাপড় কাচার কাজে। পড়াশুনো দূরস্থান, একটু আধটু খেলার সময়ও নেই, খাওয়া জোটে এক বেলা, তাও চাট্টিখানি ভাতের সঙ্গে ডাঁটার সবজি, কচুঘেচু ইত্যাদি!

বহু পরে পুত্রবধূ রুবিকে বলেছিলেন যে পেটে খিদে সারাক্ষণ চড়ে থাকত।

খাটাখাটুনিতে রাজবালার শরীরস্বাস্থ্য চেহারা দিনকে দিন ক্ষয়ে শুকনো হল, কিন্তু না খেয়ে, শুকিয়ে শিটিয়েও কাননের পরির মতো রূপে আঁচড়টি পড়ল না।

তবে কানন স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেন যে, দুঃসহ পরিস্থিতির সামাল দিতে ওদের এক সময় উঠতেই হল চন্দননগরে এক অবস্থাপন্ন আত্মীয়ের বাড়ি।

আত্মীয়ই বটে, যে দিন ওরা গিয়ে উঠল সে দিনই ওরা বাড়ির কাজের লোকেদের বিদেয় করে দিলেন!

কারণ নতুন কাজের লোক তো এসেই গেছে না?

কাননদেবী তাঁর এই আত্মীয়দের নাম জানাননি, যদিও ওখানে মা-মেয়ের উদয়াস্ত ঝিগিরির নিটোল বর্ণনা দিয়েছেন। ওঁর পুত্রবধূর অবশ্য দৃঢ় ধারণা ওই আত্মীয় কাননেরই দিদি অমিয়া।

ওই বাড়িতে মা-মেয়ের কাজের বহর আর গালমন্দ শোনার রুটিন বাঁধিয়ে রাখার মতো। তার পর এক দিন রাজাবালার হাত থেকে একটা রেকাব ছিটকে পড়ে ভাঙামাত্র গালাগালির ঝড়। কানন তখন রাজবালার হাত ধরে বলেছিল, ‘‘না, মা, আর একটা দিনও এখানে নয়। এক্ষুনি চলো। না খেয়ে মরলে মরব।’’

সেখান থেকে বেরিয়ে হাওড়ার যে-ঘোলাডাঙ্গা পল্লিতে আস্তানা হল কানন ও রাজবালার সেটা তখন ছোট ব্যবসায়ীদের আড়ত। সেখানে সংসার করা লোকজনের বাড়ির সামনে বোর্ড ঝুলত— ‘এটা গৃহস্থের ভিটা’। কে জানে, পাশের বাড়িটাই হয়তো বারবনিতাদের।

ঘোলাডাঙ্গা নিয়ে কানন দেবীর কথা আছে: ‘‘চারপাশের পরিবেশে শ্বাস নিতে অসুবিধে হত।’’

কিন্তু এখানেও বড় করে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা হয়েছিল কাননের।

এক রোগাসোগা মধ্যবয়সি বিপত্নীক ভোলাদা। সন্ধেকালে তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসে ভক্তিগীতি ধরলে একটা নতুন জগৎ খুলে যেত কাননের। কাননকে তিনি একে একে ধরাতে থাকলেন কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি, কর্তাভজা, মীরা ও সুরদাসের ভজন, সংস্কৃত মন্ত্র, ব্রহ্মসঙ্গীত এবং অতুলপ্রসাদের গান। এক সময় লালনের গান এল। কানন শুধোতে লাগল, ‘‘এর মানে কী, ভোলাদা?’’ ভোলাদা মানে বোঝাতে লাগলেন।

এক দিন সহসা আর জিজ্ঞাসার সুযোগ রইল না। ভোলাদা নিজেই কোথায় যে হারিয়ে গেলেন ইঙ্গিতটুকুও না দিয়ে।

তখন কাননের আশ্রয় হলেন সেকালের এক অতি আশ্চর্যময় কণ্ঠের গায়িকা আশ্চর্যময়ী দাসী। কাননদের বাড়ির পাশেই থাকতেন, মেয়েটির অপরূপ রূপ আর অপূর্ব কণ্ঠ ওঁকে টানল। নতুন নতুন রেকর্ড করা আশ্চর্যময়ী কাননকে গানের জগতে টানার জন্য তালিম দিতে লাগলেন। মন ভাল করার জন্য তখন ওঁর ওখানে না গেলেই নয় কাননের।

এই বৃত্তান্তও কিন্তু জনশ্রুতি। কারণ কানন দেবীর স্মৃতিচারণায় এই মহিলাকে উল্লেখ করা হচ্ছে কেবলই ‘বৌদি’ বলে।

এই বৌদিই আশ্চর্যময়ী দেবী? যা বয়ান জোগাড় হয়েছে এত দিনে, তারা সবাই এ প্রশ্নে নিরুত্তর।



কাননবালা

রাইচাঁদ ও কানন

কানন দেবী শুধু বায়োস্কোপের যুগের স্বপ্নসুন্দরী বললে কিছুই বলা হয় না। তাঁর জীবন শুরু নির্বাক ছবির আগের যুগে।

যে-বছর জীবনের প্রথম রোল পেল কানন ‘জয়দেব’ বায়োস্কোপে সেই ১৯২৬ সালটার একটা তাৎপর্য আছে।

সেই বছরই ওয়ার্নার ব্রাদার্স পৃথিবীর প্রথম টকি বা সবাক ছবি আনল বাজারে। ‘ডন জুয়ান’। সবাক, তবে কোনও সংলাপ নেই, কণ্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতে মোড়া।

এই প্রসঙ্গে আমার নিজের একটা স্ম়ৃতির কথা বলি।

১৯৭৩-এ কলকাতার কলামন্দির হলে যে-সতেরো দিন ব্যাপী উস্তাদ হাফিজ আলি খান সঙ্গীত উৎসব হল। তার স্মারকপত্রের জন্য একটা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম খান সাহেবের শিষ্য রাইচাঁদ বড়াল মশাইয়ের কাছে।

খান সাহেব সম্পর্কে অপূর্ব সব গল্প শোনানোর শেষে সাবেক যুগের দু’জন তুলনাহীন গায়িকার কথা বলে আমাকে চিরকালের মতো কৃতার্থ করে রাখলেন।

তাঁদের একজন মুশতারি বাই। রাইবাবুর ক্লাসিক আসবাব ও অভিজাত বৈঠকখানায় ঢোকার মুখে দেওয়াল শোভা করে যাঁর রূপে টস টস করা ছবি।

অন্য জন কানন দেবী।

কিন্তু রাইবাবু স্নেহের সুরে বলতেন কানন। ওঁদের একটা প্রণয়ের সম্পর্কের কথা শুনে আসছি সেই ছেলেবেলা থেকে।

দু’জনকে নিয়েই রাইবাবুর খুব বড় দম্ভ। মুশতারি যে বার প্রথম কলকাতা এলেন এবং বড়াল বাড়ির গানের বৈঠকে গাইলেন সে-আসর অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর প্রথম ওবি বা আউটসাইড ব্রডকাস্ট।

সন্ধেবেলার সেই আসর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বসে শুনে তো রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ।

ফোন করে রাইবাবুকে বললেন, ‘‘ও রাই, এ কী গান শোনালে আজ! দেবীকে একবার চোখের দেখাটি দেখাও।’’

পর দিন সকালে একটা দশ ফুট লম্বা গোড়ের মালা নিয়ে মুশতারি রাইবাবুর সঙ্গে কবি সন্দর্শনে গিয়েছিলেন।

আর কাননকে দিয়ে রাইবাবু বাংলা ছবিতে প্রথম লাইভ গাওয়ালেন। বললেন, ‘‘সংলাপের মতো গানটা গেয়ে গেল কানন। কোনও যন্ত্র নেই, কিছু না। অথচ ওই এক টেকেই নিখুঁত। যন্ত্র ছাড়া এ ভাবে আর গাইতে পারত সায়গল।’’

বলেছিলাম, ‘‘সে-ও আপনারই আবিষ্কার।’’

হেসে মাথা নেড়ে রাইবাবু বললেন, ‘‘আবার কী! ওই সায়গল আর কানন আর হবে না।’’

যা হোক, আবার ‘জয়দেব’-এ ফিরে আসা যাক।

‘জয়দেব’-এর পর আরেকটা ছোট্ট রোল পেয়েছিল কানন ‘শঙ্করাচার্য’ (১৯২৭) ছবিতে, গোড়ায় যার পরিচালনায় ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সংক্ষেপে ডিজি।

মধ্যিখানে ডিজি কাজ ছেড়ে চলে গেলে তড়িঘড়ি ছবি শেষ করেছিলেন কালিকাপ্রসাদ ঘোষ। ছবিও তড়িঘড়ি পাততাড়ি গুটিয়েছিল হল থেকে। কাননের কপালেও পুরো পারিশ্রমিক জোটেনি বলে অনুমান অনেকের।

এর পর তো টানা বেশ কয়েক বছর হাতে কাজ নেই। কাজে ফিরতে ফিরতে পেরিয়ে গেল অনেকগুলো বছর। সে গল্প অন্য (বক্স-এ দেখুন)।



হাঁটু অবধি পা, প্রেক্ষাগৃহে গোলমাল

জীবনের শেষ দিন অবধি যে-ভূমিকা না করার হতাশা ছেড়ে যায়নি কানন দেবীকে তা হল প্রথমেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’-এ পার্বতীর।

সেটা সেই সময়ের ঘটনা, যখন রাধা ফিল্ম কোম্পানিতে কাননবালা চুক্তিবদ্ধ।

নিউ থিয়েটার্স-এর জন্য ছবিটা করেছিলেন প্রমথেশবাবু। ওঁর ছবিতে ডাক পাওয়া তো কাননের নানা স্বপ্নের একটা। সেই প্রমথেশবাবুই এক দিন দেখা হতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আমি চাই তোমাকে দিয়ে পার্বতী করাতে, যদি পারো।’’

কানন বলেছিলেন, ‘‘ধন্যবাদ বড়ুয়া সাহেব। এ তো আমি চাই-ই! তা বলে কোম্পানির সঙ্গে এক বার কথা বলে দেখি।’’

রাধা ফিল্মস সে-ঝুঁকি নেয়নি, ফলে কাননেরও পার্বতী হওয়া হয়নি। ‘দেবদাস’ একাধারে ক্লাসিক এবং হিট হওয়ার পর কানন সাধুবাদ জানান প্রমথেশকে। তাতে বাঙালি জীবনে প্রায় মূর্ত দেবদাস (তদ্দিনে টিবি ধরা পড়েছে, কিন্তু মদ্যপান থামেনি) প্রমথেশ বলেছিলেন, ‘‘আমার অন্য পরিকল্পনাও আছে তোমাকে নিয়ে। দেখো, তখন পিছিয়ে যেয়ো না।’’

প্রমথেশবাবুর সেই অন্য পরিকল্পনা ছিল ‘মুক্তি’। যেখানে ছবিতে প্রথন গান এল রবীন্দ্রনাথের। গাইলেন কানন। ছবি তো দেদার হিট। বলা শুরু হল এবং হতেই থাকল যে কাননের এই হল সেরা অভিনয়।

সেই সঙ্গে একটা কাণ্ডও ঘটেছিল শহরের এক প্রেক্ষাগৃহে। ছবিতে কাননের পা হাঁটু অবধি দেখানোয় ক্ষিপ্ত জনতা হলের সিট ভাঙাভাঙি শুরু করেছিল।

সেটা কতখানি রাগ বা কতটা যৌবনের আবেগ, কে জানে! সালটা তো ১৯৩৬।



প্রেম বিয়ে বিচ্ছেদ

কানন দেবী তাঁর আত্মজীবনীতে একটি নাম উচ্চারণই করলেন না।

তাঁর প্রথম স্বামী অশোক মৈত্রের!

এক অতীব অকিঞ্চিৎকর পরিস্থিতি থেকে এই বিয়ে হয়েছিল আভিজাত্যে ওঠার এক স্বর্গীয় সিঁড়ি। কারণ শ্বশুরবাড়ি মৈত্র পরিবার ছিল বাঙালি সমাজের ক্রেম দ্য ল্য ক্রেম। মান্যতার ফিরিস্তিটা একবার শুনুন...

অশোক অক্সফোর্ড ফেরত। দেশে ফিরে কবির বিশ্বভারতীতে পড়ানো শুরু করেছেন। ওঁর পাশাপাশি তখন ওখানে পড়াচ্ছেন বলরাজ সাহনি।

অশোকের বোন রানীর বিয়ে হয়েছিল সংখ্যাতত্ত্ববিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে।

আর বাবা?

এই এক মহৎ পরিচয় ও বৃহৎ সমস্যা। তিনি ব্রাহ্ম সমাজের দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা ও সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হেরম্বচন্দ্র মৈত্র।

হেরম্বচন্দ্র সম্পর্কে চমৎকার গল্প আছে শিক্ষিত মহলে। তার একটা হল তিনি শ্যামবাজারের রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। এক ছোকরা ওঁকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, স্টার থিয়েটারটা কোন দিকে?’’

থিয়েটার হলের খোঁজ চাওয়ায় রাগে গরগর হেরম্বচন্দ্র বললেন, ‘‘জানি না!’’ বলেই হেঁটে চললেন।

খানিক গিয়েই দোটানায় পড়লেন নীতিবাদী অধ্যাপক। সে কী, একটা নির্দেশ দেবেন না বলে মিথ্যে বললেন!

সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ফিরে ছোকরাকে গিয়ে ধরলেন আর বললেন, সেই নীতিবাদী টোনে— ‘‘জানি, কিন্তু বলব না!’’

হেরম্বচন্দ্রের অন্য গল্পটাও অদ্ভুত। কলেজে অপূর্ব নিষ্ঠা ও আবেগে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়ান অধ্যাপক। হঠাৎ এক দিন কবির জীবনীতে হোঁচট খেলেন একটি তথ্যে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর সৎ বোন অগাস্টার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে ছিলেন!

ব্যস, সে দিন থেকে তাঁর প্রিয় কবির কবিতা পড়ানো বন্ধ করে দিলেন।

বলা বাহুল্য, জীবনের শেষ দিন অবধি কাননের সঙ্গে পুত্রের বিবাহ মেনে নেননি হেরম্বচন্দ্র। তাই ওঁর জীবিত কালে অশোক, কাননের সম্পর্ক থাকলেও বিয়ে হয়নি।

অশোক ও কাননের প্রথম আলাপও যেন বায়োস্কোপ থেকে তোলা।

অশোক শান্তিনিকেতনে পড়ান। আর ফুরসত হলেই কলকাতা চলে আসেন ফুর্তির খোঁজে। সাহেবি আমলের কলকাতা বলে কথা!

অশোক রাইফেল হাতে পাকা শিকারি। এক সময় ওঁর মন গেল প্রণয়ের শিকারে। ওঁক কল্পনা ও আবেগ জুড়ে তখন একটাই মুখ, একটাই মানুষ।

কাননবালা!

তো এক বার কলকাতা সফরে অঢেল পান হল্লার পর নেশায় চুর অশোক বলেই দিলেন, ‘‘এখন এই সন্ধ্যায় চাওয়া-পাওয়ার কী-ই বা বাকি রইল, শুধু কাননকে পাশে পাওয়া ছাড়া।’’

সঙ্গীসাথীরা বন্ধুর এই বাসনাটুকুও বাকি রাখতে চায়নি। তাই ওঁকে প্রায় বেহুঁশ অবস্থায় বৌবাজার পল্লির কাপালিতলা লেনে কাননের বাড়ির দোরগোড়ায় ফেলে চম্পট দেয়।

সুদর্শন, সুবেশ, নিদ্রিত পুরুষটিকে বাড়ির বাইরে ভোরবেলা আবিষ্কার করেন কাননই।

ওঁর মাথাটা তুলে নিয়েছিলেন নিজের কোলে। আধো ঘুম ও খোঁয়ারির মধ্যে চোখ মেলে নায়িকাকে দেখে অশোকের মনে হয়েছিল স্বপ্নেই আছেন।

কানন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘আপনি কে? কেমন করে এখানে আসা হল?’’

অশোক তখন নাকি চোখ মুদে বলেছিলেন, ‘‘চলে যান, স্বপ্ন ভাঙবেন না। আমি এখন কানন বালার সঙ্গে আছি।’’

বলা বাহুল্য, এর পর অশোক-কাননের প্রেম দানা বাঁধতে সময়ে নেয়নি। কিন্তু বিয়ে করা যাচ্ছে না, চিনের প্রাচীরের মতো সম্মুখে হেরম্বচন্দ্র।

ওঁরা রাজভবনে হাতার মধ্যে এজরা ম্যানসনে মিলিত হতে লাগলেন। এ ছাড়া সিনেমা দেখা ছিল। আর সময় হলেই গাড়ি হাঁকিয়ে লং ড্রাইভ। কত যে ট্রিপ হয়েছে এ ভাবে! শুধুই ফলতা বন্দর! যাওয়া হয়েছে কাশিমবাজার, মুর্শিদাবাদ। হাঁটা হয়েছে নিজামত ইমামবাড়া চত্বরে।

কাননদেবী লিখেছেন: ‘‘আমি সামাজিক স্বীকৃতিকেই আমার প্রেমের মুকুট করতে চেয়েছিলাম। সেটা পেলামও। কারণ ও-ও বিয়ে চেয়েছিল।’’

কাননকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন অশোকের মা কুসুমকুমারী দেবী। সুন্দর সম্পর্ক হয়েছিল রানী ও প্রশান্তচন্দ্রের সঙ্গে, তবু অপেক্ষা করতে হয়েছিল হেরম্বচন্দ্রের মৃত্যু অবধি। সে-বিয়ে হল ১৯৪০-এর ডিসেম্বরে। অশোকের বয়স যখন ছত্রিশ, কাননের পঁচিশ।

অনুরাগীদের আশঙ্কা ছিল ১৯৩৯-এ গায়িকা-নায়িকা উমাশশী যেমন বিয়ে করে গান ও অভিনয় ছেড়েছেন কাননও হয়তো তাই করবেন।

আর কানন সেটা করলেন না বলেই কালো মেঘ জমল সম্পর্কের আকাশে। কানন দেবী স্বীকার করে গেছেন যে, যে-অশোককে তিনি দেবতার মতো পুজো করেছেন, ওঁর সংস্পর্শে এসে জীবনের রূপরসগন্ধের স্পর্শ পেয়েছেন, পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গে দীক্ষা পেয়েছেন, জেনেছেন ভালবাসা কারে কয়, সেই ঘরের মানুষটিই বিবাগী হয়ে গেল স্ত্রী যে-কাজটা ভালবাসে সেটাই করে বলে!

তখনকার অভিনেত্রীদের বিবাহিত জীবনে অবিরত যেটা হত, তাই হল কাননের জীবনে। পাঁচ বছরের মধ্যে বিয়ে ভাঙল।

অশোকের বরাবর ধারণা ছিল, কানন যে শেষ অবধি ডিভোর্স ফাইল করেছিলেন, সেটা রানী ও প্রশান্তচন্দ্রের পরামর্শে। অশোক মামলা কন্টেন্ট করেননি।

এত শ্রদ্ধা ও ভালবাসা যে অশোক মৈত্রর প্রতি, তাঁর নামই কেন করলেন না কানন দেবী তাঁর জীবনীতে?

বলা মুশকিল এবং উত্তরও নেই।

দ্বিতীয় বিয়ে হতেই কেচ্ছা শুরু

আমরা কানন দেবীর যে অতি রূপবান, ভারী ভদ্র, উচ্চমনা ও রসময় স্বামীটিকে দেখেছি, তিনি হরিদাস ভট্টাচার্য।

সত্তর দশকের শেষ দু’বছর এবং আশির দশকের শুরুর বছর খানেক ওঁকে কয়েক বার দেখেছিলাম আনন্দবাজারের অপিসঘরে।

স্নিগ্ধ, সুপুরুষ প্রৌঢ় এসে বসতেন গৌরকিশোর ঘোষের টেবিলে। আমারও একটা জায়গা ছিল সে-ঘরে তখন।

প্রথম দিন গৌরদা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘কী রে, চিনিস এঁকে?’’

বললাম, ‘‘আলাপ হয়নি। তবে চিনি।’’

সঙ্গে সঙ্গে হরিদাসবাবু পিছনে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী করে চিনলেন?’’



বলেছিলাম, ‘‘আপনার করা ছবি দেখে।’’

বাড়াবাড়ি করছি না, কিন্তু সে দিন ওই কথায় ওঁর সোনালি ফ্রেমের চশমা ও কাঁচাপাকা চুলের (বেশিটাই পাকা) সুন্দর মুখে যে ভাললাগার ছোঁওয়া দেখেছি, তা ভোলার নয়। গৌরদাও পরে বলেছিলেন, ‘‘তুই যে শুধু কানন দেবীর বর বলে ওঁকে চিনিস না, সেটা ওঁর ভাল লেগেছে।’’

১৯৪৯-এ কানন দেবীর বর হওয়ার আগে থেকেই কিন্তু হরিদাস ভট্টাচার্য কেউকেটা।

যখন বিয়ে হচ্ছে, তখন তিনি ক্যাপ্টেন হরিদাস ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ড. কৈলাসনাথ কাটজুর এডিসি। কলকাতার মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলারদের এক। মেয়েরা ওঁকে বর আর তাদের মায়েরা ওঁকে জামাই করতে চায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন এই যুবকের চোখ পড়ল কাননবালার ওপর।

হরিদাস ওঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন....

‘‘এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম ড. কাটজুর সঙ্গে। সেখানেই দেখা কানন বালার সঙ্গে। প্রায় বাধ্য হয়েই সেখানে এসেছিল ও। সারাক্ষণ মঞ্চে থেকেও একটি কথাও বলেনি।’’

এর পর দ্বিতীয় দেখা রাজভবনে গান গাইতে এলেন যখন কানন। সেই আমন্ত্রণও হরিদাসই জানিয়েছিলেন।

এর পর ফের সাক্ষাৎ যখন নায়িকার ছবির শ্যুটিঙের পারমিশন জোগাড় করে দিলেন রাজ্যপালের এডিসি। কারণ লোকেশন হল সরকারি ঘেরাটোপের ফলতা। কাননের প্রেমের সঙ্গে আবার জুড়ে গেল ফলতা।

কানন দেবী বলেছেন যে, একজন জীবনসঙ্গীর কাছে যা কিছু তাঁর চাওয়ার ছিল, সবই পেয়েছিলেন হরিদাসের কাছে।

সব চেয়ে বড় পাওয়া হরিদাসের মনের জোর। কাননের অতীত নিয়ে কোনওই প্রশ্ন বা কৌতূহল ছিল না ওঁর।

বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে যা চর্চা লেগে গেল এবং কাগজপত্রে যা লেখালেখি শুরু হল তাতে বিয়ে টেকানো তো তিন দিনের প্র্যাকটিসে ট্র্যাপিজের খেলায় নামার সামিল।

কাননের বুকটা দমে যেত হরিদাসের কথা ভেবে। কিন্তু হরিদাসকে টলায় কে! তোয়াক্কাই করলেন না এই সব কেচ্ছার কেত্তনের।

বর-বৌয়ের সব ব্যাপারেই যে মতের মিল একই রকম। হরগৌরী যোগ, তাও নয়। কিন্তু ওঁদের সুন্দর ভাবে বেঁধে রাখল তিনটে জিনিস— ভেতরের টান, বাগানের নেশা আর সিনেমার প্রেম।

কানন ও হরিদাসকে নিয়েই একটা স্বতন্ত্র বৃত্তান্ত হয়, এবং সে-জন্য কানাঘুষোর ওপর নির্ভর করতে হয় না। ওঁদের দ্বৈত পরিচালনার শ্রীমতী পিকচার্সের ছবি তো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে জায়গা নিয়েছে।

প্রযোজিকা হিসেবে কানন দেবী এবং পরিচালক হিসেবে হরিদাস ভট্টাচার্য এক দুরন্ত হিট জুটি।

শ্রীমতী পিকচার্সের প্রথম হিট ‘মেজদিদি’-তে হরিদাস সহ পরিচালক। তিনি স্বাধীন ভাবে পরিচালনায় এলেন ‘নববিধান’ ও ‘দেবত্র’-য়। ‘দেবত্র’-য় একবারই মাত্র কানন দেবী, উত্তম ও সুচিত্রা ত্রয়ী এক সঙ্গে পর্দায় এলেন।

তবে হরিদাস ভট্টাচার্যকে আমরা ভুলিনি, ভুলব না, ‘আঁধারে আলো’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত ও অন্নদাদি’, ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’ এবং থ্রিলার ছবি ‘শেষ অঙ্ক’-র জন্য।

আর কানন দেবীকে তো বাঙালি প্রেমে পড়ে, নিন্দে করে, ভালবেসে, গাল পেড়ে, তার পর বুকে ধরে কাটিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগের পর যুগ।

‘আমি বনফুল’ গেয়ে বাঙালিকে এক কালে মাতিয়েছিলেন যে-নায়িকা তাঁকে আর প্রশ্ন করার ছিল না ‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা’?

শেষ দিন অবধি অবশ্য হরিদাস ও কানন একসঙ্গে থাকতে পারেননি। ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল।

যদিও তার মাত্র ক’বছর আগে কানন দেবী আত্মকথায় লিখছেন, ‘‘যখন হরিদাস ভট্টাচার্যকে বিয়ে করি তখন লোকের ধারণা ছিল এ বিয়ে পনেরো দিন টিকলে হয়। সেই বিয়েই তো চব্বিশ বছর টিকে গেল।’’

১৯৭৭-এর জানুয়ারিতে হরিদাস ও কানন জোড়ে গিয়েছিলেন দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে। কানন দেবী সে দিন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার নিলেন।

আর ১৯৮৯ সালের এক দিন ওঁর টাকাপয়সা, কাগজপত্র, শখের পিস্তল ও রিভলভার গুছিয়ে হরিদাস ওঁদের ১নং রিজেন্ট গ্রোভের বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।

কিছু দিনের মধ্যে কানন দেবীও ১৭ জুলাই, ১৯৯২-এ বেল ভিউ ক্লিনিকের এক নির্জন কেবিনে প্রায় চুপি চুপি সংসার ছেড়ে চলে গেলেন।

সেই কেবিনের আশেপাশের কোনও একটিতে বছর কুড়ি বাদে জীবন শেষ করলেন সুচিত্রা সেনও।

ওপর তলায় বসে এ সব স্ক্রিপ্ট কে লেখে কে জানে!

যত দোষ বাংলা বায়োস্কাপের!



Tags:

আরও পড়ুন

Advertisement