E-Paper

একসূত্রে রচনা করেছেন ভিন্ন মনন

রানী দে’র জন্ম ঢাকার বিক্রমপুরে। তাঁর বাবা কুলচন্দ্র দে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অল্প বয়সে পিতৃহারা মেয়েটি কবির উৎসাহে কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে আসেন এবং নন্দলাল বসুর কাছে ছবি আঁকার শিক্ষা গ্রহণ করেন।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:০৯
প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

সম্প্রতি ‘গ্যালারি ৮৮’-তে শিল্পী রানী চন্দের একটি প্রদর্শনী— ‘অ্যাপেন্ডস: ওয়ার্কস ইন রেসপন্স টু রানী চন্দ’স লিনোকাটস’ আয়োজিত হয়েছিল। ললিতকলা অ্যাকাডেমির তৃতীয় ‘প্রিন্ট বিয়েনাল’-এর অংশ হিসেবে রানী চন্দের ২৫টি লিনোকাট তো ছিলই। এ ছাড়া রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের তৈরি আর‌ও ৫০টি সাদা-কালো লিনোকাট নিয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন ড. পলা সেনগুপ্ত, রবীন্দ্রভারতীর গ্ৰাফিক্স বিভাগীয় প্রধান এবং শিক্ষক। রবীন্দ্রভারতীর গ্ৰাফিক্স বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের শিক্ষক সুজয় মুখোপাধ্যায় এবং অন্যান্য শিক্ষকদের নির্দেশনায়, রানী চন্দের অনবদ্য শিল্পকলার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েই শিক্ষকদের সঙ্গে এই প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছেন।

রানী দে’র জন্ম ঢাকার বিক্রমপুরে। তাঁর বাবা কুলচন্দ্র দে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অল্প বয়সে পিতৃহারা মেয়েটি কবির উৎসাহে কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে আসেন এবং নন্দলাল বসুর কাছে ছবি আঁকার শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার আগে কলকাতায় অবন ঠাকুরের কাছেও শিল্প-শিক্ষা পেয়েছিলেন। পরে কবি তাঁর সেক্রেটারি অনিল চন্দের সঙ্গে নিজে পৌরোহিত্য করে রানীর বিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

এখানে ২৫টি ছবির যে পোর্টফোলিয়ো আমরা দেখতে পেলাম, সেটি তাঁর বড় দাদা মুকুলচন্দ্র দে ছেপেছিলেন ১৯৩২ সালে। রানী চন্দের ভূয়সী প্রশংসা করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি ভূমিকা লিখেছিলেন। সেটিও এই প্রদর্শনীর অংশ।

রানী চন্দ শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত জেল খেটেছিলেন। রাজবন্দি হিসেবে তাঁর কারাজীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতার কথা লিখে রেখে গিয়েছেন, ‘জেনানা ফাটক’ নামে বইয়ে। রানীর লিনোকাট ছাড়াও, এই ব‌ইটি থেকে প্রেরণা সংগ্ৰহ করে আজকের শিক্ষক এবং তাঁদের শিক্ষার্থীরা ছবিগুলো লিনোকাটেই করেছেন। এক শতাব্দী আগের শিল্প সৃষ্টির থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে, আজকের প্রতিক্রিয়াটি পরিপূরক শুধু নয়, প্রশংসনীয় এক প্রতিবেদন, যার সাহায্যে এঁরা যেন লিনোকাটকে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

লিনোকাট কিছুটা কাঠের খোদাইয়ের মতো, যেখানে লিনোলিয়াম শিটকে রিলিফের পৃষ্ঠতল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মসৃণ এবং নরম লিনোলিয়ামকে যে কোনও দিক থেকেই কাটা যেতে পারে। অনেক শিল্পীই কাজ করেছেন ছাপচিত্রের এই পদ্ধতিতে। রানী দে-র দাদা, সেই সময়ের এক বিশিষ্ট শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে ছিলেন এ দেশের ছাপাই ছবি-শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। এর আগে ১৯৩০ সালে নন্দলাল বসুর ‘বাপুজী’ এবং সহজ পাঠের লিনোকাট আমরা দেখেছি। ১৯৪০ সালে রামকিঙ্কর বেজের একটি লিনোকাটে ‘বন্দেমাতরম’ শব্দটি ধরা পড়েছে। এর‌ও পরে শিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য বাংলার দুর্ভিক্ষের সময়টা ধরে রেখেছেন বেশ কিছু যুগান্তকারী লিনোকাটে।

রানী চন্দ তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দিয়ে ছোটবেলার বহু কথা ছাড়াও যে সমস্ত মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁদের কথা লিখে রেখেছেন। পরে লিনোকাটে গ্ৰাম্যজীবনের অন্তরঙ্গ সব ছবি, প্রাত্যহিক পরিবেশের ঘনিষ্ঠ সব মুহূর্ত, পল্লিভবনের ছবি, হাটফেরত মানুষের কাহিনি, জানালার ধারে বসে থাকা করুণাময়ী নারীমূর্তি, এক বৃদ্ধের পুরাণপাঠ, পাখিদের উড়ে যাওয়া, জলসত্র, গ্ৰামীণ গল্পগুজবের ছবি, কুটিরের অপূর্ব শান্তিপূর্ণ অবস্থান, সাঁওতাল ও বাউল নাচ, ধান ভানার ছবি ইত্যাদি আপাতদৃষ্টিতে সহজ-সরল অথচ প্রাণবন্ত এবং তেজোদীপ্ত সব লিনোকাট করে রেখে গিয়েছেন। তাঁর অনুরণন কিন্তু সর্বজনীন এবং সাদাকালোর বিতরণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হাতে করা। এ ছাড়াও মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরের এক অন্য জগতের সন্ধান দিয়েছেন রানী। এগুলো তাঁর প্রথম দিকের কাজ হলেও রীতিমতো পরিণত।

এ ছাড়াও রবীন্দ্রভারতীর আটজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে তাঁর কারাজীবনের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক লেখা ‘জেনানা ফাটক’কে মনে রেখে লিনোকাটগুলো করেছেন। বেশ কিছু অদ্ভুত চরিত্রের সঙ্গে পরিচিতি হয়েছে ওঁদের। তার মধ্যে ইন্দুমতী নামে এক পরিচারিকা যার চেহারা বেশ কিছুটা দশাসই ও ভয়াবহ, তার কাণ্ডকারখানার বিবরণ এই ব‌ইয়ে আছে। এ ছাড়াও রাজশাহী জেলের মেট্রন, যে ছিল বৈদ্য বাড়ির বিধবা— তার কথাবার্তা ও চালচলনের গল্প, আরও এক চরিত্র যার টেরিকাটা চুল, গায়ে জ্যাকেট, ধূমপান করতে করতে জিজ্ঞেস করছে, ‘আপনারা কোন জেলা থেকে আসছেন?’— এই সমস্ত আখ্যান এঁরা পড়ে অনুধাবন করেছেন। প্রথমে সিউড়ি এবং পরে রাজশাহী জেলে থাকাকালীন এক বছরের প্রচুর ঘটনা রানী গ্ৰন্থবদ্ধ করে গিয়েছেন, যেটা তাঁর হাস্যরসের অসামান্য অনুভূতি দিয়ে গাঁথা।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

প্রাণস্পর্শী: ‘গ্যালারি ৮৮’-তে আয়োজিত রানী চন্দের প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

এই সবের দৃশ্যকল্প তুলে ধরলেন শিক্ষার্থীরা। প্রদর্শনীতে এঁদের কিছু লক্ষণীয় লিনোকাট দেখা গেল। অরুণা মণ্ডলের ‘পূর্ণকুম্ভ’ ছবির অভিব্যক্তিটি সুন্দর। প্রিয়জিৎ সেনাপতির ‘দ্য ফিমেল থিফ’ একটি আকর্ষণীয় আঙ্গিকে করা, যেখানে কোনও মানুষের দেখা নেই, শুধু দু’টি হাত দেখা যায়। পূরবী জানার কিছুটা যেন জেলের গঠনে তৈরি আকর্ষণীয় কিন্তু দম বন্ধ করা এক ছবি। খোকন গিরির একটি কুটিরের সুদৃশ্য গঠন এবং পারিপার্শ্বিকের ভারী শান্তিপূর্ণ অবস্থান। এস কে রোহনের ‘ফিউচার গার্ড’ এক ফিউচারিস্ট গার্ড। সুন্দর কল্পনা। রোহনের ‘কাদম্বিনী’ অতি সুপরিচিত এক ব্যক্তিত্বময়ী চোখে পড়ার মতো পার্শ্বমুখ। সুজয় মুখোপাধ্যায়ের কাজে কারাবন্দি কিছু অসামান্য চরিত্রের অভিব্যক্তি দেখা গেল। শৈবালের ছবিতে এক বুড়ি অন্য একটি মেয়ের উকুন বাছতে ব্যস্ত। প্রিয় রানী ভৌমিকের কল থেকে জল নেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে মেয়েরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। দীপশিখা সরকারের এক ক্রন্দনরত মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়া। পরাগ রায় সম্পূর্ণ নিজস্ব এক আঙ্গিকে করেছেন, জেলে বন্দি এক মেয়ে তার কল্পনার ডানা মেলে দিয়েছে বাইরে ইত্যাদি বেশিরভাগ কাজ‌ই রানী চন্দের ব‌ইয়ের সহায়ক সব দৃশ্যকল্প। এগুলো অধিকাংশ‌ই প্রশংসার যোগ্য।

আজকের প্রজন্মের কাছে রানী চন্দ একটি প্রায়বিস্মৃত নাম। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্র-উৎসাহে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্পচর্চা শুরু করে প্রচুর কাজ করেছিলেন এবং তাঁর প্রতিভা ছিল অতুলনীয়। ড্রয়িং ছাড়াও রানী চন্দ আলপনায় পারদর্শী ছিলেন এবং ফ্রেস্কোর কাজ‌ও করেছেন। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা এই প্রচেষ্টাকে একটি কাঠামো মাত্র বলে ভেবেছেন। এই পরিকল্পনাটি পাথেয় করে ভবিষ্যতে ওঁরা আরও বিস্তারিত ভাবে কাজ করার সংকল্প নিয়েছেন, হয়তো শিল্পী রানী চন্দকে বৃহত্তর জগতের সামনে উপস্থিত করার জন্য।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Art exhibition artist Art Gallery

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy