Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

ক্যামেরার জাদুকর অজয় কর

০২ ডিসেম্বর ২০১৭ ০৭:৪০
অজয় কর

অজয় কর

পাগলা গারদ থেকে বেরিয়ে নায়ক হেঁটে চলেছে ঝড়জলের রাতে, অন্ধকার ভেদ করে। ঝড়-বৃষ্টি প্রভৃতির এফেক্ট আনতে নানা রকম সরঞ্জাম মজুত। ক্যামেরা বসানো হয়েছে উঁচু একটা পাটাতনের উপর। সবাই প্রস্তুত। আলো জ্বলে উঠল। ঝড় শুরু হল। শুকনো পাতা ওড়ানো হল। বৃষ্টি আরম্ভ হল। পরিচালক চেঁচিয়ে উঠলেন, “অ্যাকশন”। মহানায়ক ফ্রেমের মধ্যে ঢুকে সেই ঝড়জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন। দারুণ শট। তৃপ্ত পরিচালক চেঁচালেন, “কাট”। কিন্তু দেখা গেল, সহকারী চিত্রগ্রাহকের মুখটা কেমন বিবর্ণ। পরিচালক প্রশ্ন করলেন, “কী হল, সব ঠিক আছে তো?” সহকারী মাথা নামিয়ে জানালেন, “স্যার ক্যামেরা চলেনি।”

“কেন?” উত্তেজিত পরিচালক প্রশ্ন করেই বুঝতে পারলেন, ক্যামেরার সুইচ টেপার দায়িত্ব ছিল তাঁরই উপর। কারণ, এই ছবির পরিচালক এবং চিত্রগ্রাহক তো তিনিই। শটটা আবার নেওয়া দরকার। কিন্তু মহানায়ককে গিয়ে এই ভুলের কথা বলার সাহস নেই কারও। শেষ অবধি পরিচালককেই সে দায়িত্ব নিতে হল। সব শুনে মহানায়ক হেসে উঠে আবার শটটা দিতে রাজি হলেন। কিন্তু আবারও একই ঘটনা। পরপর তিনবার। অবশেষে চতুর্থবার শটটি নেওয়া সম্ভব হল। ছবির নাম ‘হারানো সুর’। নায়ক উত্তমকুমার। পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক অজয় কর।

উত্তমকুমার প্রসঙ্গে অজয় কর নিজেই লিখে গিয়েছেন এমন এক ঘটনার কথা। খুব বন্ধু ছিলেন দু’জনে। একে অপরের প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল। এক সময় ‘আলোছায়া প্রোডাকশন’ নামে দু’জনে একটা কোম্পানি খুলে ফেলেন। এই হাউজের ব্যানারেই তৈরি হয়েছিল ‘হারানো সুর’। তত দিনে অবশ্য একসঙ্গে তিনটি ছবিতে কাজ করে ফেলেছেন দু’জন, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘শ্যামলী’ ও ‘বড়দিদি’।

Advertisement

কোম্পানির অফিস ছিল অজয় করের বাড়িতেই। কাজকর্ম দেখতে প্রায়ই আসতে হত উত্তমকুমারকে। ক্রমে অজয়বাবুর বাড়িটা হয়ে উঠল তাঁর নিজের বাড়ি। অজয়বাবুর একমাত্র মেয়ে কৃষ্ণা (মুখোপাধ্যায়) তখন ছোট। তাঁর স্মৃতিতে আছে, “বাড়ির পোষ্য কুকুরটা পর্যন্ত উত্তমকুমারের ফ্যান হয়ে গিয়েছিল। উনি এলেই ও ছুটে গিয়ে পায়ে লুটিয়ে পড়ত। এটা নিয়ে বাবা খুব মজা করতেন।



‘সপ্তপদী’র শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত

অজয় করের আসল নাম ছিল অচ্চিদানন্দ। আট ভাই-বোন। চার ভাই, চার বোন। বাবা ডা. প্রমোদচন্দ্র ছিলেন রেলের ডাক্তার, মা সুহাসিনী। সবচেয়ে বড় সুনীলচন্দ্র, তার পর অচ্চিদানন্দ, সচ্চিদানন্দ ও রথীন্দ্রনাথ। আদি নিবাস পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার তেঘরিয়া গ্রাম। সচ্চিদানন্দের কন্যা অনুরাধা (বসু) এখন আমেরিকা প্রবাসী। কিন্তু কলকাতার সঙ্গে যোগ ছিন্ন হয়নি। প্রতি বছরই আসেন। বলতে পারলেন না অচ্চিদানন্দ কীভাবে নাম বদলে হয়েছিলেন অজয়। “ওঁকে আমি মণি বলে ডাকতাম। ওঁর ডাকনাম ছিল বলাই (বলরাম)। অজয় নামের রহস্য নিয়ে বলার মতো কেউ আর বেঁচে নেই আমাদের পরিবারে। আমার বাবা সচ্চিদানন্দ হলেন জগাই। জগন্নাথ থেকে উৎপত্তি। মাঝখানে আমাদের এক পিসি, সুভদ্রা। সবচেয়ে বড় ভাই সুনীলচন্দ্র হলেন মদন। আর রথীন্দ্রনাথ কানাই। খুব অল্প বয়সে মারা যান এই ভাই।”

অজয় করের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৭ মার্চ, কলকাতায়। বাবার কাজের সুবাদে অজয় করের বাল্য ও কৈশোর কেটেছে নানা জায়গায় ঘুরে-ঘুরে। শেষ পর্যন্ত লেখাপড়ার কারণে তাঁকে ও অন্য ভাইদের কলকাতায় মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯২৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ভর্তি হন। কিন্তু মাঝপথেই থেমে যায় সব। কয়েক বছরের মধ্যেই ১৯৩২ সালে মামা ডা. সতীশচন্দ্র ঘোষের যোগাযোগে ম্যাডান থিয়েটারের পরিচালক প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় অজয়ের। ছেলেবেলা থেকেই ফোটোগ্রাফির প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। সতীশচন্দ্র সেটা বুঝেছিলেন, তাই বাধা দেননি। ম্যাডান থিয়েটারে সেই সময় অন্যতম ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করতেন যতীন দাশ। অজয় নাড়া বাঁধলেন তাঁর কাছে। যতীন দাশের সুপারিশে পরের বছর ১৯৩৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানির প্রসেসিং ল্যাবরেটরিতে কাজ পেলেন তিনি। চিত্রগ্রহণ ও তার পরিস্ফুটন যেহেতু অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত, তাই এই কাজের সুযোগ যে বাড়তি সুবিধে করে দিয়েছিল অজয়কে, তা বোঝা যায় পরবর্তী সময়ে তাঁর চিত্রগ্রহণের মুনশিয়ানার দিকে নজর করলে। ফিল্ম নেগেটিভ বস্তুটিকে তিনি হাড়ে হাড়ে চিনেছিলেন বলেই তাঁর তোলা সিনেমার দৃশ্য অত বাঙ্ময় হয়ে উঠত।

১৯৩৫ সাল থেকে অজয় কর সহকারী চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। এর ঠিক দু’বছরের মাথায় তিনি হয়ে যান ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োর প্রধান চিত্রগ্রাহক। ১৯৩৯ সালে নির্মিত চারু রায়ের ‘পথিক’ ই হচ্ছে অজয় করের স্বাধীন চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজের শুরু। তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ। এর পর প্রায় ৫০টিরও বেশি ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। নীরেন লাহিড়ী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, হেমেন গুপ্ত, দেবকী বসু, সত্যেন বসু... কে নন!

১৯৪৮ সাল পর্যন্ত টানা ওই সব পরিচালকের সঙ্গে কাজের পাশাপাশি সেই সময়ের হলিউডের ছবির নেশাও অজয়কে পেয়ে বসেছিল। হলিউডের স্বর্ণযুগও এই সময়ে। হলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক ও ক্যামেরাম্যানদের কাজ তিনি আগ্রহ নিয়ে দেখতেন। বিদেশি পত্রপত্রিকা জোগাড় করে চলচ্চিত্রে ফোটোগ্রাফির খুঁটিনাটি জেনে নিতে চাইতেন। অ্যালফ্রেড হিচকক ছিলেন অজয় করের প্রিয় পরিচালক। ডিটেকটিভ সিনেমা কী ভাবে তৈরি করতে হয় তার পাঠ নিয়েছিলেন হিচককের ছবি দেখেই। কৃষ্ণা ও অনুরাধা ধরিয়ে দিলেন, “হিচককের ‘রোপ’ সিনেমাটা ছিল ওঁর অল টাইম ফেভারিট। কোনও কাট ছাড়া কী ভাবে ছবিটা টানা শ্যুট করা হয়েছিল, সেই সিনেম্যাটিক এক্সেলেন্সের দিকটা আমাদের বোঝাতে চাইতেন। হিচকক যেমন তাঁর নিজের ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে পরদায় আসতেন, উনিও ওঁর অনেক ছবিতে নিজে ক্যামেরার ফ্রেমে ঢুকে পড়েছেন। যেমন ‘হারানো সুর’-এ গাড়িটা যে চালাচ্ছে, গাড়িটা যে অ্যাকসিডেন্ট করল, সেটা উনি। ‘সপ্তপদী’, ‘সাত পাকে বাঁধা’-তেও তিনি ছিলেন।



অনুরাধা যোগ করলেন, “আমার বাবা সচ্চিদানন্দ হয়েছিলেন ‘হারানো সুর’-এর ডাক্তার। আমাদের পরিবারের সবাই কোনও না কোনও দৃশ্যে মণির (অজয় কর) ছবিতে অ্যাপিয়ার করেছে। ‘হারানো সুর’ –এ একটা নাচের দৃশ্যে আমি আছি। তখন বালকৃষ্ণ মেননের স্কুলে কথাকলি শিখতাম। সিনেমার একটা দৃশ্য ছিল মালার জন্মদিনে ‘সীতাহরণ’ নৃত্যনাট্য হচ্ছে। পুরোটাই মেননদা কম্পোজ করেছিলেন কথাকলি স্টাইলে। আমি লক্ষ্মণ সেজেছিলাম।’’

“আর ‘বর্ণালী’ ছবিতে আমি আছি”, পাশ থেকে যোগ করলেন কৃষ্ণা, “শর্মিলা ঠাকুরের বোন হয়েছিলাম। ‘সপ্তপদী’তে আবার পিসি। জেঠিমা ছিলেন ওথেলো নাটকে দর্শকের ভুমিকায়। বাবা যখন দল বেঁধে সব্বাইকে নিউ এম্পায়ারে নিয়ে যাচ্ছেন, আমার ঠাকুমা (দাদি) খুব রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু মজা হল, পরে ছবিটা রিলিজ করার পর দাদি যখন দেখতে গেলেন, বাড়ি এসে বাবাকে বলেছিলেন, ‘ওদের আর একটু দেখালি না কেন রে বলাই?”

১৯৪৮ সাল থেকে অজয় করের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সদ্য হলিউড ফেরত হরিসাধন দাশগুপ্তর। যে বন্ধু মহলের অন্য সদস্যরা ছিলেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্ত এবং সত্যজিৎ রায়। নতুন ধারার বাংলা সিনেমাকে ঘিরে আলোচনার আঁতুড়ঘর ছিল এই বন্ধুমহল। সেই সময় সত্যজিৎ ‘ঘরে বাইরে’র চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করেছেন। ঠিক হয়েছে, পরিচালনা করবেন হলিউড ফেরত হরিসাধন দাশগুপ্ত আর ক্যামেরাম্যান হবেন অজয় কর। নব্যধারার যে ছবি আর কয়েক বছর পরই আমরা পেলাম সত্যজিৎ, মৃণাল ও ঋত্বিকের কাছ থেকে, তার প্রস্তুতি পর্বের মধ্যে ছিলেন অজয় করও। বোধহয় এই বন্ধুমহলে হাতেকলমে চলচ্চিত্র তৈরির অভিজ্ঞতা ছিল একমাত্র অজয় করেরই। তাই তাঁর উপর সকলের নির্ভরতাও ছিল একটু বেশি রকম। এর প্রমাণ, ছবি বানাতে উদগ্রীব এই বন্ধুমহলের সদস্যরা ইম্পিরিয়াল টোব্যাকো কোম্পানির জন্য এক রিলের একটি বিজ্ঞাপনী ছবি বানানোর কাজে মেতে উঠলেন হরিসাধন দাশগুপ্তের নেতৃত্বে। তখন অজয় করই হলেন সে ছবির ক্যামেরাম্যান। ছবিটির নাম ছিল ‘আ পারফেক্ট ডে’।

অজয় করের ছবি পরিচালনা করার প্রথম সুযোগ এসেছিল কাননদেবীর কাছ থেকে, ১৯৪৯ সালে। সরল, হাসিখুশি, ভদ্র এই যুবকটিকে খুবই স্নেহ করতেন কাননদেবী। তিনি অজয়বাবুকে তাঁর শ্রীমতী পিকচার্সের ‘বামুনের মেয়ে’, ‘অনন্যা’ ও ‘মেজদিদি’ ছবির ক্যামেরার দায়িত্ব দেওয়ার সঙ্গে পরিচালনার দায়িত্বও দিয়েছিলেন। তবে স্বনামে নয়। ‘সব্যসাচী’ নামের এক পরিচালকগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে। এর সদস্যরা হলেন কানন দেবী, অজয় কর ও বিনয় চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু হলিউড, হরিসাধন ও সত্যজিতের সঙ্গ, হিচককের ছবি এবং সিডনি ল্যানফিল্ডের ‘দ্য হাউন্ড অব দ্য বাসকারভিলস’-এর মতো স্টুডিয়োয় তৈরি ছবির কৃৎকৌশল অজয় করকে নিজস্ব চলচ্চিত্র ভাবনা ও শৈলীর আঙিনায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যার প্রকাশ অল্পবিস্তর তাঁর ক্যামেরার কাজের মধ্য দিয়ে ঘটলেও সম্পূর্ণ আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় দিন গুনছিল। অবশেষে বিকাশ রায়, বীরেন নাগ, সুবোধ দাশ ও অজয় কর যৌথ উদ্যোগে তৈরি করলেন ‘চয়নিকা চিত্রমন্দির’ ও ‘সিনে ক্রাফট্‌স’ প্রযোজনা সংস্থা। তৈরি হল, ‘জিঘাংসা’।

‘জিঘাংসা’ দেখতে বসলে ‘দ্য হাউন্ড অব দ্য বাসকারভিলস’ ছবিটির কথা মনে পড়তে বাধ্য। ‘জিঘাংসা’র কাহিনি নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্মাণ পর্যন্ত হলিউডি ছবিটি মুখ্য অনুপ্রেরণার কাজ করেছিল বলেই মনে হয়। ‘জিঘাংসা’ বাংলা ছবির ইতিহাসে প্রথম সফল এক রহস্য-রোমাঞ্চে ঘেরা ছবি, যা পরবর্তী কালে অনেক ছবির প্রেরণা হিসেবে কাজ করলেও এর কারিগরি উৎকর্ষকে কেউ ছুঁতে পারেনি। আর এখানেই অজয় কর তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণ শৈলীর শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের অন্দর মহলে আজও তিনি একজন প্রবাদপুরুষ। কিন্তু বাইরের জগতে সেই স্বীকৃতি তিনি পাননি।

অজয় করকে বাংলা সিনেমার ব্যাক প্রোজেকশন পদ্ধতিতে ছবির জনক বলে মনে করা হয়। তিনি চিত্রগ্রাহক থেকে পরিচালক হয়ে উঠেছিলেন বলেই কাজটা তাঁর পক্ষে সহজ হয়েছিল। ‘জিঘাংসা’ পরবর্তী অনেক ছবিতেই এই ব্যাক প্রোজেকশনের অনবদ্য ব্যবহার রয়েছে। যার সর্বশ্রেষ্ঠটি অবশ্যই ‘সপ্তপদী’ ছবির ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের চিত্রায়ণ। ১৯৫১ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে অজয় কর মোট ২২টি ছবি করেছিলেন স্বনামে। তাঁর সর্বশেষ ছবির নাম ‘মধুবন’। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রযোজনায়।

সেই সময় বাংলা ছবি কেবল ভাল গল্প বলার দিকেই জোর দিত বাণিজ্যিক সফলতার আশায়। পরিচালকদের কাছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তুরুপের তাস। ১৯৫২ সালে সম্ভবত অজয় কর তাঁর সব্যসাচী গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য বিনয় চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ পরিচালনায় ‘দর্পচূর্ণ’ ছবিটি করেন। তার পর তিনি বছর তিনেক মাদ্রাজ ও বম্বেতে কাটিয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে মাদ্রাজে ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে ‘জিঘাংসা’ প্রদর্শিত হয়। এই ছবির সুবাদে ওই দুই শহরে নিজের পুরো ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে চিত্রগ্রাহকের কাজ করার আমন্ত্রণ পান। মাদ্রাজে ১৯৫২ সালে ‘পল্লিতরু’ ও ‘ভায়ারি ভামা’ নামের দুটি তামিল ও তেলুগু ভাষার ছবিতে কাজ করেন। এর পর ১৯৫৩ ও ৫৪ সালে তিনি বম্বে শহরে গুরু দত্তের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। ওই দু’বছরে তিনি ‘সয়লাম’ (বন্যা) ও ‘খাস্তি’ (ফেরি) নামে দুটি ছবিতে কাজ করেন। সেখানেও মানিয়ে নিতে পারেননি। ফলে ১৯৫৪ সালে নিজের পুরো ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় ফেরার পর তিনি ‘গৃহপ্রবেশ’ ছবির কাজে হাত দেন। কানাই বসুর কাহিনি অবলম্বনে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত এই ছবি তেমন জনপ্রিয় না হলেও দর্শকদের ভাল লেগেছিল।

১৯৫৫ সালে পরের ছবি ‘সাজঘর’ পরিচালনা করেন বিকাশ রায় প্রোডাকশনের জন্য। ছবিতে প্রধান ভুমিকায় ছিলেন বিকাশ রায় ও সুচিত্রা সেন। এক স্বনামধন্য নায়কের অধঃপতনের গল্প। চলেনি, যদিও ছবির চিত্রগ্রহণ নিয়ে সমালোচকরা সুখ্যাতিই করেছিলেন। ওই একই বছর অজয় কর শরৎচন্দ্রের ‘পরেশ’ নিয়ে ছবি করেন। জ্যোতির্ময় রায়ের চিত্রনাট্য হলেও অতিরিক্ত সংলাপ লিখেছিলেন সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস। ১৯৫৬ সালে নিরুপমা দেবীর কাহিনি নিয়ে মঞ্চসফল নাটক ‘শ্যামলী’ অবলম্বনে অজয় কর ছবি করলেন ওই একই নামে। পরের বছর ১৯৫৭ সালে অজয় কর হাত দিলেন ‘বড়দিদি’ ছবির কাজে। এই গল্পটিও শরৎচন্দ্রের এবং নিউ থিয়েটার্স ‘বড়দিদি’ নিয়ে ছবি করে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিল। অনেকেই ওই ছবিকে নিউ থিয়েটার্সের সেরা ছবি বলে চিহ্নিত করে থাকেন। তাই অজয় কর যখন ওই একই গল্প নিয়ে ছবি শুরু করলেন, ছবিটিকে ঘিরে আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছিল চলচ্চিত্র মহলে।

ওই বছরই অজয় করের ‘হারানো সুর’ ছবিটি মুক্তি পায়। মারভিন লে রয় পরিচালিত রোনাল্ড কোলম্যান ও গ্রিয়ার গারসন অভিনীত ‘র‌্যান্ডম হার্ভেস্ট’ অবলম্বনে ‘হারানো সুর’ তাঁকে বাংলা ছবির প্রথম সারির পরিচালকদের আসনে বসিয়েছিল। সেই সঙ্গে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত এই ছবি বাংলা মূলধারার ছবির দিগন্তকে খুলে দিয়েছিল। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার পায়। অজয় করের মেয়ে কৃষ্ণা ও ভাইঝি অনুরাধার মনে আছে, “যখন ‘হারানো সুর’ ন্যাশানাল অ্যাওয়ার্ড পেল, মণি (অজয় কর) আমাদের একটা করে ‘হারানো সুর’ লেখা সোনার আংটি উপহার দিয়েছিলেন।” এই ছবি প্রমাণ করেছিল অজয় কর এত দিনে নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীর হদিশ পেয়েছেন। এর পর একে একে তিনি তৈরি করেন, ‘খেলাঘর’, ‘শুন বরনারী’, ‘সপ্তপদী’, ‘অতল জলের আহ্বান’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘বর্ণালী’র মতো কালজয়ী ছবি। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে যা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে আজও।

অজয় করের ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সৌমিত্র জানালেন, “অভিনেতারা তো বেসিক্যালি ইনসিকিয়োর্ড মানুষ। সব সময় ভয় পায়, ভিতরে-ভিতরে চাপা টেনশন কাজ করে। কিন্তু সেগুলো কেটে যায় এই রকম পরিচালক পেলে। আর যেটা দেখেছি, অভিনয়টা তিনি সব সময় পাকা অভিনেতাদের দিয়ে করাতেন। তপনদা বা মানিকদা’র মতো নতুনদের নিয়ে যে সব সময় কাজ করতেন, তা নয়। তবে ‘সপ্তপদী’ ছবিতে ‘ওথেলো’ নাটকের অংশবিশেষ অভিনয় করতে গিয়ে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন যে ভাবে উৎপল দত্ত ও জেনিফার কেন্ডেলের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নিজেদের উচ্চারণকে মিলিয়েছিলেন, তা আজও অবাক করে আমাকে। ওই যে ওথেলো আর ডেসডিমনার সংলাপে লিপ সিঙ্ক করে অভিনয় করলেন ওঁরা, সেটা অ্যামেজিং। আমি উত্তমকুমারের ফ্যান, তাই হয়তো তাঁর কাছ থেকে এক্সপেক্ট করেছিলাম যে, উনি পারতেই পারেন। কিন্তু সুচিত্রা সেন এ রকম করলেন কী করে? মানতেই হবে, খুব শক্ত কাজ।”

আসলে শ্যুটিংয়ের সময় উৎপল দত্ত ও জেনিফারের বলা সংলাপগুলি প্লেব্যাক পদ্ধতিতে শ্যুটিং ফ্লোরে শোনানো হয়েছিল। আর উত্তম ও সুচিত্রা সেই সংলাপগুলি প্রম্পট হিসেবে নিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে বলে গিয়েছিলেন। তাঁদেরকেও অবশ্যই সংলাপ মুখস্থ করতে হয়েছিল নাটকে অভিনয়ের মতো করেই। তবে সঠিক শেক্সপিয়ারীয় উচ্চারণের শুদ্ধতা আনতে অজয়বাবু উৎপল ও জেনিফারের কণ্ঠস্বরকেই ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন। কাজটা মোটেই সহজ নয়। কারণ সংলাপ মিলিয়ে ঠোঁট নাড়তে নাড়তে অভিনেতাদের অভিনয়ও করে যেতে হয়েছে। আর এক দিক থেকে দেখলে ঘটনাটি অজয় করের শিক্ষিত মননের একটি বড় পরিচয়ও বটে।



স্ত্রী গৌরী করের সঙ্গে

স্মৃতিচারণ করতে বসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আরও মনে পড়ে যায়, “অজয়বাবু ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব মিষ্টি একজন মানুষ ছিলেন। আমি অনেক সময়ই ওঁর সঙ্গে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতাম। লোকের নাম ভুল করার ওঁর একটা স্বভাব ছিল। মাঝেমাঝে আমায় ডাকতে গিয়ে বলে উঠতেন, ‘এই শোনো’, আমি ধরিয়ে দিতে গিয়ে বলতাম ‘বিশ্বজিৎ’। সঙ্গে সঙ্গে উনি বুঝতে পেরে বলতেন, ‘এই না, তুমি বিশ্বজিৎ নও।’ একটু খারাপ কোনও ইয়ার্কি করলে, উনি অন্য কোথাও চলে যেতেন। পরক্ষণেই ফিরে এসে বলতেন, ‘এই কী বললে যেন?’ বাঙাল ভাষায় যখন কথা বলতেন তখন পারফেক্টলি বলতেন। আবার এমনও বলতেন যে, তোমাদের ঘটিদের যে ভাষা, তা দিয়ে সব সময় কাজ হয় না। যেমন যদি বলি, ‘Forward March’, তোমরা বলবে ‘এগিয়ে চলো’, কিন্তু বাঙাল ভাষায় বললে হবে ‘এগ্‌গাও’। এর জোর অনেক বেশি। অথচ মানুষটি সাহেবি জামাকাপড় পরতেন। শীতকাল হলে তো টুইডের জ্যাকেট আর টাই ছাড়া কেউ কোনও দিন দেখেনি তাঁকে। কাজের সময় হ্যাট পরতেন। সুব্রত মিত্র, সৌমেন্দু রায় অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন অজয় করকে।”

অজয় করের সাহিত্যপ্রীতি ছিল অসম্ভব। নাচগান ভালবাসতেন। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র নিয়মিত পড়তেন। কাজের বাইরে বাড়িই ছিল তাঁর প্রিয় বিনোদনের জায়গা। ভাই-বোনদের সঙ্গে ঠাট্টা-ইয়ার্কির সম্পর্ক ছিল। একমাত্র মেয়ে কৃষ্ণা পড়ত লোরেটো ধর্মতলায়। স্কুলে পেরেন্ট-টিচার মিটিং কোনও দিন মিস করেননি। মেয়ে কী পড়ছে, কী করছে সজাগ দৃষ্টি ছিল সে দিকে। ভোর সাড়ে চারটে বাজলেই উঠে হাঁটতে যেতেন, কী শীত, কী গ্রীষ্ম রুটিনের হেরফের হত না। অসম্ভব শৌখিন ছিলেন। যেমন গরমে কাতর হতেন, তেমনই শীতে। শীত পড়লেই একটা হাউজ কোট পরে ফেলতেন। নিজের বা কারও সামান্য কিছু হলে চিন্তিত হয়ে পড়তেন। বাড়িতে একটা কুকুর পুষেছিলেন। গৌরীপুরে যখন গিয়েছিলেন, প্রমথেশ বড়ুয়া ওঁকে সেটা উপহার দিয়েছিলেন। সেই কুকুর নিয়ে যত্নআত্তির শেষ ছিল না। দু’দিন যদি সে ঠিকমতো না খেত, বাড়ি ঢুকেই জেনে নিতেন কী খেয়েছে, কতটা খেয়েছে। কৃষ্ণাকে বলতেন, কলেজ থেকে আসার সময় মনে করে ওর জন্য ফ্রায়েড রাইস নিয়ে আসতে।

স্বভাবে তিনি ছিলেন তাঁর মায়ের মতোই আবেগপ্রবণ। অল্পতেই দুঃখ পেতেন। আনন্দিতও হতেন অল্পে। টিভিতে নিজের ছবি দেখতে দেখতে কেঁদে ফেলতেন। ‘বর্ণালী’র পর ছয়ের দশক জুড়ে তিনি ‘প্রভাতের রং’, ‘কাঁচ কাটা হিরে’, ‘পরিণীতা’র মতো ছবি করেন। সত্তরের দশকের গোড়ায় ‘মাল্যদান’ ১৯৭১-এর সেরা আঞ্চলিক ছবি হিসেবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পায়। তার পর ‘কায়াহীনের কাহিনী’, ‘দত্তা’, ‘নৌকাডুবি’ করেন ওই দশকেই। কিন্তু আশির দশকে এসে বদলে যাওয়া বাংলা সিনেমা জগতের আঁচ পড়ে তাঁরও উপরে। ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয়পাশা’ ছবির পর অবসর নিয়েছেন সুচিত্রা সেন। ১৯৮৪ সালে যখন ‘বিষবৃক্ষ’ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন গিয়েছিলেন উত্তমকুমারের কাছে। তিনি বয়সের অজুহাত দেখিয়ে রাজি হননি। এর কিছু পরেই উত্তমকুমারও মারা যান। ‘বিষবৃক্ষ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য নিজের মেয়ে কৃষ্ণাকে নিতে চেয়েছিলেন। শেষ অবধি দেবশ্রী রায় অভিনয় করেন। এর চার বছর পর তিনি সরকারি টাকায় বানিয়ে ছিলেন জীবনের শেষ ছবি ‘মধুবন’। তবে সুচিত্রা সেন মাঝে মাঝে ফোন করে ইচ্ছে প্রকাশ করতেন ওঁর বয়স অনুযায়ী কোনও চরিত্রের কথা যদি অজয়বাবু ভাবতে পারেন, তিনি আবার ফিরে আসতে প্রস্তুত। তেমন ছবি আর করা হয়নি।

কৃষ্ণা ও অনুরাধার মতে, অজয় কর সারা জীবন “স্ট্রাগল করেছেন অনেক। আর্থিক সমস্যার মধ্য দিয়ে ওঁকে যেতে হয়েছে। আপনজনদের কাছ থেকেও এসেছে আঘাত। যেমন ‘জিঘাংসা’র হিন্দি ভার্শন ‘বিশ সাল বাদ’ হয়েছিল তাঁরই সহকারী বীরেন নাগের পরিচালনায়, অজয়বাবুকে বাদ দিয়েই। অথচ অজয় করের নিজের ইচ্ছে ছিল ছবিটি হিন্দিতে করার। প্রযোজক তাঁর সেই ইচ্ছের মর্যাদা দেননি। বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। উত্তমকুমারের সঙ্গেও কোনও কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছিল। কারণটা ঠিক জানা নেই। পরে অবশ্য ঠিক হয়ে যায়।”

অনুরাধা বলে ওঠেন, “হি ওয়াজ বিট্রেড বাই লটস অব পিপল, ডিস্ট্রিবিউটার, প্রোডিউসার। টাকা পাননি। আর্থিক ক্ষতির থেকেও মণির কাছে সেই মানসিক কষ্টটা বেশি ছিল।” কষ্টের দিনে অজয় করের আশ্রয় ছিল তাঁর বাড়ি, তাঁর পরিবার। শেষ বয়সে তাঁর ‘সুইটহার্ট’ ছিল তাঁর নাতনি। নাতনির জন্য ভেবে ভেবে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন। তাকে আঁকড়েই যেন বাকি জীবনটা কাটাতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণার মনে আছে, “দু’-তিন দিন আগে বাবা এক পাঁচতারা হোটেলে গিয়েছিলেন লাঞ্চ করতে। খাবারটা খুব ভাল ছিল, কিন্তু বলেছিলেন ওঁর হজম হয়নি। বাবা হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেয়েছিলেন সঙ্গে অ্যান্টাসিড জাতীয় কিছু। যে দিন ঘটনাটা ঘটে, তার আগের দিন সন্ধেবেলা আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার গলার কষ্টটা কমেছে?’ বললেন ‘না’। বললাম, ‘তোমার প্রেশারটা একবার দেখিয়ে নাও।’ তাতেও আপত্তি। পরদিন বেলার দিকে হার্ট অ্যাটাকের মতো হল। সেটা ছিল একটা শুক্রবার। নার্সিংহোমে ভর্তি করার পর ডাক্তার দেখছিলেন। উনি বলেছিলেন, বাহাত্তর ঘণ্টা না গেলে কিছু বলা যাবে না। রবিবার দেখতে গিয়েছিলাম মেয়েকে নিয়ে। বললেন, ‘বুকটা একটু চিনচিন করছে।’ ষাট ঘণ্টা পার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার পরই তো ম্যাসিভ অ্যাটাকটা হল।” ২৫ জানুয়ারি ১৯৮৫। অজয় কর চলে গেলেন ইহলোক ত্যাগ করে।

তথ্যসূত্র: বৈশাখী, সাহিত্য
ও সংস্কৃতি বিষয়ক ষাণ্মাসিক ২০১৫-১৬

আরও পড়ুন

Advertisement