×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

কাচের বয়ামে সবুজ শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ৩০ জানুয়ারি ২০২১ ০৪:০৩

পাহাড়ি রাস্তার ধারে নুড়ি পাথরে ঘেরা এক টুকরো সবুজ। বেড়াতে গিয়ে অনেকের চোখে পড়ে এই দৃশ্য। গাছপ্রেমীরা তার মধ্যেই খুঁজে পান সৌন্দর্য ও সৃষ্টির মন্ত্র। মূলত এই ভাবনা থেকেই জন্ম টেরেরিয়াম-এর। অনেকে এটিকে ‘গ্রিন আর্ট’ বলতেও পছন্দ করেন। মুখ বন্ধ কাচের পাত্রের মধ্যে যেন প্রকৃতির অনুরূপ এক টুকরো ফোলিয়েজ গড়ে তোলা। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় বাস্তুতন্ত্র।

টেরেরিয়াম করার জন্য মূলত পাঁচটি উপাদানের প্রয়োজন হয়, যা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

• পাত্র: কাচের পাত্রেই মূলত টেরেরিয়াম করা হয়। যত বড় হয় পাত্র, ততই ভাল। কারণ ছোট পাত্রে সফল টেরেরিয়াম করার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই জায়গা বেশি হলে, ফোলিয়েজ সাজানো যায় সুন্দর ভাবে। পাত্রটির ঢাকনাও হবে কাচের এবং স্বচ্ছ। কারণ ওই পাত্রের মধ্যেই কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করতে হবে, যেখান থেকে গাছ তার সালোকসংশ্লেষের সময়ে আলো পাবে। এই আলোর ব্যবস্থাও পাত্রের উপর দিকে করা হয়, যার জন্য ঢাকনাও স্বচ্ছ হওয়া দরকার।

Advertisement

• সাবস্ট্রেট: টেরেরিয়ামের জন্য যে মাটি তৈরি করা হয়, তা বিশেষ প্রকৃতির। কারণ এই মাটির কয়েকটি স্তর থাকে। মাটি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারবে এমন উপাদান থাকে। তার সঙ্গে মাটির মধ্য দিয়ে যেন বাতাস চলাচল করতে পারে, জমাট না বেঁধে যায় আবার অতিরিক্ত জলও বেরিয়ে যেতে পারে... এমন বিষয়গুলি মাথায় রাখা প্রয়োজন। সাধারণত এই মাটিতে থাকে কোকো পিট, পাইন বার্ক, শুকনো স্প্যাগনাম মস এবং ঝুরো বালি। মাটি খুঁড়লে যে ভাবে এক-একটি স্তর উন্মোচিত হয়, এই স্তরগুলির ধারণাও ঠিক তেমনই।

একেবারে নীচে থাকে পাথরের স্তর, যাকে বলা হয় ফলস বটম। এখানে জল সঞ্চিত হয়। এর উপরে থাকে মেশ সেপারেটর, অর্থাৎ পাথরের মধ্যে যেন সাবস্ট্রেট ঢুকে না যায়। এর উপরে থাকে চারকোলের স্তর, যাতে কোনও রকম ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া বা টক্সিন না থাকতে পারে। এর উপরে থাকে সাবস্ট্রেট বা মাটি। তার উপরে হবে চারারোপণ।



• হার্ডস্কেপ: টেরেরিয়ামের যে নান্দনিকতা সেটাকেই বলা হয় হার্ডস্কেপ। অর্থাৎ প্রকৃতির অনুরূপ যে পাথর বা গাছের ডাল দিয়ে ফোলিয়েজটিকে সাজানো হয়। যে কোনও ধরনের ডাল কিন্তু টেরেরিয়ামের জন্য আদর্শ নয়। গাছের গুঁড়িজাতীয় দৃশ্যকল্প তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় ড্রিফটউডের। মালয়েশিয়ান ড্রিফটউড বা সিজ়নড উড এর জন্য আদর্শ।

ড্রাগন স্টোন, বহুমূল্য পাথরের পাশাপাশি স্থানীয় স্যান্ডস্টোনও ব্যবহার করা যায় সাজানোর জন্য।

• গাছরোপণ: টেরেরিয়ামের তিনটি পটভূমি থাকে। পিছন বা ব্যাকগ্রাউন্ড, মিডল বা মিড গ্রাউন্ড আর ফ্রন্ট গ্রাউন্ড। অপেক্ষাকৃত লম্বা গাছগুলি পিছনের সারিতে, মাঝারি আকৃতির গাছগুলি মাঝের সারিতে এবং একেবারে ছোট গাছগুলি থাকবে সামনের সারিতে।

• উপকারী পতঙ্গ: টেরেরিয়ামের মধ্যে একটি বায়বীয় চক্র তৈরি হয়। কারণ দিনের বেলা গাছ সালোকসংশ্লেষের সময়ে অক্সিজেন ছাড়ছে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করছে। সেই অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে অ্যারোবিক ব্যাকটিরিয়া, স্প্রিংটেলস জাতীয় উপকারী পতঙ্গ, যারা ঝরে যাওয়া পাতা থেকে ডিকম্পোজ় করে জৈব পদার্থ তৈরি করছে। আবার রাতে গাছ অক্সিজেন গ্রহণ করছে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়ছে। আবদ্ধ পাত্রের মধ্যে বিভিন্ন গ্যাসের এই যে ভারসাম্য, তার উপরেই কিন্তু টেরেরিয়ামের বেঁচে থাকা নির্ভর করে। গাছ যত বড় হবে, এই চক্রেরও পরিবর্তন ঘটবে। নতুন ব্যাকটিরিয়ার জন্ম হতে পারে, নতুন কোনও পোকাও জন্মাতেও পারে সাবস্ট্রেট থেকে।

কোন কোন গাছ টেরেরিয়ামের জন্য উপযুক্ত?

টেরেরিয়ামের জন্য আদর্শ ফার্ন। এ ছাড়া ইংলিশ আইভি, ক্রিপিং ফিগ, ফিটোনিয়া, বিভিন্ন প্রজাতির মস, কিছু অ্যাকোয়াটিক গাছও টেরেরিয়ামে ভাল বাড়ে।



জল ও আলোর পরিমাপ

টেরেরিয়াম রোদে রাখা যায় না। গ্রিন হাউস এফেক্টের ফলে গাছগুলো কুঁকড়ে যাবে।

স্বাভাবিক দিনের আলো (আর জি স্পেকট্রাম) যে কৃত্রিম আলোয় পাওয়া যায়, তেমন ধরনের লাইট লাগাতে হবে। অ্যাকোয়ারিয়ামে যে ধরনের আলো ব্যবহার করা হয়, সেটা এখানেও প্রযোজ্য।

টেরেরিয়ামের নিজস্ব বৃষ্টি-চক্র তৈরি হয়। যার জন্য এক বারই জল দিতে হবে। টেরেরিয়াম তৈরির প্রথম চার সপ্তাহ এই ভারসাম্য বোঝার জন্য খুব জরুরি। লক্ষ রাখতে হবে, সকালের দিকে টেরেরিয়ামের ভিতরে পুরো কুয়াশাচ্ছন্ন থাকবে, বাইরে থেকে কিছু বোঝা যাবে না। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিষ্কার হবে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার অস্পষ্ট হবে। এটাই আদর্শ চক্র হওয়া উচিত।

যদি জল বেশি হয়ে যায়, তখন সারাদিনই ‘সগি’ থাকবে। তখন টেরেরিয়াম খুলে রেখে বাড়তি জল বাষ্পীভূত করা হয়। আবার জল কম হলে দেখবেন, দিনের কোনও সময়ই মিস্টিং হচ্ছে না। তখন আবার জল দিতে হবে।

টেরেরিয়াম একটি লিভিং আর্ট। নতুন সৃষ্টির আনন্দ এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখাতেই এর সার্থকতা।

তথ্য সহায়তা: সুশান্ত চৌধুরী

Advertisement