E-Paper

চেতনার মুক্তি যে পথে

পরিবেশিত হল বিষ্ণু দে’র কবিতায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সুরারোপিত ‘জেনো, হয়ে গেছে বহু দেরি/ফেরার সময় বহুকাল কেটে গেছে’।

সৌম্যেন সরকার

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৬
মঞ্চে ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশনা।

মঞ্চে ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশনা।

একটি পরাধীন জাতির আত্মচেতনা যখন উদ্বুদ্ধ হয়, সে জাতির জীবনের নানা দিক দিয়ে তার প্রকাশ স্ফুরিত হয়। বাংলা তথা ভারতের এই নতুন জীবনের অভ্যুদয় হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে বাংলা ভাষায় একটিও দেশাত্মবোধক গান রচিত হয়নি। অবশ্য এর পর থেকে বাংলাদেশে অসংখ্য কবি ও গীতিকার মিলে দেশাত্মবোধক গানের মধ্য দিয়ে তাঁদের মনের বিচিত্র অনুভূতিকে যে ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তার তুলনা নেই।

সম্প্রতি উত্তম মঞ্চে ‘ইন্দিরা’র নিবেদন ছিল ‘মুক্তির গান’। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্মিত ভাষ্যে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সলিল চৌধুরী পর্যন্ত বাংলা ভাষায় মুক্তির গানের প্রবাহ তার সব বৈচিত্র নিয়ে হয়ে উঠেছিল যেন বিনিসুতোয় গাঁথা একটি গীতিকথিকা। যে সব গান শ্রোতার শ্রবণ থেকে, মনপ্রাণ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে, তাদের ইতিহাস, সমসময়ের নিরিখে তাদের প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গ, সর্বোপরি তাদের সুরের সম্মিলিত ধারা বিছিয়ে গেল সেই সন্ধ্যায় শ্রোতাদের মনে। এই দুরূহ কাজটিই করল ‘ইন্দিরা’।

কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘ভারত-সঙ্গীত’ কবিতাটির অংশবিশেষ সুরারোপিত হয়ে প্রথম দেশাত্মবোধক সঙ্গীত হিসেবে প্রচারিত হয়। কবিতাটি রচিত হয় ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে। এই গানে সুর দিয়েছিলেন কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠান শুরু হল সেই ঐতিহাসিক গান দিয়ে— ‘বাজ রে শিঙা বাজ এই রবে/সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে /সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে/ ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়’। এরপর একে একে পরিবেশিত হল ‘মিলে সবে ভারতসন্তান’ (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর), ‘চল রে চল সবে ভারতসন্তান’ (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর), ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ (রবীন্দ্রনাথ), ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’ (রজনীকান্ত সেন), ‘উঠ গো ভারতলক্ষ্মী’(অতুলপ্রসাদ), ‘রণরঙ্গিনী নাচে, নাচে রে নাচে’ (সরলা দেবী চৌধুরানী), ‘হাসিতে খেলিতে আসিনি এ জগতে’ (মুকুন্দদাস), ‘এই শিকল পরা ছল’ (কাজী নজরুল)। পরিবেশিত হল বিষ্ণু দে’র কবিতায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সুরারোপিত ‘জেনো, হয়ে গেছে বহু দেরি/ফেরার সময় বহুকাল কেটে গেছে’।

বাংলা গণসঙ্গীতে অসমের সুরমা উপত্যকার স্বাদ-স্বর বহন করে আনেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। যার ঐতিহাসিক শুরু ধরা যায় ১৯৪৮ সালের গান ‘বাঁচব বাঁচব রে, আমরা বাঁচব রে বাঁচব/ ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়ব’। বাংলায় বামপন্থী ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মোহিনী চৌধুরীর প্রথম রেকর্ড-ধৃত গান কৃষ্ণচন্দ্র দের সুরে পরিবেশিত হল ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতোই সলিল চৌধুরীরও জীবনারম্ভ অসমে। চল্লিশের নানা রাজনৈতিক টালমাটালের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী সলিল চৌধুরী সে দিন জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষা আর প্রতিবাদের ভাষাকে মেলে ধরেছিলেন তাঁর কথায় ও সুরে। মুক্তির গানের পূর্বানুমান-সাধ্য সীমান্তই যেন অবারিত হয়ে যায় সলিল চৌধুরীর সুর সমন্বয়ে। তাঁর অসংখ্য গানের মধ্য থেকে পরিবেশিত হল ‘বিচারপতি তোমার বিচার’, ‘হেই সামালো ধান হো’ এবং ‘ও আলোর পথযাত্রী’।

‘ইন্দিরা’র সদস্য শিল্পীদের সযত্ন প্রয়াস আর জলি বাগচী, প্রমিতা মল্লিক, মধুরা ভট্টাচার্য, রোহিণী রায়চৌধুরী, বিমল দে, মানস আচার্যের মতো বিশিষ্ট অতিথিশিল্পীদের নিবিষ্ট যোগদান মিলেমিশে প্রমাণ করল ‘মুক্তির গান’ এক সন্ধ্যার শ্রবণ পেরিয়ে, শ্রোতাদের পৌঁছে দিতে পারে বহু সকাল-সন্ধ্যার মননে! চর্চার এই সূত্রটি ধরে দিতে ভাষ্যপাঠক সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় দিনে পরিবেশিত হল ‘রবীন্দ্রনাথের গান ও ঠাকুরবাড়ির গান’। অনুষ্ঠানের শুরুতেই আদ্য বিভাগের ছোটদের কণ্ঠে পরিবেশিত হল ‘খরবায়ু বয় বেগে’ ও ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন’। স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশনা। কেউ খাতা না দেখে গান গাওয়ায় আরও ভাল লাগল। এরপর একে একে বিভিন্ন বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশন করলেন রবীন্দ্রনাথের গান ‘বাজে বাজে রম্যবীণা’, ‘তাই তোমার আনন্দ আমার ’পর’, ‘অচেনাকে ভয় কি আমার’ এবং ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি’।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির গান কেবল একটি পরিবারের সঙ্গীতচর্চা নয়, বরং বাংলা গানের আধুনিকতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এই দিনে পরিবেশিত হল দ্বিজেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ এবং সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান। ঠাকুরবাড়ির নারীরাও গানে বিশেষ অবদান রেখেছেন। যেমন প্রতিভা দেবী, সরলাদেবী চৌধুরানী, স্বর্ণকুমারী দেবী এবং ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। গম্ভীর ধ্রুপদ ভাঙা ব্রহ্মসঙ্গীত তৈরিতে ঠাকুরবাড়ির সকলেই অল্পবিস্তর সিদ্ধহস্ত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ হল স্বর্ণকুমারী দেবী রচিত ‘লক্ষ ভায়ের দাঁড়ের টানে’ সঙ্গীতের মাধ্যমে। এই গানগুলির মধ্যে সৃজিতার কণ্ঠে ‘তাই তোমার আনন্দ আমার ’পর’, উৎসার কণ্ঠে ‘অচেনাকে ভয় কি আমার ওরে’, বৈশাখী মজুমদারের কণ্ঠে ‘আমার ফাগুন শেষের বেলা’ উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা।

পরিশেষে বলা যায় যে, ‘ইন্দিরা’র অনুষ্ঠান প্রমাণ করল, শ্রোতার রুচির কাছে সমর্পণই শেষ কথা নয়। তাঁদের রুচিকে, স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলাও এমন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

অনুষ্ঠান

মঞ্চে নৃত্যরত ছাত্রীরা

মঞ্চে নৃত্যরত ছাত্রীরা

  • নব নালন্দার প্রাণপুরুষ আর্য মিত্রর ৯৫তম জন্মদিবসে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়, উত্তম মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘জীবনপুরের পথিক’। অংশগ্রহণে ছিলেন শমীক পাল, শোভন গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্নিবার সাহা, দেবাদৃত চট্টোপাধ্যায়, অরিত্র দাশগুপ্ত। এ ছাড়াও নব নালন্দা সঙ্গীত শিক্ষায়তনের নিবেদনে ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল। নব নালন্দার অধ্যক্ষ অরিজিৎ মিত্র জানালেন, এ বছর নব নালন্দার ৬০ বছর, তাই সারা বছর ধরে চলবে নানা ধরনের অনুষ্ঠান। এই উদ্‌যাপনের সূচনা হল সম্প্রতি মধুসূদন মঞ্চে, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ নৃত্যনাট্যর মঞ্চায়ন দিয়ে। ‘জীবনপুরের পথিক’ নিবেদনে পঞ্চপুত্র, এই অনুষ্ঠানটি একটি বিশেষ ভাবনা নিয়ে করা। আর্য মিত্রর দু’জন প্রিয় শিল্পী ছিলেন উত্তমকুমার এবং সলিল চৌধুরী। তাঁদেরই গান পরিবেশন করেন নব নালন্দা ও নব রবি কিরণের সঙ্গে যুক্ত সঙ্গীতশিল্পীরা। দুর্নিবার সাহার কণ্ঠে ‘রানার’, শোভন গঙ্গোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমি যে জলসাঘরে’, শমীক পালের কণ্ঠে ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’, অরিত্র দাশগুপ্তর কণ্ঠে ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ এবং দেবাদৃত চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’— গানগুলি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন মধুমিতা বসু।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

music Uttam Manch

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy