দেবভাষায় চলছে একটি যৌথ প্রদর্শনী, ‘আ পাথ টুগেদার/ আ পাথ আ্যাপার্ট’। সোমনাথ হোর এবং রেবা হোরের ৮০টি কাজ নিয়ে এই উপস্থাপনা। এর ভিতরে ৫৫টি কাজ রেবার এবং বাকি কাজ সোমনাথের। রেবা হোরের শতবর্ষের প্রাক্কালে কন্যা চন্দনার সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলস্বরূপ দেবভাষা উপহার দিল এক অনবদ্য প্রদর্শনী। তাঁদের বিয়ের বছরে ১৯৫৪ সালে কলকাতায় একসঙ্গে ছবি দেখিয়েছিলেন সোমনাথ এবং রেবা। তার পর এই শহরে আর কখনও ওঁদের কাজ একসঙ্গে মানুষ দেখতে পাননি।
প্রদর্শনীতে রেবা হোরের কাজ সবই অদেখা। এ ছাড়াও প্রদর্শনীর বিশেষ আকর্ষণ সোমনাথের করা রেবার প্রতিকৃতি এবং রেবার করা সোমনাথের প্রতিকৃতি। এ ছাড়াও আছে ওঁদের দু’জনের করা কন্যা চন্দনার প্রতিকৃতি।
এখানে সোমনাথের গ্ৰাফিক্সের কাজ, মূলত লিথোগ্ৰাফ ও এচিং ছাড়া ড্রয়িংও আছে। রেবার প্যাস্টেল ও মিশ্র মাধ্যমের কাজ এবং জলরঙের ছবি ছাড়াও ড্রয়িং আছে প্রদর্শনীতে। আশির দশকের শেষ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তাঁর বহু কাজ দেখতে পেলেন দর্শক। রেবার ১৯৮৮ সালে করা গোটা খাতার পুরো সিরিজ়টি আছে এখানে।
রেবার ছবিতে দর্শক দেখবেন এবং অনুভব করবেন রং ব্যবহারের তাৎপর্য। অত্যন্ত প্রতাপের সঙ্গে রং ব্যবহার করেছেন। কোথাও যেন সেটা সঙ্গীতের মতো একেবারেই শান্ত করে তোলে। আবার অন্য ছবিতে জীবনের স্পন্দন অনুভব করায়। আবার কোথাও যেন এক একাকী মানুষের একাকিত্বের বেদনা ছোঁয়া যায়। তাঁর ছবিতে আলো যেন অন্য রূপে ধরা দেয়। একটি ছবিতে মানুষটি একলা বসে আছেন, কিন্তু চারদিকে নানা মানুষের মুখের অভিব্যক্তি। যেন ছবির নায়ক বড়ই নিঃসঙ্গ।
অপর একটি ছবিতে টেবিলে বসে নারী-পুরুষ, কিন্তু তাদের মধ্যে অন্তহীন দূরত্ব। এরই ভিতরে স্কেচজাতীয় একটি অসাধারণ ছবি, যেটি আঁকা হয়েছে ২০০০ সালে। সোমনাথ বসে দেখছেন কন্যা চন্দনার পড়াশোনা, সামান্য ক’টি লাইনে ফুটিয়েছেন রেবা। আন্তর্জাতিক মানের এই সব ছবি প্রদর্শনীতে দেখা গেল।
রেবা হোরের কিছু ছবিতে বাইরের জগতের প্রতিফলন লক্ষণীয়। সেখানে মাঠেঘাটে মানুষের জমায়েতে বিচ্ছেদ বা উদাসীনতা চোখে পড়ে। কিছু ছবিতে আলো যেন গোপন কোনও তথ্য প্রকাশ করেছে দর্শকের সামনে। সে যেন প্রাণশক্তির ছোঁয়া। রোদের আলোর রঙে নীলের ছোঁয়া চমকে দেয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে সকালের মিঠে আলো থেকে দুপুর ছাড়িয়ে গোধূলির আলো দেখিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিসের মেয়ে রেবা। বিদেশভ্রমণ এবং নানা মিউজ়িয়াম দেখা তাঁর কাছে ছিল সহজসাধ্য। ভালবেসে বামপন্থী সোমনাথ হোরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় দারিদ্র্যবরণ করেছিলেন। সাধিকার জীবন ছিল তাঁর। প্রথম দিকে তেলরঙে কাজ করেছেন অনেক। পরে অ্যালার্জিতে ভোগার জন্য নিজের মতো করে অভিনব এক মাধ্যম সৃষ্টি করেছিলেন।
প্রথম দিকে ডায়াসেশন স্কুলে পড়িয়েছেন। পরে দিল্লির এক স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। শান্তিনিকেতনে যখন গিয়েছিলেন, দু’জনে একসঙ্গে চাকরি করতে রাজি হননি, কারণ অন্য কোনও পরিবার তাতে বঞ্চিত হবে। আজকের যুগে এ এক অকল্পনীয় ধারণা। ১৯৫৮ সালে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন রেবা হোর। তা নিয়ে কোনও দিন তিনি মাথাও ঘামাননি। শুধু কাজ করে গিয়েছেন প্রাণের আনন্দে।
যাত্রাপথের আনন্দের সঙ্গে আবার একা থাকার নিস্তব্ধতা মেনে নিয়েছিলেন তাঁরা। কমিউনিস্ট মতাদর্শে চলেছেন সারা জীবন। মানুষের সেবা, মানুষকে নিয়ে সমবেত ভাবে জীবন কাটানোতেই বিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা। সাধারণ জীবনযাপন থেকে কোনও দিন বিচ্যুত হননি। এই অসামান্য দম্পতি যেন ধারণ করেছেন সারা পৃথিবীর রং, আনন্দ এবং তার সঙ্গে একাকিত্ব। আশ্চর্য ক্ষণজন্মা মানুষ ছিলেন তাঁরা।
অন্য দিকে, কে জি সুব্রহ্মণ্যম, শান্তিনিকেতনে সকলের ‘মানিদা’ বলেছিলেন যে, সোমনাথ হোর খুব সম্ভবত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রিন্টমেকার বা ছাপচিত্রকার। অথচ সোমনাথ কোনও দিন বিদেশ যাননি। প্রদর্শনীতে সোমনাথের যে সমস্ত বিমূর্ত কাজ দেখা গেল, সেগুলো সবই ষাটের দশকের কাজ। তার অনেক পরে তিনি রেবা এবং চন্দনার যে সব প্রতিকৃতি এঁকেছেন, তাতে কিন্তু বিমূর্ততার কোনও আভাস নেই। সেই ভাবে সেগুলিকে অতি আধুনিক বলা যায় না, কিন্তু লাইনের উপরে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল অবিশ্বাস্য।
এই প্রদর্শনী দেখে একটা কথা উল্লেখ করা দরকার। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মনে রাখতে হবে যে, সোমনাথ হোর দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর নিয়ে বহু ছবি করেছেন বলে মানুষ সেগুলিকেই তাঁর জীবনের প্রধান অবদান বলে মনে করেন। কিন্তু আসল কথা শিল্পী সোমনাথ যে পরিমাণ গ্ৰাফিক্সের কাজ করেছেন তা উল্লেখযোগ্য। তাঁর বিমূর্ত ছবির সংখ্যাও কিছু কম নয়।
এখন প্রশ্ন জাগে যে, ১৯৬৩ সালের সেই সব অসাধারণ লিথোগ্ৰাফের সঙ্গে এই ধরনের বাস্তবায়ন করা প্রতিকৃতি কী ভাবে সম্ভব হয়েছে তাঁর পক্ষে? এর কারণ হয়তো শুধুমাত্র স্বাক্ষর নিয়ে সারা জীবন পড়ে থাকলে হয় না। শৈল্পিক যাত্রায় নানা রকম প্রতিঘাত আসে। যাত্রাপথ এঁকেবেঁকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে চলে। তাতেই শিল্পীর সম্পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়। সেই ভাবেই শিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে যুগে যুগে।
কবির ভাষায় বলতে হয় ‘পথের দু’ধারে আছে মোর দেবালয়।’ পথের শেষের গন্তব্যে পৌঁছনোর কথা ভাবতে বলেননি কবি। পথের ধারে যেখানে প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিকতাই শিল্পের প্রতিচ্ছবি, সেখানেই দেবদেবীর উপস্থিতি, কোনও বিশেষ তীর্থস্থানে নয়। সেখানেই শিল্পীর দেবালয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)