অবসন্ন সন্ধের কুয়াশা ভেঙে দাঁড়িয়ে আছে অজর-অমর অরণ্য। তার উপরে রঙে আবিল আকাশ। কিরিবুরুর সেল গেস্ট হাউসের ‘সানসেট পয়েন্টে’ দাঁড়িয়ে আমরা তখন অকরুণ হিমের দাঁতের ভিতরে আটকে। কিন্তু উদ্বিগ্ন নয়। বরং পরতে পরতে খুলে যাওয়া এক অসম্ভব গোধূলির রূপের মধ্যে নিরুপায় আত্মসমর্পণ করে দাঁড়িয়ে।
সামনেই রেলিং। তার পরই পাহাড়ের ঢাল সো-জা নেমে গিয়েছে অতল নীচে। অন্ধকার ক্রমে আসিতেছে! এক আদিবাসী রমণী খান-তিরিশেক ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছেন তাঁর ঘরের দিকে, পাহাড়তলিতে। নৈরাজ্যময় শাল জঙ্গলের নীচে বাঁধা কোনও পাতার নিভৃত কুটিরে কি? সূর্য আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে অরণ্যের সবুজ সমুদ্রে। ওডিশার সারান্ডার নৈঃশব্দ্যের কনচের্তোয় শুধু ঘরমুখী কিছু পাখির কল্লোল।
যে-দিনটি শুরু হয়েছিল জনবহুল হাওড়া স্টেশনে, সেই দিনের গোধূলিই যে এত অভূতপূর্ব রঙে-রসে ধরা দেবে, কে জানত! চারটে নাগাদ লাঞ্চ সারলাম আমরা কিরিবুরু গেস্ট হাউসের ক্যান্টিনে। তখন আর বাংলোয় ফিরিনি। ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলাম সূর্যাস্ত দেখব বলে। সেই দেখার রোমাঞ্চ নিয়ে ক্রমশ আরও কড়া হওয়া শীতের ঝাপটানির মধ্য দিয়ে অবশেষে হা-ক্লান্ত আমরা সন্ধে পার করে ফিরলাম বনবাংলোয়। সেখানে সিকন্দর নামের ছেলেটির অপূর্ব চা দিয়ে বন-বাস শুরু হল। শেষ হল আশ্চর্য বেগুনপোড়া, রুটি আর ডিমের কারিতে। তাড়াতাড়ি শুতে হল। পরদিন ভোরে উঠেই যেতে হবে ‘সানরাইজ পয়েন্ট’।
পুন্ডুল জলপ্রপাত
উঠলাম প্রায় রাত থাকতেই। গাড়ি বলাই ছিল। এখান থেকে ছ’কিলোমিটারের মতো পথ। খানিকটা গিয়ে একটা টি-ব্রেক নিয়ে তার পর পয়েন্টে গেলাম। একটা চৌকো চত্বর। সেই চত্বরের দু’পাশে দু’টি দীর্ঘ গাছ। ভোরের পাহাড়ি হাওয়া এসে সেখানে উদ্ভ্রান্ত করে তুলছে শুকনো পাতার সংসার। একটু মেঘ-কুয়াশার বাড়াবাড়ি ছিল বলে সূর্যকে সে ভাবে পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু জঙ্গুলে পরিবেশের মাঝখানে একটুকরো ভোরের সেই স্নিগ্ধ কোলাজ স্মরণীয়।
বাংলোয় ফিরে দ্রুত ব্রেকফাস্ট। তার পর বেরিয়ে পড়া সারা দিনের জন্য। পুন্ডুল ফল্স, স্বপ্নেশ্বর শিবমন্দির। পুন্ডুলের পথের এক দিকে জঙ্গল, অন্য দিকে খাদ। পুন্ডুলের বেশ খানিকটা আগে গাড়িকে ত্যাগ করতে হল। বেশ খানিকটা ট্রেকিং। জলপ্রপাতের নীচে একটা কুণ্ডের মতো দেখতে অংশ। তার চারপাশে ইতস্তত বড় বড় প্রাচীন পাথর। কোথাও সবুজ, কোথাও হলুদ রাগী তিতিবিরক্ত শ্যাওলায় ঢাকা সে সব। সেখানে জলের স্রোত-শব্দের মধ্যে অনেকক্ষণ থাকলাম। বড় নির্জন।
পরদিন একেবারে ভারী ব্রেকফাস্ট করে সারান্ডার আরও নিবিড় গভীর আদিমতার দিকে আমাদের বন-যাত্রা শুরু হল সকাল ন’টায়। থলকোবাদ। যাওয়ার পথে এক অসাধারণ আদিবাসী হাট আমাদের নজরে এল।
সানসেট পয়েন্ট
সুদীর্ঘ সুপুষ্ট মহা মহা বৃক্ষের নীচে এক বিস্তৃত হাট। দেশি মুরগি থেকে পিঁপড়ের ডিম, নানা রঙের এবং আকৃতির শিম থেকে কাঁচালঙ্কা-কুমড়ো, হাঁড়িয়া থেকে গজা, নদীর মাছ থেকে মশলাপাতি— বিচিত্র পশরা নিয়ে বসেছেন স্থানীয় মানুষেরা। সেই হাটের গন্ধ, শব্দ, বর্ণ সবই বড় অকৃত্রিম, মনকাড়া। যেখানে হাঁড়িয়া বিক্রি হচ্ছে, হাট সারতে সারতেই মানুষ সেখানে পৌঁছে যাচ্ছেন। গোল গোল তেলেভাজা, সিদ্ধ কড়াই আর কাঁচালঙ্কা-সমেত সেই হাঁড়িয়া বিক্রির ছবিটাই দারুণ!
ঘণ্টাখানেক পর হাট পিছনে রেখে গাড়ি চলল থলকোবাদের দিকে। কিরিবুরু একটু শহর-শহর। এ বার গাড়ি পড়ল একেবারে আদিম অরণ্যের অকৃত্রিমতায়। থলকোবাদের পথটি সেল-এর লৌহখনি অঞ্চল দিয়ে। লোহার গুঁড়োর জন্য সমস্ত পথটাই অন্য রকম লাল লাল। এক দিকে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের প্রান্তের গাছগুলি রক্তিম হয়ে পড়েছে।
পথ এঁকেবেঁকে চলেছে সুদূরে। বন্য বাতাসের বিলোল লীলায় কেঁপে উঠছে মহাবৃক্ষের অন্ধকার।
কিরিবুরুর হাট
সেই ক্রমশ সন্ধের আবছা আঁধার-রণিত বুনো পরিবেশে কী এক অপার্থিব অনুভব! কোনও বন্যপ্রাণী সামনে এসে পড়েনি। তবুও কী নিদারুণ রোমাঞ্চ! দুরন্ত অটল সব গাছের আলো-ছায়ার দৈত্য গোটা পথটা অধিকার করে! অথচ জঙ্গল তো এত কিছু জানে না। চির নিরুৎসুক উদ্ভিদের নিরুপায় লাবণ্যের অগোচরেই আমরা হয়তো রোমাঞ্চিত হচ্ছি। ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না, কোথায় শেষ এই শাল-মহুয়া-নিম-অর্জুন এবং আরও কত কত নাম-না-জানা মহাবৃক্ষের মহাসমুদ্রের! জঙ্গলের পিছনে তখন লাল সূর্য। আজানুলম্বিত অরণ্যের ঝুঁটি ছোঁয়া সেই সূর্য আমাদের সঙ্গে দূরত্ব রচনা করছে মুহূর্তে মুহূর্তেই।
অবশেষে থলকোবাদ! বাংলোর চাবি নিয়ে এলেন এক অমল মানুষ— মঙ্গল সিংহ। শ্যামলা রং কিন্তু উজ্জ্বল স্বাস্থ্যের শান্ত স্নিগ্ধ মধুর এক মানুষ। সেই রাতে বনবাংলোর চত্বরে নিজে হাতে রেঁধে খাওয়ালেন বনমুরগির কারি। আদিম সারান্ডার মতোই আদিম সেই রান্না।
কীভাবে যাবেন
হাওড়া স্টেশনের নিউ কমপ্লেক্স থেকে ভোর ছ’টা কুড়ির বরবিল জনশতাব্দী চেপে বড়াজামদা স্টেশন। দুপুর ১টা। বড়াজামদা থেকে ১ ঘণ্টার গাড়িপথে কিরিবুরু। সেখান থেকে থলকোবাদ কমবেশি ঘণ্টাপাঁচেকের পথ।