অর্থবর্ষ পড়তেই স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পে জারি নতুন বিজ্ঞপ্তি, পিপিএফ থেকে সুকন্যা সমৃদ্ধিতে বদলাচ্ছে সুদের হার?
নতুন আর্থিক বছরের (২০২৬-’২৭) প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার ঘোষণা করল কেন্দ্র। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কতটা প্রভাব পড়েছে তাতে?
স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পে লগ্নিকারীদের জন্য সুখবর। নতুন আর্থিক বছরের (২০২৬-’২৭) প্রথম তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) সুদের হারে কোনও পরিবর্তন করছে না কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক। ফলে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিপিএফ), সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (এসএসওয়াই), সিনিয়র সিটিজ়েন সেভিংস স্কিম (এসসিএসএস), ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট এবং কিসান বিকাশ পত্রে (কেভিপি) পুরনো হারেই রিটার্ন পাবেন বিনিয়োগকারীরা। মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যে আমজনতাকে স্বস্তি দিয়েছে এই ঘোষণা।
ইরান যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ডলারের নিরিখে টাকার পতন এবং অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে নতুন অর্থবর্ষের (২০২৬-’২৭) গোড়াতেই স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলিতে সুদের হার কমবে বলে মনে করা হচ্ছিল। যদিও বাস্তবে সেই রাস্তায় হাঁটেনি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। বিশ্লেষকদের দাবি, প্রথাগত বিনিয়োগের বাজারে লগ্নি ধরে রাখতে এবং টানতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রক। এতে শেয়ারবাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় কিছুটা সুবিধা হবে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে নতুন অর্থবর্ষের (২০২৬-’২৭) প্রথম ত্রৈমাসিকের (এপ্রিল-জুন) সুদের হার সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে কেন্দ্র। সেখানে বলা হয়েছে, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (এসএসওয়াই) এবং প্রবীণ নাগরিকদের স্থায়ী আমানতে (সিনিয়র সিটিজ়েন সেভিংস স্কিম বা এসসিএসএস) বছরে ৮.২ শতাংশ হারে সুদ দেবে কেন্দ্র। অন্যান্য প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে অবশ্য সুদের হার এর চেয়ে কম।
কন্যাসন্তানদের পড়াশোনা এবং বিয়ের খরচের কথা মাথায় রেখে সারা দেশে যে ক’টি প্রকল্প চালু রয়েছে, সুকন্যা সমৃদ্ধি তার মধ্যে অন্যতম। মেয়েদের জীবন সুরক্ষিত রাখা এবং উচ্চশিক্ষার সময় যাতে কোনও সমস্যা না হয়, সেই লক্ষ্যে এসএসওয়াইতে লগ্নির পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন। কন্যাসন্তানের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে জমা টাকার পুরোটাই সুদ-সহ হাতে পাবেন বিনিয়োগকারী।
অন্য দিকে কেবলমাত্র ষাটোর্ধ্বরা প্রবীণ নাগরিক স্থায়ী আমানতে (এসসিএসএস) লগ্নি করতে পারেন। এতে সর্বোচ্চ ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যায়। তা ছাড়া প্রতি তিন মাস অন্তর সুদবাবদ প্রাপ্ত অর্থ তুলে নেওয়ার সুবিধা রয়েছে। আবার লগ্নিকারী ইচ্ছা করলে মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে সুদেমূলে পুরো টাকা প্রত্যাহার করতে পারেন। এটি একটি পাঁচ বছরের প্রকল্প, যা তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেটের (এনএসসি) গ্রাহকেরা বছরে ৭.৭ শতাংশ হারে সুদ পাবেন। কিসান বিকাশ পত্রের (কেভিপি) ক্ষেত্রে সেটা ৭.৫ শতাংশ। এ ছাড়া বছরে ৭.১ শতাংশ হারে আর্থিক বৃদ্ধি হবে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিপিএফের। আমজনতার মধ্যে ডাকঘরের এই সমস্ত প্রকল্পের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। বর্তমানে এগুলির প্রতিটির লগ্নিকারীর সংখ্যা কয়েক কোটি।
সিনিয়র সিটিজ়েন সেভিংস স্কিমের মতো ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেটের মেয়াদও পাঁচ বছর। মাত্র হাজার টাকা দিয়ে যে কোনও ডাকঘরে এর অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন গ্রাহক। এতে বিনিয়োগের কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। তবে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে এনএসএসটির টাকা কোনও ভাবেই তুলতে পারবেন না লগ্নিকারী। তবে সুদেমূলে পুরো টাকা হাতে পাওয়ার পর ফের পাঁচ বছরের জন্য এতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন তিনি।
এনএসসির পাশাপাশি কেভিপিতে লগ্নিরও কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। নিশ্চিত রিটার্নের এই প্রকল্পে মাত্র হাজার টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন গ্রাহক। আড়াই বছর পর কেভিপি থেকে টাকা তোলার সুযোগ পাবেন তিনি। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের হিসাবে ১১৫ মাসে (৯ বছর ৭ মাস) দ্বিগুণ হয়ে যায় কেভিপির বিনিয়োগ।
কেন্দ্র পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষিত সঞ্চয় প্রকল্প হল পিপিএফ। এতে সুদের হার শেয়ারবাজারের সূচকের ওঠানামার উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে পিপিএফের লগ্নিকারীরা নিশ্চিত রিটার্ন পেয়ে থাকেন। এতে ন্যূনতম ১৫ বছরের জন্য বিনিয়োগ করতে হয়। ফলে সন্তানের উচ্চশিক্ষা, বিয়ে বা অবসরের পর ভাল সঞ্চয় হাতে পেতে এটি অন্যতম বিকল্প হতে পারে।
আরও পড়ুন:
সব শেষে অবশ্যই বলতে হবে মান্থলি ইনকাম স্কিম (এমআইএস) এবং পোস্ট অফিস সেভিংস অ্যাকাউন্টের কথা। এ বছরের জুন পর্যন্ত বছরে ৭.৪ শতাংশ এবং ৪ শতাংশ হারে সুদ পাবেন এই দু’য়ের গ্রাহক। সংশ্লিষ্ট স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পের মধ্যে পিপিএফকে বাদ দিলে বাকিগুলিতে একমাত্র লগ্নি করা যাবে ডাকঘরে। পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের অ্যাকাউন্ট ডাকঘরের পাশাপাশি সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাঙ্কে খুলতে পারবেন বিনিয়োগকারী।
এ ছাড়া ডাকঘরে চালু রয়েছে বেশ কয়েকটি স্থায়ী আমানত বা এফডি (ফিক্সড ডিপোজ়িট) প্রকল্প। স্বল্প সঞ্চয়ের পাশাপাশি সেগুলিরও সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। ফলে এক, দুই এবং তিন বছরের স্থায়ী আমানত প্রকল্পে যথাক্রমে ৬.৯ শতাংশ, ৭ শতাংশ এবং ৭.১ শতাংশ সুদ পাবেন লগ্নিকারী। পাঁচ বছরের এফডিতে মিলবে ৭.৫ শতাংশ সুদ।
ডাকঘরের মেয়াদি আমানত বা আরডির (রেকারিং ডিপোজ়িট) হিসাব আবার পুরোপুরি আলাদা। এতে প্রতি মাসে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবেন লগ্নিকারী। মেয়াদি আমানতেও সুদের হার অপরিবর্তিত রয়েছে। পাঁচ বছরের আরডিতে বার্ষিক ৬.৭ শতাংশ হারে সুদ পাবেন গ্রাহক।
আর্থিক বিশ্লেষকদের কথায়, স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকলেও এতে লগ্নির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের উপর নজর রাখতে হবে। যেমন লগ্নিকারীর অবসরের বয়স। তা ছাড়া সন্তানের শিক্ষা, বিয়ে, চিকিৎসা খরচ এবং গৃহ সংস্কারের খরচের কথাও এই ধরনের বিনিয়োগের আগে হিসাব করে নেওয়া উচিত। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে লগ্নি করা টাকায় হাত দিতে পারবেন না গ্রাহক।
কেন্দ্রের স্বল্প সংঞ্চয় প্রকল্পগুলির মধ্যে কিছু মূলগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা এবং পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড হল দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প। এতে বেশি রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্য দিকে স্থায়ী আমানত এবং মেয়াদি আমানতে এক বছরের জন্য লগ্নি করতে পারেন গ্রাহক। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সুদেমূলে অনেক কম টাকা পাবেন তিনি।
স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলির আর একটা সুবিধা হল আয়করে ছাড়। উদাহরণ হিসাবে পিপিএফ এবং এসএসওয়াইয়ের কথা বলা যেতে পারে। বর্তমানে আবার দেশে দু’টি করকাঠামো চালু রয়েছে। একটি হল নতুন এবং অপরটি পুরনো কাঠামো। এর মধ্যে একমাত্র দ্বিতীয়টিতেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলির জন্য ছাড় পাবেন করদাতা।
চলতি বছরের ৬ এপ্রিল থেকে বৈঠকে বসবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) মুদ্রানীতি কমিটি। সেখানে সুদের হার বা রেপো রেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, পশ্চিম এশিয়ায় ইরান বনাম ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ এবং তাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জেরে এ বার রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখবে আরবিআই।
গত বছরে (পড়ুন ২০২৫) মোট চার বার রেপো রেট হ্রাস করে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক। এর শেষটা হয়েছিল ডিসেম্বরে। এর জেরে মোট ১২৫ বেসিস পয়েন্ট কমেছে সুদের হার। ফলে বর্তমানে রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশে ঘোরাফেরা করছে। আগামী ৮ এপ্রিল মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক শেষে নতুন সুদের হার ঘোষণা করার কথা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের।
অন্য দিকে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ডলারের নিরিখে ক্রমাগত পড়েছে টাকার দাম। বর্তমানে সেটা ৯৩-৯৪ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে ভারতীয় মুদ্রার সর্বাধিক অবমূল্যায়ন হয়েছে, যেটা প্রায় ১০ শতাংশ। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে চলতি অর্থবর্ষের (২০২৬-’২৭) দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলির সুদের হার কতটা স্থির থাকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।