ফি বছর ‘গায়েব’ ৮০ লক্ষ শিশু, ধনকুবেরদের ‘খিদে’ মেটাতে আনা হত অনাথদের! ভয়ঙ্কর দাবি এপস্টিন ফাইল্সে
রয়েছে বহু আইন, তবু সারা পৃথিবী জুড়েই রমরম করে চলে শিশু পাচার। শিশু অপহরণ বা উধাও হয়ে যাওয়ার বহু ঘটনা অমীমাংসিতই রয়ে যায়। আর তাতে রাজপরিবার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের প্রত্যক্ষ মদতের অভিযোগ উঠেছে এপস্টিন ফাইলে! কী বলছে সেই ফাইল?
বিশ্ব থেকে প্রতি বছর উধাও হয়ে যাচ্ছে ৮০ লক্ষ শিশু! পরিবার ও নিরাপদ কোল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে অন্ধকার জগতের গর্ভে। দুনিয়া জুড়ে শিশু অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা হৃদয় কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতি বছর ভারতে ৬২ হাজার ৯৪৬ শিশুকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আটলান্টিক পারের দেশটিতে ৮ লক্ষ ৪০ হাজার শিশু উধাও হয়ে যায় প্রতি বছর। সেখানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে, একটি শিশু নিখোঁজ হয় অথবা অপহৃত হয়। যদিও এফবিআইয়ের দাবি, শিশু নিখোঁজ বা অপহরণ সংক্রান্ত বেশির ভাগ অভিযোগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করা হয়।
কিন্তু এর মধ্যে এমন কিছু নিখোঁজ বা অপহরণের ঘটনা থাকে যা ধোঁয়াশার আড়ালে চলে যায়। শিশু অপহরণ বা উধাও হয়ে যাওয়ার বহু ঘটনা অমীমাংসিতই রয়ে যায়। হাজার চেষ্টা করেও অপহৃত বা নিখোঁজ শিশুদের আপনজনদের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারেনি প্রশাসন। তা হলে কোথায় হারিয়ে যায় এই নিষ্পাপ শিশুরা?
কিছু কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তবে বেশির ভাগ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয় টাকা ও ক্ষমতার জোরে, মত শিশু সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলির। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন নামের আন্তর্জাতিক সংস্থা জানাচ্ছে, বেশির ভাগ শিশুকে অপহরণ করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। যৌনদাসী হিসাবে কাজ করানো হয় বিভিন্ন মুলুকে।
সংগঠনটি কয়েকটি ঘটনার কথা প্রকাশ্যে এনেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১০ বছর বয়সি নাতাশা কাম্পুশকে অপহরণ করা হয় অস্ট্রিয়া থেকে। অপহরণকারী তাকে আট বছর ধরে একটি গোপন ভূগর্ভস্থ কক্ষে আটকে রাখে। আবার ১৯৯৬ সালে বেলজিয়ামে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময়ে ১২ বছর বয়সি সাবিন ডার্ডেনকে এক শিশু যৌননিগ্রহকারী অপহরণ করে নিয়ে যায়। এপস্টিন বিতর্ক নিয়ে হইচই পড়ে যাওয়ায় শিশু অপহরণের ‘নেটওয়ার্ক’ নিয়ে নতুন করে জলঘোলা হতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন:
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলতেই ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে পড়েছে দুনিয়াকাঁপানো ব্যক্তিত্বদের চরিত্রের মসিলিপ্ত দিক। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের নথি প্রকাশ্যে আসতেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছে অনেকের। একের পর এক ‘হেভিওয়েটের’ নাম জড়িয়েছে এপস্টিনের ফাইলে। এই নথিতে মূলত রয়েছে, কোনও ব্যক্তিত্ব এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে যৌন আকাঙ্ক্ষা কী ভাবে পূর্ণ করেছিলেন তার খুঁটিনাটি।
এপস্টিনের সঙ্গী তথা ব্রিটিশ সমাজকর্মী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন যৌন নিগ্রহের শিকার ভার্জিনিয়া জিউফ্রি। সেই মামলার সূত্র ধরেই একে একে প্রকাশ্যে আসছে এমন সব নাম যা দেখে স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, টেসলাকর্তা ইলন মাস্ক, বিনোদনজগতের মাইকেল জ্যাকসন, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, জর্জ লুকাস, জেসন রিচার্ডস, কেভিন স্পেসি, ব্রুস উইলিস, ড্যানিয়েল উইলসনের নাম। বাদ যাননি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদ্যপ্রাক্তন অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরও।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিষেবার প্রাক্তন আধিকারিক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভ্যাসিলি প্রোজ়োরভ বেশ কিছু দিন আগে এক বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছিলেন নিজের দেশের বিরুদ্ধেই। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুসারে ব্রিটেনের গুপ্তচর সংস্থা এমআই৬-এর যৌথ সহায়তায় ইউক্রেন, ব্রিটেন-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইউক্রেনীয় শিশুদের পাচার করছে এঞ্জেল হোয়াইট নামের একটি সংস্থা। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারের অনাথ শিশুদের উদ্ধারের পর পাচার করে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তোলে ক্রেমলিনের সংবাদমাধ্যমগুলি। পাল্টা অভিযোগ তুলে রয়্যাল প্রেস বা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইউক্রেনীয় শিশুদের অপহরণের দায় চাপিয়ে দেয় রাশিয়ার বিরুদ্ধে।
ইউক্রেন থেকে শিশু পাচারে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যতম পরিচিত মুখ প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম উঠে এসেছে এপস্টিন ফাইলে। ভার্জিনিয়া জিউফ্রে অভিযোগ করেছেন, কৈশোরে তাঁকে ব্রিটিশ রাজপুরুষ অ্যান্ড্রুর যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। এই যৌন কেলেঙ্কারির সঙ্গে কোটিপতি, রাজপরিবার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের প্রত্যক্ষ মদতের অভিযোগ উঠে এসেছে বার বার।
আরও পড়ুন:
আমেরিকার কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ এবং ‘যৌন কেচ্ছায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে’ অ্যান্ড্রুর রাজকীয় খেতাব কেড়ে নিয়েছেন ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস। রাজপ্রাসাদ থেকেও বিতাড়িত হন তিনি। এপস্টিন ফাইলে নাম জড়ানোয় রাজপরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে জনমত তৈরি হচ্ছিল। অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে নাবালিকাদের সঙ্গে জোর করে যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগও ওঠে। এমনকি ইউক্রেনে হাজির হয়ে সেখানে দুই নাবালিকাকে তুলে হেলিকপ্টার উড়িয়ে গোপন আস্তানায় চলে যাওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও রয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই সদস্যের বিরুদ্ধে।
ব্রিটেন পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গেও যথেষ্ট দহরম-মহরম ছিল এপস্টিনের। আমেরিকায় ব্রিটেনের দূত ছিলেন পিটার ম্যান্ডেলসন। এপস্টিনকে সংবেদনশীল নথি পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই খবর ফাঁস হতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে তাঁকেও।
অভিযোগ, আমেরিকার ভার্জিন আইল্যান্ডসের লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে চলত ভয়ঙ্কর যৌনাচার। ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ওই দ্বীপের মালিক ছিলেন এপস্টিন। অনেক মহিলা এবং শিশুকে এই দ্বীপে নিয়ে এসে পৃথিবীর তাবড় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করার সুযোগ করে দেওয়া হত বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
এপস্টিনের সমস্ত কুকীর্তির সহচরী ছিলেন বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশু ও কিশোরীদের অপহরণ করে নির্জন দ্বীপে তুলে আনার দায়দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল এই ম্যাক্সওয়েলের হাতেই। এপস্টিনের সঙ্গী ম্যাক্সওয়েলও যৌন অপরাধে অভিযুক্ত। তিনি বর্তমানে জেল খাটছেন। আমেরিকার আদালত তাঁকে ২০ বছরের সাজা শুনিয়েছে। ম্যাক্সওয়েল অল্পবয়সি মেয়েদের শিকারে পরিণত করে এপস্টিনের নির্যাতনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন বলে আদালতে অভিযোগ করেছেন আইনজীবীরা।
জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টিন। আমেরিকার ধনকুবের হলেও জন্মসূত্রে ইহুদি। তাঁর বিরুদ্ধে কম করে ৪০ জন মহিলা যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছিলেন। প্রত্যেকেই জানিয়েছিলেন, তাঁরা ধনকুবেরের ইন্দ্রিয়াসক্তির শিকার হয়েছিলেন অল্প বয়সে। কেউই তখনও ১৮ উত্তীর্ণ হননি। নাবালিকা বা কমবয়সি তরুণীদের ফাঁদে ফেলার জন্য প্রেমিকা ম্যাক্সওয়েলকেই শিখণ্ডী করতেন যৌন অপরাধী জেফ্রি। চাকরির লোভ দেখিয়ে ‘শিকার’কে নিজের ডেরায় টেনে আনতেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবিতে ঘরের দেওয়াল ভরিয়ে রেখেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। একাধিক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ছবি ছিল। ফলে সন্দেহের অবকাশ থাকত না চাকরিপ্রার্থী তরুণীদের।
প্রথম পর্যায়ে ম্যাক্সওয়েলকে অত্যন্ত ভদ্র, স্পষ্টভাষী এবং দয়ালু বলে মনে হত। বিশ্বাস অর্জনের পর্ব শেষ হলে তরুণীকে দ্বিতীয় ইন্টারভিউয়ের জন্য এপস্টিনের কাছে নিয়ে যেতেন ম্যাক্সওয়েল। অভিযোগ, সেখানে যৌন হেনস্থা করা হত তাঁদের। শিশু এবং নাবালিকাদের জোর করে যৌনপেশায় নামানো, ধর্ষণ, নারী পাচারের মতো অজস্র অপরাধে নাম জড়িয়েছিল এপস্টিনের।