ধেয়ে আসছে বুলবুল, অতীতে পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়েছিল যে সব ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়
অতীতে এ রাজ্যের উপরে আছড়ে পড়া সেই ভয়ঙ্কর সব ঘূর্ণিঝড় নিয়েই রইল এই গ্যালারি
বৃহস্পতিবার রাতেই গভীর নিম্নচাপ থেকে অতি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় (ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম)-এ পরিণত হয়েছে ‘বুলবুল’। শুক্রবার সকাল থেকেই তার প্রভাবে কলকাতা ও দুই ২৪ পরগনায় শুরু হয়েছে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সঙ্গে মেঘলা আকাশ। উপকূলীয় এলাকায় বইছে দমকা হাওয়া।
পশ্চিমবঙ্গের মাথায় এখন বুলবুলের খাঁড়া ঝুলছে। যে কোনও মুহূর্তে আছড়ে পড়তে পারে এ রাজ্যে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন আবহবিদেরা। অতীতে এ রাজ্যের উপরে আছড়ে পড়া সেই ভয়ঙ্কর সব ঘূর্ণিঝড় নিয়েই রইল এই গ্যালারি
৩ নভেম্বর ১৯৭০। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উপর আছড়ে পড়েছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ভোলা। হাওয়ার গতি ছিল সর্বাধিক ২৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল বাংলাদেশ। সে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একাধিক জনবসতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। মৃত্যু হয়েছিল অন্তত ৩ লাখ মানুষের।
এর তিন বছর পর ফের আরও এক ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয় বঙ্গোপসাগরের উপর। সর্বাধিক ২০৫ কিলোমিটার গতিবেগে বাংলাদেশের উপর আছড়ে পড়েছিল এই ঝড়। প্রভাব পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও। তবে ক্ষয়ক্ষতি মূলত বাংলাদেশেই ঘটেছিল।
২০০৭ সালের ১১ নভেম্বর মধ্য বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। তা সাইক্লোন সিডার নামে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।চার দিন পর পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় জেলা এবং বাংলাদেশের উপর আছড়ে পড়ে এই ঘূর্ণিঝড়। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের জেলাগুলো মিলিয়ে প্রায় চারহাজার মানুষের মৃত্যু হয়। প্রচুর মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। হাওয়ার সর্বাধিক গতি ছিল ২১৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা।
আরও পড়ুন:
২০০৮ সালে ২৫ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরে জন্ম হয় ঘূর্ণিঝড় রাশমির। রাশমি সিংহলি ভাষা। শ্রীলঙ্কা এই নাম দিয়েছিল। যার অর্থ আলোর রেখা। হাওয়ার গতিবেগ ছিল ৮৫ কিলোমিটার। এর প্রভাবে অসমের তিন জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছিল।
এর প্রভাবে ভুটান এবং অরুণাচলপ্রদেশেও বন্যা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে কোনও প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও, কয়েকশো মানুষ আশ্রয় হারিয়েছিলেন। বাংলাদেশে অন্তত ১৫ জন মারা গিয়েছিলেন। ৫০ মত্স্যজীবী নিখোঁজ হয়ে যান।
এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আয়লা। ২০০৯ সালে মে মাসের তীব্র গরমে ঘণ্টায় প্রায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আছড়ে পড়েছিল ঘূর্ণিঝড় আয়লা। নদীবাঁধ ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছিল সুন্দরবন-সহ বাংলাদেশের একাংশের জনজীবন।
বাংলাদেশ এবং ভারত মিলিয়ে প্রায় ৪০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। অন্তত এক লাখ মানুষ ভিটেমাটি খুইয়েছিলেন। আয়লার প্রভাব ঝড় থামার পরও থেকে গিয়েছিল। সুন্দরবন এলাকায় মহামারির আকার নিয়েছিল ডায়েরিয়া।
আরও পড়ুন:
২০১৫ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে বঙ্গোপসাগরের উপরে সৃষ্টি হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় কোমেন। এর মূল অক্ষ বাংলাদেশের উপরই আছড়ে পড়েছিল। গতিবেগ ছিল সর্বাধিক ৮৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। সারা ভারতে মোট ৮৫ জন মানুষ মারা যান।
২০১৬ সালে সর্বাধিক ৮৫ কিলোমিটার গতিবেগে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। তীব্র আশঙ্কা থাকলেও বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সে ভাবে পড়েনি পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যের গাঙ্গেয় উপকূলে মেঘলা আকাশ এবং বৃষ্টিপাত হয়েছিল শুধু। অন্যদিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ভোলা, নোয়াখালি, কক্সবাজার, পটুয়াখালি ও লক্ষ্মীপুর— এই ছয়টি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অন্তত ২১ জন মারা যান।
একইভাবে ১১০ কিলোমিটার বেগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আছড়ে পড়েছিল ঘূর্ণিঝড় মোরা। পশ্চিমবঙ্গেও তার প্রভাব পড়েছিল। আগাম সতর্কতা ছাড়াই আচমকাই এই ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছিল। এর প্রভাবে বাংলাদেশে ন’জনের প্রাণ যায়। তবে পশ্চিমবঙ্গে কোনও প্রাণহানি ঘটেনি।
চলতি বছরেই আরও একটি ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে। ফণী। যার গতিবেগ ছিল সর্বাধিক ২০৫ কিলোমিটার। এর প্রভাবে তছনছ হয়ে যায় ওড়িশা উপকূল। পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়েও ঝড় বয়ে যায়। তবে ওড়িশায় দাপাদাপির পর তার গতিবেগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
ফলে এ রাজ্যে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তছনছ হয়ে যায় ওড়িশার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। অন্তত ৮৯ জনের মৃত্যু হয়। টানা আট দিন জল-বিদ্যুত্হীন হয়ে পড়েন মানুষ।