কর্মীদের জবরদস্তি খাটিয়ে বিপুল পণ্য উৎপাদন! ভারতকে নিয়ে ৩০১ ধারায় তদন্ত, কী বলছে আমেরিকার আইন?
অন্যায্য বাণিজ্যিক লেনদেনের অভিযোগ তুলে এ বার ১৯৭৪ সালের আইনের ৩০১ নম্বর ধারা মেনে ভারত-সহ ৬০টি দেশের পণ্য উৎপাদন নিয়ে তদন্তে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। কতটা বিপজ্জনক ৫২ বছরের পুরনো ওই আইন? এতে কতটা লোকসান হতে পারে নয়াদিল্লির?
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে জোর ধাক্কা খেয়েছে তাঁর শুল্কনীতি। দেশের ভিতরে বাণিজ্য থেকে রাজনৈতিক মহল, সর্বত্রই উঠছে সমালোচনার ঝড়। কিন্তু তার পরেও দমে যাওয়ার বান্দা নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বার ভারত-সহ মোট ৬০টি দেশের পণ্য উৎপাদন নিয়ে তদন্ত শুরু করল তাঁর প্রশাসন। শুধু তা-ই নয়, সেখানে ‘দোষী সাব্যস্ত’ হলে নতুন করে শুল্ক চাপানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর কোপে পড়তে পারে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইজ়রায়েলও।
চলতি বছরের ১৩ মার্চ সংশ্লিষ্ট তদন্তের বিষয়টি জানিয়ে দেয় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিরের কার্যালয়। একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরেই আমেরিকার কর্মী এবং পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে বিদেশি সংস্থার অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বলপূর্বক শ্রমশক্তি ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে তাদের। ফলে অত্যন্ত সস্তায় বিভিন্ন সামগ্রী আমেরিকার বাজারে বিক্রি করতে পারছে তারা। এতে আখেরে আর্থিক ভাবে লোকসান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।’’
গ্রিরের কার্যালয় জানিয়েছে, এ ব্যাপারে ৩০১ ধারায় তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প জমানায় দ্বিতীয় বারের জন্য এই পদক্ষেপ করল মার্কিন প্রশাসন। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) এপ্রিলে নতুন পারস্পরিক শুল্কনীতির ঘোষণা করেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। সেই সময় সংশ্লিষ্ট ধারায় বাণিজ্যিক অংশীদারদের উপর তদন্ত চালিয়েছিল গ্রিরের দফতর। ভারত ছাড়াও এ বার চিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং কানাডা তদন্তের আওতায় থাকবে বলে জানা গিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ভারত, ইইউ, চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) এবং মেক্সিকো-সহ মোট ১৫টি দেশের ‘অন্যায্য বাণিজ্যিক লেনদেন’ খতিয়ে দেখছে মার্কিন প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির উৎপাদন খাতে কাঠামোগত অতিরিক্ত ক্ষমতা, উৎপাদন সম্পর্কিত আইন এবং নীতি নিয়ে তদন্ত করবে তারা। দ্বিতীয় ধাপে বাকিদের উপর পড়বে কোপ। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে এই দেশগুলি যে আমেরিকার বাজারের ‘বড় খেলোয়াড়’, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যে ৩০১ নম্বর ধারায় এই তদন্ত হচ্ছে, তাকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি বা ইউএসটিআরের (ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজ়েন্টেটিভ) একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার বলা যেতে পারে। ১৯৭৪ সালে পাশ হওয়া বাণিজ্য আইনে এই অধিকার দেওয়া হয়েছে তাঁকে। যদি কোনও বাণিজ্যিক লেনদেন আমেরিকার জন্য ‘অন্যায্য’, ‘বৈষম্যমূলক’ বা ‘ক্ষতিকর’ বলে মনে হয়, তা হলে এই আইনের ধারায় তদন্ত করতে পারেন তিনি।
আরও পড়ুন:
গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি এই বাণিজ্য আইন যখন পাশ হচ্ছে, তখন যথেষ্ট বেকায়দায় আমেরিকা। টানা ১২ বছর ধরে চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ওয়াশিংটনের অর্থনীতি। শুধু তা-ই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির জলে-জঙ্গলে লড়তে গিয়ে প্রাণ হারায় বিপুল সংখ্যায় মার্কিন সৈন্য, যেটা আন্তর্জাতিক স্তরে ‘সুপার পাওয়ার’ যুক্তরাষ্ট্রের মুখ পুড়িয়েছিল। ফলে কতকটা বাধ্য হয়েই ১৯৭৩ সালের মার্চে সেখান থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয় মার্কিন সরকার।
১৯৭৪ সালের জুনে সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি সারে আমেরিকা। ওই সমঝোতার মাধ্যমে অপরিশোধিত খনিজ তেলের সঙ্গে জুড়ে যায় মার্কিন মুদ্রা ডলার, আগে যা সোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট চুক্তিটির পর পরই বাণিজ্য আইন পাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেস। এতে বিদেশি রাষ্ট্রের আইন বা কোনও নিয়ম ওয়াশিংটনের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং তার কর্মীদের লোকসান করছে কি না, তা খতিয়ে দেখায় অধিকার পেয়ে যান সেখানকার ইউএসটিআর।
সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য আইনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হল ৩০২(বি)। এর মাধ্যমে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমদানি-রফতানিতে কোনও লোকসান হচ্ছে কি না, সেই সংক্রান্ত তদন্ত শুরু করতে পারেন ইউএসটিআর। এর জন্য প্রেসিডেন্ট বা কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি, তদন্ত চলাকালীন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের জায়গাগুলি নিয়ে কথা বলতে পারবেন তিনি। আন্তঃসংস্থা বা উপদেষ্টা কমিটির মতামত গ্রহণের অধিকার রয়েছে তাঁর।
ইউএসটিআরের কার্যালয় থেকে জানা গিয়েছে, এ বারের তদন্তে একাধিক অর্থনীতিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করবে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি গ্রির। এ বছরের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে আগ্রহী পক্ষগুলি তাদের মতামত লিখিত ভাবে জমা দিতে পারেন। ২৮ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে শুনানির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সেখানে সমাধানসূত্র বার না হলে ফের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শুল্ক চাপানোর রাস্তায় হাঁটার পরামর্শ দিতে পারেন গ্রির, যা নয়াদিল্লি জন্য একেবারেই স্বস্তিজনক নয়।
আরও পড়ুন:
৩০১ নম্বর ধারায় তদন্ত শুরু করার ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে হোয়াইট হাউসও। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দেশগুলি তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা এমন ভাবে বৃদ্ধি করেছে, যা ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তা ছাড়া কয়েকটি রাষ্ট্র নাকি তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে অল্প দামে বিপুল পরিমাণ পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই কারণেই ওই আইনের ধারা প্রয়োগ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হচ্ছে তাদের।
অন্য দিকে, এই ইস্যুতে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি গ্রির। তাঁর কথায়, ‘‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়ম-বহির্ভূত বাণিজ্য বন্ধ করতে চান। আর তাই ফের শুল্ক চাপাতে পারেন তিনি। আমাদের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন তিনি। পাশাপাশি ঘরোয়া উৎপাদনকে সুরক্ষিত করতে চাইছে ওয়াশিংটন।’’ যদিও এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) পারস্পরিক শুল্কনীতি চালু হওয়া ইস্তক বার বার ভারতীয় পণ্যে শুল্ক বদলেছেন ট্রাম্প। গোড়ার দিকে ২৬ শতাংশ কর আরোপ করে তাঁর প্রশাসন। পরে রাশিয়ার থেকে খনিজ তেল কেনা বন্ধ করতে বলে হুমকি দেয় তাঁর প্রশাসন। নয়াদিল্লি বিষয়টিতে আমল না দেওয়ায় শুল্কের মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। কিন্তু, চলতি বছরে শুল্ক ইস্যুতে চাঞ্চল্যকর রায় ঘোষণা করে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। তখনই বড় ধাক্কা খান ‘পোটাস’।
এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের নীতিকে বাতিল করে আমেরিকার শীর্ষ আদালত। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দেওয়া রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন বা আইইইপিএ-কে (ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট) ব্যবহার করে যে বাড়তি শুল্ক চাপানো হয়েছিল, তা আর কার্যকর হবে না। আদালতে ধাক্কা খাওয়ার পর প্রতিটা দেশের পণ্যে ১৫ শতাংশ সাময়িক শুল্ক নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প।
আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী, মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ১৫০ দিনের বেশি এই ধরনের শুল্ক কার্যকর করা সম্ভব নয়। ফলে ৩০১ নম্বর ধারায় অন্যায্য বাণিজ্যিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া তার মধ্যে ইউএসটিআরকে শেষ করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে ১৬টি দেশের ক্ষেত্রে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ হবে বলে আশাবাদী গ্রিরের কার্যালয়। যদিও সরকারি ভাবে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা যৌথ ভাবে ইরান আক্রমণ করলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। লড়াইয়ের প্রথম দিনেই সাবেক পারস্যের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিকেশ করে ইহুদি ও মার্কিন ফৌজ। প্রাণ হারান তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির একগুচ্ছ পদস্থ আধিকারিক। এর পর হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে প্রত্যাঘাত শুরু করে তেহরান।
পারস্য ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ় প্রণালী হল খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা। ১৬৭ কিমি লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিমি চওড়া ওই সরু একফালি জায়গা দিয়ে দুনিয়ার ২০ শতাংশ তরল সোনা ও এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) সরবরাহ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার যাবতীয় আরব মুলুক। সেই রুট আইআরজিসি অবরুদ্ধ করায় দুনিয়া জুড়ে তৈরি হয়েছে জ্বালানি সঙ্কট। ফলে ওয়াশিংটনের উপর যে চাপ বাড়ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এই পরিস্থিতিতে ভারতকে ৩০ দিনের জন্য রুশ খনিজ তেল কেনার ‘অনুমতি’ দেওয়া হয়েছে বলে হঠাৎই ঘোষণা করে হোয়াইট হাউস। এই নিয়ে হইচই শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ওয়াশিংটনের যুক্তি, নয়াদিল্লি তাঁদের ‘ভাল বন্ধু’ ও ‘ভাল কাজ’ করেছে। সেই কারণেই কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারকে ‘ছাড়’ দিয়েছেন তাঁরা। অন্য দিকে আগামী দিনে ভারতকে বিক্রি করা তরল সোনার পরিমাণ আর প্রকাশ করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে মস্কো।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪০ শতাংশ আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। আর তাই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি, রাশিয়ার উরাল ক্রুডের আমদানি বৃদ্ধি করেছে কেন্দ্র। যদিও আমেরিকার ‘অনুমতি’র বিষয়টি মানতে চায়নি মোদী প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে ৩০১ নম্বর ধারায় তদন্ত শুরু হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার বিষয়টি বিশ বাঁও জলে যেতে চলেছে বলেই মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা।