Advertisement
E-Paper

সোনার কেল্লার খোঁজে

ষাটের দশকে এক জাতিস্মর বালককে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উৎসাহেই কলকাতায় তৈরি হয় প্যারাসাইকোলজি সোসাইটি। অফিস ছিল লালমোহন ভট্টাচার্য রোডে। সেখানে আজীবন সদস্য সত্যজিৎ রায়। ফেলুদার উপন্যাস ও সিনেমার পিছনে রোমাঞ্চকর বাস্তব। সিনেমার জগৎ মানেই কল্পনার দুনিয়া। আপাত দৃষ্টিতে সে জগৎ বাস্তব থেকে যতই দূরে হোক না কেন, তার সৃষ্টির আকর কিন্তু সংগৃহীত হয় চিরপরিচিত বাস্তব থেকেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতেও জাতিস্মর মুকুলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল প্রভু নামের রাজস্থানের এক ছেলে, আর প্যারাসাইকোলজিস্ট ড. হেমাঙ্গ হাজরার মধ্যে ধরা পড়েছিল জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি। এমনকী ‘হাজরা’ পদবি এবং ‘লালমোহন’ নামটাও প্রভু-কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

প্রজিতবিহারী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০০:০০
জাতিস্মর: মুকুল ও নকল ডক্টর হাজরা। ‘সোনার কেল্লা’ (১৯৭৪) ছবির দৃশ্য

জাতিস্মর: মুকুল ও নকল ডক্টর হাজরা। ‘সোনার কেল্লা’ (১৯৭৪) ছবির দৃশ্য

“খোকা, তোমার নাম কী?’’

“আগের জন্মের নাম না এ জন্মের নাম বলব, হুজুর?”

“তোমার আগের জন্মের বাড়ির কথা মনে পড়ে?”

“হ্যাঁ। একটি ছোট্ট দুর্গের ভিতর কয়েকটি বাড়ি আছে। তারই মধ্যে একটা হাভেলি আমার ছিল।”

প্রশ্নকর্তা ভরতপুরের তৎকালীন মহারাজা কিষণ সিংহ, আর উত্তর দিচ্ছিল সেলিমপুর গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে, নাম প্রভু। প্রভু ছিল জাতিস্মর। পূর্বজন্মের অনেক কথা সে হুবহু মনে করতে পারত। এমনকী বলেছিল পূর্বজন্মে হাঠোরি গ্রামে দুর্গের মধ্যে তার হাভেলির সামনে মাটিতে পুঁতে রাখা পাঁচটি পুরনো টাকার কথাও। পরে মহারাজার লোকেদের সামনে মাটি খুঁড়ে উদ্ধারও হয় সেই টাকা। প্রভু নামের সেই রাজস্থানি ছেলেটির গল্পই কি ধরা পড়েছে সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’য়?

সিনেমার জগৎ মানেই কল্পনার দুনিয়া। আপাত দৃষ্টিতে সে জগৎ বাস্তব থেকে যতই দূরে হোক না কেন, তার সৃষ্টির আকর কিন্তু সংগৃহীত হয় চিরপরিচিত বাস্তব থেকেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতেও জাতিস্মর মুকুলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল প্রভু নামের রাজস্থানের এক ছেলে, আর প্যারাসাইকোলজিস্ট ড. হেমাঙ্গ হাজরার মধ্যে ধরা পড়েছিল জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি। এমনকী ‘হাজরা’ পদবি এবং ‘লালমোহন’ নামটাও প্রভু-কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

পঞ্চাশ-ষাটের দশকে হেমেনবাবুর হাত ধরে প্যারাসাইকোলোজি উত্তর ভারতের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়। হেমেনবাবু নিজেও পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, লেবানন থেকে ব্রাজিল, তুরস্ক থেকে মিশর, কোথায় না গিয়েছিলেন তিনি জাতিস্মরদের সন্ধানে! এমনকী প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি, জন এফ কেনেডির মেজো ভাই ববি কেনেডির আততায়ী শিরহান বি শিরহান যখন দাবি করেন যে তিনি আসলে ভূতাবিষ্ট হয়ে খুন করেন, তখন তাঁর দাবির সত্যাসত্য যাচাই করতে ডাক পড়েছিল এই হেমেনবাবুরই!

গবেষক: সম্পূর্ণানন্দের সঙ্গে হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)

হেমেনবাবুর বাবা ছিলেন রেল কর্মচারী। বদলির চাকরিতে সারা জীবনই কেটেছিল উত্তর ভারতের ছোট ছোট রেল স্টেশনে। ১৯৩১ সালের ২৫ অক্টোবর রাজস্থানের আবু রোডে জন্ম হয় হেমেন্দ্রনাথের। এখানেই কাটে তাঁর শৈশব। বাবার চাকরি সূত্রে আসেন মধ্যপ্রদেশের মৌ-এ, সেখানেই শুরু তাঁর স্কুলজীবন। পরে ভর্তি হন অজমেঢ় সরকারি কলেজে। কলেজে পড়ার সময় এক দিন এক পুরনো বইয়ের দোকানে একটি বই দেখেই প্রথম প্যারাসাইকোলজির প্রতি আকৃষ্ট হন। জীবনের মোড় যায় ঘুরে। ১৯৫১-তে বিএ পাস করে চলে যান ইলাহাবাদে। ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন বেশ নামডাক। সেখানে দর্শন বিভাগে এমএ ক্লাসে যোগ দেন। মানুষের মৃত্যুর পর কী ঘটে, তা নিয়ে তখন তাঁর প্রবল অনুসন্ধিৎসা। ১৯৫৩-তে যখন রাজস্থান শিক্ষা দফতরের ছোট্ট একটা চাকরিতে ঢোকেন, কৌতূহল স্তিমিত হয়নি তখনও। চাকরির পাশাপাশি তাই তিনি চালিয়ে যান লেখাপড়া। অবশেষে, ১৯৫৭ সালে রাজস্থানের চাকরির সুবাদে হেমেনবাবু থিতু হন গঙ্গানগরে। সেখানেই স্থানীয় এক বর্ধিষ্ণু পরিবারের আর্থিক আনুকূল্যে তিনি স্থাপন করেন শেঠ সোহনলাল মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট অব প্যারাসাইকোলজি। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবেই ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে শুরু করেন হেমেনবাবু।

শিরোনামে: ষাটের দশকে আনন্দবাজার পত্রিকায় হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে প্রকাশিত খবর। বাঁ দিকে, ওয়েস্ট বেঙ্গল প্যারাসাইকোলজিকাল সোসাইটি-র নামপত্র

ঠিক একই সময় উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, ড. সম্পূর্ণানন্দও প্যারাসাইকোলজি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন। সম্পূর্ণানন্দ ছিলেন পুরনো আমলের কংগ্রেস সোশালিস্ট। এক দিকে তিনি মার্ক্সভক্ত, হিন্দিতে মার্ক্সের অনুবাদক, অন্য দিকে আবার মহাত্মা গাঁধীর দ্বারাও অনুপ্রাণিত। মার্ক্স এবং গান্ধীর টানাপড়েনেই গড়ে উঠেছিল বর্ষীয়ান এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর নিজস্ব এক রাজনৈতিক ভাবাদর্শ। স্বপ্ন দেখতেন বিশ্বভ্রাতৃত্বের, আবার স্থূল বস্তুবাদেরও ঘোর বিরোধী ছিলেন। এমন এক সাম্যবাদের রাজনৈতিক অন্বেষণে ছিলেন, যার ভিত্তি থাকবে আধ্যাত্মিকতা ও জীবপ্রেমের উপর, প্রাতিষ্ঠানিক মার্ক্সবাদের মতো বস্তুবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামে নয়। তাঁর মতে একমাত্র এমন এক আধ্যাত্মিক সাম্যবাদের উপর ভিত্তি করেই নতুন রাষ্ট্র গড়া সম্ভব। তিনি মনে করতেন, আধ্যাত্মিক চেতনাহীন, নিরেট বস্তুবাদী সাম্যবাদ শেষমেষ হয়ে দাঁড়াবে নিছক একটি গোষ্ঠীর অন্য গোষ্ঠীকে নিপীড়ণ করার অজুহাত মাত্র। গণতন্ত্রে তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী নিজের স্বার্থ চাপিয়ে দেবে সংখ্যালঘুর উপর। যদি বিশ্বভ্রাতৃত্বের এমন এক আধ্যাত্মিক ভিত্তির হদিস পাওয়া যায়, তা হলে শুধু তাকে সামনে রেখে গড়া যাবে নতুন সমাজ, নতুন রাষ্ট্র। কিন্তু এই যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের আধ্যাত্মিক ভিত্তি, এর সন্ধান দেবে কে?

সম্পূর্ণানন্দের বিশ্বাস ছিল, এই হদিস দিতে পারে একমাত্র বিজ্ঞান। তবে তা তৎকালীন মূলধারার বিজ্ঞান নয়। তাঁর মতে, সাম্রাজ্যবাদের চাপে বিজ্ঞান লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে। মানুষের আধ্যাত্মিক ঐক্যের সন্ধান না করে, বিজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন রাষ্ট্র, রাজ্য বা গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। যে বিজ্ঞানের মহৎ উদেশ্য হওয়া উচিত ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের আধ্যাত্মিক ঐক্য সাধন, সেই বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে বিধ্বংসী অ্যাটম বোমা তৈরির উপকরণ। যে বিজ্ঞানের দৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল মঙ্গলময়, তা বরং নিক্ষিপ্ত হয়েছে বিষাক্ত গ্যাস, বোমারু বিমানের মতো মারণাস্ত্র তৈরির দিকে। তাই সম্পূর্ণানন্দ চেয়েছিলেন নতুন এক বিজ্ঞান, যা হদিস দেবে নতুন এক মানব সমাজের, যার ভিত্তি হবে আধ্যাত্মিক সাম্যবাদের উপর।

নতুন সমাজের জন্য নতুন বিজ্ঞান, ব্যাপারটা মোটেই নতুন ছিল না। স্বয়ং লেনিন রুশ বিপ্লবের পর নতুন রাষ্ট্রের বিজ্ঞানের নতুন পরিকাঠামো গড়ার ভার দিয়েছিলেন আলেক্সান্দার বোগদানভকে। বোগদানভ ছিলেন কল্পবিজ্ঞান লেখক। তাঁর লেখা কল্পবৈজ্ঞানিক উপন্যাস, রেড স্টার, প্রাক-বিপ্লবী রাশিয়ায় বিপ্লবী মহলে বহুল প্রচার লাভ করেছিল। উপন্যাসটিতে বোগদানভ চেষ্টা করেছিলেন নতুন একটি সাম্যবাদী বিজ্ঞানের চিন্তা করতে। সম্পূর্ণানন্দও সেই ঘরানারই দার্শনিক। আর এই নতুন বিজ্ঞানের সন্ধান করতে গিয়েই তিনি পৌঁছে যান প্যারাসাইকোলজির মুখোমুখি।

স্বাধীন ভারতে তাঁরই উদ্যোগে উত্তরপ্রদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠে প্যারাসাইকোলজি বিভাগ। বিশেষ করে ইলাহাবাদ এবং লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় এই নয়া উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। এ ছাড়া সেই সময় উত্তরপ্রদেশ সরকার এই বিষয়ে গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্রও গঠন করেন। ড. যমুনা প্রসাদের নেতৃত্বাধীন এই কেন্দ্রটি পুনর্জন্ম ছাড়াও নানান বিষয়ে গবেষণা চালায়। সে সব গবেষণার মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ইন্দ্রিয়-বহির্ভূত জ্ঞান বা ‘এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশন’ বিষয়ক। এই গবেষণার সঙ্গে হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও যুক্ত হন। সম্ভব এই সময়ই হেমেনবাবু ও তাঁর কাজ সম্পূর্ণানন্দের দৃষ্টিগোচর হয়।

পরবর্তী কালে যখন দিল্লিতে কংগ্রেস নেতারা ঠিক করেন যে সম্পূর্ণানন্দকে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে, তখন তাঁকে রাজস্থানের রাজ্যপালের পদাভিষিক্ত করা হয়। সালটি ছিল ১৯৬২। রাজ্যপাল রূপে কার্যভার গ্রহণ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, সম্পূর্ণানন্দ হেমেনবাবুকে বলেন, তাঁর গঠিত বেসরকারি গবেষণা কেন্দ্রটি জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও রাজ্যপাল সেই মর্মে আদেশ দেন। ফলস্বরূপ, শেঠ সোহনলাল মেমোরিয়াল প্রায় রাতারাতি হয়ে যায় জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইকোলজি বিভাগ।

ষাটের দশকের প্রথম ভাগটা ছিল ভারতে প্যারাসাইকোলজির স্বর্ণযুগ। হেমেনবাবুর নামডাক তত দিনে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। রুশ, মার্কিন, তুর্কি, নানা দেশের বিজ্ঞানীরা তখন তাঁর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বহু মানুষ ও সংস্থা তাঁর গবেষণার জন্য আর্থিক সাহায্য দিতে উৎসুক। দেশে-বিদেশে নানান পত্রপত্রিকায় প্রায়শই তাঁর গবেষণার কথা ছাপা হচ্ছে।

জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবগঠিত প্যারাসাইকোলজি বিভাগটির নানান কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম ছিল বিশদ এক প্রকাশনা সূচি। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব প্যারাসাইকোলোজি’ নামক একটি সাময়িক গবেষণাপঞ্জি ছাড়াও বিভাগটি পুনর্জন্ম বিষয়ক কয়েকটি প্রাতিস্মিক ঘটনার একক বিবরণীও বই আকারে প্রকাশ করতে থাকে। এই বইগুলির শিরোনাম দেওয়া হত ‘আ কেস সাজেস্টিভ অব এক্সট্রা-সেরিব্রাল মেমরি’। হেমেনবাবুর বক্তব্য ছিল— পুনর্জন্ম, জাতিস্মর, আত্মা ইত্যাদি শব্দের মধ্যে ধার্মিকতার আভাস পাওয়া যায় এবং তাই সেগুলি ঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হয়ে উঠতে পারবে না। তাঁর মতে, জাতিস্মর বলতে আমরা যা বুঝি তার মূলে রয়েছে এমন কোনও অজানা উপায় যার দ্বারা একটি মৃত মানুষের স্মৃতি আর একটি মানুষের চেতনায় প্রকাশ পাচ্ছে। যদিও সাধারণত আমরা স্মৃতির অবস্থান মস্তিষ্কে বলেই মনে করি, জাতিস্মরের ক্ষেত্রে স্মৃতির উত্তরাধিকারে মস্তিষ্কের কোনও প্রত্যক্ষ অবদান থাকছে না। তাই হেমেনবাবুর মতে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে জাতিস্মরের ঘটনা হল আদতে ‘এক্সট্রা-সেরিব্রাল মেমরি’ বা মস্তিষ্কাতিরিক্ত স্মৃতির ঘটনা। ‘আত্মা অবিনশ্বর’ ইত্যাদি ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে এই মস্তিষ্কাতিরিক্ত স্মৃতির কোনও সম্বন্ধ তো নেই-ই, বরং বৈজ্ঞানিক কাজে এ সব শব্দ আরও জটিলতা সৃষ্টি করে।

মস্তিষ্কাতিরিক্ত স্মৃতি বিষয়ক যে বইগুলি জয়পুর থেকে হেমেনবাবু প্রকাশ করেন, তার মধ্যে প্রথমটাই ছিল প্রভুকে নিয়ে। প্রভুর জন্ম ১৯১৯ সালে, তৎকালীন স্বাধীন ভরতপুর রাজ্যের সেলিমপুর গ্রামে। তার বয়স যখন সাড়ে তিন, তখন প্রভু হঠাৎই মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে তার পূর্বজন্মের কথা বলতে থাকে। তার মা তাকে ঘুম পাড়াবার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রভু বলে যে সে পূর্বজন্মে হাঠোরি নামের ছোট্ট এক গ্রামে থাকত। গ্রামটি ছিল একটি দুর্গের মধ্যে। প্রভুর পূর্বজন্মের নাম ছিল হরবক্স। জাতিতে সে ছিল ব্রাহ্মণ এবং যজমানি করে তার বেশ ভালই চলত। গ্রামের জমিদার বংশের পৌরোহিত্য করত হরবক্স। প্রভু তার পূর্বজন্মের নামধাম, ছেলেমেয়েদের নাম, ভাইদের পরিচয় ইত্যাদি নানা তথ্য দেয়। ঘটনাটি ভরতপুরের মহারাজার কর্ণগোচর হতে তিনি এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রভুকে তাঁর প্রাসাদে নিয়ে এসে তিনি নিজে তাকে পরীক্ষা করে দেখেন। যখন দেখেন যে প্রভু পূর্বজন্মের নানান পরিচিত ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনা সঠিক ভাবে চিনতে পারছে, তখন তিনি রায়বাহাদুর শ্যাম সুন্দরলালের নেতৃত্বে এই কেসটি আরও বিশদে ও বৈজ্ঞানিক ভাবে অনুসন্ধান করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির রিপোর্টের উপর নির্ভর করে, ১৯৬৪ সালের শীতকালে হেমেনবাবু জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে আবার কেসটি নিয়ে গবেষণা করেন।

হেমেনবাবুর সেই গবেষণার বিশদ বিবরণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। তাতে রয়েছে নানান চমকপ্রদ ঘটনার বিবরণ। তবে ‘সোনার কেল্লা’র সূত্রে দেখলে, প্রভু সংক্রান্ত মূল ঘটনাটি ছাড়াও, দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম হল ‘শিবকুমার ডুবে হাজরা’ নামটা। হরবক্সের বিষয়ে বিশদ ভাবে জানতে হেমেনবাবু নানান ব্যক্তির দ্বারস্থ হন। অবশেষে হাঠোরির এক গ্রামবাসী তাঁকে জানান যে হরবক্সের জীবন ও বংশের সব থেকে বিশদ বিবরণ দিতে পারবে একমাত্র তাদের পারিবারিক পান্ডা, শিবশঙ্কর লাপসিয়া। হেমেনবাবু তাঁর কথামতো শিবশঙ্করের সন্ধানে যান বিহারের সারনে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে শিবশঙ্কর বহু কাল গত হয়েছেন। তবে মৃত্যুর আগে অপুত্রক শিবশঙ্কর তাঁর সমস্ত যজমানি খাতাপত্র দিয়ে গেছেন তাঁর দুই জামাইকে। অবশেষে ছোট জামাই, শিবকুমার ডুবে হাজরার কাছেই হেমেনবাবু খুঁজে পান হরবক্সের বংশের বিশদ বিবরণ। ‘হেমাঙ্গ হাজরা’ নামটার মধ্যে কি লুকিয়ে রয়েছে হেমেনবাবু ও পান্ডা শিবকুমার হাজরার আলাপের ইতিহাস?

দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, হেমেনবাবু যখন সেলিমপুর ও হাঠোরি গ্রাম পরিদর্শনে যান, তখন মরুভূমির মধ্যে দু-দু’বার তাঁদের গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। প্রথম বার রাস্তা খারাপ থাকায় ইঞ্জিনের অনেক পার্টস খুলে পড়ে যায় এবং গাড়িটিকে শেষে ভরতপুরের মহারাজের গ্যারাজে ফেরত পাঠাতে হয়। পরের বার এমন জায়গায় গাড়ি খারাপ হয় যে করার কিছুই ছিল না। ড্রাইভার যত ক্ষণ গাড়ি সারান, হেমেনবাবু ও তাঁর সঙ্গীদের বসে থাকতে হয় রাস্তার ধারে। মরুভূমির শীতে ঠকঠক করে কাটে তাঁদের প্রায় গোটা একটি রাত। এ সবেরই বিশদ বিবরণ রয়েছে হেমেনবাবুর প্রভুকে নিয়ে লেখা বইটিতে। এখানেই কি ‘সোনার কেল্লা’র সন্ধানে গিয়ে ফেলুদা, তোপসে ও লালমোহনবাবুর শীতের রাতে মরুভূমির মাঝে রেল স্টেশনে বসে থাকার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়?

তবে হেমেনবাবুর গবেষণা ও প্রভুর স্মৃতি, সবই হয়তো থেকে যেত সত্যজিতের অজানা, যদি না এক দিন হঠাৎ করেই হেমেনবাবুর পরিচয় হত বিমল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবারের ছেলে বিমলবাবুর ছিল বহুমুখী প্রতিভা। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাকা বিমলবাবুর সঙ্গে হেমেনবাবুর আলাপ হয় এক বন্ধুর বাড়ি। প্রথম আলাপেই আড্ডা জমে ওঠে। হেমেনবাবু আক্ষেপ করে বলেন যে প্যারাসাইকোলজির এত বাড়বাড়ন্ত হওয়া সত্ত্বেও কলকাতা শহরে এ বিষয়ে কোনও সংগঠিত আলোচনা দানা বাঁধছে না। বিমলবাবুর গোড়া থেকেই অলৌকিক নানান বিষয়ে আগ্রহ ছিল, তাই তিনিও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। সে দিন রাতে বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুই নতুন বন্ধু সোজা চলে আসেন বিমলবাবুর লালমোহন ভট্টাচার্য রোডের বাড়িতে। সেখানে অনেক রাত অবধি চলে আড্ডা, আলোচনা। ঠিক হয়, বিমলবাবু কলকাতায় তৈরি করবেন নতুন একটি সংগঠন, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল প্যারাসাইকোলজি সোসাইটি’। জয়পুর ফিরে গিয়েও হেমেনবাবু এ কথা ভুললেন না। বারবার ফোন করে বিমলবাবুকে তাড়া দিতে লাগলেন।

বিমলবাবু তাঁদের পরিকল্পনার কথা বললেন তাঁর চেনাজানা নানান বিদ্বজ্জনকে। সকলেই উৎসাহ দেখালেন। অবশেষে বিমলবাবুর পারিবারিক বন্ধু, কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ড. প্রশান্তবিহারী মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৈরি হল ওয়েস্ট বেঙ্গল প্যারাসাইকোলজি সোসাইটি। সোসাইটির রেজিস্টার্ড অফিস হল বিমলবাবুর লালমোহন ভট্টাচার্য রোডের বাড়িতে। তৎকালীন বঙ্গসমাজের বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ সোসাইটির সদস্য হলেন। গোড়ার দিকের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। এর কিছু দিন বাদেই সত্যজিৎ রায় যোগ দিলেন সোসাইটিতে। উত্তমকুমারের মতো সত্যজিৎও হলেন লাইফ মেম্বার। সোসাইটির কাজকর্মের মধ্য দিয়েই সত্যজিতের সঙ্গে বিমলবাবুর পরিচয় ঘনীভূত হল। সোসাইটির মাধ্যমে হেমেনবাবুর গবেষণা বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠলেন সত্যজিৎও।

তত দিনে ষাটের দশক প্রায় শেষ। রাজ্যপাল সম্পূর্ণানন্দের মেয়াদ ফুরিয়েছে, তিনি রাজস্থানের গদি ছেড়েছেন। ও দিকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক মতাদর্শও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছিল। নতুন নেতারা আধ্যাত্মিকতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের সুলুকসন্ধানের থেকে বিজ্ঞানের মাধ্যমে ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকেই বেশি আগ্রহী। এরই মধ্যে জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয় প্যারাসাইকোলজি বিভাগটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। হেমেনবাবু তখন গবেষণার কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। হঠাৎ এক দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভাগের গবেষণার সব কাগজপত্র অজ্ঞাত কোনও স্থানে স্থানান্তরিত করে বিভাগের দফতরে তালা মেরে দিল। হেমেনবাবুর পরিকরদের মধ্যে অন্যতম, এ কিউ আনসারি ছুটে গেলেন হেমেনবাবুর স্ত্রীর কাছে। তিনি গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে। দ্বারস্থ হলেন খবরের কাগজেরও। কিন্তু লাভ হল না। এর মধ্যেই শুরু হল বাংলাদেশ যুদ্ধ। তখন আর পুনর্জন্ম নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই কারও।

সত্যজিৎ রায় কিন্তু ব্যাপারটা ভোলেননি। এক দিন সকালে হঠাৎই বিমলবাবুকে ফোন করলেন তিনি। এক বার আমার বাড়ি আসতে পারবেন? দরকার আছে। পর দিন বিমলবাবু সত্যজিতের বাড়ি আসতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘‘প্যারাসাইকোলজি নিয়ে একটা গল্প লিখেছি।’’ এরও কয়েক বছর পরে গল্পটা পরিণত হল ‘সোনার কেল্লা’ সিনেমায়। আবার ডাক পড়ল বিমলবাবুর। এ বার সত্যজিতের আবদার, তাঁকেও অভিনয় করতে হবে ছবিতে। বিমলবাবুর কোনও অজুহাতই তিনি মানবেন না। অগত্যা বিমলবাবু হয়ে গেলেন ‘সোনার কেল্লা’র নকল মুকুলের দাদু। সাদা কাগজে সত্যজিতের নিজের হাতে বিমলবাবুর জন্য লেখা ‘সোনার কেল্লা’র সংলাপ আজও সযত্নে রেখে দিয়েছেন বিমলবাবুর ছেলে চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।

কেন সত্যজিৎ বিমলবাবুকে ‘সোনার কেল্লা’য় অভিনয় করাতে এত আগ্রহী হলেন? তিনি কি চেয়েছিলেন বিমলবাবুর মাধ্যমে দর্শকদের একটি সুপ্ত ইঙ্গিত দিয়ে যেতে যে এটি শুধুই কাল্পনিক এক আখ্যান নয়? ‘সোনার কেল্লা’ বইয়ে, এবং আরও বেশি করে সিনেমায় সত্যজিৎ কি তাই ছড়িয়ে রেখেছিলেন এতগুলো সঙ্কেত? বারবার করে যেন দর্শকদের মনে করিয়ে দিতে চাইছিলেন গল্পের পিছনে চমকপ্রদ বাস্তব ঘটনাগুলি! লালমোহনবাবুর নামের মধ্যে তাই মিশে আছে প্যারাসাইকোলজি সোসাইটির ঠিকানা, ‘হেমাঙ্গ’ নামের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে হেমেনবাবুর গবেষণা, ‘হাজরা’ পদবীটি ইঙ্গিত করছে সারনের সেই পান্ডার কাহিনি, মরুপথে গাড়ি খারাপ হওয়ার দৃশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছে হেমেনবাবুদের সেলিমপুর যাত্রার ইতিহাস, কেল্লার ভিতর ছোট্ট গ্রাম এবং তারও মধ্যে ভগ্ন পোড়ো বাড়ি হাতছানি দিচ্ছে হাঠোরির প্রায়-বিস্মৃত দুর্গের দিকে, মুকুলের মাঝরাতে জেগে উঠে বাড়ি যাওয়ার আবদারের মধ্যে আছে জাতিস্মর প্রভুর ছেলেবেলার কথা! আর রুপোলি পর্দায় আছেন সশরীরে বিমলবাবু, এই ভুলে যাওয়া ইতিহাসের স্মারক হয়ে!

Satyajit Ray Feluda Sonar Kella Parapsychological Society
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy