E-Paper

অমনোনীতা

বিভা দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গিয়ে লোকটির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “আস্তে আস্তে উঠুন, আমি হাত ধরছি আপনার।”

বাসুদেব মালাকর

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫২
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

এমন একটা বিস্ময়কর ঘটনা দিয়ে দিনটি শেষ হবে, বিভা সকালেও বুঝতে পারেনি! অটো থেকে নেমে সে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল।

অঘ্রান মাস। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। চরাচরে হালকা কুয়াশার ছোঁয়া। পথটুকু কম নয়। একটি পরিত্যক্ত গোডাউনের পিছন দিয়ে বেশ লম্বা একটা ইটের রাস্তা, সেটা পেরিয়ে বড় রাস্তা— সেখানে অনবরত গাড়ি চলাচল করছে। সেটা আড়াআড়ি পার হয়ে খানিকটা এগিয়ে বাঁ-দিকে আর একটা সরু রাস্তা ঢুকে গিয়েছে বিভাদের পাড়ায়।

পাড়ার দু’পাশে ঝোপঝাড়, বাগান, পুকুর। সেই রাস্তার শেষে তাদের বাড়ি। বাড়িতে সে আর মা। বাবা বছরকয়েক আগে মারা গিয়েছেন।

বিভার পুরো নাম বিভাবরী। সবাই সেটাকে ছোট করে নিয়েছে। মাসতিনেক হল, সে অনেকটা দূরের একটি বেসরকারি স্কুলের টিচার হিসেবে যোগ দিয়েছে। সেখান থেকেই ফিরছিল।

ইদানীং তাদের পাড়াটা আর আগের মতো নেই। কিছু গুন্ডা-মস্তান টাইপের ছেলে জুটেছে, অশ্রাব্য তাদের মুখের ভাষা! পিছনে খুঁটির জোর আছে। যে কোনও উপলক্ষে চাঁদা তুলে বিকট শব্দে সারা রাত ডিজে বাজিয়ে নেশার আসর বসায়, বাজি ফাটায় নানা উপদ্রব করে।

সেই রকমই কয়েক জন দুলালের চায়ের দোকানের সামনে সেদিনও ছিল। চেনা দৃশ্য। তবে যা আলাদা তা হল, রাস্তার পাশে একটা বাইক কাত হয়ে পড়ে আছে, একটা লোক, সম্ভবত যুবক এবং আহত— কপালের এক পাশ চেপে ধরে মুখ নিচু করে বাইকের পাশে বসে। ছেলেগুলো খুব তড়পাচ্ছে! একপ্রস্ত মারধরও দিয়েছে নির্ঘাত।

বিভার মাথায় রক্ত চড়ে গেল! কড়াস্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে রে? ও কে? ওকে মেরেছিস তোরা?”

একটা ছেলে বলল, “হ্যাঁ মেরেছি! তো? কী করবেন? আমাদের কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতলের উপর দিয়ে বাইক চালিয়ে দিয়েছিল!”

বিভা দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গিয়ে লোকটির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “আস্তে আস্তে উঠুন, আমি হাত ধরছি আপনার।”

লোকটি মুখ তুলে তাকাতেই, সেই আবছা অন্ধকারেও বিভা তাকে চিনতে পারল! এবং কী এক বিতৃষ্ণায় মনটা ভরে উঠল। আবার পলকেই সেটা সরে গিয়ে মনটা কোমলও হয়ে গেল!

বাবা মারা যাওয়ার পরে সুজয় মাকে নিয়ে খুব আতান্তরে পড়ে গিয়েছিল। তার উপরের দুই দাদা বিজয় অজয় কেউই মায়ের পুরো দায়িত্ব নিতে চাইছিল না। বাবার পেনশন ছিল না। ফলে মা একেবারে দু’ছেলের হাততোলা হয়ে পড়ল। বিজয়ের পোস্টিং জলপাইগুড়িতে। অজয় বাড়িতে আছে যদিও, কিন্তু বৌদি আর এখানে থাকতে চাইছিল না। অজয়ের অফিসের কাছাকাছি ফ্ল্যাট নিয়ে চলে যাওয়ার কথা চলছে। সুজয়ের ভরসা বলতে তখন হাওড়ার এক কারখানায় হাজার পনেরো টাকার একটি অস্থায়ী চাকরি। অজয় বৌদিকে নিয়ে চলে গেলে মাকে কে দেখাশোনা করবে! মায়ের নার্ভের সমস্যা আছে— ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না।

বড়বৌদিই তখন সমাধান বাতলে দিয়েছিল। শাশুড়িকে বলেছিল, “সুজয়ের একটা বিয়ে দিন। ওর বৌ এসে আপনার দেখাশোনা করতে পারবে। ওরও তো বিয়ের বয়স হয়েছে।”

পনেরো হাজার টাকার অস্থায়ী চাকরির উপর ভর করে বিয়ে! সুজয় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তার আপত্তিতে কান না দিয়ে বড়দা-মেজদা-বৌদিরা মিলে এক জন স্থানীয় ঘটকও ঠিক করে ফেলল! কিন্তু পনেরো হাজার টাকার চাকুরের হাতে কে মেয়ে দেবে! ঘটক ঠোক্কর খেতে খেতে নানা জায়গায় হন্যে হয়ে ছুটতে লাগল! কিছুতেই আর শিকে ছেঁড়ে না!

শেষে এক দিন এসে বলল, “এবার আর ফস্কাবে না! মেয়ে রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। তবে একেবারে হাঁড়ির হাল! বাপ নেই, মা আছে। কিন্তু মা-মেয়ের দিন চলা ভার!”

মায়ের আসন্ন দুর্দশার কথা ভেবে সুজয় ওদের কথা অমান্য করতে পারেনি। সে-ও পাত্রী দেখতে গিয়েছিল। সঙ্গে দুই বৌদি ও মেজদাও ছিল।

পাত্রীর ঘরবাড়ির দীনহীন দশা। তবে মেয়েটি লেখাপড়া জানে— এমএ পাশ। দুই বৌয়ের কেউই কলেজের গণ্ডি টপকায়নি। মেয়েটা দেখতেও বৌদিদের থেকে সুন্দরী। দুই জায়ের চোখে-চোখে একটু হীনম্মন্যতাসঞ্জাত ঈর্ষার নীল বিদ্যুৎ খেলে গেল গোপনে।

সামান্য সাজগোজ করে সামনে এল মেয়েটি। দেখা গেল, তার চলনটি ঠিক স্বাভাবিক নয়। পদক্ষেপে ডাইনে-বাঁয়ে একটু-একটু দুলুনি আছে।

বড়বৌদি রাখঢাক না করেই জিজ্ঞেস করল, “তোমার পায়ে কি কোনও সমস্যা আছে?”

মেয়েটি মৃদুস্বরে বলল, “হ্যাঁ, আমার ডান পা-টা আধ ইঞ্চি ছোট।”

“চলাফেরা করতে অসুবিধা হয় না?”

“না তো! স্লিপারের হিলের হাইটটা একটু বাড়িয়ে নিই। তখন বোঝা যায় না।"

সুজয় গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল তাকে। গভীর কালো চোখ, বিষাদে-পুলকে মাখামাখি! মেয়েটিও দু’বার পূর্ণদৃষ্টিতে দেখেছিল সুজয়কে।

ঘটককে ওখানেই তুলোধোনা করল দুই বৌ। মেয়ের মাকে বলল, “মেয়ের খুঁত লুকিয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য এতদূর থেকে ডেকে এনেছেন আমাদের! ছিঃ!” মেয়েটি আঁচল কামড়ে ধরে মাকে নিয়ে উঠে চলে গেল।

তার পরে বেশ কয়েক মাস কেটে গিয়েছে। সুজয় পাড়ারই একটি মহিলাকে কিছু টাকা দিয়ে দিনের বেলাটুকু মায়ের দেখাশোনার জন্য রেখেছে। বড়দা-মেজদা চলে গিয়েছে নিজ-নিজ গন্তব্যে। সুজয় ছোট একটা সরকারি চাকরি পেয়ে কারখানার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে।

বাইক ঠেলতে ঠেলতে সুজয় বলল, “আমি আপনার কাছে, মায়ের কাছেই যাচ্ছিলাম ক্ষমা চাইতে। সেদিন যে ব্যবহার করেছিলাম আমরা... রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওরা গুলতানি করছিল। কোল্ডড্রিঙ্ক-টিঙ্ক অজুহাত— বাইকটা টার্গেট ছিল!”

“এত দিন পরে আমাকে যে এখানে পেতেনই, তার কোনও গ্যারান্টি ছিল?”

“ছিল! অন্তত খোঁজটুকু তো পেতে পারতাম!”

সুজয়ের ডান হাত বাইকের হ্যান্ডলে, বিভা তার উপর বাঁ-হাতটা রেখে নিঃশব্দে বলল, ‘আমাকে খোঁজ না তুমি বহুদিন...এক নক্ষত্রের নীচে তবু... আমরা দু'জনে আছি...’

বিভাদের বাড়ির দরজা এসে গেল। সন্ধ্যাও ঘন হয়ে আসছে।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy